অগ্নিযুগের বিপ্লবী কমরেড আব্দুর রাজ্জাক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আবুল হোসেন : ১৪ মার্চ ’১৭ আরও একটি মহা প্রয়াণ দিবস নীরবে নিভৃতে পেরিয়ে যাচ্ছেন কমরেড আব্দুর রাজ্জাক। আমরা কিছুই করতে পারি নাই। একথা ভাবতে নিজের কাছে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। অথচ ক্লান্তিহীন জীবনে শেষ দিন পর্যন্ত কমরেড আব্দুর রাজ্জাক কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি ছিলেন দৃঢ়, অবিচল। কোনো ঘটনাই তাঁকে দোলাচলে ফেলতে পারেনি। সমাজের অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের মনোবল ভেঙে দিত, কিন্তু কমরেড আব্দুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে গেলে আমরা সাহস মনোবল নিয়ে ফিরে আসতাম। আবার নতুন উদ্যমে শুরু হতো পথচলা। কমরেড আব্দুর রাজ্জাক ছাত্র জীবনেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ এবং ঢাকা আইন কলেজ থেকে আইনে স্নাতক পাস করেন। অল্পদিন আইন পেশায় থাকলেও খুবই সুনাম অর্জন করেন। যা এখনও প্রবীন আইনজীবীদের মধ্যে আলোচিত বিষয়। কমরেড আব্দুর রাজ্জাক ১৯৪৮ সালে অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। উপমহাদেশের সাড়া জাগানো সে কালের কৃষক আন্দোলন তথা তেভাগা আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। সময়ের বাঁকে বাঁকে পার্টি বেআইনি থাকাকালে আত্মগোপনে থেকেছেন দীর্ঘসময়। স্বদেশী আন্দোলন করতে গিয়ে গোপন অবস্থায় ছদ্মনামে খুলনার নিভৃত গ্রামের এক হিন্দু পরিবারে গোপাল নামে জনৈকা মাসিমার বাড়িতে থাকা অবস্থায় কমরেড আব্দুর রাজ্জাক পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ছাড়া পাওয়ার পর প্রথমেই ঐ মাসিমার সাথে দেখা করতে যান। ততক্ষণে মাসিমা জেনে যায় গোপাল নয় ঐ ব্যক্তি আব্দুর রাজ্জাক। মাসিমার সাথে দেখা করে কমরেড নিজের পরিচয় বলতে গেলে মাসিমা তাকে স্বাদরে গ্রহণ করে বলেন- “তুই রাজ্জাক নয়, তুই আমার গোপাল”। একইভাবে আত্মগোপনে পালিয়ে যাওয়ার পথে চুয়াডাঙ্গা রেল স্টেশনে নেমে পালাবার সময় পুলিশ পিছু নেয়। স্টেশনের পাশে ঝুপড়িতে ঢুকে ল্যাম্প জেলে বসে থাকা অপরিচিত মহিলাকে ‘মা’ ডেকে নিজের স্বদেশী পরিচয় দিয়ে বিপদের কথা জানালে মহিলা ল্যাম্প নিভিয়ে নিজের সন্তানের মতো পাশে স্বামীর বিছানায় লুকিয়ে রেখে পুলিশকে সন্তান পরিচয় দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। মহিলার স্বামী ফিরলে তাকে জানিয়ে রাতে আশ্রয় দিয়ে পরে নিরাপদে যেতে সাহায্য করে। এমন মা ও মাসিমাদের আর কখনও খোঁজ নিতে পারে নাই বলে নিজের ভিজে ওঠা চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো প্রকাশ করেছিলেন সেদিন। অনেক সময় ছদ্মনামে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও জীবন বাজী ধরে পার্টির কাজ করেছেন। যে সমস্ত এলাকায় থেকেছে সেমস্ত কর্ম এলাকায় সাধারণ মানুষ এমনকি শিশুদের সাথেও তার ছিল নাড়ির সম্পর্ক। সমাজের সকল প্রকার শোষণ-বঞ্চনার অবসান করে একটি সাম্যবাদী সমাজ গড়াই ছিল তাঁর রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। একারণে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাঙার ভ্রান্তনীতি কখনো তিনি মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তিকালে দৃঢ় ও দ্বিধাহীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেন তাঁর পৈত্রিক বাড়ি যে দেশেই পড়বে সেখানে তিনি বসবাস করবেন। ঘটনাক্রমে তাঁর পৈত্রিকবাড়ি বর্তমান ভারত সীমান্তের খুব কাছে ২/১শ গজ দূরে বাংলাদেশের মধ্যে যশোর জেলার শার্শা উপজেলার নারকেল বাড়িয়া গ্রামে পড়ে। ’৪৭ এ ভারত বিভাগের পর ঢাকায় এসে সাংবাদিকতা পেশয়ায় কিছুদিন যুক্ত ছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় এক সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫২‘র ভাষা আন্দোলনে, ৫৪‘র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, ৬২‘র শিক্ষা আন্দোলনেও আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কারাবরণ করেন। ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান ও ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য। পাক আমলে, কমিউনিস্ট পার্টি বে-আইনি থাকায় পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) পূর্ব পাকিস্তান শাখার সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও যশোর জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ৬০ এর দশকে তিনি একবার যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতিকালে কারফিউ ভাঙার দায়ে পাক বাহিনীর হাতে তিনি শারীরিক ভাবে নিগৃহীত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাঙালি সমাজ এবং সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের সমর্থন ও সহযোগিতা অর্জনে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তি বাহিনীতে বাম রাজনৈতিক কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ায় তাঁর অবদান ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ ক্যাম্পে ব্যবস্থাপনায় তিনি অপরিসীম অবদান রেখেছিলেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ এর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও যশোর জেলা সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ন্যাপ বিভক্তির পর তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে ফিরে আসেন এবং যশোর জেলা কমিটিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আবার গ্রেপ্তার হন এবং কারাবরণ করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নিপীড়ন, জেলজুলুম সহ্য করেছেন। কিন্তু মেহনতি মানুষের সংগ্রাম থেকে কখনই পিছু হটে আসেন নাই। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক শিবিরে বিপর্যয়ে কমরেড আব্দুর রাজ্জাক খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন, কিন্তু ভেঙে পড়েননি। তিনি বলতেন, “সমাজতন্ত্র-অজেয়, কমরেড ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন”। ১৯৯৩ সালে আমাদের পার্টিতে বিপর্যয় নেমে আসলেও কমরেড আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন পার্টির পক্ষে অবিচল। তাঁর শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্য তাকে কখনও থামিয়ে দিতে পারেনি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই কোনো ঘটনা ঘটুক তার চোখ এড়িয়ে যেত না। বিশেষ করে কমিউনিস্ট মুভমেন্ট, শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন, কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির বাহিরে ছিল না। শেষ জীবনে অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রতিটি ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে করণীয় কী হবে তা উল্লেখ করে চিঠি লিখতেন। কখনও পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি, সম্পাদক এবং সাথে আমাদেরকেও। এমন কয়েকশ চিঠি যা আমি সংগ্রহ করেছি। তার চিঠিগুলোতে শুধু কুশল বিনিময় থাকতো না। বর্তমান দেশের রাজনীতির অবস্থার বর্ণনা থাকতো, সাথে সাথে আমাদের করণীয় সম্পর্কেও লিখতেন। ১৯৯৩ সালের পর কমরেড আব্দুর রাজ্জাক যশোর জেলা পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, একই সাথে পার্টির কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি পার্টির জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন। কমরেড আব্দুর রাজ্জাক সারা জীবনই সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে যুক্ত থেকেছেন। এই নিত্য কল্যাণকামী মানুষটা ছিলেন একেবারেই প্রচারবিমুখ। শত ব্যস্ততার মধ্যে সকল সুহৃদকে স্মরণ করতেন, চিঠি লিখতেন পোস্ট কার্ডে। প্রয়াত কমরেড আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ১৩২৩ সালের ২ কার্ত্তিক যশোর জেলা শার্শা থানাধীন নারকেল বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কমরেড আব্দুর রাজ্জাক তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ প্রতীম মাস্টার নুর জালালের কন্যা রিজিয়া বেগমকে বিবাহ করেন। তিনি ৪ পুত্র ২ কন্যার জনক। অগ্নিযুগের এই বিপ্লবী বাংলা ১৪১১ সালের ৩ ফাল্গুন (২০০৫ সালের ১৪ মার্চ) নড়াইল শহরস্থ নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লেখক : যশোর পার্টির সদস্য ২২ কার্তিক আমাদের একটি স্মরণীয় দিন। কমরেড আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ২২ কার্তিক ১৩২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। অগ্নিযুগের এই বিপ্লবী কমরেডের জন্মদিনের অনুষ্ঠান অনাড়ম্বরভাবে হলেও তা পালন করে বিপ্লবী দিনের গল্পে আমরা সতেজ হতাম। এমন একটি জন্মদিন ২২ কার্তিক ১৪০৬ সন্ধ্যা ৬.০০ টায়। কমরেড তাঁর জন্মদিনের অনুভূতি নিজ হাতে লিখে আমাদের পড়ে শোনালেন। “আমার ৮২তম জন্মদিনে আপনারা বৃদ্ধ-যুব-কিশোর-শিশু সকলে যে আনন্দ উপভোগ করিতেছেন তার জন্ম আমিও আনন্দিত। আপনাদের সকলের জন্য আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা স্নেহ রইল। আপনাদের সকলকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করি। বয়স্কতার কারণে আমার শরীর দুর্বল কিন্তু আপনাদের সান্নিধ্য সহানুভূতি, সাহচর্য্য আমার মনের শক্তিকে কখনই দুর্বল হতে দেয়নি। আমার জীবনের সমাপ্তির পূর্বেই বিংশ শতাব্দির শেষ। ঊনবিংশ শতাব্দির শেষদিন রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন শতাব্দীর শেষ সূর্য অস্ত গেল রাগের সাধে। তখনই রুশ-জাপান যুদ্ধ চলছিল। আর আজ বিংশ শতাব্দি একশো বছর শেষ হচ্ছে পুঞ্জীভূত আনবিক বোমার আবৃত হয়ে। বর্তমানে পৃথিবীর বারো রাষ্ট্রের হাতে যে পরিমাণ আনবিক বোমা গচ্ছিত আছে তা ব্যবহার করলে আমাদের বাসোপোযোগী পৃথবীর আয়তনের পঞ্চাশটি পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে। মানুষের শ্রম আজ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়ে পৃথিবী ধ্বংসী মারণাস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার হচ্ছে। বিংশ শতাব্দিতে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটেছে। কিন্তু তার মালিকানা কতিপয় মানুষের হাতে আটকে যাওয়ায়, আর তারা অর্থ পুঞ্জীভূত করার আবিষ্কার গুলি ব্যবহার করায় মানুষের সুষম স্বাচ্ছন্দ্য সভ্যতার অগ্রগতি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধ্বংস হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে সভ্যতা অগ্রসর না হয়ে মানব সমাজ আজ বিকৃতির পথে এগুচ্ছে। বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়ে সভ্যতার বিপরীত খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা নিষ্ঠুর লোভাতুর শক্তি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজ আতঙ্কিত। সাধারণ মানুষের খাদ্য বস্ত্র চিকিৎসা সৎ শিক্ষা আজ ব্যাহত, বাধাপ্রাপ্ত। অপসংস্কৃতি প্রবলবেগে সুস্থ সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে। পৃথিবী আজ ধনবাদী মুনাফাখোর সমাজব্যবস্থায় বিশ্বায়িত হওয়ায় মানুষ জীবশ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কতিপয় দুর্লোভী মুনাফাখোরের খপ্পরে পড়ে সত্যিকার মানবিক গুণাবলিগুলি হারাইয়া ফেলিতেছে। তবে মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ সাধারণ মানুষের ক্ষমতা অসীম। আপনারা সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করিলে এই অবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ বিশ্বাস আমার দৃঢ়। আপনারা অগ্রসর হউন। আমি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনাদের সহিত একাত্ম্য হয়ে আছি। আপনাদের নিত্য শুভেচ্ছাকামী সহযোগী। বিনীত- আব্দুর রাজ্জাক।”

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..