গণমানুষের লড়াই মুক্তিযুদ্ধ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাঙালির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রাম ‘পাকিস্তানকে দু’টুকরো করা’র জন্য লড়াই ছিল না। তা কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন ছিল না। তা ছিল ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম’-এর ধারায় পরিচালিত একটি লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ভৌগলিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে অর্জনের তাৎপর্য আরো অনেক গভীর। পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত জাতিগত শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। পাশাপাশি এই লড়াই ছিল শ্রেণিগত শোষণ ও শ্রেণি বৈষম্যের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য গণমানুষের লড়াই। এটি ছিল একটি জনযুদ্ধ। পাকিস্তানের একটি খণ্ডিত নবসংস্করণ প্রতিষ্ঠা করাটা মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। ‘ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হওয়ার মতবাদ’কে ভিত্তি করে হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত পৃথক দু’টি অঞ্চল নিয়ে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত ‘লাহোর প্রস্তাবে’ পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ‘একাধিক’ রাষ্ট্রের সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠনের পরিকল্পনা হাজির করা হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে যে, জিন্নাহ সাহেব পরে বহুবচনবোধক ‘একাধিক’ শব্দটি পরিবর্তন করে অখণ্ড একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা চাপিয়ে দেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অনেকে ‘লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন’ হিসেবে রূপায়িত করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের কথা অনুসারে, ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয় এবং মুসলমানরা পৃথক জাতি– এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে সেই ভিত্তিতে ‘বাঙালি মুসলমান’দের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। এই মতবাদ দ্বারা আমাদের লড়াইয়ের চরিত্রকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের জন্য ‘পাকিস্তানে’র অনুরূপে একটি স্বাধীন ‘বাংলাস্থান’ বা ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বলে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এসবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীকে আড়াল করে তার উপর পাকিস্তানি ভূত চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস মাত্র। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের ‘মানচিত্র’ ও ‘মতবাদ’ উভয় বিষয়কে নেতিকরণের (হবমধঃরড়হ) জন্য একটি আন্দোলন-লড়াই। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে নতুন একটি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে রূপ দেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের কৃত্রিম ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থা নাকচ করে ভিন্ন ধরনের চরিত্র সম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। পাকিস্তানি ভাবাদর্শগত ও ব্যবস্থাগত বৈশিষ্ট্যের সাথে ‘ছেদ’ ঘটিয়ে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। সূচিত হয়েছিল তার নতুন যাত্রাপথ। আওয়ামী লীগ দু’দুবার ক্ষমতায় আসতে পারলেও আজ পর্যন্ত দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ফিরিয়ে আনলেও এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’-এর বিধান ও জিয়াউর রহমানের ‘বিসমিল্লাহ...’ বহাল রেখেছে (যা কিনা আবার কখনো কোনোভাবে পরিবর্তন করা যাবে না বলে সংবিধানের অন্য এক ধারা কর্তৃক চিরস্থায়ী করে দিয়েছে), সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ লিখে রাখলেও সে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন, খোলাবাজার, পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদী নীতি, বিনিয়ন্ত্রণ, উদারিকরণ ইত্যাদির পথ অনুসরণ করছে। ফলে শোষণ-বৈষম্য বাড়ছে। গরিব মানুষের জীবনে অসহায়ত্ব ও দুর্গতি বাড়ছে। ‘জাতীয়তাবাদ’ লিখে রাখা সত্ত্বেও নানা চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশকে স্থায়ীভাবে সাম্রাজ্যবাদের শিকলে বেঁধে ফেলে জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। ‘গণতন্ত্র’র কথা বললেও জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার বদলে ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র ও আমলাতন্ত্রের থাবার নিচে গণতন্ত্রকে পিষ্ট করা হচ্ছে। কোথায় রইল একাত্তরের বিজয়? বিজয় আনতে পারলেই, একথা নিশ্চিত হয়ে যায় না যে, সে বিজয় রক্ষা করা যাবেই। বিজয় আনতে যে দল ও শ্রেণি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল, তাদের পক্ষে তা রক্ষা করা যে সম্ভব হয়নি– বাংলাদেশের ঘটনাবলি সেই অভিজ্ঞতাই তুলে ধরে। বিজয় অর্জন ও একই সাথে তার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হলে ভিন্ন ধরনের দল ও শ্রেণির নেতৃত্ব প্রয়োজন। দেশবাসী বিজয় অর্জন করে এবার তা আর হারাতে চায় না। বিজয়কে চিরস্থায়ী করতে চায়। তাই, এবার দেখতে হবে যেন বিজয় অর্জনের পাশাপাশি সে বিজয় ধরে রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত থাকে। সেজন্য দেশের বামপন্থি শক্তি ও শ্রমজীবী মানুষকে আরো দৃঢ়ভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..