ব্রিকসকে কেন ভয় ট্রাম্পের?

প্রকাশ কারাত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গত ৬-৭ জুলাই রিও ডি জেনেরো শহরে এগারোটি সদস্য দেশের সম্প্রসারিত শক্তির ১৭তম ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসের সাথে যুক্ত দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বসলেন। এর আগেও ট্রাম্প এই মঞ্চ মার্কিনী ডলারের আধিপত্য সরিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চাইছে–এমন অভিযোগ তুলে ব্রিকস দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছিলেন। ব্রিকস নিয়ে ট্রাম্প এত ভীতসন্ত্রস্ত ও ক্ষিপ্ত কেন? শুরুতে ব্রিকস ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাঁচ দেশীয় মঞ্চ। ২০০৯-এ অবশ্য আরম্ভ হয় চারটি দেশ নিয়ে। এক বছর পর যোগ দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী মঞ্চ হিসেবেই ভাবা হয়েছিল ব্রিকসকে। বিশ্ব জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ ও বিশ্ব অর্থনীতির এক চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করত ব্রিকস। ২০২৪ সালে জোহানেসবার্গের ১৬তম সম্মেলনে ছটি নতুন দেশ–মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়াকে যুক্ত করা হয় এই মঞ্চে। এই মুহূর্তে ব্রিকসের ১১টি সদস্য দেশ প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্ব জনসংখ্যার ৪৯.৫ শতাংশ, বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ২৬ শতাংশকে। ব্রিকস কোনো গোষ্ঠী বা জোট নয়। এ হলো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের লক্ষ্যে গঠিত দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির (রাশিয়াই একমাত্র ব্যতিক্রম) একটি মঞ্চ। ফলে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং বাণিজ্য ও অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার মত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর জি-৭ দেশগুলি ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রত্যাহ্বান জানানোর মত শক্তি রয়েছে ব্রিকসের। ব্রিকসের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ২০০৮-এর বিশ্ব অর্থনীতির সংকটের প্রেক্ষিতে এবং সেটা অধিকতর প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে যখন জি-২০ দেশগুলো জি-৭ দেশগুলির ছত্রছায়া থেকে বেরোতে ব্যর্থ হল। রিও ডি জেনেরো সম্মেলন আগ্রাসনের দু’টি ঘটনার প্রেক্ষিতে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির প্রতিক্রিয়াকে ব্যক্ত করেছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে পরমাণু কেন্দ্রের উপর হামলার কড়া নিন্দা করেছে এই সম্মেলন এবং নিন্দা প্রকাশ করেছে গাজার উপর নতুন করে নেমে আসা হামলা ও খাদ্য ও মানবিক সাহায্য সরবরাহে অবরোধের বিরুদ্ধে। ঘোষণাপত্রে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করা হলেও একতরফা শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত পদক্ষেপের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাংকে দক্ষিণ গোলার্ধের প্রধান দেশগুলির অধিকতর ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারত ও ব্রাজিলের অন্তর্ভুক্তির দীর্ঘদিনের দাবিগুলিও পুনর্বার উত্থাপিত হয়েছে। ব্রিকস ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা এবং বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ জি-৭ দেশগুলির কব্জা হ্রাস করার পদক্ষেপ শুরু করতেই ট্রাম্পের গোঁসা জেগে উঠেছে। নির্দিষ্ট কিছু দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বাণিজ্যিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি ও আন্তর্জাতিক অর্থ ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের বহিষ্কার করে দেওয়ার ঘটনার অভিঘাতে এখন আরো অনেক বেশি সংখ্যক দেশ চাইছে নিজেদের স্বার্থরক্ষায় বিকল্প পথের সন্ধান করতে। ব্রিকস দেশগুলি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও মুদ্রা বিণিময়ের ব্যবস্থাবলি নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছে। আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের পদক্ষেপও রয়েছে আলোচ্যসূচিতে। রিও ঘোষণায় জানানো হয়েছে, নেতৃবৃন্দ নিজেদের দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছে ‘ব্রিকসের আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং ব্রিকস লেনদেন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স বা কার্যনির্বাহী দল ব্রিকসের আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থাপনার জন্যে প্রয়োজনীয় আরো বেশি পরিপূরক কার্যপ্রণালী নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে যে যে বিকল্প পথ চিহ্নিত করতে পেরেছে সে সম্পর্কে অবহিত হতে। এখন অবধি যদিও বিকল্প মুদ্রার ব্যবস্থা নির্ণয়কে নির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে সামনে রাখা হয় নি, ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসের সামান্য কিছু পদক্ষেপই ট্রাম্প প্রশাসনের চোখে সমূহ বিপদ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। ব্রিকস যে ধীরে ধীরে কিছু বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে এগোচ্ছে সেটা নিউ ডেভেলাপমেন্ট ব্যাঙ্ক (এনডিবি) প্রতিষ্ঠার মধ্যেই স্পষ্ট। ২০১৫ সালে সাংহাইয়ে প্রধান কার্যালয় স্থাপন করে ১০০ বিলিয়ন ডলার পুঁজি নিয়ে এই ব্যাঙ্ক যাত্রা শুরু করে। ঋণ মেটানোর জন্যে ঋণপ্রদানের পরিবর্তে পরিকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে সহায়তাই ছিল এই ব্যাঙ্কের লক্ষ্য। এখন অবধি ব্রিকস সদস্য দেশ সহ দক্ষিণ গোলার্ধের বিভিন্ন দেশের ৯৮টি পরিকাঠামো প্রকল্পে এই ব্যাঙ্কের তরফে ৩৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা করা হয়েছে। এই ব্যাঙ্কের বর্তমান সভাপতি ব্রাজিলের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি দিলমা রুসেফ। এনডিবি ছাড়াও ব্রিকস সদস্য দেশগুলির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে যৌথ তহবিলের মাধ্যমে কনটিনজেন্ট রিজার্ভ আ্যারেজমেন্ট বা আপদকালীন তহবিলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সিআরএ সদস্য দেশগুলির নগদ সংকটের সময়ে সহায়তার হাত বাড়ায়। বামপন্থিদের মধ্যেও কেউ কেউ ব্রিকসকে গ্রাহ্যতায় আনতে নারাজ যেহেতু এই মঞ্চের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবিচল অবস্থান নেই। এই সমালোচনা অমূলক। ব্রিকস কোনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মঞ্চ নয়। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধের অবস্থান ব্যাখ্যায় এবং দক্ষিণ গোলার্ধের উন্নয়ন সম্পর্কিত চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে যে ধরনের যৌথ উদ্যোগগুলোর সূচনা করেছে ব্রিকস, তা বহুমেরু বিশ্বের উদ্দেশ্যকেই শক্তিশালী করবে। বিস্তৃতি ও সংহতি, উভয় দিক দিয়েই যত অগ্রগতি অর্জন করছে ততই ব্রিকস মঞ্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করছে। ভারত সহ ব্রিকস দেশগুলির অনেকেরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত চুক্তি রয়েছে। কিন্তু এই দেশগুলিও বহুমেরু বিশ্বে বস্তুনিষ্ঠভাবে নিজেদের জায়গা করে নিয়ে জাতীয় স্বার্থ আরো সার্থকতার সাথে পূরণ করতে পারছে। এ ধরনের দেশের জন্যে ব্রিকসে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার পরও একটা সীমা অবধি কৌশলগত স্বনির্ভরতা রক্ষা করার অধিকতর সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনে বাণিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে একতরফা আগ্রাসন পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শুল্কযুদ্ধ থেকে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মত ঘনিষ্ট মিত্রদেশগুলিও ছাড় পাচ্ছে না। এর ফলে একদিকে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদী জোট দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধের যথার্থ মঞ্চ হিসেবে ব্রিকসের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন নতুন দেশ এখন ব্রিকসে যোগদান করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করছে। রিও সম্মেলন ‘সহযোগী দেশ’ নামে নতুন একটি স্তরের সংযোজন করেছে মঞ্চে। আটটি দেশকে এবার ‘সহযোগী দেশ’-এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে- বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা ও উজবেকিস্তান। নতুন এই স্তর যুক্ত হওয়ায় দক্ষিণ গোলার্ধের আরো বহু দেশ ব্রিকসের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। ব্রিকসের অধ্যক্ষের পদ এক বছর মেয়াদের। ২০২৫ সালের অধ্যক্ষ ছিল ব্রাজিল। রাষ্ট্রপতি লুলার নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত হয়েছে যা কপ৩০ শিরোনামের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের সম্মেলনের প্রাক্কালে এই মঞ্চের একটি সমন্বিত অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, এই মঞ্চ কৃত্রিম মেধা বিষয়ক আলোচনায় দক্ষিণ গোলার্ধের সীমিত প্রতিনিধিত্বের অভিযোগের স্বীকৃতি দিয়ে বৈশ্বিকস্তরে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া আরো একটি সিদ্ধান্তে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে পরিকাঠামো ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা প্রদানে ব্রিকস মাল্টিলেটারেল গ্যারান্টিস ইনিশিয়েটিভ বা ব্রিকস বহুপক্ষীয় অঙ্গীকার প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের অধ্যক্ষ পদ ভারতের এবং মোদী ইতোমধ্যেই থিম স্থির করেছেন, ‘সহযোগিতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের লক্ষ্যে স্থিতিস্থাপকতা ও নতুনত্বের নির্মাণ’। দক্ষিণ গোলার্ধের কন্ঠস্বর হয়ে ওঠার দাবি সত্ত্বেও মোদী সরকার বিদেশ নীতি ও কৌশলগত নীতির প্রশ্নে সাধারণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। পাকিস্তান-সর্বস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সন্ত্রাসবাদকে সমস্ত বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের মঞ্চে আলোচ্য সূচিতে নিয়ে আসার বর্তমান প্রবণতা দক্ষিণ গোলার্ধের সামগ্রিক উদ্বেগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোয়াড গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক দৃঢ়তর করতে সরকার অতিশয় ব্যগ্র। অথচ ভারতই ট্রাম্পের ক্রমাগত উচ্চারিত খেয়ালীপনার বিষয় হয়ে উঠেছে। যতই এই সরকার ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির সাথে আপোষ করতে তৎপর হবে, ততই সে ট্রাম্পের আঘাতের নিশানা হবে। সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হচ্ছে যে তারা বহুমেরুত্বেরই পোষকতা করছে। সম্প্রতি ভারত ও চীন সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা প্রশমনে উদ্যোগী হয়েছে। অর্থনৈতিক ও ভ্রমণ সংক্রান্ত বিষয়ও পুনঃস্থাপন করতে চাইছে। এর ফলে অবশ্যই ব্রিকস মঞ্চের সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড আরো সহজতর হবে। এটা অবশ্যই প্রত্যাশা করা যেতে পারে যে ব্রিকসের নেতৃত্বের আসনটিকে মোদী সরকার দক্ষিণ গোলার্ধের সমষ্টিগত স্বার্থের স্বপক্ষে ব্যবহার করবে এবং একইসঙ্গে বিকল্প নীতি ও পন্থার উদ্ভাবনে যে প্রয়াস চলছে তাকে বিনষ্ট করার সমস্ত অপচেষ্টাকে রুখে দেবে। প্রথম প্রকাশ : পিপলস ডেমোক্রেসি সৌজন্যে : মার্কসবাদী পথ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..