
এক
মার্কস ও নৈতিকতা–এই দুই শব্দ নিয়ে পশ্চিমা নীতিদার্শনিকদের মধ্যে ধাঁধা রয়েছে, রয়েছে বিতর্ক। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দির পুরোটা জুড়ে এ বিতর্ক চলমান ছিলো। নৈতিকতা সম্পর্কিত মার্কসবাদী পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে এধরনের আলোচনার সূত্রপাত হয় মূলত ১৯৮০ সালে প্রকাশিত Marx, Justice and History গ্রন্থটিকে কেন্দ্র করে। এ গ্রন্থের লেখকগণ নানা পরিপ্রেক্ষিত থেকে দাবি করতে চাচ্ছেন যে, মার্কস নৈতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিছেন। কেউ কেউ বলেছেন ‘মার্কসীয় দর্শন’ হলো ‘নীতিশূন্য’।
দুই
প্রথমেই আমরা বুঝে নিতে পারি–মার্কসের কাছে নৈতিকতা কী? পুঁজিবাদী দার্শনিকরা সামাজিক জীবনে অসাম্য, অন্যায্যতা ও শোষণ বহাল রেখেও নীতি ও নৈতিকতার মুখোশ পরে ছিলেন। মার্কস সমাজ ও পুঁজির উৎসমূলে গিয়ে এর সন্ধান করেছেন। তিনি সামাজিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে নৈতিকতাকে বোঝার চেষ্টা করেন। মার্কসীয় বিবেচনায় সমাজের দুটি কাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ : একটি হলো ভিত্তিকাঠামো (basic structure), অন্যটি উপরিকাঠামো (super-structure)। উৎপাদিকা শক্তি, উৎপাদনের উপায়, উৎপাদন সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে ভিত্তি কাঠামো (base-structure)। উৎপাদনের উপায়সমূহ হলো যন্ত্র, আবাদের যন্ত্রপাতি, কলকারখানা। উপরিকাঠামো হলো শিল্পকলা, পরিবার, পরিজন, সংস্কৃতি, ধর্ম ও বিশ্বাস, আইন, মিডিয়া, রাজনীতি, বিজ্ঞান, দর্শন, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। মূলত উৎপাদন সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক চৈতন্য গড়ে ওঠে। ভিত্তি কাঠামেরা ওপরই গড়ে ওঠে মানুষের ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, ভাবাদর্শ ও সামাজিক জীবনযাত্রার নানা মাত্রা। এই মাত্রাসমূহ হলো উপরিকাঠামো (super-structure)। অন্যভাবে বলা যায়—ভিত্তি কাঠামোর স্তর গড়ে ওঠে মূলত উৎপাদনের নিয়ামকের ওপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন পদ্ধতি, উৎপাদন ব্যবস্থা। শ্রমদানকারী মানুষজনের সঙ্গে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যেও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের মধ্যে একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রতিনিয়ত সক্রিয় থাকে। এর ভেতর দিয়েই সমাজ তার অভ্যন্তরীণ কলা-কৌশল পাল্টায়। মার্কস এই কলাকৌশলের শোষণবাদী চরিত্রটি প্রতিপাদন করতে চেয়েছেন।
নৈতিকতা তাই ‘ঐশী আদেশনামা’ (divine command) হবার প্রশ্ন আসে না। ধর্মীয় চার্চ প্রভাবিত দার্শনিক টমাস একুইনাস, সেন্ট অগাস্টিনসহ আরো অনেকে তাই মনে করতেন। আবার কোনো কাজ আমাদেরকে পরিতৃপ্তি দিলেই তা নৈতিক হতে পারে না। অথচ জিরোমি বেন্থাম ও জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখের উপযোগবাদী দর্শন তাই মনে করেছে। নৈতিকতার এই ধারার বাইরে গিয়ে মার্কস ‘নৈতিকতাকে’ অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন মাটি ও মানুষের মধ্যে। আর তাই তিনি নৈতিকতাকে দেখেছেন,মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন অভিঘাতের ফসল হিসেবে।
নীতিচিন্তার ইতিহাসে নৈতিকতাকে দেখানো হয়েছে ‘সদগুণ’ হিসেবে, ঈশ্বরের আইনকে, কিংবা সন্তুষ্টির প্রতিবিধানকে। এসব কয়টা ভাবনাই নিরেট সমাজবিচ্ছিন্ন। কিন্তু নৈতিকতা সমাজবিচ্ছিন্ন নয়। একেবারে মাটি ও মানুষের প্রয়োজন ও তার আঙ্গিকের নানা বৈচিত্র্য বিবেচনা করে নৈতিকতা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই নৈতিকতাকে কোনো অমোঘ শর্ত, আকাশ থেকে পতিত ‘ঐশী নির্দেশ’ না ভেবে, বরং সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কের (ভিত্তি কাঠামোর) ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ (উপরিকাঠামো) হিসেবে বুঝতে হবে। প্রশ্ন হতে পারে ভিত্তি কাঠামোর সঙ্গে উপরিকাঠামোর এই যে নির্মোহ কার্যকারণিক সম্পর্ক, তা কতোটা যৌক্তিকতার নিরিখে গ্রহণ করা যেতে পারে? এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে পরবর্তীকালে মার্কস-সমালোচকদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। ভিত্তি কাঠামোর সঙ্গে উপরিকাঠামোর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মার্কসীয় প্রচেষ্টাকে গ্রামসী উল্লেখ করেছেন অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ হিসেবে। প্রিজন নোটবুকস-এ গ্রামসী এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। মানবচৈতন্য নিরপেক্ষ অদৃশ্য এই অমোঘ নিয়মের আবিষ্কারকে গ্রামসী তুলনা করেছেন “অনেকটা ধর্মবিশ্বাসের মতোই”। তাই বলে গ্রামসীর এই অবস্থানও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আসলে গ্রামসী সামাজিক ভারসাম্যের লক্ষ হিসেবে পাল্টা গণমানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আধিপত্যকে (কাউন্টার হেজেমনি) সমুচ্চারিত করতে চেয়েছেন। একারণে রাজনীতি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এই গুরুত্বের অবস্থান থেকে হয়তো গ্রামসী দাবি করছেন, অর্থনৈতিক সংকট কখনোই রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয় না। এ সংকট সম্পূর্ণ আলাদা। এর অর্থ হলো ভিত্তি কাঠামো ও উপরিকাঠামো এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই।
গ্রামসীর দার্শনিক চিন্তার অনুসারী রেমন্ড উইলিয়ামস ও ই. পি. টমসন তাঁরাও মার্কসীয় ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা করেন। হালের উত্তর-মার্কসবাদী লুই অ্যালথুসার মার্কসের এই ভাবনার প্রতিস্থলে এক সংশ্লেষিত ভাবনার (synthethetic thought) প্রস্তাব করেন। তিনি বলছেন যে, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও বিশ্বাস এসবই সমন্বিতভাবে থাকে। এই সমন্বিত ভাবটিকে তিনি বলেছেন সামাজিক সংগঠন (Social Formation)| প্রত্যেক সামাজিক সংগঠন ত্রয়ী ক্রিয়াকাঠামোতে গড়ে ওঠে : তার একটি হলো অর্থনীতি, দ্বিতীয়টি হলো রাজনীতি, আর তৃতীয়টি হলো মতাদর্শ (Ideology)। প্রশ্ন হলো এরা কী আলাদা? মার্কস বলবেন আলাদা নয়, এদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কার্যত অ্যালথুসার মার্কসের সঙ্গে একমতই হয়েছেন।
১৯৭০ সালে প্রকাশিত অ্যালথুসারের এক প্রবন্ধে `Ideology and the ideological state apparatus” এ সম্পর্কিত ভাবনার একটি রূপরেখা পাই। অ্যালথুসারও মার্কসের মতোই ‘মতাদর্শকে’ [ নৈতিকতাকেও] দেখেছেন উপরিকাঠামো হিসেবে। গ্রামসী ও টমসন থেকে আলাদা অবস্থান নিয়েছেন অ্যালথুসার। তাঁর অভিমত হলো–সকল সময় মতাদর্শ যে সামাজিক ও উৎপাদন সম্পর্কের আঙ্গিকে সৃজিত হবে, এমনটি নয়। কারণ ভিত্তি কাঠামো সকল সময় উপরিকাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে না। যেমন আমরা যে উৎপাদনী শক্তি (productive force) ও উৎপাদন সম্পর্কের (relations of the production) কথা বলি, তা হলো সামাজিক সম্পর্কের দুই মাত্রা। সকল সময় একটি মাত্রা অন্যমাত্রাকে প্রভাবিত করবে, অথবা একটির সঙ্গে অন্যটির কার্যকারণিক সম্পর্ক থাকবে, তা নয়। তাহলে সম্পর্কের এই মাত্রা টিকে থাকবে কীভাবে? এ পরিসরে এসে অ্যালথুসার রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও আদর্শের কথা বলেছেন। বৈশিষ্ট্যগত কারণে রাষ্ট্রের রয়েছে বিশেষ ক্ষমতা, যা ‘রাষ্ট্র ক্ষমতা’ (state power) হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রকে পরিচালিত হবার জন্য প্রয়োজন আদর্শের, এই আদর্শই রাষ্ট্রীয় আদর্শ (state ideology) হিসেবে খ্যাত। কোনো রাষ্ট্র যদি প্রথম শর্তের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, তাহলে সে রাষ্ট্রকে অ্যালথুসার বলছেন দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র (repressive state apparatus), আর দ্বিতীয় শর্ত দিয়ে পরিচালিত রাষ্ট্র হলো ‘মতাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র’ (ideological state apparatus)। এই মতাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র মূলত নৈতিক আদর্শ সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। পুঁজিশাসিত একমুখী সমাজের দেউলিয়াত্ব কাটিয়ে সমতা ও ন্যায্যতার আলোকে এই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। মার্কসের সঙ্গে অ্যালথূসারে এটুকু পার্থক্য। কিন্তু মিলটা হলো নৈতিকতা আরোপিত, কিংবা ঈশ্বর নির্দেশিত কোনোকিছু নয়। নৈতিকতা হলো রাজনৈতিক, তা অর্জন করতে হয়।
তিন
পুঁজিবাদী সমাজ: সমতার বিকল্প যেখানে প্রতিযোগিতা
সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদকে মার্কস অন্যায্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পুঁজিবাদী সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থা, পুঁজি ও পুঁজি বণ্টনের মধ্যে রয়েছে অসমতা ও অন্যায্যতা। মালিক পুঁজি সরবরাহ করেন, শ্রমিক দিচ্ছেন শ্রম। এ দুয়ের কৌশলগত সমন্বয়েই মুনাফা হয়ে থাকে। এখানে শ্রম হলো শ্রমিকের নিজস্ব, যেভাবে শ্রম শ্রমিকের। শ্রম আবার ব্যক্তির ‘জৈবিক ক্রিয়াও’, পুঁজি শুধুই ‘পুঁজি’। ব্যক্তির এই জৈবিক ক্রিয়া মালিকের কাছে বিক্রি করছে। অথচ সে তা বিক্রি করছে অসম মূল্যে। শ্রমিকের শ্রম ও মালিকের পুঁজি এই দুইয়ের মধ্যে যে পার্থক্য–তা অসম। মালিক মজুরের শ্রমের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে তা থেকে যে উদ্বৃত্ত মূল্য পায়, তাই হলো শোষণের উৎস। এই শোষণ নিপীড়নমূলক ও অনৈতিক। পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে শোষণ ও বৈষম্য, যা অনৈতিক। এর অর্থ হলো পুঁজিবাদের অন্যায্যতা সামাজিক জীবনের অনৈতিকতার ভিত্তি। নৈতিকতা সম্পর্কে এ হলো মার্কসের আবিষ্কার।
কিন্তু মার্কসবাদী দার্শনিক এলান উডের বিশ্লেষণে আমরা ভিন্ন তথ্য পাই। তিনি বলছেন, একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বিশেষ কোনো আচরণের সমালোচনা করা যেতে পারে, সেই মোতাবেক নির্দিষ্ট কাঠামোর সমালোচনাও করা যেতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদের সমালোচনা করা যায় না, একে অন্যায্য হিসেবে বাতিল করে দেয়া যায় না। মার্কস ঠিক তাই করেছেন। আসলে কী তাই? একটু তলিয়ে দেখা যাক। মার্কস ন্যায়পরায়ণতা, তথা ন্যায্যতার ভূমিকা অনুসন্ধান করেছেন ঐতিহাসিক বস্তুবাদে। মার্কস মনে করতেন, আইনগতভাবে বৈধ সংস্থাসমূহ (juridical institutions) হলো উপরিকাঠামোরই (superstructure) অংশ। আর ন্যায়পরায়ণতার ধারণা হলো আদর্শিক। তাহলে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ধারণা অনুসারে, উপরিকাঠামো ও আদর্শ–উভয়ের যে সক্রিয়তা ও সক্ষমতা রয়েছে তাই অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্থিতিশীল করে থাকে। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিক হলেন সর্বেসবা। আর সমাজের সবকিছু এই মালিকদের বলয়ে থাকে। সমাজের প্রভাশালী আদর্শ হলো শাসকগোষ্ঠীর আদর্শ। আর শাসকগোষ্ঠীর আদর্শবাদের মূলকথা ‘আমার স্বার্থটা আগে’। সুতরাং, প্রভাবশালীর নৈতিকতার মানেও হবে তার স্বার্থ সংরক্ষণের নৈতিকতা। স্বার্থ সংরক্ষণের নৈতিকতা নিয়ে মার্কস প্রশ্ন করেছেন, প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি নৈতিকতাকে বাতিল করে দিয়েছেন। উলটো তিনি নৈতিকতার জন্য আলাদা মানবীয় ও সমতাবাদী চরিত্র রূপায়ন করতে চেয়েছেন।
চার
সাম্যবাদ ও নৈতিকতা
আমরা লক্ষ্য করে দেখব যে, তরুণ মার্কস থেকে শুরু করে পরিণত মার্কস নীতিতত্ত্ব সম্পর্কে একটি নিজস্ব অবস্থান নিয়েছেন, যার ধরন ও প্রকৃতি প্রথাগত নীতিবিদ্যার (বুর্জোয়াদের নীতিদর্শন) মতো নয়। মার্কসের অনেক আলোচনায় নৈতিকতা ধারণাটিকে সরাসরি ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে পিয়েরে-যোশেফ প্রুধো (১৮০৯-১৮৬৫) ও সিসমন্দি (১৭৭৩-১৮৪২) সাচ্চা সমাজতন্ত্রী হবার দাবিকে সমালোচনা করতে গিয়েও তিনি ‘নৈতিকতার’ ধারণা ব্যবহার করেছেন। গোথা কর্মসূচির সমালোচনায়ও তিনি ‘নৈতিকতা’ ধারণাটি ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে গোথা কর্মসূচিতে তিনি বার বার ‘ন্যায্য মজুরি’ ও ‘ন্যায্য বণ্টনের’ ধারণা ব্যবহার করেছেন। এসব ধারণার অভিনবত্ব প্রসঙ্গে মার্কস উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও তিনি এর প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা করতে ছাড়েননি। মার্কস ধারণা ও ভাবাদর্শকে যৌক্তিকতার নিরিখে গ্রহণ করতে আগ্রহী।
মার্কস নিজেই সমাজতন্ত্রকে বলেছেন ‘পুঁজিবাদের জন্মদাগ’। পুঁজিবাদের সংকট ও সীমাবদ্ধতা এখানে থাকলেও, এ সমাজব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার চর্চার প্রারম্ভিক অগ্রযাত্রা পুঁজিবাদের শেষ পর্বে এসে শুরু হয়েছে। কিন্তু তা অসম্পূর্ণ ও অস্থায়ী। এ ব্যবস্থায় ন্যায্যতা, সমতা সকলের জন্য নয়। কিন্তু সাম্যবাদ সকল দিক থেকে নাগরিকের সাথে নাগরিকের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত। এর চরিত্র হলো নির্বিশেষ ও নিরপেক্ষ। প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার অনন্য এক মাধ্যম হয়ে উঠবে সাম্যবাদ। সাম্যবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকের স্বাধীনতার পরিপূর্ণ উপভোগ। তাহলে নৈতিকতার অনন্য নীতি হিসেবে ‘সমতা ও ভ্রাতৃত্ব’ সাম্যবাদী সামাজিক ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। এর অর্থ হলো মার্কস নীতি ও আদর্শকে অস্বীকার করে সাম্যবাদী মডেল দাঁড় করান নি।
মার্কসীয় নীতিচিন্তার আরেকটি পরিপ্রেক্ষিত হলো–পুঁজিবাদী বিন্যাসে অসমতা ও আত্মস্বার্থপরতার উৎস অনুসন্ধান। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কমিউনিস্টি ম্যানোফেস্টোতে পুজিবাদী ব্যবস্থার আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার রূপরেখা দিয়েছেন। স্বার্থপরতার বিশেষত্ব হলো, তা মানুষকে একরোখা ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ভেতর দিয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার মানবিক জ্ঞান। প্রতিযোগিতার মধ্যে বিকাশমান সামাজিক সংস্কৃতি ভরপুর থাকে দেউলিয়া ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায়। সামজে সৃষ্টি হয় অমানবিকতার আস্ফালন। মার্কস সামাজিক ব্যবস্থার এই বদ্ধ-অবস্থা পরিবর্তনে সামাজিক পুঁজি ও মানুষের রুচিবোধের মধ্যে মতাদর্শিক পরিবর্তনের রূপকল্প দিয়েছেন। এই রূপকল্পের ভেতর দিয়ে মানুষ বের হয়ে আসতে পারবে প্রথমত সামাজিক শোষণ, অন্ধবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতার মতো নির্মমতা থেকে, দ্বিতীয়ত নতুন সমতাভিত্তিক সামাজিক রূপকল্পে অনুপ্রবেশের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করতে উৎসাহী হবে। মতাদর্শিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণ সামাজিক হয়ে ওঠবে, মানবিক বাস্তবতা হয়ে ওঠবে তার সেই সংগ্রামের লক্ষ্য। এই সংগ্রামে প্রতিষ্ঠা পাবে মানবিক সমাজের। মার্কস একে বলেছেন সামাজিক মানবতা (social humanity) হিসেবে। তাহলে মার্কসের দর্শনে নৈতিকতা আছে, আর তা হলো সামাজিক মানবতা।
তাঁর দার্শনিক অনুসন্ধানের একটি অনন্য অবদান হলো– নাগরিক সমাজে অভিজাততন্ত্র বা এলিটিজমের চরিত্র অনুসন্ধান। এখানে যারা কেন্দ্রে, তারা দখলে নেয় পুঁজি ও উৎপাদনের সকল নিয়ামকসমূহ। বাকি জনগণ পরিণত হয় তার শ্রমদাসে-সেবাদাসে। নাগরিকের সমাজের এই অবস্থার মুক্ত করে দিয়েছেন মার্কস। এই প্রচেষ্টার মধ্যে তিনি যা করেছেন, তা নৈতিকতার ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণের প্রয়াসেই করেছেন। এ হলো পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মার্কসের নৈতিক সমালোচনা। তাহলে মার্কসীয় নৈতিকতা সম্পর্কিত ধারণা একটু আলাদা, পুঁজিবাদী দার্শনিকদের নৈতিকতা সম্পর্কিত ধারণার সঙ্গে তাকে মেলানো যাবে না।
পাঁচ
পাশ্চাত্য চিরায়ত দর্শনে নৈতিকতা সম্পর্কিত যে আলোচনা পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে ছিলো মূলত গ্রিক দর্শনের প্রভাব। দ্বিতীয় প্রভাবটি গড়ে ওঠেছিলো হেগেল ও জন স্টুয়াট মিল এর হাত ধরে। আমরা যদি গ্রিক নীতিবিদ্যার কথা বলি তাহলে অবশ্যই বলতে হবে যে, তা বিকশিত ও উৎকর্ষ অর্জন করেছিলো এরিস্টটলের হাতে। তিনি প্রকৃতিবাদী নীতিবিদ্যার গোড়াপত্তন করেছিলেন। তাঁর নীতিদর্শনের অন্যতম একটি দিক হলো–অভাব ও কামনার ভেতর দিয়ে মানুষ তার ভালোত্ব অর্জন করে। মানুষের জন্য পরম শুভ হলো ‘ইউডেমোনিয়া’ (eudaimonia) : এ আবার আনন্দও। এরিস্টটল এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কোনোকিছুর উৎকর্ষ ও বিকাশমান অবস্থাকে নির্দেশ করার জন্য। এ মূলত মানুষের যুক্তিবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে। কল্যাণ, আত্ম-উপলব্ধি ও উৎকর্ষ এসবকে এরিস্টটল মানব প্রকৃতির গুণধর্ম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর এই গুণধর্ম হলো সদগুণ (virtue)। সমাজ ও গোষ্ঠীতে মানুষ তার নিজের সর্বোচ্চ উৎকর্ষের পরিচয় দিয়ে থাকে সদগুণের মাধ্যমে। অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে একমাত্র মানুষের তার গোষ্ঠীর মধ্যে নিজের উৎকর্ষ ও দক্ষতা প্রকাশের সক্ষমতা রয়েছে। একারণে মানুষকে এরিস্টটল উল্লেখ করেছেন ‘রাজনৈতিক প্রাণী’ হিসেবে–এর মধ্যে রয়েছে নীতিবিদ্যা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক। এরিস্টটলের এই প্রস্তাবনাকে মার্কস একটি কাঠামোবদ্ধ স্বরূপে উন্মোচিত করতে চেয়েছেন। মার্কসের মতে, সমাজ ও রাজনীতির জন্য কাঠামোবদ্ধ নৈতিক উৎকর্ষটি কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে এরিস্টটলের কোনো নির্দেশনা ছিলো না। এখানেও মহীরুহ এরিস্টটলের সমালোচক হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন মার্কস। দ্বিতীয় পরিসরে এসে মার্কস দেউলিয়াত্ব উন্মোচন করেছেন বেন্থাম, মিল, অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো ও ম্যালথাসের মতো অর্থনীতিবিদদের। এ সমালোচনা পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের ভালো লাগেনি, সহ্য হয়নি। কারণ এসব দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদরা হলো পাশ্চাত্যের চিন্তা ও ধ্যানের আশ্রম। সেই আশ্রম ভেঙে যাক, ব্যর্থ প্রমাণিত হোক, এটা তাঁরা চান না। আর তাই মার্কসের দর্শন নিয়ে তাঁদের যতো কথা ও সমালোচনা।
লেখক : শিক্ষক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়