মৃদুলার গল্প

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

নন্দিতা বৈষ্ণব : এর আগে কখনো তোমাকে মৃদুলাদের গল্প বলিনি। একদিন মৃদুলা নামটা শুনতেই বল্লে কেমন একটা যাযাবর গন্ধ লাগে। বেদেদের মেয়ে নাকি? আমাদের বাড়ির দক্ষিণে একটা বিশাল দিঘী। সেই দিঘীর পাড়ে একটা উঁচু লম্বা কালো তালগাছ। আমার স্মৃতিতে তালগাছ মানে ঐ একটাই; শৈশবের লম্বা তালগাছটা। তার তলায় মৃদুলাদের ঘর। মৃদুলার বাবার নামটা সুন্দর। নৈদের চাঁন। উনি পাশের বাজারে আলু বিক্রি করতেন আর প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের ঠাকুরঘরে সন্ধ্যারতির সময় মৃদঙ্গ বাজাতেন। তারপর কখনো কখনো গাইতেন -’ ছিলাম মায়ের জঠরে, কত ঘোর অন্ধকারে/ কষ্ট পেয়ে কাতর হয়ে ডাকছি তোমারে......দীনবন্ধু কর করুণা/ কত আর সব যন্ত্রণা’? গাইতে গাইতে উনার চোখ জলে ভরে উঠতো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম মৃদুলার বাবা গান গাইতে গাইতে কাঁদছেন! আমি আর মৃদুলা একই ক্লাসে পড়তাম। প্রতিদিন ভোরে ঠাকুরের ফুল পাড়তে উঠতাম। সমাধি বাড়িতে গিয়ে দেখতাম মৃদুলা আমার আগেই গাছের সব ফুল পেড়ে নিচ্ছে। দেখে রাগ হতো। বকতাম। তারপর ও বুঝিয়ে নিতো। ওর সাঁঝির কিছু ফুল আমার সাঁঝিতে ভরে দিতো। আমি করবী গাছের ডাল নাগাল না পেলে ও ধরে আগিয়ে দিতো। ভর দুপুরে না ঘুমিয়ে রোদে পুড়ে পুড়ে ওর সাথে নাকে কড়া মরিচ পোড়া গন্ধ নিয়ে বড়ই গাছ তলায় বড়ই কুড়োতাম। তারপর বিকেল হলে গোল্লাছুট। দারুণ দৌঁড়াতো মৃদুলা। সব খেলা যেন ওর চারটা হাত পায়ের নাগালের ভিতর। মনে আছে ওর বাঁহাতে ছিলো ছ’টা আঙুল। আমি ভালো দৌঁড়াতে পারতাম না। কিন্তু গোল্লাছুট খেলায় ও কখনো আমাকে আঘাত করতো না। মৃদুলার সাথে আমার একটা অদ্ভুত মিল। আমাদের দুজনেরই মাথার চুল রোদেপোড়া লাল। স্কুলে যাবার আগে ও দক্ষিণের বড়দিঘীটা সাঁতরে এপার ওপার করতো। আর আমি আমাদের ছোট পুকুরটায় ভয়ে ভয়ে ডুব দিয়ে উঠতাম। কাদের যেনো একটা মেয়ে বিয়ের আগে গর্ভবতী হয়েছে বলে আত্মহত্যা করেছিলো ওপাশের কচুরীপানা ছাওয়া গড়টায়। তারপর থেকে সেই মেয়েটার অতৃপ্ত আত্মা দীঘির পাড়ে ওই তালগাছটায় থাকতো। এই গল্পটা প্রথম আমাকে মৃদুলাই বলেছিল। সন্ধ্যায় অথবা রাতে কখনো কুপি হাতে আলো নিয়ে গাছের নিচে ঘাটে দাঁড়াতো মৃদুলা। ওর মা বাসন কোসন মেজে উঠতো। আর এপার থেকে অতৃপ্ত আত্মার ভয়ে আমাদের হাত পা সিঁটিয়ে যেতো। একবার খুব গ-গোল বাঁধলো। কারা যেন মৃদুলাদের পুরো পাড়া জ্বালিয়ে দিলো আগুনে। মৃদুলাদের গরীব গেরস্থালির সমস্ত জিনিস আগুনে পুড়লো। আমাদের বাড়িতে তখন অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। মৃদুলার মা মেয়েদুটোকে নিয়ে এসেছেন আমাদের বাড়ি। ওর কাছে শুনলাম বাজারের মুসলমানরা এসে সব শেষ করে দিয়েছে। ওর চোখে মুখে আতঙ্কের এই ছায়া আমি এর আগে কখনো দেখিনি। মৃদুলার বাবা নাকি ওদের অনেককেই চেনেন। ওই মানুষগুলো আমাদের বাড়িতেও এসেছিলো। পরে বুঝেছি অনেক মানুষকে একসাথে দেখে ওরা সাহস করেনি কোন ক্ষতি করার। কিন্তু ততক্ষণে মৃদুলাদের ক্ষতি হয়েছিলো অনেক! এই ঘটনার পর মৃদুলার বাবা পুরো পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন। ওদের পাড়াটা আস্তে আস্তে খালি হয়ে গেলো। কিছুদিন পর দীঘিটা আর থাকলো না। তালগাছটাও কাটা পড়লো। আমি ভাবতাম ঐ গর্ভবতী অতৃপ্ত আত্মাটা কোথায় যাবে? বোধহয় মৃদুলাদের সাথে চলে গিয়েছিলো। এরপর প্রায় পঁচিশ বছর বাদে সেদিন মৃদুলার সাথে দেখা হলো। ও এখন গেরস্থ বাড়ির বউ। সেই ঘটনার কিছুদিন পর ওরা ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিলো। এখন ওখানেই ওর সংসার। তোমাকে মৃদুলার গল্প বলতে বলতে শৈশবের স্মৃতিতে ডুবে গেছিলাম। আসলে তোমাকে বলতে চেয়েছি মৃদুলাই আমার শৈশব!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..