উৎসাহ উদ্দীপনাই আমাদের বড় শক্তি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গোলাম কিবরিয়া পিনু
অবিভক্ত ভারতে ত্রিশের দশকে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী যে চিন্তাসূত্রের উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রগতি লেখক সংঘ তার চলা শুরু করেছিল, দেশভাগের পর সে উদ্যোগ ক্রমান্বয়ে স্তিমিত হয়ে আসে। স্বাধীন বাংলাদেশে যার কোনো সাংগঠনিক উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ২০১৪ সালে প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আবার প্রগতি লেখক সংঘ বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে, ঠিক আরেকটি প্রকট সাম্প্রদায়িক একমুখী ধর্মজ জাতীয় চেতনার প্রতিষ্ঠালগ্নে। এই পরিস্থিতিতেই প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২৭ জানুয়ারি ২০১৭। সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন গোলাম কিবরিয়া পিনু। একতা’র সাহিত্য পাতা তার মুখোমুখি হয় এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে– ১৯৩৯ সালে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশে তার পুর্নযাত্রা। এই দীর্ঘবিরতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? প্রগতি লেখক সংঘ তৈরি হয়েছিল একটা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে। ১৯৩৩ সালে ফেসিস্ট হিটলার জার্মান দখল করে বইপত্র, লাইব্রেরি পুড়িয়ে দিল, তখন সারাবিশ্বেও প্রগ্রেসিভ রাইটার, দার্শনিক তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্রান্সে ইন্টারন্যাশনাল সম্মেলন করল, এটা প্রতিরোধ করতে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রগতি লেখক সংঘ ১৯৩৬ সালে তৈরি হয় লক্ষ্মৌতে। তারপর পশ্চিমবঙ্গে বিকশিত হলো। বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন অনেকেই এসেছে। কবি, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার সবাই। পরে স্তিমিত হয়ে যাওয়ার কারণটা হলো সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কারণে মানুষের অস্তিত্ত্বের সংকট। আগের পাঞ্জাব (পাকিস্থানের) থেকে ভারতের পাঞ্জাবে, পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ববাংলায়, পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম বাংলায় লোকের যেতে হলো। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষ হতভম্ভ। ফলে সকল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও স্থবিরতা আসল। তারই প্রেক্ষাপটে দেখা গেল লেখক সংঘের কাজও স্থগিত হয়ে যায়। প্রগতি লেখক সংঘ স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে আপনি দেশভাগের রাজনৈতিক সংকটকেই চিহ্নিত করছেন? না, তা না। আরো নানা কারণ আছে। লেখকদের মধ্যেও অনেক মতাদর্শগত বিভেদও চলে আসছিল। ১৯৭১ পূর্ববর্তী বাংলাদেশের প্রগতি লেখক সংঘ সম্পর্কে কিছু বলুন? ’৭১ পূর্ববর্তী যারা লেখক সংঘে যুক্ত ছিল, তারাই কিন্তু ষাটের দশকের আন্দোলন, গণআন্দোলন এবং ’৭০ এর ক্ষেত্রে অগ্রণী। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে হয়তো প্রগতি লেখক সংঘ ওভাবে সচল থাকেনি। তবে অন্যরূপে এর উত্তরসূরিরাই বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের মূলধারা, শক্তিশালী প্রধানতম ধারা। যা আজ পর্যন্ত প্রবাহমান। সাম্প্রদায়িক দেশভাগের প্রেক্ষাপটেতো প্রগতি লেখক সংঘের আরো সক্রিয় থাকার কথা ছিল। তা হয়নি। আপনার কি মনে হয়, ফেসিস্ট বিরোধী যে আন্দোলনের সূত্র ধরে প্রগতি লেখক সংঘের জন্ম তা একটি ধার করা আন্দোলন? নিজ মাটি থেকে জন্ম না নেয়ার কারণেই ব্রিটিশ চলে যাওয়ার সাথে সাথে আন্দোলনও গতি হারায়। না, ধার করা না দুটো কারণে। ফেসিস্ট সাম্রাজ্যবাদের আঘাত তো এই সাবকন্টিনেন্টেও ছিল। সারাবিশ্বে তখন যে সংকট তার প্রভাব কিন্তু এখানেও এসেছিল। সামগ্রিক কারণে অনেক বড় সংগঠনও নানা কারণে স্তিমিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে তার অনেক উদাহরণ আছে। দাউদ হায়দারের নির্বাসন থেকে বর্তমান পুলিশি নিরাপত্তা রিডিং, এই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাকে প্রগতি লেখক সংঘ কীভাবে মোকাবিলা করবে? আমরাতো এটার প্রতিবাদ করছি বিভিন্নভাবে। সাংগঠনিকভাবে আমরা অনেক সময় অনেক জায়গায় বক্তব্য দিয়েছি। নানা ফোরামে, ব্যক্তিগতভাবে, টকশো থেকে শুরু করে আলোচনা সভায় প্রতিবাদ করেছি। প্রগতি লেখক সংঘ বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীলদের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক স্কুলিং সনাক্ত করেছে কি, যেগুলোর বিরুদ্ধে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধটা করতে হবে? অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়াশীল স্কুলিং বিরোধী কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা? অনেকভাবে আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি। প্রগতি লেখক সংঘ কেবল দাঁড়াচ্ছে। তারপরও আমাদের কিছু লক্ষ্য আছে। সংগঠনটা ঢাকা থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত করবো। আমাদের মেইন দায়িত্ব হচ্ছে যারা লেখক, যারা সাংস্কৃতিককর্মী তাদেরকে সচেতন করা। ধর্মগ্রন্থকে ইতিহাস অনুসন্ধানেরও একটি সাহিত্যিক উপাদান হিসেবে পাঠ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে , প্রগতি লেখক সংঘের এ বিষয়ে ভাবনা কী? ধর্ম সাহিত্য, কিন্তু ধর্মটাতো ফিলোসফিক্যালিও অনেকে দেখে। দর্শনতো প্রশ্নহীন কিছু না? প্রশ্নছাড়া দর্শনের অস্তিত্ব কোথায়? না, আমরাতো সেটাই বলি। মানুষকে বলার অধিকার দিতে হবে। যুক্তি তুলে ধরার পরিবেশ পরিস্থিতি থাকতে হবে। প্রগতি লেখক সংঘতো এই কথাটাই মিটিং মিছিল দিয়ে বলবে না। লেখার মধ্য দিয়ে বলবে। এই বিষয়ে প্রগতি লেখক সংঘের কোনো অবস্থান আছে? প্রগতিশীল মানুষের মধ্যে দুটি উপাদান কাজ করে। এক যুক্তিবাদীতা আরেকটা হলো মানবিকতা। ধর্মের মধ্যেও দ্বিমত আছে। যেমন ইসলাম ধর্মেও। ইসলামের মধ্যেও দর্শনকে কেন্দ্র করে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে। যেমন কাদেরীয়া, মোজাদ্দেদিয়া–ওরা যেভাবে যুক্তি দিয়ে, যুক্তি খণ্ডন করে কথাগুলো বলেছে আমরা কিন্তু সেটুকুও বলতে পারছি না। যুক্তিসঙ্গতভাবে উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য আমরা সে কথাগুলোই বলতে চাই। প্রগতি লেখক সংঘের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দুর্বলতা কী? অনেক সংগঠন আছে, তবে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী স্বার্থে বিভক্ত। তাই অগ্রসর লেখক অনেকেই এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের সাথে কাজ করার উৎসাহ দেখিয়েছেন। এই উৎসাহ, উদ্দীপনাই আমাদের বড় শক্তি। আমরা যদি সে অনুযায়ী সংগঠনকে গুছিয়ে নিতে না পারি তবে তা বড় দুর্বলতা হয়ে যাবে। ধন্যবাদ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..