প্রগতি লেখক সংঘ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শ্যামল কুমার সরকার : বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, মানিকগঞ্জ জেলা শাখার প্রথম সম্মেলন আগামী ৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত সুখের। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী লেখক সংগঠন মানিকগঞ্জে গঠিত হয়েছে বলে সত্যিই গর্ববোধ করছি। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন উপজেলায় বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। সংগঠনটির পেছনে ফিরে দেখা যাক। ১৯৩৫ সালের ২১ জুন প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সে সম্মেলনে ইউরোপ প্রবাসী ভারতীয় লেখকদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন মুলুকরাজ আনন্দ। ১৯৩৫ সালের শেষদিকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কতিপয় শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবী লন্ডনে একত্রিত হয়ে সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ইংরেজিতে এ সংগঠনের ইশতেহার রচনা করেছিলেন সাজ্জাদ জহীর এবং এতে স্বাক্ষর করেছিলেন সাজ্জাদ জহীর, মুলুকরাজ আনন্দ, ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রাজা রাও, মুহম্মদ আশরাফ, ইকবাল সিং, ভবানী ভট্টাচার্য্য, প্রমোদ রঞ্জন সেনগুপ্ত এবং জ্যোতিষ ঘোষ। লিখিত এ ইশতেহারে প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের প্রেক্ষাপট আলোকপাত করা হয়। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিল লক্ষ্মৌতে নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’র প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যের দিকপাল মুন্সী প্রেমচন্দ এবং উদ্বোধনী ভাষণ প্রদান করেন সরোজিনি নাইডু। আর এ সম্মেলনের মাধ্যমে সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন সাজ্জাদ জহীর। ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’। ১৯৩৬ সালের শেষের দিকে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা খোলার জন্য রনেশ দাশগুপ্ত উদ্যোগ নেন। ১৯৩৭ সালের শেষ দিকে সংঘের শাখা স্থাপনের জন্য নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহীর, নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী এবং অন্যতম সংগঠক ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ঢাকায় আসেন। ১৯৩৯ সালে ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সদস্য ছিলেন রনেশ দাশগুপ্ত, সোমেন চন্দ, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, অমৃত কুমার দত্ত, জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত এবং সতীশ পাকড়াশী। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি গেন্ডারিয়া হাইস্কুলে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনের মাধ্যমে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পীসংঘ’ গঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত কাজী আবদুল ওদুদ। এ সম্মেলনে রণেশ দাশগুপ্তকে সংগঠনের সম্পাদক এবং সোমেন চন্দকে সহ-সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৪১ সালের অক্টোবরে প্রগতি লেখক সংঘ, ঢাকা জেলা শাখার দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সোমেন চন্দ সম্পাদক ও অচ্যুত গোস্বামী সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। মৃত্যু পর্যন্ত (৮ মার্চ ১৯৪২) সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ এ দেশভাগের পর প্রগতি লেখক সংঘে অস্থিরতা দেখা দেয়। ১৯৪৮ সালে মার্চ মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম সম্মেলন। এ সম্মেলনে নীতিগত কারণে সংগঠকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং ক্রমে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় কলকাতা তথা সমগ্র ভারতে সংগঠনটি নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে। কলকাতার এ বিরূপ হাওয়া ঢাকাতেও প্রভাব বিস্তার করে। ফলশ্রুতিতে ১৯৫০ সালের মাঝামাঝিতে ঢাকার প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়। ঢাকা হতে প্রগতি লেখক সংঘের প্রকাশনা ‘ক্রান্তি’ এবং ‘প্রতিরোধ’ প্রকাশ হয়েছিল। পরিবর্তীতে ২০০৮ সালের ৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হকের বাসভবনে ১১ জন উৎসাহী ব্যক্তি এক সভায় একত্রিত হন। তাঁরা প্রগতি লেখক সংঘকে পুনর্জীবিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। এ নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে থাকেন অধ্যাপক বদিউর রহমান (আহ্বায়ক), ড. রতন সিদ্দিকী (যুগ্ম-আহ্বায়ক), মতলুব আলী, নিরঞ্জন অধিকারী, কাজল বন্দোপাধ্যায়, সোহরাব হাসান, ভীষ্মদেব চৌধুরী, বিশ্বজিৎ ঘোষ, সৈয়দ আজিজুল হক, মশিউল আলম এবং সৌমিত্র শেখর। ২০০৮ সালে বিহারে অনুষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলন এবং এতে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের প্রতিনিধিত্ব করেন অধ্যাপক বদিউর রহমান ও অধ্যাপক মতলুব আলী। ২০১১ সালের ১ মে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয় ঢাকায়। উক্ত কমিটিতে অধ্যাপক বদিউর রহমান সভাপতি এবং অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে থাকেন। ২০১৪ সালে ৮ আগস্ট বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম জাতীয় সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। আর এ লেখক সংঘের দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে। মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক অধ্যক্ষ ও অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলাম আরজুর উৎসাহে মানিকগঞ্জে প্রথম গঠিত বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের জেলা শাখার আহ্বায়ক হিসেবে আমি, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম ও ভজন কৃষ্ণ বণিক উক্ত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করি। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ মার্চ আমাকে আহ্বায়ক এবং মো. নজরুল ইসলাম ও পংকজ পালকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, মানিকগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। প্রগতিশীল লেখক সংগঠনটি অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে। সূদুর লক্ষ্মৌ হতে মানিকগঞ্জে এসে দাঁড়িয়েছে। যাঁদের শ্রমে, ঘামে, মেধায় ও ত্যাগে সংগঠনটি আজ এ পর্যায়ে এসেছে তাঁদের সবার কাছেই আমরা ঋণী। আমরা চিরকৃতজ্ঞ তাঁদের কাছেও যাঁরা অর্থ, সময়, লেখা ও পরামর্শ দিয়ে এ সম্মেলনের আয়োজনকে সফল করতে সহযোগিতা করেছেন। সাধের সাথে সাধ্যের সখ্য না থাকাতে এ প্রকাশনা ও সম্মেলনে অনেক অপূর্ণতা থেকে গেলো। এ জন্য আপনাদের ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনাদের নৈতিক সমর্থন, পরামর্শ ও প্রেরণায় মানবতাবাদী বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, মানিকগঞ্জের পূর্ণাঙ্গ কমিটি আরো সমৃদ্ধ হবে এ কামনা করি। মানবতার জয় হোক। লেখক : সহকারি অধ্যাপক, ঝিট্কা খাজা রহমত আলী ডিগ্রি কলেজ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..