মহান অক্টোবর বিপ্লব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কাজী মোতাহার হোসেন : আজ থেকে পঞ্চাশ বছর রাশিয়ার নিপীড়িত জনগণের হৃদয় মথিত করে যে মন্ত্র রোল উঠেছিল- যার করুণতায় আল্লার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল- তারই ফলে রাশিয়ায় মানব মানবতা জাগ্রত হয়েছিল ব্যাপকভাবে, সর্বহারা কৃষক মজুরদের মনে, আর তাদের দরদী নেতাদের মনে। এরই প্রকাশ হয়েছিল ১৯১৭ সালের মহান অক্টোবর বিপ্লবরূপে। এ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রাম, দানবতার বিরুদ্ধে মানবতার সংগ্রাম। তাই এর নাম ‘বিপ্লব’-‘বিদ্রোহ’ নয়। বিদ্রোহের তেমন কোন উন্নত আদর্শ নেই,- সে কেবল স্বার্থের লড়াই, ‘জোর যার মুল্লুক তার’-নীতির উপর তার প্রতিষ্ঠা। এতে একরাজা বা পুঁজিপতি শ্রেণি শাসন বা শোষণ করছে, তার থেকে প্রবলতর রাজা বা পুঁজিপতি দল সেই শাসন ক্ষমতা বা শোষণ-ক্ষমতা কেড়ে নেয় মাত্র, ছলে, বলে কৌশলে। এই হল বিদ্রোহের সাধারণ রূপ। কিন্তু অক্টোবর বিপ্লবের ছিল মহান আদর্শ : আল্লার দান, পৃথিবীর ঐশ্বর্য যার যার প্রয়োজন মত সকলে মিলেমিশে ভোগ করবে; সকলেই যার যার সাধ্য ও প্রকৃতি অনুসারে কাজ করে সম্পদ বাড়াবে; সকলেই ভাই ভাই- কেউ কারো অধীন নয়; সকলেই শিক্ষা বিজ্ঞান, কালচার, প্রভৃতিতে উন্নত হওয়ার সমান স্বাধীনতা ও সুযোগ লাভ করবে; এইসব নীতি। মোটকথা, সোভিয়েত রাশিয়ার পতাকায় যে স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর প্রতীক অঙ্কিত রয়েছে, তাই অক্টোবর বিপ্লবের মূল আদর্শ। আদর্শ তো এক প্রকার উচ্চ মানস গঠন, যার সার্থকতা হয় কর্মের ভিতর দিয়ে। আদর্শ ফলবান করবার জন্য চাই সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, বহু ধরনের কাজের জন্য বহু ধরনের লোক, এর পরিকল্পনা ও পরিচালনার জন্য সবিশেষ উপযুক্ত কর্মসংঘ, যেখানে শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল ও কর্মদক্ষ লোকদের আদর্শ, উপদেশ ও উদাহরণ সকল কর্মীই সুশৃঙ্খলভাবে যার যার করণীয় কাজ ঠিকভাবে করে যাবে। অক্টোবর বিপ্লবের নেতৃত্ব করেছিলেন মহামনীষী ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ্ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)। এর জন্য তিনি ১৮৯৩ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত কখনও গুপ্তভাবে রাশিয়ায় কখনও বা দেশান্তরে থেকে বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সুসংগঠিত করেন। এই পার্টি থেকে বলশেভিক পার্টির উদ্ভব হয়। লেনিনের নেতৃত্বে এঁরা সর্বৈবভাবে জারের শাসন উচ্ছেদ করে কৃষক মজুরদের কর্তৃত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। শুধু পরিকল্পনাই নয়, কার্যক্ষেত্রেও যে লেনিন বিপ্লবের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন, নীচের টুকরো ঘটনাগুলো থেকে তা পরিষ্কার বোঝা যাবে। ১৯১৭ সালের ৭ অক্টোবর তারিখে দেখা গেল, ফিনল্যান্ড থেকে রেল গাড়ির ইঞ্জিনে চড়ে দেহরক্ষী ভ্যাসিলীকে নিয়ে লেনিন এলেন পেট্রোগ্রাডে। ১০ অক্টোবর ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন অধিবেশন। এই সভায় বিপ্লবের কার্যক্রম গ্রহণ করার কথা। ট্রটস্কি, ক্যামেনভ এবং জীনোভিয়েভ প্রত্যেকে বললেন, বিপ্লব অবশ্যই ঘটাতে হবে, কিন্তু তা সোভিয়েত কংগ্রেস অথবা বিধান সভায় প্রস্তাব পেশ করবার পরে। কিন্তু লেনিন বললেন, ‘আমাদের যা প্রস্তুতি আছে, তাতে এখনই অতর্কিত আক্রমণ করলে জয়ের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। একযোগে নৌ শক্তি, স্থলসৈন্য ও রাইফেলধারী শ্রমিক ও কৃষকদের সমবেত হামলা করতে হবে পেট্রোগ্রাডের উপর; আর অবিলম্বে দখল করতে টেলিফোন, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা, ব্রিজ ও ও রেলস্টেশনগুলো। অবশ্য এর জন্য অসাধারণ নৈপুণ্য ও সাহসের আবশ্যক- কিন্তু আমাদের এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’ তিনি আরও বললেন, “এখনও যারা গড়িমসি করবার পরামর্শ দিচ্ছে, তারা হয় নির্বুদ্ধিতা না হয় বিশ্বাসঘাতকতার বশেই ওরকম বলছে।” যা হোক সারারাত বাকবিতাণ্ডার পর ভোরের দিকে লেনিনের সশস্ত্র অতর্কিত হামলার প্রস্তাবই গৃহীত হয়। ওদিকে জারের সহকারী ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিরা মতলব আঁটছে, গণতন্ত্রী পার্টিদের এগিয়ে দিয়ে প্রথমে দেশে শান্তি ও শৃংখলা আনা যাক, তারপর সুযোগ বুঝে এই ট্রজান-ঘোড়াকে বিদায় করে দিলেই চলবে। আবার প্রাদেশিক গভর্নমেন্ট কোটিপতিদের পরামর্শ মত জার্মানির হাতে পেট্রোগ্রাড সমর্পণ করে, জার্মান সৈন্যদের বুটের তলে রাশিয়ান বলশেভিকদের হাতে ককেশাস কআর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির কাছে ইউক্রেন বিলিয়ে দিয়েও কাজ হাসিলের সুপারিশ করছে। অর্থাৎ এদের মতে অধেক রাশিয়া যায় যাক, কিন্তু চাষা মজুর প্রভৃতি ছোট লোকেদের (প্রলেটারিয়েটদের) আস্পর্দা চূর্ণ করা চাই-ই-চাই। তাই আগে ফ্যাক্টরির মজুর ও কর্মচারীদের নিরস্ত্র করতে হবে। আবার কেউ বলছে, ও কাজটা মেনশেভিক আর সমাজ বিপ্লবীরাই সহজে করতে পারবে। কেউ বলছে লেনিনকে আগে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দাও। ইতিমধ্যেই মেনশেভিক ঝকভ আর সমাজ বিপ্লবী রুত্কোস্কিকে হাত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রামাঞ্চল থেকে লেনিনদের কাছে খবর আসছে, সমস্ত বুর্জোয়া শ্রেণির গরুবাছুর কৃষক শ্রমিকেরা ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছে, তাদের প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের জমি জমাও জবরদখল করতে হবে কিনা, সে সম্বন্ধে উপদেশ প্রার্থনা করছে। হুকুম গেল- “জমি জমাও দখল করে নাও, জমিদারদের তাড়িয়ে দাও।” ২৪ অক্টোবর সাঁঝাসাঁিঝ সময় লেনিন স্মালনি কারখানায় এসে পৌঁছলেন। হুকুম হল, শেষরাত্রি থেকেই হামলা আরম্ভ করতে হবে। প্রথমে আবুকোভ্ ও নার্ভা কারখানা, তারপর উইন্টার প্যালেস অধিকার করতে হবে। অপরপক্ষও ক্যামেনভ ও জিনোভিয়েভের মারফতে আসন্ন বিপ্লবের খবর পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারা লেনিনের মত এত তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি। তাদের পরিকল্পনা ছিল, ২৬ তারিখ সীমান্ত থেকে তাদের সৈন্য এসে পড়বে; মিলিটারি স্কুলের ক্যাডেটরাও আসবে; দুই ব্যাটালিয়ান কসাক সৈন্য এসে পৌঁছবে; তখন প্রথমেই স্মালনী কারখানার সোভিয়েতদের প্রধান আড্ডা ধ্বংস করে সোভিয়েতদের মু-পাত করা হবে। সঙ্গে সঙ্গে লেনিনকে ধরবার ব্যবস্থাও হয়ে গেছে; উইন্টার প্যালেসের রক্ষা ব্যবস্থার জন্য অফিসার, ক্যাডেট ও কসাক ইউনিট ছাড়াও বেসামরিক লোকদের মধ্যে যাদের উপর নির্ভর করাযায়- অর্থাৎ সিভিল সার্ভিসের লোক, ব্যাংকের কর্মচারী আর ছাত্র দলকে-রাইফেল দিয়ে সজ্জিত করার প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হয়েছে; ঐ দিন যাতে প্রলেটারিয়েটরা শহরে ঢুকতে না পারে তার জন্য পেট্রোগ্রাডের প্রান্তবর্তী সমুদয় ব্রিজ ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে, আর নদীর বাঁকে বাঁকে সশস্ত্র সৈন্য মোতায়েনের আয়োজনও প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। লেনিনের অগ্নিগর্ভ বাণীতে সারা সোভিয়েত বাহিনী উত্তেজিত আনন্দে উৎফুল্ল। তারা যেন ইতোমধ্যেই বিজয় লাভ করে ফেলেছে, এইরকম আত্মবিশ্বাসের সাথে আক্রমণ করতে বেরিয়েছে ২৫ অক্টোবরে ভোর না হতেই। ক্রাউস্ট্যাট যুদ্ধ জাহাজের সৈন্যেরা লেনিনের বাণী পাঠ করছে- “দুনিয়ার এমন কোনও শক্তি নাই যা প্রলেটারিয়েটদের বিজয়কে রোধ করতে পারে; তারা এখন অভিযোগ, ভিক্ষা ও অশ্রুজলের পথ ছেড়ে সক্রিয় বিপ্লবী কর্মপন্থা গ্রহণ করেছে। অভিযান শুরু হয়েছে আর বিলম্ব নয়- যুদ্ধকর্মে দ্বিধা ও বিলম্বই মারাত্মক।” বাল্টিক সাগরের বাতাস লেনিনের বাণী দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে দিল। সৈনদল গান গাইতে গাইতে চলল– “জাগো অনশন বন্দি জাগোরে, দুনিয়ার লাঞ্ছিত বঞ্চিত সব জগো রে।” দূর-দুরান্তের সেভিয়েত স্বেচ্ছাসৈনিকেরা বলতে বলতে চলল, “কমরেডগণ, আমরা চলেছি পুঁজিবাদ ধ্বংস করার জন্য, নির্যতিতের পরিত্রাণের জন্য–সোভিয়েট শক্তি চিরজীবী হোক, লেনিন অমর হোক।” –এই সব বোল্ আওড়াতে আওড়াতে আর শ্রমিক ও কৃষকের মিলন বাণী উচ্চারণ করতে করতে– “খেতে আর কারখানায় আমরা সবাই খেটে খাই আমরা সবাই একদলের, খেটে খাওয়া ভাই ভাই।” যাহোক লেনিনের অগ্রবতিতার সুযোগে, লেনিনের প্রতি সোভিয়েট দলের প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকায়, আর তাদের ন্যায্য মানবাধিকার লাভ করার প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহের ফলে সোভিয়েতদেরই জন্ম হল, লেনিনের কর্মসূচির প্রত্যেকটি কাজ সম্পন্ন হল–মাত্র এক দিনের প্রাণপন সংগ্রামের ফলে। সামরিক বিপ্লবী কমিটির থেকে হুকুম নানা জারি হল–“আজ থেকে বিনা খেসারতে ভুসম্পত্তির মালিকানা রহিত হল। খেত খামার, সংশ্লিষ্ট গরু, ঘোরা ভেড়া প্রভৃতি পশু ও যন্ত্রপাতিসহ সমুদয় সম্পত্তি সোভিয়েত জনসাধারণের সম্পত্তি হয়ে গেল।” সোভিয়েত কমান্ডার ম্যাটাভিয়েভ উইন্টার প্রাসাদের বৃত্তাকার ঘরে সমবেত প্রাদেশিত মন্ত্রীদের কাছে সামরিক বিপ্লব কমিটির নামে ঘোষণা করলেন, ‘প্রাদেশিক গভর্নমেন্টের মন্ত্রীগণ, আপনাদের সমুদয় গভর্নমেন্টকে সর্বসাকুল্যে গ্রেফতার করা হল। নাগরিকগণ, আপনারা অধীর হবেন না, কোনও ভয় নাই। প্রলেটারিয়ান বিপ্লব সম্পন্ন হতে চলেছে’। এমন সময় উইন্টার প্রাসাদে লেনিন এসে উপস্থিত হলেন। তুমুল হর্যধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে জনতা কিছুটা শান্ত হলে লেনিন ঘোষণা করলেন, “কমরেডগণ, কৃষি মজুরদের যে বিপ্লবের জন্য বলশেভিকগণ সর্বদা অপেক্ষা করছিলেন, তা সাফল্যের সঙ্গে ঘটে গেছে।” আবার প্রচণ্ড হুররা ধ্বনি উঠলো। কে যেন ইন্টার ন্যাশনাল সঙ্গীতের সুর ধরলো। তখন সকলের সমবেত কণ্ঠে ইন্টারন্যাশনাল মহাসঙ্গীত প্রবলভাবে ধ্বনিত হয়ে উঠল। (বিপ্লবের ঘটনার এই টুকরোগুলো নেওয়া হয়েছে এলেক্সী ক্যাপলারের “অক্টোবরে লেনিন” নামক বিখ্যাত ফিল্ম চিত্রের মার্থারেট ভেটলিন-কৃত ইংরেজি অনুবাদ থেকে। মাসিক সোভিয়েত সাহ্যিত- ৮ম সংখ্যা, ১৯৬৭) মহান অক্টোবর বিপ্লবের টুকরো টুকরো ঘটনাবলির তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে: সোভিয়েতদের দলীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবার জন্য অধিকাংশের অভিমত গ্রহণ করা আবশ্যক;–ডেমোক্রেসিতেও যা করা হয়। মূলনীতি হলো পরিশ্রমের মর্যাদা অর্থাৎ উৎপাদকদের কর্মের ন্যায্য স্বীকৃতি দেওয়া; এটি প্রাচ্যে না হলেও পাশ্চাত্যে বহুলাংশে স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, মেহনতী লোকেরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে; এটা কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন আদর্শ। তবে মননশক্তি, সংগঠনী শক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান-কালচার এসবেরও যথাযোগ্য সমাদর ও সম্মান রয়েছে-নইলে লেনিনের নেতৃত্ব এতটা ফলদায়ক হতে পারতো না। দেশের যাবতীয় সম্পত্তির মালিকানা কারো একার নয়, সমষ্টিগতভাবে সোভিয়েত জনগণের। আর এই সম্পত্তির উৎপাদনের প্রত্যেকেই আপন আপন সাধ্য অনুসারে কাজ করবে, আর তা ভোগ করবে প্রত্যেকে যার যার প্রয়োজন মত; এতে সব মানুষ সমান নয়, তার স্বীকৃতি রয়েছে, আর সাধারণ সম্পত্তির একটা সর্বসম্মত বণ্টন নীতিও গড়ে উঠেছে। এতে হন্তকর্মীদেরও ভয় নেই; আবার বুদ্ধিজীবী নেতৃগণ ও সুদক্ষ কর্মতৎপর প্রবানদেরও অসুবিধা নেই। সমগ্র দেশের কল্যাণ বা স্বার্থই সর্বাগ্রে, অর্থাৎ সমষ্টির মুখ্য; ব্যষ্টির হিত গৌণ, এবং সমষ্টির হিত সাধনের উপায় মাত্র। এই সব নীতি ও তার সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপ উপস্থিত অবস্থর উপর নির্ভরশীল–অর্থাৎ ভাবাদর্শের মূল অংশ অটুট রেখে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর আবশ্যকীয় পরিবর্তন সাধন করতে বাধা নেই; এই নীতির অনুসরণ করেই সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান নীতির প্রচল হয়েছে। দলীয় সংহতি একটা অত্যাবশ্যক অঙ্গ। দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে (অথবা, অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের সংখ্যাগুরু জনসাধারণের স্বার্থের বিরুদ্ধে) যাওয়া বিশ্বাসঘাতকতার কাজ, অত্যন্ত গর্তিত ও কঠোরতম দণ্ডে দণ্ডনীয়–যেমন ক্যামেনভ ও জিনোভিয়েভের ব্যবহার (শত্রু পক্ষের কাছে কেন্দ্রীয় কমিটির সংকল্পের কথা ফাঁস করে দেওয়া)। পৃথিবীতে যত প্রাচীন নীতি–পারিবারিক, গোত্রীয়, মিল্লতি, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় যত প্রকার আছে–সবই অভিজ্ঞতা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে; আর দেশকালভেদে এর বিভিন্নতা ও বিবর্তনও হযেছে। এসব হচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা। যে দেশেরই অভিজ্ঞতা হোক, সমস্ত মানুষ জাতির মৌলিক চরিত্রের মধ্যে ঐক্য রয়েছে বলে, সব দেশেই কিছু ভিন্ন রূপ হলেও–সেই সবের পুনরাবির্ভাব হয়ে থাকে। তাই ১৯১৭ সালে রাশিয়ার যে অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল, আর দেশে মাথা গুণতি অধিকাংশ লোকে অক্টোবর বিদ্রোহের ভিতর দিয়ে যে ভাবে তার সমাধান করেছিলেন, সেই সর্ব কর্মপন্থা, সংগঠন, চিন্তাধারা ও আদর্শ সামনে রেখে কিয়াস ও ইজমার (সাদৃশ যুক্তি ও সর্বসম্মত নীতির) সাহায্যে আমরাও আলোক পেতে পারি। এবং অন্যসব দেশেও তার রূপান্তরিত প্রয়োগ হতে পারে। তাই মহান অক্টোবর, বিপ্লবের মত একটা বিশ্ববিখ্যাত ঘটনার স্মৃতি পালন করা একটা আন্তর্জাতিক মহোৎসবের মর্যাদা লাভ করেছে। এই বিপ্লবের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, সাদাকালো, আশরাফ-আতরাফ, ধনীদরিদ্র, আর্য-সেমেটিক, ইঙ্গবঙ্গ, পাকভারতীয় নির্বিশেষে সকলেই (ও সকল জাতিই) সাধনা ও সুনেতৃত্বের বলে মানবীয় গুণ ও আকাক্সক্ষার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে পারে। বর্তমান পৃথিবীর উন্নত জাতি, বিশেষ করে যাঁরা বিংশ শতাব্দিতেই জনজাগরণের দ্বারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট সামরিক বেসামরিক জ্ঞান ও কলাকৌশলে শ্রেষ্ঠতা লাভ করেছেন, তাঁরা নিপীড়িত অনুন্নত ও সদ্যস্বাধীনতাপ্রাপ্ত ও সাম্রাজ্যবাদের পদানত সমগ্র এশীয়, আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ ভাইদের অবস্থা উন্নয়নে সহায়তা করতে পারেন এবং কোন কোন স্থানে করেছেন আর করছেনও। তাই বিপুল সম্ভাবনাপূর্ণ এই মহান অক্টোবর বিপ্লবের স্বাধীনতা, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শকে স্বাগত জানাই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..