শেষ হয়নি মুক্তিযুদ্ধ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময় হিসাবে বলা হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এই কালপর্বটিকে। যদিও এই ইতিহাসও হয়তো একদিন অতিক্রম হবে এবং শ্রেষ্ঠতর– পূর্ণতর কোনো সময়ের সাক্ষাৎ আমরা ভবিষ্যতে পাবো এবং প্রতিটা জাতির মতো বাঙালি জাতিও নিশ্চয় এক অজর্নকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে পূর্ণতর আরেক অর্জনের দিকে। সে জন্যই স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই স্বাধীনতার পক্ষের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অগ্রসর শক্তিবৃন্দ স্লোগান দিয়েছিলেন ‘স্বাধীনতা এনেছি– সমাজতন্ত্র আনবো’। এমনকি ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক কবিতার মতো ভাষণে বঙ্গবন্ধুও দুই ধরনের আকাঙ্খাই ব্যক্ত করেছিলেন। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবং ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। বলা বাহুল্য ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সমাপ্ত হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে যখন দখলদার উপনিবেশিক পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু জনগণের মুক্তি সংগ্রাম আজও অব্যাহত আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের পরাজিত শত্রু, স্বাধীনতা বিরোধী দালাল শক্তি থেকে মুক্তি, সাম্রাজ্যবাদের নানা ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি, শোষণ-অত্যাচার-অবিচার থেকে মুক্তি, দারিদ্র ও ক্ষুধা থেকে মুক্তি, বেকারত্ব থেকে মুক্তি, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, রোগ-শোক-ব্যাধি থেকে মুক্তি, স্বেচ্ছাচারিতা-সন্ত্রাস-লুণ্ঠন থেকে মুক্তি, স্বৈরাচার ও অগণতান্ত্রিক হামলা থেকে মুক্তি, এসবই আজো রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অথবা কোথাও কোথাও স্বল্পমাত্রায় একটু-আধটু অগ্রগতি হলেও স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এই মার্চ মাসে এসে আমরা যদি পুনরায় বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরি তাহলে দেখবো স্বাধীন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে এসব ‘মুক্তির’ কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন কোণে কোণে শুধু অন্ধকার নয়, লুকিয়ে আছে গভীর অন্ধকার। তাই স্বাধীনতা আমরা এনেছি ঠিকই কিন্তু মুক্তির যুদ্ধ এখনো চলছে বলেই আমাদের ধরে নিতে হবে। কোথাও তীব্র। কোথাও শ্লথ। এই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ একটি ভিন্ন ধরনের জটিল এবং কঠিন মুক্তিযুদ্ধ। এখানে রাইফেল হাতে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে তথা হানাদার বিজাতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির সশস্ত্র প্রতিরোধের কোনো অবকাশ নেই। এই লড়াইয়ে শত্রু আমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে। আমাদের মধ্যেই যারা দেশটাকে পিছিয়ে পুনরায় পাকিস্তানি আদলে গড়ে তুলতে চায়– চায় সাম্রাজ্যবাদ, একচেটিয়া পুঁজিবাদ এবং সামন্ত সংস্কৃতির আধিপত্য কায়েম করতে তাদের বিরুদ্ধে একটি তীব্র মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করাই হচ্ছে আজকের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কর্তব্য। এ জন্য একদিকে যেমন এসব অপশক্তির আধিপত্য ধ্বংস করতে হবে অন্যদিকে তেমনি গড়ে তুলতে হবে বাম-গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক বিকল্প শক্তির ঐক্য, জাগরণ ও আধিপত্য। স্বাধীনতা পরবর্তী কালপর্বে আমাদের অসমাপ্ত জাতীয় এবং গণতান্ত্রিক কর্তব্যগুলি সম্পাদনের জন্য দৃঢ়ভাবে এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’। এই অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের অন্যতম প্রধান দুটি দিক হচ্ছে উৎপাদন শক্তির বিকাশ সাধন এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন উন্নত উৎপাদনসম্পর্ক স্থাপন। মনে রাখতে হবে যাতে একই সাথে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং ঐ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সেসব শ্রমিক-কৃষক-মানসিক শ্রমজীবী এবং সৃজনশীল উদ্যোক্তাবৃন্দের অবদান রয়েছে তাঁরা যাতে তাদের ন্যায্য হিস্যাটুকু লাভ করে উৎপাদনবৃদ্ধিতে পুনরায় আরো উৎসাহিত হয়ে উঠেন সেদিকটার প্রতি। এইভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ন্যায্য বণ্টনের সমন্বয়ে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির চাকা ক্রমশ: সামনের দিকে অগ্রসর হবে। সেটাকে সঠিক দিকে সঠিক বেগে পরিচালিত করাই এই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কর্তব্য। স্বাধীনতার ৪৬ বর্ষ যাপনের এই মাসে আসুন আমরা আমাদের জাতির মধ্যে থেকে সেইসব কর্ণধারদের খুঁজে বার করি এবং সামনে নিয়ে আসি যারা বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়নতার সঙ্গে জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সক্ষম, যারা অগ্রসর চিন্তার অধিকার, এবং আগে থেকেই ভবিষ্যত দেখেন এবং যারা তার জন্য জীবনপন করতে মোটেও দ্বিধা বোধ করেন না। জনগণ তাঁদেরকে খুঁজে বার করুন এবং তাঁরাও জনগণকে খুঁজে বার করুন এটাই আজ দেশমাতৃকার দাবি।
সম্পাদকীয়
ঘুষ-দুর্নীতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..