বাজছে আণবিক যুদ্ধের ডঙ্কা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

হাসান তারিক চৌধুরী : মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক রণতরী ইউএসএস কার্ল ভিনসন কোরীয় উপদ্বীপে ভিড়েছে। এখবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই পুরো এশিয়া জুড়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বিরাট আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, মার্কিনের এ রণতরীর সক্ষমতা সম্পর্কে যারা জানেন তারা এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারবেন না। গত ১৪ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার পত্রিকা দ্য কোরিয়া হেরাল্ড লিখেছিলো, ‘পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক রণতরী ইউএসএস কার্ল ভিনসন ১৫ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ায় আসছে’। এখবরটি প্রকাশিত হবার পর থেকে কোরীয় উপদ্বীপকে কেন্দ্র করে মার্কিনের সামরিক তৎপরতার আরো নানা খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হচ্ছে। মুলতঃ উত্তর কোরিয়াকে পদানত করার উদ্দেশ্যেই কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই ব্যাপক সমরসজ্জা। যে অত্যাধুনিক রণতরী ইউএসএস কার্ল ভিনসন কোরীয় উপদ্বীপে পাঠানো হয়েছে। সেটি একাই কোনো একটি দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করতে সক্ষম। ১৯৮২ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত এই যুদ্ধ জাহাজ এফ-১৮ সুপার হর্নেট জঙ্গি বিমান এবং সীহক হেলিকপ্টার এর মতো ৯০ টি আকাশযান একইসঙ্গে বহন করতে সক্ষম। এ জাহাজ থেকেই এসব জঙ্গি বিমানের উড্ডয়ন, অবতরণ এবং মিসাইল নিক্ষেপ সম্ভব। যে কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর কম্যান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুক বলেছেন, এ ধরণের সামরিক উপস্থিতি কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিনের সামরিক শক্তির সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। আসলে মার্কিন কম্যান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুক যথার্থই বলেছেন, কোরিয়ায় এরকম নগ্নভাবে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন না করলে মার্কিনের সাম্রাজ্যবাদী পেশীশক্তি প্রদর্শনের ষোলকলা পূর্ণ হয় না। কিন্তু কেন এ পেশীশক্তি প্রদর্শন? কাকে তারা এ শক্তি দেখাচ্ছেন? সে প্রশ্নের মূল্যায়ন খুবই জরুরি। মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়মিত সামরিক সহযোগিতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে নাকি মার্কিন রণতরী ইউএসএস কার্ল ভিনসন কোরীয় উপদ্বীপে নোঙ্গর ফেলেছে। এর পেছনে কোনো আগ্রাসী উদ্দেশ্য নেই। আবার একইসঙ্গে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে, উদ্ধত উত্তর কোরিয়াকে রুখতে মার্কিনের এ সামরিক আয়োজন। এরকম পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেয়ার ভেতর দিয়ে মার্কিন প্রশাসন নিজেই তাদের নেতিবাচক চরিত্রটি প্রকাশ করে দিয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে যাই বলুক না কেন, আসল সত্যটি নানাভাবে মার্কিন কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রিত পত্র পত্রিকাতেও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সেটি হলো, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ইস্যুর বিতর্ককে ব্যবহার করে এশিয়ায় বড় ধরনের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কারণ, এনিয়ে যদি বহুপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে দেখানোর মতো কোনো যুক্তি মার্কিনের হাতে থাকবে না। মার্কিন ও তার মিত্ররা যেভাবে উত্তর কোরিয়াকে উদ্ধত হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে দেখাতে চাইছে- বাস্তব অবস্থা মোটেও সেরকম নয়। বলা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া নাকি ছোট মাত্রার মিসাইল নিক্ষেপের পরীক্ষা চালিয়ে কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করেছে। অথচ, গত মাসেই দক্ষিণ কোরিয়া ‘পুকগুকসং-২’ নামের একটি মাঝারি মাত্রার ব্যালাস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। যা প্রচলিত সামরিক আচরণ বিধির পরিপন্থী। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া আঞ্চলিক সামরিক আচরণবিধি মেনে চললেও তাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এখানেই মার্কিনের সমরসজ্জার শেষ নয়। উত্তর কোরিয়াকে পদানত করতে কোরীয় উপদ্বীপে মানববিহীন যুদ্ধ বিমান পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জেফ ডেভিস। তিনি বলেছেন, এ লক্ষ্যে গ্রে ঈগল সিস্টেম কোম্পানি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করা হয়েছে। এরা দক্ষিণ কোরিয়ার কুনসান বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা স্থাপনা প্রতিষ্ঠিত করবে। এভাবেই কোরীয় উপদ্বীপ সহ পুরো এশিয়াকে এক ভয়ানক যুদ্ধের দুয়ারে নিয়ে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। চীন ও রাশিয়াকে প্রয়োজনে মোকাবেলা করার জন্য এশিয়ায় মার্কিনের সবল উপস্থিতি আজ নিশ্চিত করা হচ্ছে। আর তাই এর পটভূমি সৃষ্টি করার জন্য যা যা করার দরকার সবই তারা করছে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা মার্কিনের কাজে লেগেছে। দুর্নীতির দায়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি পার্ক গিউন হাই এর অভিশংসন ও অপসারণের পর দেশটির ক্ষমতাসীন ডানপন্থি দল লিবার্টি কোরিয়া পার্টি আগামী নির্বাচনে তাদের পরাজয় ঠেকাতে এক ধরনের যুদ্ধোন্মাদনাকে ব্যবহার করতে চাইছে। আর সেটিকেই লুফে নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ফলে যেভাবে পরিস্থিতি ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে তাতে যে কোনো মুহূর্তে উত্তর কোরিয়া আক্রান্ত হতে পারে। ট্রাম্প পূর্ববর্তী মার্কিন শাসকশ্রেণি উত্তর কোরিয়া আক্রমণের কথা বহুবার ভেবেও পিছিয়ে এসেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের শাসনামলে পরিস্থিতি কী হবে তা অনুমান করা এখন বেশ কঠিন। তবে যুদ্ধ যদি সংঘটিত হয় তা কেমন হবে এ প্রসঙ্গে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর তৎকালীন জয়েন্ট চীফ অব স্টাফ জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ড। তিনি বলেছিলেন, ‘অবধারিতভাবেই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধ হবে বহু পাক্ষিক এবং অঞ্চলব্যাপী’। জেনারেল ডানফোর্ড এর এ মূল্যায়ন এখনো প্রাসঙ্গিক। সে কারণে শুধু দক্ষিণ কোরিয়াই নয় তাদের সঙ্গে জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে যুক্ত করে নিজের সামরিক অভিলাষকে চরিতার্থ করতে মার্কিন প্রশাসন আজ মরিয়া। তাদের সে অভিলাষের অংশ হিসেবেই দক্ষিণ কোরিয়া সফর করলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..