ভয়াবহ সংকটে আফ্রিকা

১৪ লাখ শিশু মৃত্যুর আশংকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সৈয়দ ফরহাদ : প্রচণ্ড খরা চলছে আফ্রিকা মহাদেশে। তার সাথে যোগ হয়েছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সোমালিয়া, চাদ, নাইজেরিয়া, নব্য স্বাধীন দক্ষিণ সুদানে কয়েক কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত। ইয়েমেনও রয়েছে বিপর্যস্ত অবস্থায়। এ ছাড়া কেনিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও তানজানিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ মারাত্মক দুর্ভিক্ষের হুমকিতে রয়েছে। কেবল তানজানিয়াতেই ৭৮ শতাংশ মানুষ খাদ্য সংকটে আছে। খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে গবাদিপশু ও পাখিরও। এর সঙ্গে আছে পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। গত সপ্তাহে দক্ষিণ সোমালিয়ায় অনাহারে এবং ডায়রিয়ায় অন্তত ১১০ জন মারা গেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সোমালিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারাত্মক খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণে ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তাদের জন্য অবিলম্বে মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ও সোমালিয়ায় বড় ধরনের দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। আফ্রিকার অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র এইসব অঞ্চলে খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার কথা। বৈশ্বিক উষ্ণতার দরূণ এই অঞ্চলে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি আছে যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত। এসব নানা কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিকশিত হতে পারছে না। বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলোর সীমাহীন এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফল এই গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া। যার দরূণ পৃথিবীতে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। আর এর মূল ক্ষতির শিকার হচ্ছে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো যাদের এতে কোনো সংশ্লিষ্টতাই নেই। বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে এক ভয়াবহ সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ধনী রাষ্ট্র গুলো অনেকটা নিমরাজি হয়ে সংকট সমাধানে উদ্যোগী হয়েছেন। যদিও কখনোই তারা প্রতিশ্রুতি রাখেনি। তারপরও প্যারিসে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের জলবায়ু সম্মেলনকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে এই অর্থে যে শেষমেস বড়লোক রাষ্ট্রগুলো নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চলা আফ্রিকার এইসব অঞ্চলের খরা ও খাদ্য সংকটের আপাত সমাধান কী? জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চল গত বছর থেকেই দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত। আর সোমালিয়ায় যা চলছে ২০০০ সাল থেকে। ২০১১ সালের দুর্ভিক্ষে সোমালিয়ায় অন্তত ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নিহত হন। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসেবে, যাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী মাসের মধ্যে এই চারটি দেশে অন্তত ১৪ লাখ শিশুর মৃত্যু হবে খাবারের অভাবে। মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ২ কোটি মানুষ। সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষের কারণ খরা। বাকি দেশগুলোতে সংঘাত আর মানব সৃষ্ট কারণে ঘটছে এমন বিপর্যয়। একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হল পৃথিবীতে দারিদ্র, খরা বৃদ্ধির পাশাপাশি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ধনী থেকে আরও ধনী হচ্ছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ওয়েলথ রিপোর্ট ২০০৬-এ বলা হয়েছিল, পৃথিবীর মোট সম্পদের শতকরা ৪০ ভাগ ভোগ করছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। আর ওয়ার্ল্ড ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৫ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে পৃথিবীর শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদ। অর্থাৎ ৯ বছরে ১ শতাংশ ধনীর সম্পদ বেড়েছে ১০ শতাংশ। ঘুরিয়ে বললে, এই ৯ বছরে বিশ্বের শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের সম্পদ কমেছে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়েছে। পৃথিবীতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কী হারে বাড়ছে, তা অনুধাবনে এই একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। এমন বাস্তবতায় বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে আরও তীব্র খরা, খাদ্য এবং অর্থ সংকটে ভুগবে এমনটাই অনুমেয়। দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া এবং ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার প্রায় ৪৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক এই সংগঠনটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, ‘মানবিক বিপর্যয় রোধ করতে মার্চের শেষ নাগাদ আমাদের প্রায় ৪৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ মাত্র ৯ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।’ পরিহাসের বিষয় হল, পৃথিবীর শীর্ষ ধনীরা এই অর্থ দিতে ভালভাবেই সক্ষম। কিন্তু তাতে স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। দরকার এই পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষকে দারিদ্র এবং ক্ষুধার মধ্যে রেখে কখনই এই মানবিক বিপর্যয়ের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..