পাঁচগড়ে পঞ্চগড় : সম্ভাবনা ও সংকটের আলাপ

হাবীব ইমন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এক. মানচিত্রের প্রথম জেলা পঞ্চগড়। স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রথম বিজয় অর্জন করে এই জেলাটিই। শীত ভীষণ তীব্র এবং একরোখা। একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে পঞ্চগড় গিয়েছিলাম। ওখানে যেতে ট্রেন অথবা বাস হচ্ছে অপরিহার্য বাহন। সাধারণত আরামের জন্য রেলপথটাই মানুষ বেশি পছন্দ করে। প্রচুর মানুষ রেলে যাতায়াত করে। আমিও রেলপথটাকে বেছে নিয়েছি। টিকেট পাওয়াটা ‘সোনার হরিণ’ পাওয়ার মতো। ট্রেনে যেতে যেতে অনেক মানুষের দেখা পেলাম, তারা সবাই অপরিচিত। এদের মধ্যে একজন ছিলো, আমার পাশের সিটে সে বসেছিলো। ‘স্বচ্ছ’ ওর নাম। সবে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আলাপচারিতায় মনে হয়নি কম বয়স ওর। খুবই আন্তরিক ছেলে। বোদায় স্বচ্ছ-র বাড়ি। কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের কথা বলতেই ওর চোখে-মুখে এক গৌরবের ছাপ দেখতে পেলাম। কথা প্রসঙ্গে এবং আমার পরিচয় পাওয়ার পর সে আমাকে তাঁর বাবার কথা বললো, বোদা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুল আলম লিটন ওর বাবা। একসময় তিনি কমরেড ফরহাদের সাথে রাজনীতি করতেন, ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। এখন নিজেকে টিকিয়ে রাখা ও পাওয়ার প্র্যাকটিসের জন্য আওয়ামী লীগ করেন। বোদা উপজেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিনি। এটা স্বচ্ছের কথা। স্বচ্ছকে জিগ্যেস করলাম, পঞ্চগড়ের কথা। সে যা বললো, কোনোটিই পঞ্চগড় মানুষের জন্য ভালো কোনো কথা না। পঞ্চগড়ের ঐতিহ্য-পঞ্চগড়ের সংস্কৃতি কিংবা পঞ্চগড়ের পর্যটন নিয়ে তাঁর কথাগুলো ছিলো বেশিভাগই নেতিবাচক। আমার বিপরীত দিকে বসা, কম বয়সী দম্পতি, আনহা-আলিম আফ্রিদী আমাকে জিগ্যেস করলো, পঞ্চগড়ে ঘুরতে যাচ্ছি কিনা। স্বচ্ছের কথা শুনে ওরা কিছুটা বিব্রত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে, বোঝা গেলো, নিজের অঞ্চল সম্পর্কে যে কারোর মন্দ কথা যেকোনো মানুষেরই ন্যুনতম খারাপ লাগা তো তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। পঞ্চগড় সম্পর্কে আনহা-আলিম আফ্রিদীর কথাগুলো খুব মুগ্ধ ভরে শুনছিলাম। বিভিন্ন জায়গার কথা, খাওয়ার কথা, কৃষি উন্নয়নের কথা, চা-বাগানের কথা, পাথর শিল্পের সংকট, করতোয়া নদীর কথা বলছিলো ওরা। বললো, ওদের ওখানে সবাই টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে, আলাদা করে ফুটানো পানি কিংবা মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করতে হয় না। এখানে খাওয়া-দাওয়া ভীষণ টাটকা এবং প্রাকৃতিক। ওদের কথাগুলো খুবই সত্য। আনহা নামে মেয়েটি খুব আফসোস করলো, অক্টোবর-নভেম্বরে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘাটা পরিষ্কার দেখা যেতো। আলিম আফ্রিদী ছেলেটি আমাকে নম্বর নিয়ে বললো, তাকে বললে সে আমাকে পঞ্চগড় ঘুরে ঘুরে দেখাবে। সময় কম পাওয়ার কারণে সব কিছু না দেখতে পারলেও আলিম আফ্রিদী আমাকে কিছু কিছু জায়গা দেখিয়েছে। এখানকার মানুষ খুব সহজ-সরল, শান্তশিষ্ট এলাকা। মারামারি-কাটাকাটি নাই। তবে, ভূমি বিরোধ, নারী নির্যাতন, মাদক সমস্যা আছে, এগুলো ম্লান করে দিচ্ছে এ অঞ্চলের গৌরব ও সম্ভাবনাকে। সড়ক ব্যবস্থা মসৃণ। চমৎকার। তবে, ভীষণ ধুলো উড়ে এখানে, বায়ুদূষণ হয়, এটা একটা বড় সমস্যা। মাছ ধরা, জার বুনন, মাটির হাঁড়িপাতিল তৈরি, হাঁস মুরগি পালন, বাঁশ-বেতের কাজই ছিলো এ অঞ্চলের জীবন জীবিকা অর্জনের অন্যতম সংস্কৃতি। পরবর্তীতে কৃষি সংস্কৃতি শুরু হয়, চীনা কাউন, ভুট্টা এবং পয়রা চাষের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে হচ্ছে ধান, গম, আখ, ভুট্টা, ডাল, চিনাবাদাম, তরমুজ, কমলালেবু, স্ট্রবেরিসহ উন্নত ফল ও ফসল। কর্মে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ, পাথর-বালি আহরণ। গড়ে ওঠেছে মিল ও ফ্যাক্টরি। সবুজ ঘেরা সমতল পঞ্চগড়ের উর্বর মাটিতে চা-চাষের মহোৎসব এখানকার মানুষের কৃষি উন্নয়ন ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। জুটমিল, ডিস্ট্রিলারিজ, খাম্বা, জেমকন ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন পর্যাপ্ত হলেও শিল্প কালচারে এ অঞ্চলের জনমানুষের মাঝে তা ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। জগদলের স্থানীয় ব্যবসায়ী আসলাম উদ্দিন বলেন, ‘পঞ্চগড়ের মাটি সোনা, এখানে যা লাগানো হবে, সব ফলবে।’ তবে চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখানকার শ্রমিকদের অনেকে কষ্টে আছেন বলে চিনিকল সংশ্লিষ্টরা জানায়। দুই. ঘড়ির কাঁটা, রাত ২টা। সরব হয়ে উঠেছে চা বাগানগুলো। বাগানজুড়ে চলছে আলোর খেলা। রাতের আঁধারের মাঝে ছোটো ছোটো বাতি নড়াচড়া করছে। দূর থেকে হঠাৎ দেখলে কেউ ভৌতিক চরিত্র বলে বিভ্রমে পড়তে পারে। কিন্তু চরিত্রগুলো আসলে রাতের চা শ্রমিক। মাথায় টর্চ লাইট বেঁধে চা পাতা তোলার কাজ করছেন। একসময় দিনের বেলায়ও সূর্যের কড়া তাপ সয়েই চা পাতা তোলার কষ্টসাধ্য কাজ করেছেন চা শ্রমিকরা। এতে যেমন ভোগান্তি পোহাতে হতো তাদের, তেমনি শুকিয়ে যেতো পাতা। কারখানা মালিকরাও নিতে চাইতেন না শুকনো পাতা। গত দুই বছর ধরে শ্রমিকরা মধ্যরাত থেকে পাতা তোলার কাজ শুরু করেন। দিন দিন বাড়তে থাকে রাতের শ্রমিকের সংখ্যা। প্রতিটি দলে শ্রমিক থাকেন ১০ থেকে ১৫ জন। প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা তোলার বিনিময়ে বাগান মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি দেন ৩ টাকা। একজন রাতের শ্রমিক প্রতিদিন পাতা তুলতে পারেন ২০০ থেকে আড়াইশ কেজি। সেই হিসেবে তাদের দৈনিক আয় হয় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। শ্রমিকদের কাছে জানা যায়, রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন তারা। আর উঠে পড়েন রাত ২টায়। তারপর হাতে চা পাতা কাটার চাকু আর মাথায় টর্চ লাইট বা মোবাইলের লাইট বেঁধে নেমে পড়েন চা বাগানে। রাতের নিরব শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে চলতে থাকে চা পাতা তোলার কাজ। সকাল ১০টার মধ্যেই পাতা তুলে তা কারখানায় পাঠানোর পর বাড়ি ফেরেন। পরে দিনের বেলা আবার অন্য কাজ করেন। দ্বৈত আয়ে সুন্দরভাবে চলছে তাদের সংসার। অর্থকষ্টে থাকা এই শ্রমিকদের জীবনে এখন সচ্ছলতা এসেছে। পঞ্চগড়ে সাতটি ও ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বড় চা বাগান হয়েছে। প্রায় ৭৫৯৮ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। ভ্রমণকালে রাস্তার দু’পাশে যেদিকে চোখ যায়, দেখা যায় দিগন্ত-বিস্তৃত চা বাগান। সবুজ, শ্যামল, সুন্দর, সুবর্ণ, রূপসী, অনন্য। সৌন্দর্য পিপাসু মনের খিদে মেটানোর এক অপরূপ ভূ-চিত্র। পঞ্চগড়ের চা শিল্পে চাষিদের পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা আগে অলস সময় কাটাতেন। কোনো কাজ ছিলো না। এখন চা বাগানে কাজ করে তাঁরা সচ্ছলতা পেয়েছেন। এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে জানা যায়, যাদের ২ বিঘা জমি আছে, সেগুলো উঁচু, তারা চা বাগান করে ফেলেন। প্রথম বছর পরিচর্যা করলেও দ্বিতীয় বছর থেকে চল্লিশ দিন পর পর চা পাতা কাটা হয়। কৃষকরা দিন দিন লাভবান হচ্ছে। তিন. ডিসেম্বরের ২১ তারিখ, শীত বেশ ভালোভাবেই জেঁকে বসেছে। পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তেঁতুলিয়ায় জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় যখন পা পড়লো তখন গড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল সাড়ে ৮টা। কুয়াশা তখনো কাটেনি, বাংলোর এক পাশে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর হিমালয় দেখছিলাম। দেখা যাচ্ছিলো না। অক্টোবর-নভেম্বরে পরিস্কার দেখা যায়। পাথর শনাক্তের লোহার রড দিয়ে নদী থেকে পাথর তুলছে শ্রমিক। দীর্ঘ চৌদ্দ ঘণ্টা ভ্রমণে যখন চোখে ক্লান্তি, ঠিক তখনই দৃষ্টি পড়লো মহানন্দার বুকে। ওপাশটা ভারতীয় কাঁটাতারে ঘেরা, এ পাশটা বাংলাদেশ। দু’দেশের সীমানার উপর দিয়েই মহানন্দার চলাফেরা। হিমালয়ে কোলঘেঁষা মহানন্দার পানি থেকে ধোঁয়া উঠছিলো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার মহালিদ্রাম পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিবঙ্গের উত্তরাংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলা হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে নদীটি। পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা থেকে শুরু করে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার দু’দেশের সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে মহানন্দা। মূলত এই অংশটুকুর মধ্যেই পাথর উত্তোলন করা হয়। মহানন্দা নদীর বাংলাদেশের যে অংশটুকুর মধ্যে পাথর উত্তোলন করা হয় এর এক পাশে তেঁতুলিয়া অন্য পাশে ভারতের হাতিয়া গছ ও শিলিগুড়ি। নদীটির উজানে ভারতের ফুলবাড়িতে রয়েছে স্লুইস গেইট। ভারত এ গেইট বন্ধ রাখে আবার কখনও খুলে দেয়। খুলে দিলেই পানির ¯্রােতের সঙ্গে ভেসে আসে বিভিন্ন আকৃতির পাথর। সেই পাথরেই জীবিকা তেঁতুলিয়াসহ পঞ্চগড়ের অধিকাংশ মানুষের। দূর থেকেই আঁচ করা গেলো বেশ ঠাণ্ডা হবে মহান্দার পানি। কিন্তু তাতে কি? তবুও থেমে নেই মহানন্দা পাড়ের মানুষের কর্মব্যস্ততা। বাতাসে ফুলানো গাড়ির চাকার টিউবের ভেলায় পাথর তুলছেন এক শ্রমিক। নদীতে নামা পাথর শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের জীবন-যাপন ও মহানন্দার গল্প। তারা জানান, এককালে অভাব-অনটন ছিলো এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। এখন আর সে অবস্থা নেই, পাল্টেছে জীবনের দৃশ্যপট। মহানন্দার পাথর তুলে যে আয় হয় তা দিয়েই ঘুরে তাদের জীবনের চাকা। কেউ পাথর তুলছেন। আবার কেউ নদীরঘাট থেকে সে পাথর কিনে এনে মেশিনের কাছে দিচ্ছেন। কেউবা মেশিন চালিয়ে রোজগার করছেন, আবার কেউ ট্রাকে পাথর লোড-আনলোড করছেন। অনেকে আবার কারবারিদের কাছে পাথর সরবরাহ করছেন। বিশাল কর্মযজ্ঞ। মহানন্দার পাথরই তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন এখন। তবে, সরকারের বিধি-নিষেধ থাকার কারণে আগের মতো স্থানীয়ভাবে পাথর উত্তোলন করতে পারেন না। পাথর পর্যাপ্ত তুলতে না পারায় পাথর সরবরাহে একটি সংকট বর্তমানে রয়েছে। অনেক জায়গায় তারা প্রত্যাশিত পাথর সরবরাহ করতে পারছেন না। চার. পঞ্চগড়ে হাজারো নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, পেটের দায়ে ও সংসার চালাতে তারা পুরুষের সমান কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পান না। এক সময় এখানে নারীরা ঘর থেকে বের হতো না। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে ও অভাবের তাড়নায় ক্রমেই উপজেলার নারী শ্রমিক পাথর শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়ে। দেশের সর্ব উত্তরের অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পাথর উত্তোলন-প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াও সমতল ভূমিতে চা চাষ, চা পাতা সংগ্রহ, ভবন নির্মাণ ও কৃষিকাজে পুরুষের পাশাপাশি এদের অবদান অপরিসীম। পাথর ভাঙাসহ বিভিন্ন কাজ করে সংসারের হাল ধরেছে এসব নারী শ্রমিকরা। পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায়ই পাথরের কাজ করেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। সেখানে পুরুষ শ্রমিকরা সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করে মজুরি পান ৩০০-৩৫০ টাকা। কিন্তু একই সময় পর্যন্ত কাজ করে নারী শ্রমিকরা পান মাত্র ২০০-২৫০ টাকা। সারাদিন পাথর ক্র্যশিং মেশিনে হারভাঙা পরিশ্রম করে সংসারের হাল ধরেছে এসব নারী শ্রমিকরা। কিন্তু সমান পরিশ্রম করলেও পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকরা এখনো মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ফাতেমা বেগম বলেন, ‘কয়েক বছর আগত স্বামী পালায় ঢাকাত আরেকটা বিহা করিছে, ঐঠে আরহ দুইঝন ছুয়া ছে। পাথর ক্র্যশিং মেসিনত কাজ করে সংসার চালাছু। দুই ছুয়াক লেখাপড়া করাছু। পুরুষলার লগত ঔ সমান কাজ করছু। কিন্তু হামার মুজরি উমার চেয়ে কম। এইখান রৌদত এইরকম ঘাম ঝড়চে হামার। কিন্তু হামার মুজুরি কম হবে কেনে? পুরুষলার মতো মোর একশ টাকা বেশি হলে ছুয়ালাক ভালো খাবার তো কিনে দিবা পারিম।’ স্থানীয় পাথর ও চা বাগান ব্যবসায়ী আসলাম উদ্দিনকে জিগ্যেস করলে তিনি বলেন, ‘এরা মহিলা, তাই মজুরি কম দেয়া হয়’। পাঁচ. পঞ্চগড় অঞ্চলে প্রচলিত শব্দাবলি মূলত প্রাকৃত ও প্রাচীন বাংলারই সামান্য পরিবর্তিত রূপ। পালি, প্রাকৃত, প্রাচীন মধ্য বাংলা এবং ব্রজবুলি- আসামী- হিন্দী- বিহারী ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ এই অঞ্চলে অধিক প্রচলিত। মুন্ডা ও সাঁওতালী ভাষার কয়েকটি শব্দ যেমন চাউলি, চুলা, জাইত, পাড়া, হাল, ডোঙ্গা, মেয়েছেলে, বেটাছেলে, মেয়েলোক ইত্যাদি এই অঞ্চলে প্রচলিত। স্বামী অর্থে ‘ভাতার’ বিবা অর্থে ‘বিহা’ যুবক যুবতি অর্থে ‘গাভুর’ বিধবা অর্থে ‘আড়ি’ বাউন্ডেলে অর্থে ‘বাউদিয়া’ স্ত্রী অর্থে ‘মাইয়া’ ঘর জামাই অর্থে ‘ডাঙ্গুয়া’ ব্যথা অর্থে ‘বিষ’ ইত্যাদি শব্দগুলো পঞ্চগড়ের ভাষায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নজরুল পাঠাগারকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ে সাংস্কৃতিক চর্চা গতিশীল হয়ে উঠে। অসংখ্য বই, মানচিত্র, বিশ্বকোষ, রচনাবলী ইত্যাদির সমৃদ্ধ সংগ্রহে এই পাঠাগারটি ছিলো পঞ্চগড় অঞ্চলের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক বাতিঘর। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাঠাগারের অনেক মূল্যবান বই ও এনসাইক্লোপিডিয়া জ্বালিয়ে দেয়। পঞ্চগড় অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে ‘হুলির গান’ সর্বাধিক প্রচলিত ও জনপ্রিয়। হিন্দুদের হুলি পুজা থেকে হুলির গান নামটির উৎপত্তি হলেও সমসাময়িক ঘটনা বা অসংগতিপূর্ণ সামাজিক চিত্র, প্রেম কাহিনি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করেও ব্যাঙ্গাত্মক ও রসাত্মকভাবে এই গান পরিবেশিত হয়। সাধারণত শীতকালে রাতের বেলায় এ গান পরিবেশিত হয়। হুলি পালা শ্রেণির গান। এই গানে যেমন রয়েছে নাটকীয়তা তেমনি আছে কাহিনির ধারাবাহিক বিন্যাস। কাহিনীকে আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য একজন ছেলে (মেয়ের সাজে ছেলে অভিনেতা) এবং একজন সং (জোকার) উপস্থিত থাকে। এরাই দর্শক ও শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দুু। হুলি পরিবেশনের সময় ঢোল, বাঁশি, কাসর, সারেঙ্গী ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং বর্ণিল পোশাক ব্যবহৃত হয়। ছয়. পঞ্চগড়ে মাদক পরিস্থিতি সেখানকার তরুণ সমাজকে দিন দিন অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটাই পঞ্চগড়ের দুঃখ। ছেলের হাতে মায়ের খুন হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে এখানে। মাদকের ছোবলে আক্রান্ত তরুণ ও যুবসমাজ বিপর্যয়ের মুখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ছড়িয়ে পড়ার কারণে সেখানকার পরিবেশ কলুষিত হচ্ছে। অন্যদিকে মাদকের জন্য অর্থের জোগান দিতে গিয়ে এসব ছাত্ররা চাঁদাবাজি ও দলবাজি করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। সীমান্তের ওপার থেকে আসছে মাদক। হাত বাড়ালেই এখানে শহর কী গ্রামে, সব জায়গায় মাদক মেলে। দু-এক জায়গায় গোপনে মাদক কারবার চললেও প্রায় জায়গায় চলে প্রকাশে বেচাকেনা চলে। বাড়ি থেকে শুরু করে রাস্তা, কর্মক্ষেত্র, বস্তি, পার্ক, বিপণীবিতান, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত মাদক পৌঁছে গেছে। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত–সব শ্রেণির মানুষ মাদক আসক্ত হচ্ছেন। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা এ ব্যাপারে অনেক উদ্বেগে আছেন। মাদক ও চোরাকারবারিদের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার শিংরোড প্রধানপাড়া, নায়েকপাড়া, ভুজারিপাড়া, দক্ষিণপাড়া, ঘাগড়া, মোমিনপাড়া, জুলিপাড়া, বাঙালপাড়া, বড়দরগা, নালাগঞ্জ, বড়বাড়ি, অমরখানা, টোকাপাড়া সীমান্ত। বোদা উপজেলায় রয়েছে বড়শশী, পাহাড়িয়া, ধামেরঘাট, সুয়েরপাড়, বালাপাড়া, মালকাডাঙ্গা, সরদারপাড়া, কাজীপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, মহিষবাথান ও নাওতারি সীমান্ত। এছাড়া তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ভূতিপুকুর, সরদারপাড়া, দেবনগর ইউনিয়নের শুকানি, কালিয়ামনি, শালবাহান ইউনিয়নের পেদিয়াগছ, তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের শারিয়ালজোত, বড়বিল্লাহ, পুরাতন বাজার, সরদারপাড়া, তীরনইহাট ইউনিয়নের ভোকতিডাঙ্গী, ইসলামপুর ও রৌশনপুর, বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের দেবীভিটা, বন্দিভিটা, সরদারপাড়া, নারায়নজোত, চুতরাগছ, উকিতজোত, জাগিরজোত, কাশেমগঞ্জ, বাংলাবান্ধা এবং আটোয়ারী উপজেলার ধামোর, তোড়িয়া, সোনাপাতিলা, গিরাগাঁও, বোদগাঁও সীমান্ত এলাকাও ব্যবহার হয়ে আসছে। বাংলা মদ, চোলাই মদ এর সাথে এসব সীমান্তে ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা, পেথেডিন ইনজেকশনসহ নানা ধরনের মাদক ঢুকে যাচ্ছে। কখনো আসছে অবৈধ অস্ত্রও। এসবের সাথে ব্যবসায়ী শিল্পপতি, প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানেরা জড়িয়ে পড়েছে এসব নেশায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। মাদকের বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। মাদকের ভয়াবহ গ্রাস থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতেই এই ঘোষণা দেন তাঁরা। এসব ঘোষণা যে ‘গালগল্প’, স্থানীয় কয়েকজন তা মনে করে। তাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, সেসব দলের লোকজনই এসব মাদক কারবারের সাথে জড়িত। স্থানীয়রা মনে করে, এ মাদক সমস্যাটাই পঞ্চগড়কে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সাত. পঞ্চগড়ে পর্যটনে সম্ভাবনা প্রচুর। রাজনগড়, মিরগড়, ভিতরগড়, দেবেনগড় ও হোসেনগড়—এই পাঁচগড়ের সমন্বয়েই হয়েছে জেলার নাম ‘পঞ্চগড়’। তবে এই ‘পঞ্চগড়’ নামের অপভ্রংশ ‘পঞ্চগড়’ নামটিও দীর্ঘদিন এ জনপদে প্রচলিত ছিলো। হিমালয়কন্যা নামেও দেশজোড়া এ অঞ্চলে একটা পরিচিতি ছিলো। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত একটি থানা ছিলো। এখানে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। সড়ক ব্যবস্থা অনেক উন্নত হলেও পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। এ পর্যটনখাতকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়ন বৈষম্যও রয়েছে। জেলা শহরটিকে ঘিরে একটা পরিকল্পনা নেয়া উচিত। এ বিষয়ে রাজনৈতিক মহলসহ সকলের মহলের ভাবা দরকার। লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, যুব ইউনিয়ন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..