এক তোলা কন্যা

আইনুন্নাহার সিদ্দিকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

“অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক রাজা। সেই রাজার কোনো সন্তান ছিল না। অনেক সাধনার পর এক সাধু রাজাকে বর দিলেন। বললেন, তোমার একটি কন্যা হবে। তার ওজন হবে এক তোলা। তবে কোনো পুরুষ যদি তাকে ছুঁয়ে দেয় তবে কন্যার ওজন বেড়ে যাবে।”—-এটা একটা রূপকথার গল্প। আজকের দিনে নারীরা মঙ্গল গ্রহে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছেন। দেশ পরিচালনা করছেন, হিমালয় জয় করছেন। সর্বোপরি একজন নারী আর একটি প্রাণকে দেহে ধারণ করে সেই মানবসন্তানকে জন্ম দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখানোর যে কষ্ট সহ্য করেন তা কোনো পুরুষ কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু আমাদের সমাজ সংসার রূপকথার যুগের সেই ট্যাবু নিয়েই আছে। নারীর দেহ নারীর নিজের নয় তা পরিবারের, সমাজের সকলের সম্পত্তি। নারীর শরীরের ওপর সমাজ সংসারের সম্মান বজায় রাখার গুরু দায়িত্ব!!! কোনো পুরুষের যদি দুর্ঘটনায় কোনো অঙ্গহানি ঘটে তবে তো সেই পুরুষের সামাজিক মর্যাদার কোনো হানি ঘটে না? কিন্তু কোনো নারী যদি ধর্ষণের মতো নির্যাতনের শিকার হয়, যেখানে সেই নারীর কোনো ভূমিকাই থাকে না, সেখানে সেই নারীর সমাজে ঠাঁই হয় না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার পরিবারসহ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় জীবন বাঁচানোর জন্য। সেই নারীর চরিত্র হনন হয়ে যায়। খুব সহজেই তাকে চরিত্রহীন আখ্যা দেয়া হয়। এবং মামলায় নারীর চরিত্রের ওপর নির্ভর করে আাসামির বিচার করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে ধর্ষণের বিচার করা হয়। কিন্তু সাক্ষী নেয়া হয় ১৮৭২ সালে প্রণীত সাক্ষ্য আইনের দ্বারা। দুইশত বছরেরও আগের তৈরি আইন দিয়ে একবিংশ শতাব্দির বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে। যাদের তৈরি আইন আমরা ব্যবহার করছি তারাও যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের আইন পরিবর্তন করে নিয়েছে, যা আমরা এখনো করে উঠতে পারিনি। অতি সম্প্রতি রেইনট্রি মামলা নিয়ে বেশ হৈচৈ হচ্ছে। যদিও এমন আরো হাজার হাজার মামলা রয়েছে। এখানেও সামাজিক বিভাজনটি লক্ষ্য করার মতো। যাই হোক মামলাটির চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি, কারণ উচ্চ আদালতের রায়ের পরই তা চূড়ান্ত রায় বলা যাবে। কিন্তু মামলাগুলোর অবস্থা এমন কেন হচ্ছে? আইনের ফাঁক গলে আসামি বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়ার কয়েকটি ধাপ রয়েছে। অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, সাক্ষী। চিকিৎসাপত্রও একটি অন্যতম সাক্ষ্য। দুঃখজনকভাবে ধর্ষণ মামলায় নির্যাতিতার চরিত্রও একটি বিচার্য বিষয়। নারীর চরিত্র বলতে কি বুঝায় তা আমরা আগেই জেনেছি। এই সবকিছুর ওপর নির্ভর করে বিচারক তার সিদ্ধান্ত দেন। এখানে অভিযোগ যদি সঠিকভাবে না করা হয় তবে একটি ফাঁক তৈরি হয়। পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তা তার তদন্তে গাফিলতি করলে সেখানে একটি সুযোগ তৈরি হয় অভিযুক্তের ছাড়া পাবার। আর ধর্ষণের মতো ঘটনায় চাক্ষুষ সাক্ষী সাধারণত থাকে না। তখন সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও একটি সুযোগ আসামির মুক্ত হওয়ার এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাও একটি কারণ দুর্বল সাক্ষ্যের। সর্বশেষ নির্যাতিতার চরিত্র। ধর্ষণের সংজ্ঞাতেও রয়েছে অসামঞ্জস্যতা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈবাহিক ধর্ষণকে ধর্ষণের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিন্তু আমরা এখনো তা করতে পারিনি। সেখানে মামলায় নারীর চরিত্র একটি বিশেষ বিচার্য বিষয় হয়ে ওঠা ভাবিয়ে তোলে আমরা কি এগুচ্ছি না পিছাচ্ছি!! প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। কিন্তু আমাদের সমাজ আমাদের দেশের আইন নারীদের এখনো স্বাধীনতা দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। একজন নারী তার জীবন যাপন কেমন করবে সেটা তার একান্ত নিজস্ব বিষয়। সে বিয়ে করবে কি করবে না, সন্তান নেবে কি নেবে না, কখন সন্তান ধারণ করবে এমনকি তার যৌন সম্পর্কও সমাজ নির্ধারণ করে দেয়। নারীর চরিত্র বলতেও শুধু তার শরীর। কোনো পুরুষ ঘুষ দুর্নীতি করলে, চুরি করলে, জনগণের সম্পদ লুটপাট করলেও চরিত্র হনন হয় না। দুর্ঘটনায় পঙ্গু হলেও সমাজে কোনো প্রভাব পড়ে না, যতখানি প্রভাব পড়ে কোনো নারী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলে। তখনই দোষ হয় সেই নারীর পোশাকের, নারীর স্বাধীন-স্বাবলম্বী হওয়ার, নারীর প্রতিবাদী হওয়ার, তার দৃঢ়চেতারও দোষ হয়। নারী প্রতিবাদী হয়ে বিচার চাওয়ারও কোন অধিকার রাখে না। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে স্বাধীনতা দেবে কি!এই একবিংশ শতাব্দিতেও তারা চায় নারী হবে দাস। ক্রীতদাসদের যেমন কোন স্বাধীন জীবন থাকে না, আমাদের সমাজও চায় নারীর স্বাধীন জীবন থাকুক না। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও আমার দেশের নারী মানুষের অধিকার আদায় করতে পারেনি। উন্নয়ন, নারী স্বাধীনতা, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন এসব শুধুই রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি। একজন নারী দেহব্যবসায়ী হতে পারে, সে একা জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে, একা রাতে চলতে পারে- তার অর্থ এটা নয় যে তাকে ধর্ষণ করার অধিকার কারো জন্মায়। প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী তার ইচ্ছায় যে কারো সাথে যৌন সম্পর্ক করতেই পারে, কিন্তু তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে, তার অসম্মতিতে তার সাথে কোনরকম শারীরিক সম্পর্ক করার কারো কোনো অধিকার নেই। সেটা অন্যায়, বেআইনি। যৌন মিলনে অভ্যস্ত মানেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি তা সঠিক নয়। শুধুমাত্র চিকিৎসাপত্রই একমাত্র সাক্ষ্য নয় ধর্ষণের বিচারের জন্য। পারিপার্শ্বিক ঘটনাও একটি সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে, এমনটাই আমাদের উচ্চ আদালতের মত। সাক্ষ্য আাইনের ধারা ১৫৫(৪) বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি আবেদন করা হয়েছে। সরকার বলছে তারা ধারাটি বাতিলের প্রক্রিয়াতে আছে। আইনটি যদি সত্যি বাতিল হয় তবে নারী অধিকার আন্দোলন একটি বাধা পার হয়ে একটি সোপান অতিক্রম করবে। আমরা আশাবাদী। আইনের সাথে সাথে সমাজেরও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..