নারী, আন্দোলন ও একজন ইলা মিত্র

স্বপন বাগচী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪২ সালের অর্থাৎ বাংলা ১৩৫০ সালে শুরু হওয়া মন্বন্তরের চরম পর্বে: এক মা ফিরছিলেন হাট থেকে। সেখানে সে বিক্রি করে এসেছেন পরিবারের বড় আদরের গরুর ঘণ্টাটা। ঘণ্টা বিক্রি করে ফেরার পথে নদীর পাড় থেকে আসা নারী কণ্ঠে আকৃষ্ট হয়ে সে মুখোমুখি হয় এক ভয়ঙ্কর হৃদয়বিদারী দৃশ্যের– এক রমণী তার জীবন্ত শিশুকে মাটির গর্তে শুইয়ে দিতে দিতে বলছে- “আর কোন কষ্ট থাকবে না তোর, এখানেই আরামে ঘুমাবি তুই।” জীবন্ত সমাধির ঐ দৃশ্য দেখে বিচলিত সেই মা চিৎকার করে বলে উঠেছিল- “নিজের ছেলেকে জ্যান্ত কবর দিচ্ছিস? এমন অমানুষ তুই হতে পারলি কি করে?” তারপর যে কলহের সূত্রপাত হয় তাতে সেই রমণীর করুণ ব্যাখ্যা– সন্তানকে খাওয়ানোর সাধ্য তার শেষ আর সন্তানের পেটের জ্বালা জুড়ানোর ওটাই তার ছিল ব্যথাতুর শেষ পন্থা। ঐ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে সেই মা শেষ পর্যন্ত তার আদরের গরুটা দান করে দেয়, যাতে রমণীটি তার সন্তানকে বাঁচাতে পারে। নিজে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মহিলা তার শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দিতে পেরেছিল। নারীদের মধ্যে মানবিকতার শেষটুকু অবশিষ্ট ছিল। মানুষের তৈরি মন্বন্তরের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছিল নারী। দুর্ভিক্ষের ফলশ্রুতিতে গ্রামীণ দরিদ্র রমণীকূল তাদের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে শুরু করে। বাংলায় এক প্রধান মহিলা সমিতির সভায় যেখানে অংশ নিয়েছিল একহাজার মহিলা, সেখানে একজন বয়স্কা কৃষক রমণীর বক্তব্য ছিল– “মা, মরতে আর ভয়ের কী আছে। অন্ধকারে মরার চেয়ে আলোয় মরা অনেক ভালো।” কারণ সেসময়ে জমিদার, তার ছেলে কিংবা জমিদারের কর্মচারীরা কৃষক রমণীদের ওপর জঘন্য যৌন নির্যাতন চালাতো। রায়তের বিয়ের সময় জোতদারের মতামত নিতেই হতো; সবকিছুই নির্ভর করতো তার সম্মতি আর অসম্মতির ওপর। ধর্ষণকে সামন্ত্রতন্ত্র আইনসম্মত অধিকারে পরিণত করেছিল। কোনো কারণে কাউকে সুন্দরী মনে হলেই তাকে কথা বলতে কিংবা কাজ করতে জোতদারের কাচারিতে যাবার নির্দেশ দেয়া হতো। এছাড়া বিধবারা ছিল প্রভুদের ক্রীতদাসীর মতো- সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রাতে প্রভুকে শয্যায় সঙ্গ দিতে হতো। ‘ভাগচাষির গাছের আম, কলা কিংবা অন্য ফলের মতো বেটিও ছিলো জমিদারের সম্পত্তি।’ সামাজিক পরিস্থিতিই বাংলার নারীকে ঘর থেকে বের করেছিল। কখনও খাদ্যের দাবিতে কখনও কাপড়ের দাবিতে তাদের নামতে হয়েছিল রাজপথে। দুর্ভিক্ষ শুধু নারীকে ঘর থেকে বেরই করেনি অসংখ্য নারীকে বানিয়েছিল পতিতা। লম্পট ব্রিটিশ সৈনিক আর বাংলার লুটেরা জমিদার ও তাদের দালালদের ভোগের পণ্য হয়ে ওঠে নারী। এই সময়ে বাংলার আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠে পতিতাপল্লী। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দুর্গতি জুটেছিল সেইসমস্ত নারীদের ক্ষেত্রে যারা যোগ দেয় চট্টগ্রামের সামরিক শ্রম শিবিরে। রাস্তা তৈরির কাজে বহাল হবার আশায় তারা ফাঁদে পড়েছিল সামরিক ঠিকাদারদের রমরমা দেহব্যবসায়। এদের মধ্যে অনেকেই যৌন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। সেসময়ের এক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়- নারীদের শুধু “নৈতিক দিক দিয়েই নিঃস্ব করা হয়নি, তাদের দুর্দশাপ্রসূত রোগও তাদেরই বহন করতে হয়।” অভাবের তাড়নায় পোড় খাওয়া নির্যাতিত মহিলাদের রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত করতে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৩৬ সালে লক্ষেèৗ কংগ্রেস থেকে সর্বভারতীয় কিষাণ সভার গোড়াপত্তন ঘটে। পরের বছরই কিষাণ সভার প্রাদেশিক শাখাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। কমিউনিস্ট পার্টি আর কিষাণ সভা একত্রে তেভাগা আন্দোলনের জমি তৈরি করেছিল। আর কিষাণ সভায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল আশাতীত। অনেক সময় বাড়ির পুরুষ সদস্য দোদুল্যমনতায় ভুগলেও নারী সদস্যরা সক্রিয়তায় এগিয়ে গেছে। ময়মনসিংহে জমিদার অবাধ্য চাষীদের শায়েস্তা করতে ঠেঙ্গারে বাহিনী পাঠালে হাজং রমণীরা তাদের দা নিয়ে তাড়া করেছিল। নড়াইল মাগুড়া অঞ্চলেও কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে দাবী আদায় করা হয়। মাতঙ্গিণী হাজরা থেকে ইলা মিত্র এই কৃষক আন্দোলনের ফসল। কিষাণ সভার বিস্তৃত গণসংগঠনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। ১৭ মার্চ ১৯৪৩ সালে বাংলার আইনসভার সামনে জড়ো হয়েছিল পাঁচহাজারেরও বেশী নারী। সেদিন তাদের কণ্ঠে ছিল খাদ্যের দাবি। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠনের সাথে সাথেই মহিলাদের লড়াকু চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ দেখা দেয়। যার ফলে অসংখ্য নারী মিছিল সরকারের দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র গণসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের মধ্যে আগেই গড়ে তোলা হয়েছিল আলাদা ছাত্র সমিতি। মহিলা ছাত্রীরা লক্ষৌতে সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে। আমাদের বৃহত্তর জেলা যশোরে প্রাদেশিক সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রীদের আলাদা শাখার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলে। নারী জাগরণের এই সময়টাতে ইলা সেন সারা বাংলায় পরিচিত মুখ। অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, ডিবেট ইত্যাদিতে তার সাবলীল পদচারণা। স্বাভাবিক ভাবেই তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে আসা হয় সাংগঠনিক কাঠামোয়। ১৯৪৩ সালে ইলা মিত্র কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হন। হিন্দু কোড বিল এর বিরুদ্ধে মহিলা সমিতির আন্দোলনে তিনি একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, সেই সাথে আগ্রহী হন মার্কসবাদী রাজনীতিতে। রমেন মিত্রের সাথে বিবাহ বন্ধনের পর ইলা মিত্র নাম নিয়ে ১৯৪৫ সালে চলে আসেন চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে। বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র তখন তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। নাচোল অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি রমেন মিত্র। তেভাগা আন্দোলনের মূল স্রোতধারা তখন নড়াইলের গ্রামাঞ্চলের ভাগচাষীর আন্দোলন। আর সে আন্দোলনের সংগঠক নূরজালাল, অমল সেন, রসিকলাল, মোদাচ্ছের মুন্সী প্রমুখ। সিনিয়রদের মধ্যে হেমন্ত সরকার, কৃষ্ণ বিনোদ রায়। তেভাগা আন্দোলনে ইলা মিত্রের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয় নাচোলের সবজায়গায়। ইলা মিত্র হয়ে ওঠেন রাণীমা। ১৯৪৬-৫০ সাল পর্যন্ত নবাবগঞ্জ অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকে রাণীমা খ্যাত ইলা মিত্রের হাতে। তারপরের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। একজন মায়ের সংগ্রাম, একজন গৃহবধুর সংগ্রাম আর সেই সাথে মেহনতি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার সংগ্রাম। এডলফ হিটলার স্বপ্ন দেখেছিলেন পৃথিবীকে করায়ত্ব করার- কিন্তু স্বপ্ন ভেঙেছিলো বাঙালির, একজন বাঙালি কিশোরীর। তিনি ইলা সেন। ১৯৪০ এ হেলসিঙ্কি সামার অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়নি। ইলা সেনেরও অংশগ্রহণ করা হয়নি অলিম্পিকে। ট্রফির পাশে দাঁড়ানো ইলা মিত্রের যে ছবি আমরা এখন দেখি সেটি সচিত্র ভারত ছেপেছিলো ১৯৩৮ এ। পাশে ছিলো ৪৭টি ট্রফি। ইলা সেন যদি অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে পারতেন তাহলে হয়তো তার ট্রফির ঝুড়িতে যুক্ত হতো আরেকটি ট্রফি- অলিম্পিক পদক। কিন্তু তা হয়নি। ইলা সেন পরে যিনি ইলা মিত্র হয়েছিলেন তিনি কী শুধু অ্যাথলেটিক্স আর সাতারেই পারদর্শী ছিলেন? না। লেখাপড়ায়ও তিনি ছিলেন চৌকষ। বেথুন কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছেন আর সংস্কৃতিতে করেছেন এমএ। তেভাগা আন্দোলনে ইলা মিত্রের অবদান কিংবদন্তি। তার ওপর নেমে আসা অত্যাচারও কিংবদন্তী। ১৯৫১ সালে একজন মেয়ে হয়ে আদালতে তিনি যে জবানবন্দী দিয়েছেন সেটি মহিলাদের মধ্যে প্রথম। নিজের মুখে নিজের উপর পাশবিক অত্যাচারের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। রক্ষণশীল বাঙালি সমাজে যা অভাবনীয়। শত অত্যাচারেও পথভ্রষ্ট হননি তিনি। যৌবনে শোষিত মানুষের পাশে থাকার যে ব্রত তিনি গ্রহণ করেছিলেন আমৃত্যু ভোলেননি। ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়ে ভারতে যান। ১৯৫৬ সালে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে হাঁটার সাথে সাথে ধীরে ধীরে যুক্ত হন সক্রিয় রাজনীতিতে। সিটি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯ আর ১৯৭২ চারবার কলকাতার মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৬৭-৭২ সালে বিধান সভায় কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার ছিলেন। ১৯৬২-০২ সাল পর্যন্ত শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। ভারতও খুব একটা সুখে রাখেনি তাঁকে। বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে ১৯৬২, ৭০, ৭১ ও ৭২ সালে কারাগারে যান তিনি। ইলা মিত্রের সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিল আত্মিক। মানবিক মূল্যবোধের মাত্রায় মানুষকে মাপতেন তিনি। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক অগ্রসরতা ভাবিত করতো তাঁকে। সেজন্যই তিনি বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু হতে পেরেছেন। নাচোলের হার না মানা, উপমহাদেশের নারী জাগরণ ও কৃষক আন্দোলনের এই কিংবদন্তির মৃত্যু হয় ২০০২ সালে। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি বিস্মরণের ওপারে চলে যেতে বসেছেন। আলোকিত কিছু মানুষ প্রতিবছর জন্ম-মৃত্যুতে তাঁকে স্মরণ করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় স্মৃতি সংরক্ষণের। কিন্তু সবই ধোঁয়াশা। তাইতো ইলা মিত্রকে নিয়ে গোলাম কুদ্দুসের কবিতার ভাষায়– ‘সোনার ধানের সিংহাসনে কবে বসবে রাখাল কবে সুখের বান ডাকবে কবে হবে সকাল’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..