পরিবেশ বিপর্যয় ও পুঁজিবাদ সমাধান বৈজ্ঞনিক সমাজতন্ত্রে

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সম্পদের নিঃশেষণ: আজকে পুঁজিবাদ যেমন অভাবনীয় প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে তেমনই পৃথিবীর পরিবেশেরও বিপর্যয় ঘটিয়েছে। পুঁজিবাদ দিনদিন পৃথিবীর বহু প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং ব্যবহার করছে। শিল্প বিপ্লব মানব সমাজকে অগ্রগতির আকাশচুম্বী পর্যায়ে উন্নীত করে মাটি কামড়ানো অবস্থা থেকে। ফলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষিত হচ্ছে। বিভিন্ন খনিজ সম্পদ ছাড়াও নিঃশেষণের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে সুপেয় পানি। অধিক জনসংখ্যা এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পৃথিবীর অনেক স্থানে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অন্য অনেক সম্পদের বেলায় এই কথাটা খাটে, যা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। বর্জ্য সমস্যা : সম্পদ নিঃশেষণের পরে আসে বর্জ্য সমস্যার বিষয়টি। উৎপাদন ও ভোগ উভয়ই বর্জ্য সৃষ্টি করে। পৃথিবীকে একদিকে মানুষের জন্য যেমন সম্পদ সরবরাহ করতে হয়, অন্যদিকে তেমনি মানুষের উৎপাদন ও ভোগের কারণে সৃষ্ট বর্জ্য গিলতে হয়। কিন্তু সময়ে এই বর্জ্যরে পরিমাণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। এর বড় উদাহরণ বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাস। বায়ুতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধির ফল হচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি। গত এক শতাব্দীতে পৃথিবীর তাপমাত্রা এরই মাঝে এক ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বেড়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে দুই ডিগ্রী ছাড়িয়ে যাবে, এমনকি চার ডিগ্রীও হতে পারে। গোটা পৃথিবীতে তা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনবে। অতিরিক্ত কার্বন উদ্গীরণ দ্বারা সৃষ্ট জলবায়ু বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে। তাপবৃদ্ধি জমাট বরফ গলিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ তাই বলা যায় সমুদ্র ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের বুকে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুহারা এবং জীবিকাহারা হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়াগত দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ঘন ঘন ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস হচ্ছে। ঋতুচক্রের নিয়ম ভেঙ্গে বিভিন্ন রোগ ও মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটছে। তাই জলবায়ু মোকাবেলা বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশ পদভার বৃদ্ধি : পরিবেশ পদভার (Echological Footprint) হচ্ছে মানুষের সম্পদ আহরণ ও বর্জ্য নিক্ষেপের ফলে পৃথিবীর সক্ষমতা এবং সহ্যমাত্রা সম্বলিত পরিমাপ। মানুষের ভোগকৃত পণ্য ও সেবার উৎপাদন এবং ভোগের কারণে সৃষ্ট বর্জ্য আত্মস্থ করার জন্য পৃথিবীর কতটুকু ‘জৈবিক পরিসর’ (Biological Space) প্রয়োজন পরিবেশ পদভার তারই পরিমাপ দেয় হেক্টর হিসেবে। এই হিসেবে দেখা গেছে যে, মানুষের সমষ্টিগত পরিবেশ পদভার ইতোমধ্যে পৃথিবীর পরিবেশ পুনরুৎপাদন ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা ৭০০ কোটিরও বেশি। বর্তমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে মাথাপিছু উপযুক্ত জৈবিক পরিসর হচ্ছে ১.৮ হেক্টর, অথচ মাথাপিছু পরিবেশ পদভারের পরিমাণ ইতোমধ্যে ২.৫ হেক্টরে গিয়ে পৌঁচেছে। ভোগ বড়েছে দিনদিন এর পরিমাণও বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোর পদভার পরিমাপ সবচেয়ে বেশি। এর জন্য শুধু ভোগই দায়ি নয়, ভোগের প্রকৃতিও দায়ি। যেমন জৈব-অপচনশীল ভোগ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে প্লাস্টিকের কথা। উৎপাদনে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পরিমাণ এখন প্রাকৃতিক উপাদানের চেয়ে অনেক বেশি। প্রবৃদ্ধি উভয়সংকট(Growth Dilemma): উপরের আলোচনা থেকে একটা জিনিস বোঝে আসে যে, পুঁজিবাদের যুগে অর্জিত অব্যাহত উৎপাদন এবং আয় বৃদ্ধির ফলে পৃথিবী এক পরিবেশ সংকটের মুখোমুখি। একদল চিন্তাবিদ মনে করেন এই সংকট মোকাবেলার পথ হচ্ছে ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি’(Green Growth)। এই ধারাটি হচ্ছে কম কার্বন খরচ করে বিকাশ যা পরিবেশবান্ধব উপায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে। সংকট মোকাবেলার এটা আন্তর্জাতিক ধারাও। তবে অভিজ্ঞতা বলে, শুধুমাত্র সবুজ প্রবৃদ্ধি ধারায় পৃথিবীর পরিবেশ সংকটের সমাধান হচ্ছে না। উষ্ণতা বৃদ্ধি হয়েই চলেছে। ১৯৯৭ সালের ‘কিয়েটা চুক্তির’ পর যেখানে ২০১২ সাল নাগাদ উষ্ণতা ১০ শতাংশ কমানোর কথা ছিলো সেখানে বর্তমানে ৪৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন অনেকেই প্রস্তাব করছেন, ‘প্রবৃদ্ধিহীন’(Zero Growth) উন্নয়নের। আবার কেউ ‘নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি’ (Nagetive Growth)-এর প্রস্তাব করেন। তাদের এমনতর প্রস্তাব উন্নত বিশ্বকে লক্ষ্য করে। আবার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের জীবনমানের বৃদ্ধির জন্য প্রবৃদ্ধি আবশ্যক। বস্তুত নেতিবাচক বা শূন্য প্রবৃদ্ধি পুঁজিবাদে সম্ভব না। এই অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মুনাফার তাড়নায় ক্রমাগত শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। মুনাফা বৃদ্ধির উপায় হচ্ছে শ্রম সাশ্রয় ও মোট মজুরি হ্রাস। তাই পুঁজিবাদ অনবরত শ্রম সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। মুনাফার মোট পরিমাণ বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতায় সফলতার জন্য পুঁজিপতিদের কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি করে যেতে হয়। সুতরাং সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদন ত্যাগ পুঁজিপতিদের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার পৃথিবীকে ঘনিভূত পরিবেশ সংকট থেকে বাঁচাতে সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদন রহিত করা প্রয়োজন। এদিকে প্রবৃদ্ধি থামলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। এমনিতেই উন্নত দেশে বেকারত্ব ক্রমশ বাড়ছে। সুতরাং উভয়সংকট, অনেকেই যাকে বলছেন প্রবৃদ্ধি উভয় সংকট। উভয়সংকট থেকে বেরুতে হবে: এই উভয় সংকটের পুরোপুরি সমাধান গবেষকরা এখন পর্যন্ত বের করতে পারছেন না। ধারণা করা হচ্ছে শুধু অর্থনীতির মধ্যে আটকে থেকে এই সমস্যার সমাধান বের করা সহজ নয়। বাস্তবে প্রয়োজন সমাজের আমূল পরিবর্তন। পুঁজিবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমাজের উপর অর্থনীতির প্রভুত্ব কায়েম। পুঁজিবাদে সব উৎপাদন ও সেবা পণ্যে পরিণত হয়। প্রকৃতি এবং মানুষও পণ্যে রূপান্তরিত হয়- এটা মার্কস বলেছেন। প্রকৃতি ও মানুষের এই রূপান্তর একটি অলীক (fictitious) পণ্যকরণ। এটা কোনো স্বাভাবিক পরিণতি নয়। এটা সমাজের উপর অর্থনীতির প্রভুত্ব কায়েমে অনুষঙ্গী। অর্থনীতির এই প্রভুত্বের জন্য বিশ্ব পরিবেশ সংকট মোকাবেলা করা কঠিন হচ্ছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো মুনাফার লোভে তাদের কাজের জন্য সৃষ্ট পরিবেশের সংকটকে হিসেবে নিচ্ছে না। পুঁজিপতি শ্রেণি হিসেবে তারা রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করছে স্ব স্ব দেশে। এরা দেশের জাতীয় নীতিমালাকেও নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করছে। একারণে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে না। এসব দেশে তাই প্রবৃদ্ধি উভয়সংকটের সমাধান নেই। আসলে প্রয়োজন সমাজের আমূল পরিবর্তন। অর্থনীতির উপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা : আমরা যদি পরিবর্তনকে অগ্রসর করতে চাই তাহলে অর্থনীতির উপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই প্রবৃদ্ধি উভয়সংকটের সমাধান-ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তখন উৎপাদন ব্যক্তিগত মুনাফার বদলে সমাজের ব্যাপক কল্যাণে পরিচালিত হবে। আমরা দেখেছি পুঁজিবাদে শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বেকারত্ব বাড়ায়। এর অবসানের জন্য প্রয়োজন ‘নিয়োজন অংশীদারি’ (Employment Sharing) এবং ‘মুনাফার অংশীদারি’ (Profit Sharing)। এদুটো যথাক্রমে বেকারত্ব হ্রাস ও আয় রক্ষা করতে সহায়ক হবে। পুঁজিবাদে উৎপাদনশীলতার বিপুল উন্নতি সাধিত হলেও কর্মদিবসের দৈর্ঘ আট ঘন্টার নীচেতো আসেইনি বরং বেড়েছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কর্ম দিবস হ্রাস বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। শ্রম অংশীদারি এবং কর্মদিবস-হ্রাস শ্রমিকের আয় হ্রাস করতে পারে। মুনাফার অংশীদারির মাধ্যমে এরূপ আয় হ্রাস এড়ানো যেতে পারে। ফলে মানুষের অবসর সময় বৃদ্ধি পাবে এবং তা জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ বৃদ্ধি করবে। অর্থনীতির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: অর্থনীতির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ সংকট সমাধানের পথ খোলে দেবে। তখন উৎপাদন কার্যক্রম মুনাফার জন্য না-হয়ে সমাজের ব্যাপক কল্যাণে হবে। অর্থায়ন খাতের উপর সামাজিক মালিকানা নতুন বিনিয়োগকে পরিবেশ সহায়ক ধারায় পরিচালিত করবে। ব্যক্তিভোগের জায়গায় সামাজিক ভোগকে শ্রেয় জ্ঞান করা যাবে যা বিশ্ব পরিবেশ সংকটকে সহজে মোকাবেলা করবে। সামাজিক মালিকানা বাস্তবায়নের শর্তসমূহ: ক) বৈজ্ঞানিক উপায় সন্ধান :সামাজিক মালিকানা বাস্তবায়নের অনেক সমস্যা। এসব সমস্যা মোকাবেলার বৈজ্ঞানিক উপায় খোঁজে বের করতে হবে। খ) পরিবেশবান্ধব নীতি দৃঢ়ভাবে মানতে হবে : প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে অর্থনীতির উপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের নিশ্চয়তা দেয় না। এর উদাহরণ হলো আমু দরিয়া ও সির দরিয়া নদীর গতিমুখ পরিবর্তন। এতে কাজাখাস্তানের তুলা উৎপাদন সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সর্বনাশ ডেকে আনে। ফলশ্রুতিতে আরল সাগর মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং খাজাখাস্তানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা সৃষ্টি হয়। অপরদিকে পৃথিবীময় ব্যক্তি উদ্যোগও পরিবেশ সহায়ক বলে বিবেচিত হচ্ছে না। সুতরাং পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় অর্থনীতির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ যেসব সম্ভাবনা খোলে দেয় তার সফল বাস্তবায়ন-সমস্যা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় তত্ত্বীয় সমাধান আবশ্যক। বিশ্ব পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় অর্থনীতির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের যে যুক্তি তা এখনকার সময়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষেই যুক্তি। উৎপাদনের বৃহদাকারের সাথে ব্যক্তি মালিকানার অসামঞ্জস্যের যে কথা মার্কস বলেছিলেন তা আজ সপ্রমাণিত পরিবেশ সংকটে। তাই আজকের পরিবেশ সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমষ্টিগত প্রয়াস, দেশে দেশে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, স্বার্থহীনতা যা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে সম্ভব। লেখক : কলামিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..