বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডিসেম্বর মাস। বিজয়ের মাস। বর্ষ পরিক্রমায় ঘুরে এলো ডিসেম্বর মাস। এই মাসটা এলেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের যুদ্ধ, বীরত্ব ও অসামান্য আত্মত্যাগের কথা। একইসঙ্গে কত রক্ত, জীবন, অশ্রু আর বেদনার কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বলা হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এই কালপর্বটিকে। যদিও এই ইতিহাসও হয়তো একদিন অতিক্রম হবে। শ্রেষ্ঠতর-পূর্ণতর কোনো সময়ের সাক্ষাৎ আমরা ভবিষ্যতে পাবো এবং প্রতিটা জাতির মতো বাঙালি জাতিও নিশ্চয় এর অর্জনকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে পূর্ণতর আরেক অর্জনের দিকে। সে জন্যই স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই স্বাধীনতার পক্ষের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অগ্রসর শক্তিবৃন্দ স্লোগান দিয়েছিলেন ‘স্বাধীনতা এনেছি- সমাজতন্ত্র আনবো’। এমনকি ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক কবিতার মতো ভাষণে বঙ্গবন্ধুও দুই ধরনের আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছিলেন। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবং ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর সকলেই জানতো এই স্বাধীনতার তাৎপর্য কী। অন্ততঃ এক ভয়ঙ্কর দানব ও জল্লাদের হাত থেকে মুক্তি। সেটা ছিল তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি। কিন্তু এত রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা- আমাদের প্রত্যাশা তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল। শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, আমরা চেয়েছিলাম মুক্তি। তাই এই যুদ্ধকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ; যার চেতনার মধ্যে ছিল সামগ্রিক শোষণমুক্তি। মুক্তিযুদ্ধের সেই আকাঙ্ক্ষা ও চেতনা প্রতিফলিত হয়েছিল সশস্ত্র যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যেই রচিত সংবিধানে। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে ঘোষিত হল সমাজতন্ত্র। সামগ্রিক মুক্তি, মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণের অবসান। সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদের চির সমাধি। মানবজাতির বহু কাক্সিক্ষত সেই সমাজতন্ত্র। কিন্তু হায়! স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে সমাজতন্ত্র শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করে না শাসকশ্রেণি, না শাসকদল আওয়ামী লীগ না প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ধনিক শ্রেণির এই দুই দলই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে, লাখো শহীদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি স্তম্ভ গণতন্ত্র এখানে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। বর্তমান সরকার নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। ১৯৭২ সালে যে প্রত্যাশা ছিল তা এখন কোথায়? স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এই ডিসেম্বর মাসে এসে আমরা যদি পুনরায় বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরি তাহলে দেখবো স্বাধীন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের জীবনে এসব ‘মুক্তির’ কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন কোণে কোণে শুধু অন্ধকার নয়, লুকিয়ে আছে গভীর অন্ধকার। তাই স্বাধীনতা আমরা এনেছি ঠিকই কিন্তু মুক্তির যুদ্ধ এখনো চলছে বলেই আমাদের ধরে নিতে হবে। সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার যে সম্ভাবনা ছিল তাকে সামরিক শাসন এবং দুই বড় বুর্জোয়া দলের শাসন, বলা ভালো অপশাসন বহুদূর ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের রক্তের দামে অর্জন করা স্বাধীনতা, সেই চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। আরও পারি না লাখ লাখ শহীদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে। তখনকার প্রজন্ম এনেছিল জাতীয় স্বাধীনতা। আজকের প্রজন্ম জাতীয় স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলবে, বাস্তবায়িত করবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। তা করতে পারে একমাত্র বাম গণতান্ত্রিক শক্তি, যার প্রধান কেন্দ্র হতে হবে কমিউনিস্ট পার্টিকে। বড় বুর্জোয়া দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে হবে। নতুন শক্তির ও নতুন রাজনীতির উদ্বোধন ঘটাতে হবে। এবারের বিজয়ের মাসের সেই উপলব্ধি শাণিত হোক কমিউনিস্ট পার্টির হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে। এবং তা সঞ্চারিত হোক জনগণের মধ্যে, বিশেষ করে শ্রমিকসহ মেহনতি জনগণের মধ্যে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..