পোশাক শিল্প : জাতীয় ও শ্রেণি পরিপ্রেক্ষিত

এম এম আকাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমরা এমন একটি শিল্প নিয়ে কথা বলছি যা আমাদের রপ্তানির প্রায় ৭৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। যদিও নীট রপ্তানি আয় হিসাব করলে (অর্থাৎ আমদানিকৃত কাঁচামালের অংশ বাদ দিলে) এটি হ্রাস পেয়ে দাঁড়াবে সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশে। (যদি আমরা ধরে নেই যে- মোট রপ্তানি মূল্যের ৭০ শতাংশ ব্যয়িত হয় আমদানিকৃত কাঁচামাল তথা কাপড় এবং অন্যান্য অনুসঙ্গ দ্রব্যাদি আমদানির জন্য)। তবে আমাদের দেশে একসময় প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল আমদানিকৃত ব্যয়। মাত্র ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজন দিয়ে আমাদের এই পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে নানা ধরনের পশ্চাদবর্তী সংযোগ শিল্প গড়ে উঠেছে। ফলে অনুমান করা হয় যে- বর্তমানে গড়ে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ পুনরায় বাইরে চলে যায়। ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজন দিয়ে শুরু করে ১৯৮০ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে ৪০-৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনে পৌঁছানোর প্রবণতাটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে। পোশাক শিল্পের দুটি শাখা রয়েছে- ওভেন শাখা ও নীট শাখা। নীট শাখায় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের হওয়ায় সেই কাপড় ক্রমবর্ধমান হারে দেশে তৈরি হচ্ছে এরং তাই নীট রপ্তানির অংশ অপেক্ষাকৃত বেশি। সম্প্রতি কোটা উঠে যাওয়ার পর যেহেতু এ দেশের পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির কাঠামো ক্রমাগত নীট শাখার দিকে ঝুঁকছে সে জন্য মোট রপ্তানিতে নীট শাখার উৎপাদনের অংশও বাড়ছে। ফলে মোট রপ্তানিতে আমদানির অংশও হ্রাস পাচ্ছে। কেউ কেউ তাই মনে করেন যে, গড়ে এই মুহূর্তে হয়তো পোশাক শিল্পের মোট উৎপাদনে আমদানিকৃত কাঁচামাল বিষেশতঃ কাপড়ের/সুতার জন্য ব্যয়ের পরিমাণ সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ বা তার নীচেই নেমে গেছে। একথা সত্য হলে পোশাক শিল্পের সংযোজিত মূল্য দাঁড়াবে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। তখন মোট রপ্তানিতে এর নীট রপ্তানির অংশ দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ৪৬ শতাংশ! দেশের মোট রপ্তানিতে ৭৭ শতাংশ বা নীট হিসাবে ৪৬ শতাংশ কোনটিই খুব অনুল্লেখযোগ্য নয়। এছাড়া এই শিল্পের চরিত্র অত্যন্ত শ্রমঘন এবং প্রধানত নারীরা এই শিল্পে নিয়োজিত আছেন। যা কিনা শিল্পখাতে মোট নিয়োজিত শ্রমিকের প্রায় এক তৃতীয়াংশের সমান। চলতি হিসাবে দাবি করা হয় এই শিল্পে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ লক্ষ শ্রমিক নিয়োজিত আছেন (করোনার আগে তা ৪০ লক্ষ পর্যন্ত উঠেছিল বলে দাবি করা হোত!)। এই শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার শিল্পখাতের অন্য সব শিল্পের চেয়ে বেশি। এই শিল্প প্রথম থেকেই সমগ্র শিল্প খাতের নেতৃত্বদানকারি খাত হিসাবে চিহ্নিত। এক মাত্র সিমেন্ট শিল্প ও ঔষধ শিল্পই প্রবৃদ্ধির হারের মাপকাঠিতে এ শিল্পের সঙ্গে তুলনীয়। ইদানিং জাহাজ শিল্প দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষ্যণীয় যে এসব নেতৃত্বদানকারী শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা রপ্তানিমুখি শিল্প। বিশাল বিশ্ববাজারের কারণে এসব শিল্পের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অসীম। স্থানীয় বাজারের সীমাবদ্ধতা এদের প্রবৃদ্ধির লাগাম টেনে রাখতে পারে না। তবে এরা শ্রমঘন শিল্প এবং শ্রমের দাম বাংলাদেশে খুবই সস্তা বলে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে এদের একধরনের প্রতিযোগিতামুলক সক্ষমতাও বিদ্যমান। তবে র্যা ডিকেল অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন এ ধরনের শিল্পের অবস্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির এক ধরনের সচেতন আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী অপেক্ষাকৃত শ্রমঘন কাজগুলি, নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলি তারা হয় প্রবাসী শ্রমিকদের দ্বারা নিজের দেশে সম্পন্ন করার স্ট্র্যাটেজি বা রণকৌশল গ্রহণ করেছেন অথবা এইসব বিশেষ ধরনের শিল্পের অবস্থানকে তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তিক অঞ্চলগুলিতে ঠেলে দিয়েছেন। এর ফলে এসব প্রান্তিক দেশ চিরকাল সস্তায় শ্রমঘন-পরিবেশ প্রতিকূল-ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যগুলি তেরি করবে এবং কেন্দ্রগুলিতে তা রপ্তানি করবে। তদুপরি এসব শিল্পের বাজার শুধু নয় উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও উন্নত ধরনেরে প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্যগুলির জন্যও এসব দেশকে চিরকাল কেন্দ্রগুলির উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে। এতে এসব দেশের শিল্পায়ন কখনোই উন্নত দেশের মত পুঁজিঘন শিল্পায়নের স্তরে প্রবেশ করতে পারবে না। তারা স্থায়ীভাবে নিম্ন উৎপাদনশীলতা ও উচ্চ শ্রমঘনত্বের ফাঁদে আটকে থাকবে। ফলে তাদের শিল্পগুলো অধিকাংশই হবে ‘sweat shop’ বা ‘footloose industry’। আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিশেষতঃ দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন প্রমুখ দেশের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা উপরোক্ত হতাশাবাদী চিত্রটিকে কিছুটা প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। আমার নিজের অতীত মতটিকেও এই নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা উচিত বলে মনে করি। ‘পুঁজিবাদী পথে বিকাশ অসম্ভব’ বা ‘অপুঁজিবাদী পথে বিকাশের সম্ভাব্যতা’-র অতীত তত্ত্ব দুটিকে অন্ততঃ পুনরায় খুঁটিয়ে পরীক্ষার সময় এসে গেছে। ১৯৮২ সালে আমার লিখিত একটি প্রবন্ধ ‘পরনির্ভরশীল পুঁজিবাদের মডেল ও বাংলাদেশ’এ আমি লিখেছিলাম- ‘প্রথমত, শ্রমনির্ভর দ্রব্য রপ্তানির নীতি গ্রহণ করলে সাম্রাজ্যবাদের আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজন চক্রান্তের খপ্পরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে একটি দেশ চিরকালের জন্য শ্রমনির্ভর এবং উৎপাদনের পশ্চাৎপদ অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে এই বিপদ খুবই প্রকট আকার ধারণ করেছে। ১৯৭৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট আমদানি ব্যয়ের ৩৩ শতাংশই ব্যয়িত হয়েছে জ্বালানির জন্য। আবার এসব আমদানি দ্রব্যের দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে রপ্তানির দাম বাড়ছে না ফলে তাদের রপ্তানি শিল্প বিপদগ্রস্থ হচ্ছে। সস্তা মজুরের তুলনামূলক সুবিধা যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে কোরিয়ার বস্ত্র শিল্প। কোরিয়ার বস্ত্র শিল্পে ১৯৭৩-৭৪ এর আগে (অর্থাৎ জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ও তদনুসৃত পুঁজিবাদী বিশ্বের মুদ্রাস্ফীতির আগে) মোট উৎপাদন খরচের ৫০ শতাংশই ছিল সস্তা মজুরিদের মজুরি তহবিল। কিন্তু বর্তমানে মোট খরচে মজুরির অংশ হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। সুতরাং কোরিয়া পড়েছে শাঁখের করাতে- তাকে বস্ত্র শিল্পকে ঠেলে পুঁজিনির্ভর রূপে সুসজ্জিত করতে হচ্ছে। আবার এর ফলে তার সস্তা শ্রম নির্ভর পণ্য রপ্তানির যে বাজার অতীতে ছিল তা আংশিকভাবে হারাতে হচ্ছে। নতুন বিশ্বমূল্য পরিস্থিতিতে এসব দেশকে শ্রম-নির্ভর প্রযুক্তি থেকে পুঁজিনির্ভর প্রযুক্তিতে যেতে হয় অথচ সাম্রাজ্যবাদী শ্রমবিভাজন এখন আর তার অনুমতি দিচ্ছে না।’ (এমএম আকাশ, বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, প্যাপিরাস ২০০৪, পৃষ্ঠা ১২৩) ১৯৮২-র এই লেখার পর প্রায় ৩০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সাহায্য নিয়ে নেহেরুর মত প্রথমেই পুঁজিঘন আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পসমূহ পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের অধীনে নির্মাণ করে জাতীয়তাবাদী শিল্পায়ন নীতি ধরে এগোনোর সুযোগ এখন অনেক বেশি সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। তদুপরি তদানীন্তন ভারতসহ ঐ ধরনের অপুঁজিবাদী পথে অগ্রসরসমান দেশগুলোও এখন ‘ট্র্যাক’ বা রাস্তা পরিবর্তন করে শ্রমঘন রপ্তানিমুখি শিল্পের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। চীনও অনেকদিন ধরে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ দুই পায়ে হাঁটার নীতি অনুসরণ করছে। অর্থনীতিবিদরা চীনের এই সফল কৌশলকেই সঠিক বলে মনে করেন। একে ইংরেজিতে নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করা যায়: ‘Selective Combination Of Import substitution and Export Combination.’ অর্থাৎ শ্রমঘন এবং পুঁজিঘন উভয় কৌশলই শিল্পায়নের ক্ষেত্রে একইসঙ্গে একই সময়ে গ্রহণযোগ্য। দেং এর ভাষায় আগের মত বিড়াল কাল না সাদা তা দেখলে চলবে না। যে বিড়াল যখন ইঁদুর মারতে পারবে তখন সে বিড়ালটিকেই পুষতে হবে- এটাই হবে কৌশলগত বাণিজ্যের মূল কথা। অভিজ্ঞতা আরো দেখিয়েছে, অনেক দেশই একপেশেভাবে সংরক্ষিত শিল্প হিসাবে আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প গড়তে গিয়ে দেশের আয় বণ্টন আরো অসম করে ফেলেছে, বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নানারকম ভর্তুকি ও লোকসানের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে, অদক্ষ মাথাভারী প্রশাসন ও অদক্ষ শিল্পের জন্ম হয়েছে। আবার অন্যদিকে যেসব দেশ নিজেদের শ্রমিকদের শিক্ষিত করতে পেরেছে, শৃংখলার মধ্যে এনে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পেরেছে, শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম জীবনধারণ মান অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মৌলিক সুবিধাগুলি নিশ্চিত করতে পেরেছে তাদের পক্ষে ধাপে ধাপে শ্রমঘন রপ্তানি থেকে শুরু করে পুঁজিঘন ও দক্ষতা নির্ভর শিল্প ও সেবা পণ্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছে তারা। কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে একদিকে স্থানীয় বাজারের প্রসার ঘটেছে অন্যদিকে রপ্তানির প্রসারও অব্যাহত রয়েছে। কোনো কোনো দেশ পণ্য বা সেবা নয় সরাসরি দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি করে প্রচুর ধন উপার্জন করছে। বিশ্ব-অর্থনীতিতেও ক্রমে ক্রমে এসব দেশ তাদের প্রান্তিক অবস্থান পরিবর্তন করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং সেই সম্ভাবনা ক্রমশঃ আংশিক বা পরিপূর্ণ দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। যদিও এই পথের পদে পদে প্রচুর বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এই নতুন সম্ভাবনাকে সবচেয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে একটি রূপকের মাধ্যমে। একে বলা হয়েছে ‘Flying Geese Model’। এই মডেল অনুযায়ী ভবিষৎবাণী করা হয় যে, সবচেয়ে উন্নত দেশগুলি ক্রমাগত অধিকতর পুঁজিঘন পণ্য রপ্তানিতে ঝুঁকবে, ফলে ঠিক তাদের নিচে যে দেশগুলো আছে তারা তাদের শুণ্যস্থান দখল করে নিতে সক্ষম হবে এবং এইভাবে নীচের সারির দেশগুলি একে একে পরবর্তী ধাপে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হবে। তবে প্রথম এবং দ্বিতীয় সারির দেশগুলির মধ্যে দ্বন্দ্বে দ্বিতীয় সারির দেশগুলোর বিজয় এবং একধাপ উপরে ওঠার মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়ার ‘Multiplying Effect’ চালু হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের উপরে যে দেশগুলো রয়েছে যেমন: চীন ও ভারত, তারা যদি নীচে নেমে বাংলাদেশের সঙ্গে সস্তা পোশাক উৎপাদন ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তাহলে বাংলাদেশের মত তৃতীয় সারির দেশগুলির পক্ষে এই মডেলের উত্তরণ ঘটানোর সম্ভাবনা কমে আসবে বা নাকচ হয়েও যেতে পারে। কিন্তু একথা এখনই কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে সবচেয়ে শ্রমঘন নিম্নস্তরের পোশাক উৎপাদক বাংলাদেশ কি কোটা ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে নিজের জন্য এক ধাপ উঁচুতে বিশেষ একটি স্থান বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে নাকি নীচু উৎপাদনেই আটকে থাকবে? নাকি আরো নীচে নেমে গিয়ে সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়বে? এটা নির্ভর করবে অসম বিশ্বায়নে আমরা কতটুকু নিজেদের জাতীয় স্বত্তা ও মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারি। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারাটাই হবে এখানে নিয়ামক উপাদান। যেসব দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতাসীন নয় সেসব দেশে তাই ‘Flying Geese Model’ কার্যকরী হয়নি-সেজন্য এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এধরনের বিকাশের সম্ভাবনা অনুপস্থিত। তবে হতাশাবাদীরা যেমন বলেছিলেন যে, ২০০৫ সালে ‘এম.এফ.এ.’ উঠে যাওয়ার পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সংকটে পড়বে। বিশেষত ২০০৮ সালের পর চীনের সঙ্গে যখন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের লড়াই করে টিকে থাকতে হবে তখন বাংলাদেশ হেরে যাবে, বাজার হারাতে থাকবে এবং পুরো পোশাক শিল্পে সংকট ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তা কি আসলেই হয়েছে? পরিসংখ্যান বলে এখন পর্যন্ত তা হয়নি। ২০০৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে গড়ে আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের মোট রপ্তানি মূল্য প্রতিবছর ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তবে দ্রুতই তা আমরা সামলে উঠতে পেরেছি বলে বাইরে থেকে মনে হচ্ছে। এখানে একটু বলে রাখি, এই লেখাটা লেখার পেছনে অন্যতম অনুঘটক হচ্ছে মিরপুরে গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সিপিবি নেতা ডা. সাজেদুল হক রুবেলকে আটক ও হয়রানি। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শ্রমিক শ্রেণির দাবি শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা (যেমন- বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃত্ব সেবা, বিনোদন, দুর্ঘটনা বীমা ইত্যাদি) খুবই ন্যূনতম পর্যায়ে রয়েছে। এগুলির আরো উন্নতি ঘটানোর সংগ্রাম চলছে। সাধারণভাবে কোটামুক্ত প্রতিযোগিতার কারণে পোশাকের রপ্তানিমূল্য কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু তার ফলে পোশাক শিল্প অলাভজনক হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে না। তবে মালিকরা কি আরো মজুরি কমিয়ে নতুনভাবে অ্যাডজাস্ট করে মুনাফা ঠিক রেখে অগ্রসর হবে না কি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনের বহুমুখীকরণ ঘটিয়ে আরো উন্নত প্রবৃদ্ধি ও উন্নততর মজুরির দিকে যুগপৎ অগ্রসর হবে- এই প্রশ্নটিই বারে বারে বিভিন্ন পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়। বর্তমান উন্মুক্ত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য চারটি ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে হবে। ১) পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি। ২) পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে রাখা। অর্থাৎ পণ্যের দাম সহজে বৃদ্ধি করা যাবে না। ৩) লিড টাইম কমানো তথা অর্ডার নেয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্ডার সাপ্লাই নিশ্চিত করা। ৪) আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও ডিসেন্ট ওয়ার্ক এর ‘Standard’ রক্ষা করা। বিশেষত উন্নত দেশের ক্রেতারাসহ সারা বিশ্বেই এখন শ্রমিকদের জন্য ‘Compliance’-এর যে কথা বলা হচ্ছে তা বাস্তবায়িত করা। তা না পারলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে নিম্নমানের শ্রমঘন পণ্যগুলি থেকে বের হয়ে ‘Branded Item’ ধরতে পারবে না। সকল পক্ষই শেষ পর্যন্ত মুখে একমত হন যে- এই শিল্পকে ‘ঘামের দোকান’ বানিয়ে রাখা চলবে না। শ্রমিকদের জন্য কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে শ্রমিকদের ভালভাবে বাঁচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটা ছাড়া শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি করা যাবে না এবং বাজারে প্রতিযোগিতাতে ভালভাবে থাকা যাবে না। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এই ৩টি দাবির উপর অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়- ১) প্রত্যেক শ্রমিককে একটি অফিসিয়াল নিয়োগপত্র প্রদান করতে হবে। ২) ১৯৯৪ সালে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ২০০৫-এ এসে এদমই অচল। এটা বাড়াতে হবে, শ্রমিক প্রতিনিধিরা দাবি বরেন ১৯৯৪ এর ডলার মান অনুযায়ী ২০০৫ সালে চলমান মজুরির প্রকৃত ১৯৯৪ এর তুলনায় অর্ধেকে পরিণত হয়েছে। সুতরাং বর্ধিত ন্যূনতম মজুরির দাবিটি জরুরি দাবি হিসাবে উত্থাপিত হয়। ৩) আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের যে ধারাগুলি বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করেছে তা দৃঢ়ভাবে কার্যকর করতে হবে: ক) কনভেনশন ২৯ (বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ করা)। খ) কনভেনশন ৮৭ (সংগঠন গড়ার স্বাধীনতা)। গ) কনভেনশন ১০০ (সমান কাজের জন্য সমান মজুরি)। ঙ) কনভেনশন ১৮২ (শিশু শ্রম নিষিদ্ধকরণ)। তবে শ্রমিকরা সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন কনভেনশন ৮৭ এর উপর। যদি বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জগুলি গ্রহণ করে করনীয়গুলি দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে এবং শিল্পের শান্তি রক্ষা করে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে তাহলে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জল। কিন্তু যদি আমাদের পুঁজিপতিরা লোভী কৃষকের মত স্বর্ণ ডিম্ব প্রসবিনী রাজহংসটিকে মেরে একবারে বেশি ডিম পাওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার। এই শিল্পে তখন ঝগড়া-বিবাদ-নৈরাজ্য ক্রমাগত বাড়তে খাকবে। এবং আমরা একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলবো। আমি উপসংহারে এসে বলবো সকল প্রতিনিধিদের বক্তব্যগুলিতেই যুিক্ত রয়েছে। জাতীয় স্বার্থে সরকারের উচিত ন্যূনতম ‘Consensus’ হিসাবে এগুলি গ্রহণ করা এবং আন্তরিকভাবে ও মালিক বা কায়েমী স্বার্থের পক্ষে এককভাবে না থেকে পক্ষপাতিত্বহীন ভাবে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা। এজন্য শ্রমিকদেরও নিজস্ব শ্রেণিস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..