বৈষ্ণব ভাব আন্দোলন : চেতনায় মণিপুরী রাসোৎসব

আহমদ সিরাজ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

(১) ভারতবর্ষে বৈষ্ণব আন্দোলন বা ভক্তিবাদের একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। বিশেষত বাংলায় এ আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ঐতিহাসিক সামাজিক ভূমিকা আছে। মূলত ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজীর আকস্মিক নদীয়া আক্রমণ এবং বাংলার শেষ সিন্ধু রাজা লক্ষণ সেনের নদীয়া থেকে পলায়ন করে বিক্রমপূরে আশ্রয়গ্রহণ। অতঃপর একে একে বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠা লাভ। রাজ্য ও রাজার উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে বাংলায় ফিরোজশাহী ও হুসেনশাহী শাসনের প্রভাব বিস্তৃত হয়। এসময়ে মুসলিম শাসনামলে বহু মুসলমান ধর্মপ্রচারক বঙ্গদেশে আসতে থাকেন। তারা ইসলাম ধর্মের সাম্য ও শান্তির বাণী প্রচার করে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেন। হিন্দু ধর্মীয় জাতপাত-বর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন আবেদন সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে তুলে এবং অনেকে দলে দলে এ ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। সিলেটে হযরত শাহজালাল এর আগমন এমনই একটি ঘটনা। এখানে যারাই এসেছেন তারা এদেশের জল, মাটি, আবহাওয়ায় একাত্ম্য হয়ে স্বদেশি হয়ে উঠেছেন। এজন্য স্বাধীন সুলতানি আমলে কিন্তু কিছু কিছু অঘটনের মধ্যে একটা সাবলীল বিভেদহীন অবস্থা ছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, হুসেনশাহী রাজবংশের সুলতানেরা হিন্দু সমাজের প্রতি উদারনীতি গ্রহণ করেন। এই সময়ে রাজকার্যের বহুবহু উচ্চপদে হিন্দুদের অবস্থান চিহ্নিত ছিল। হিন্দুধর্ম ও বাংলা সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন ঘটে এই সময়ে বলা চলে। এই পরিবর্তনের চরম পরিণতি হলো ষোড়শ শতাব্দিতে ভক্তি আন্দোলন ও সাহিত্য চর্চার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন। এ সময়ে উত্তর ভারত, দক্ষিণ ভারত, আসাম বাংলায় বৈষ্ণব ধর্ম প্রসারিত হয়ে উঠে। বিশেষত হিন্দুধর্মের জাত-পাত বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। জন্মসূত্রে জাতিভেদ বৈষ্ণবেরা স্বীকার করেন না। তাদের স্বয়ং মহাপ্রভু বলেন: চন্ডাল চন্ডাল যদি কৃষ্ণ বোলে বিপ্র নহে বিপ্র যদি অসৎ পথে চলে শ্রীচৈতন্য জাত ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মগ্রহণ করেও ভক্তিধর্ম গ্রহণ করার পর জাতিভেদ ধর্ম ইত্যাদি পরিহার করেন। এ ভক্তিধর্ম সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে কি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল তা তাদের বৈষ্ণবীয় উক্তি থেকে বুঝা যায়। মুচি যদি ভক্তি পাবে ডাকে কৃষ্ণ ধনে কোটি নমস্কার মোর তাহার চরণে বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন শীর্ষক গ্রন্থে সুনীতিভূষণ কানুনগো এই ধর্মের মূলকথার উৎস সম্পর্কে বলেন-“একেশ্বরবাদের মহিমা প্রচার বৈষ্ণব আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। তাই বৈষ্ণবধর্মের একেশ্বরবাদ প্রধানত কৃষ্ণভক্তি ও কৃষ্ণপূজার মধ্যেই সীমিত ছিল। গীতা ও ভাগবত বৈষ্ণবদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ গীতা ও ভাগবতে কৃষ্ণকে প্রধান উপাস্যরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। গীতার কৃষ্ণকে প্রধান উপাস্যরূপে বর্ণনা করতে গিয়ে শ্রীভগবান নিজেই বলেছেন অন্যান্য দেবীর পূজা অর্চনার মাধ্যমে কৃষ্ণেরই ভজনা করা উচিত। একমাত্র কৃষ্ণের ভজনা করলে অন্যান্য দেব-দেবীর পূর্জা অর্চনার আর প্রয়োজন পড়ে না। ” পৃষ্ঠা-৮৭। এজন্য এ ধর্ম সহজ অনাড়ম্বর। এজন্য ভক্তের কোনো উপাচার যাগযজ্ঞ আচার অনুষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে না। কেবলমাত্র ভক্তিপ্রেমের মাধ্যমে কৃষ্ণকে লাভ করা যায়। ঈশ্বর প্রেমময় জগত। প্রেমময় এই সত্য এ ধর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। এজন্য ভক্তিবাদী ধর্মে সকল বাহুল্য বর্জন করে কেবল নাম সংকীর্তনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মূখ্য বিষয় হয়েছে জাত বর্ণ নির্বিশেষে যাতে সকলে একই অবস্থানে কীর্তনে অংশ নিয়ে প্রেমের দরিয়ায় অবগাহন করতে পারে। তাই কীর্তনে নৃত্যেরও উৎসারণ ঘটেছে। (২) পুরী নবদ্বীপে বৈষ্ণবধর্মের প্রধান স্থান বিবেচিত হলেও প্রাক চৈতন্যযুগে বৈষ্ণব সমাজে শ্রীহট্টের বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। অদ্বৈত আচার্য, শ্রীবাসভ্রাতৃচতুষ্ঠয় সহ অনেকের শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীচৈতন্যের পিতা-মাতা শ্রীহট্টেই জন্মেছিলেন। যেমন:- শ্রীহট্টে জন্মিলা পণ্ডিত গদাধর মুরারী মিশ্রের ঘরে সভায় গোচর সেই দেশে শ্রীরাম পণ্ডিত শ্রী নিবাস শ্রীচন্দ্র শেখর মুরারী প্রকাশ। এ থেকেই সিলেটে বৈষ্ণব প্রভাব অনুমিত হয়। এই আন্দোলন তাই সর্বত্রই আলোড়িত করে। ভারতবর্ষে ইতালির মতো রেনেসাঁ বা জাগরণের একটা আলোড়ন হয়েছিল বলে পণ্ডিত মহলে মত আছে তর্ক-বিতর্ক আছে। ভক্তিবাদী আন্দোলনের হিসাবে বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাব একটা নবজাগরণের মতো সনাতন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল, সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়। এই আন্দোলনের প্রভাব মণিপুরী সমাজের লোকজনকেও প্রভাবিত করে। জানা যায় মণিপুরী রাজা খাগেম্বার শাসনামলে বঙ্গদেশ থেকে কীর্তনের একটি দল মণিপুরে প্রবেশ করলে তাতেই মণিপুরে বাংলার সংকীর্তন ধারার বীজ রোপিত হয়। আদিবাসী হিসাবে খ্যাত জনগোষ্ঠী মণিপুরীদের এত সহজে এই ভক্তিবাদী আন্দোলন আকৃষ্ট করার কারণ হচ্ছে। মণিপুরী সমাজের সামাজিক গড়ন ও বৈশিষ্ট্য। মণিপুরী সমাজের নৃতাত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এমন যে, বৈষ্ণব ধর্মের জাতপাতহীন ভক্তিবাদী ধারা তাদের জীবনব্যবস্থার সঙ্গে মিশখাওয়ানোর মতো গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম মণিপুরে প্রসার লাভ করে এভাবে। রাজা ভাগ্য চন্দ্র নিজে এ ধর্মে দীক্ষা লাভ ও এই ধর্মের প্রসারে উদ্যেগী হয় উঠেন। এখানে উল্লেখ্য বৈষ্ণবীয় চেতনায় বঙ্গীয় নৃত্যধারা মণিপুরী নৃত্যধারার মিশ্রণ, যন্ত্রের ব্যবহার মিল-অমিল যাই থাক না কেন, একটা বড় ধরনের পারস্পরিক সাযুজ্য ছিল–যার ফলে বৈষ্ণবের চেতনার ধারার অভিন্ন প্লাবন বয়ে এনেছে। (৩) বৈষ্ণবীয় তত্ত্বে আদিতে পরম পুরুষ বিধাতা একাত্ম্য ছিলেন বলে নিসঃঙ্গতা থেকে মুক্তির জন্য নিজ অংশ থেকে প্রকৃতিরূপা হল্লাদিনী শক্তি নারী সৃষ্টি করেন। প্রকৃতিরূপা প্রেমের শক্তি রাধা। এজন্য বৈষ্ণবমতে সৃষ্টি ও স্রষ্টা অভিন্ন, আবার ভিন্নও বটে। যেমন পানি ব্যতীত ঢেউ হয় না, আবার পানি ও ঢেউ অভিন্ন হয়েও ভিন্ন। এভাবে সৃষ্টির সমস্ত কিছুই ভেদ অভেদ। মুসলমানদের সুফি তত্ত্বে ‘ইশক’ বা প্রেম দিওয়ানা এভাবে ব্যাখ্যায়িত হয়েছে। বাকাবিল্লা থেকে ফানাবিল্লা অর্থাৎ সৃষ্টির মাঝে লীন হয়ে যাওয়া। বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যেমন বীজ খোসায় পরিণত হয়ে অসংখ্য বীজে রূপান্তরিত হয়ে উঠে। তাই গাছ থেকে বীজ অভিন্ন নয়। আবার ভিন্ন হয়েও ভিন্ন নয়। তাই বৈষ্ণবরা বলেন “আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি বাঞ্চা ধরে প্রেম নাম” কিন্তু এখানে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্যে একটি পুরাণ কাহিনী ভাগবত তত্ত্ব হলেও চন্ডীদাস এখানে সমাজ ও কাল পরিবেশে তার নবতর সংযোজন করেছেন। তিনি এটাকে বস্তুত লৌকিক কাহিনী হিসাবে চিত্রায়িত করেছেন। তার এ কাহিনী রূপায়নে যে রাধা-কৃষ্ণকে পাওয়া যায় তাদের আচরণে আহারে বিহারে কোন দেবতার লক্ষণ খোঁজে পাওয়া যায় না। তাতে কোন অলৌকিক স্বত্বারও হদিস মিলে না। এখানে মর্ত্যরে কাহিনী হচ্ছে রাধা হচ্ছেন গোয়ালিনী বা গোয়ালা পরিবারে জন্ম পিতা মাতা যথাক্রমে বৃষভানু ও কলাবতী। রাধা বিবাহিত নারী হলে স্বামী নপংসুক আয়ান ঘোষ। তথাপি রাধা সংসারে সুখে শান্তিতে আনন্দেই ছিলেন। আর এখানে গোপাল বালকের বেশে কৃষ্ণ মথুরায় আর্বিভূত হয়েছেন। এজন্য রাধাকৃষ্ণ একই অঙ্গের ভিন্ন রূপ হলেও লীলা কীর্তন সংগঠনে মর্ত্যের জগতে দৃশ্যত। মর্ত্যরে নরনারীর মতো সন্দাহীত, লীলায়িত হওয়া না গেলে তার সার্থকতা থাকে না। এখানে উল্লেখ্য যে, রাধাকৃষ্ণ লীলায় দ্যুতি হিসাবে বড়াই চরিত্র একটি দৈনন্দিন একটা জাগতিক চরিত্র। চন্ডীদাস রাধাকৃষ্ণ প্রেম লীলাকে অলৌকিকতার কুয়াশাচ্ছন্নতা থেকে লৌকিকতার একেবারে গ্রামীন পটভূমিতে নিয়ে এসেছেন। তিনি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক প্রেমাভিসারকে ১৩টি খন্ডে ভাগ করে তার স্থানিক বাস্তব অবয়ব চিহ্নিত করেছেন, যা কোন স্বর্গের দেব দেবীর কান্ড নয়, মর্ত্যরে মানুষের নর-নারীর মাঝে নিয়ত ঘটে থাকে। এই খন্ডগুলো হলো জন্মখন্ড, তাম্বুল খন্ড, নৌকা খন্ড, ভার খন্ড, ছত্র খন্ড, বৃন্দাবন খন্ড, কালীয় দমন খন্ড, তার খন্ড, মান খন্ড, বংশী খন্ড ইত্যাদি বর্ণনায় যে বিচিত্র স্বরুপ বর্নিত হয়েছে তাতে জীবন ও জগতকে মত্থিত করেছে। এসব খন্ডে খন্ডে রাধাকৃষ্ণ এর লীলায়িত অবস্থান এতই জাগতিক হয়ে উঠেছে যে, তাতে ভক্তিতত্ত্বের কৃষ্ণকে খোঁজে মিলে না। তবে জাগতিক প্রেমেও ভেদ অভেদ জাত পাত আভিজাত্য দ্বারা বিবেচিত হয় না। প্রেমের স্বরূপ সমান, তার আবেদন সকল স্তরেই গৃহীত। রাধা-কৃষ্ণের লীলায় তাই উদ্ভাসিত হয়েছে। বৈষ্ণবীয় চেতনায় রাধাকৃষ্ণ লীলা একটা ধারা এ ধারায় অন্যত্র গীতনৃত্য হচ্ছে রাসলীলা যা বাঙালি সনাতন হিন্দুসমাজ, অপরাপর সমাজে, সমতল, অসমতল সমাজে, আদিবাসী মণিপুরী সমাজে এই রাসলীলা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে রাধাকৃষ্ণের মিলন বা প্রেমকে কেন্দ্র করে তার আধ্ম্যাতিক ব্যাখ্যা নানা ভাবে আছে ছন্দে, গানে কবিতায় নানা রূপে মনের মাধুরী মিশিয়ে ব্যাখা করা হয়েছে। তবে এটা সত্য যে, ভৌগলিক সামাজিক রীতিনীতি ধরণ ধারণে নানা ব্যবধানে রুচি প্রকৃতির রূপায়নেও কিন্তু কৃষ্ণ প্রেমলীলার রুপায়ন দেশে দেশে বা ভৌগলিক অবস্থানে পার্থক্য চিহ্নিত করেছে। আত্মা-পরমাত্মার মিলনের মধ্য দিয়ে লীলা সংগঠিত হয়েছে। রাধাকৃষ্ণ প্রেমের অলৌকিকতার সুর বোঝাতে বলা হয়েছে- “রজকিনী প্রেম নিকশিত হেম কাম গন্ধ নাহি তায়।” আমাদের বুঝে নেয়া ভাল যে, এখন জগতের মানুষের রাধাকৃষ্ণের আদলে লীলা করতে হয়। মানুষরূপী যে রাধা কৃষ্ণ লীলা অনুষ্টিত হয়, তাতে লৌকিক, মত্যের মানুষের মাঝে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তারা সবাই মর্ত্যের রাধাকৃষ্ণ দৃশ্যমান মানবীয় সত্তা রক্ত মাংসের গড়া শরীর। তাকে উপেক্ষা করা নয় বরং তাকে বহন করেই মর্ত্যরে নর নারীদের লীলা ধর্ম পালন করতে হয়। (৪) কার্তিক মাসের পূর্ণিমার রাতটি রাসোৎসবের একটি সুন্দর ¯িœগ্ধ প্রিয় রাত ভরা চন্দ্রিমার প্রস্ফূটিত আলো দিক দশ আমোদিত করে। অবগাহিত হয়ে উঠে। পূর্ণিমার এমন আলোয় জগত সংসারে মূর্চনার ঢেউ তুলে তাল লয়ে একটা উন্মাদনা অনন্ত যৌবনা নরনারীর চিত্তে আলোড়িত করে তুলে। তাই বহু আঙ্গিকে রাসোৎসব টি উদ্যাপিত হয়ে থাকে। নৃত্যগীত কীর্তনে এ রাতের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য চিত্রায়িত হয়। আদিবাসী, মণিপুরী সমাজেও এ রাত গভীরতর আনন্দের সঙ্গে গীত হয়। তবে তাদের কাছে রাসোৎসবটি নাট্য আঙ্গিকে নাট্যভিনয়ে ও নৃত্যগীত নির্ভর হিসাবে গুরুত্ব পেয়েছে। মূলত মণিপুরী সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি উপজীব্য হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। একটা উৎসব অনুষ্ঠানে মূল যাই থাকুক সমাজ সংস্কৃতির প্রভাব ও স্বভাব থাকে বলে দেশে দেশে সংস্কৃতির রূপ রূপান্তর ঘটে। একই অনুষ্ঠানে ভেদ অভেদ থাকতে পারে। তাই এই উৎসব পালনে আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। উৎসবের শৃঙ্খলা দায়িত্ব আগে থেকেই বন্টিত হয়। উৎসবের নৃত্য, গীতে যারা অংশ নেবে তাও আগে থেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে নৃত্যগীতের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়–যাতে কোনো ছন্দপতন না ঘটে। তাকে কেন্দ্র করে যে লোক সমাজের সমাবেশ মেলা, দোকান পাটের পসরার বিস্তার ঘটে তাও কিন্তু লীলার অংশ হয়ে উঠে। অধুনা সমাজ ব্যবস্থায় মহারাসলীলাকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্তের বহু মহাজনের যে আগমন ঘটে তাতেও বাড়তি দায়িত্বের প্রয়োজন পড়ে। সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠে পূর্ণিমার ¯িœগ্ধ রাতটি। আবাল-বৃদ্ধ, বণিতার কাছে যেমন আগ্রহের তেমনই তরুণ-তরুণীর কাছে মহাআকর্ষণের রাত। রাধাকৃষ্ণকেন্দ্রিক এই প্রেমের রাতটি একটা সমবায়ী প্রেমের রাত হয়ে উঠে। কুশ্রিতা বিশ্রিতার বাইরে অনাবিল হৃদয় নিংড়ানো রাত যেন হাজার রজনীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠে। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বাইরে মহারাস অভেদ চিহ্নিত করে মহিমামণ্ডিত হয়ে উঠে। আমাদের বুঝে নেওয়া ভালো অগ্রসর পৃথিবীতে মহাকাশ জয়ের বার্তা প্রকাশ পেলেও সব কিছু তথ্য প্রযুক্তির ভার্চুয়াল হয় না, উৎসব অনুষ্ঠান ভার্চুয়াল হয়ে উঠলে তখন উৎসবের ব্যানার থাকলেও মানুষ থাকে না। তাই স্বর্গের রাধাকৃষ্ণ মর্ত্যের মানুষের কাছে অলৌকিকতা ছেড়ে ছন্দায়িত, লীলায়িত হয়ে উঠেছেন মানুষের আদলে। রাসোৎসবের এটি একটি বড় সত্য। সহায়ক সূত্র: ১। বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন-সুনীতি কুমার কানুনগো ১৯৮৭। ২। বুড়োচন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য-ড. শামসুল আলম সাঈদ-২০০৮। ৩। আরণ্যক, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী-২০২১।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..