করোনার অভিঘাত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও নতুন ইস্যু

সুতপা বেদজ্ঞ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এদেশে ইস্যুর কোন অভাব হয় না। একটি ঘটনার দু’একদিন পেরোতে না পেরোতেই নতুন ঘটনার খবর আসে। ফলে অনেক সময় ভয়ঙ্কর বা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুও নতুন নতুন ইস্যুর ভারে চাপা পড়ে যায়। গতদিন যা ছিল টক অব দ্য সিটি আজ তা বিস্মৃতির অতলে। এতে করে যা হচ্ছে তা হলো কোন সমস্যারই সমাধান তো দূরের কথা সর্বশেষ অবস্থাও জানা যাচ্ছে না। আলোচনায় আসছে না। তেমনি একটি সবে পুরোনো কিন্তু জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে নতুন করে ভাবার জন্যই এ আলোচনার অবতারণা। আমরা জানি, বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কম ছিলো এ দেশে তখন বেশি ছিলো। সরকারের এক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থান ছিলো বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে এদেশে বাড়ানো হবে না, ফলে তখন সমন্বয় হয়ে যাবে। গত সাত বছরে রাষ্ট্রয়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ৪৩ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে- সংবাদ মাধ্যমের কল্যানে এ তথ্য মানুষের অজানা নয়। বিপিসির তহবিল থেকে দুই দফায় অর্থমন্ত্রণালয় ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী বিপিসির তহবিল থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৪ হাজার ১২৩ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে। গত সাড়ে পাঁচ মাসে বিপিসি লোকসান করেছে ১১৪৭.৬০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় মালিকানার উদ্বৃত্ত সরকার ব্যবহার করেছে কিন্তু লোকসানের সময় ভর্তুকি না দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে করোনার অভিঘাতে জর্জরিত জনগোষ্ঠীকে ঘুরে দাঁড়ানোয় সহযোগিতা না করে বরং চরম দুর্ভোগে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের দেশে আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর সরকার বিভিন্ন ধরনের কর-শুল্ক আরোপ করে থাকে। যা আমদানি মূল্যের প্রায় ৩৪ শতাংশের সমপরিমান। এক লিটার ডিজেল আমদানিতে ভ্যাট ও কর দিতে হয় ১৯ টাকার মতো। ডিজেলে দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ দূরপাল্লার বাস ভাড়া বেড়েছে ২৬.৭৬ শতাংশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বেড়েছে ২৮ শতাংশ এবং লঞ্চ ভাড়া বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে ডিজেলের খরচ যদি যানবাহন পরিচালন ব্যয়ের ৪০ শতাংশও হয়, তাহলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির অনুপাতে পরিবহন ভাড়া ৮-৯ শতাংশের বেশি বাড়ার কথা নয়। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে যেখানে পাইপ লাইনে গ্যাসের সুবিধা নেই সে সকল নগর ও গ্রামীন জনপদের জীবনযাত্রার বেশিরভাগটাই জ্বালানি তেলের সাথে নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের প্রধান ব্যবহারকারী পরিবহন খাত। যার উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছে আছে বলেও মনে হয় না। এরা কথায় কথায় ধর্মঘট ডেকে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ভাড়া বাড়ানোর পায়তারা করে। অনেকেরই মনে থাকার কথা গত বছর সারাবিশ্ব যখন করোনা ভয়ে জর্জরিত, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির খবর আসছে, বাংলাদেশে লকডাউন চলছে- শিথিল হচ্ছে, সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকাটাই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছিলো ঠিক সে সময়ে পরিবহণ মালিকেরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক যাত্রী বহনের অজুহাতে সরকারের সাথে দেন দরবার করে বাস ভাড়া ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিলো। দু’দিন যেতে না যেতেই তারা তাদের ওয়াদা ভঙ্গ করেছিলো কিন্তু বাসভাড়া কমেনি একটুও। এবারেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আসার সাথে সাথে পরিবহন মালিকেরা ধর্মঘট ডেকে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দিলো এবং ভাড়া বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হলো। পৃথিবীর মানুষ দীর্ঘ দুঃসময় কাটিয়ে সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরে নয়। করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে বিশ্ববাজরে তেলের দাম বাড়বে একথা সবারই জানা ছিল। সরকার তার পূর্বের নীতি-কৌশল থেকে সরে এসে বিশেষজ্ঞ বা জনমতের তোয়াক্কা না করে ডিজেল ও কেরোসিনে লিটার প্রতি পনের টাকা বাড়িয়ে দিল। বিআইডিজি ও পিপিআরসির জরিপ অনুযায়ী করোনাকালে এদেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ৩ কোটি ২৪ লক্ষ মানুষ। চলতি বছরের মার্চ মাসে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা ছিলো ২ কোটি ৪৫ লাখ। অর্থাৎ গত ছয় মাসে ৭৯ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। করোনার প্রবল প্রতাপের সময় ২০২০ সালের জুলাই মাসে লোকসানের অজুহাতে ২৫টি সরকারী পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছে। তাদের অনেককেই এখনও পর্যন্ত সরকার পাওনা অর্থ বুঝিয়ে দিতে পারেনি। লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। যাদের রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে তাদের জীবন-জীবিকার দায়িত্ব নিতে সরকারের অনাগ্রহ। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর। অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে এবং বেকার জীবন যাপন করছে। এই সকল বাস্তবতা মেনে নিয়েই মানুষ পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে সেটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। মানুষ করছিলোও তাই। কিন্তু হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাদের নতুন সংকটে ফেলে দিয়েছে। একথা সকলেরই জানা আছে দীর্ঘদিন ধরে দেশে সিন্ডিকেটের প্রবল দৌরাত্ম্য চলছে। সুযোগ ও মৌসুম বুঝে হঠাৎ হঠাৎ পণ্যের সরবরাহ বন্ধ রেখে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ যাবৎকালে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে সরকারের উদ্যোগ খুব সামান্যই চোখে পড়ে। টিসিবির মাধ্যমে স্বল্প ও অপ্রতুল পণ্য কোটি কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ বেলায় খালি হাতে ঘরে ফেরার খবর তারই সাক্ষ্য বহন করে। দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চাল, ডাল, তেল, আটাসহ সকল পণ্যের দাম আগে থেকেই বেশী ছিলো। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তারা নতুন করে সংকটে পড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী. করোনাকালে এবং করোনাত্তর সময়ে দেশে প্রবৃদ্ধি স্থির নেই বরং বেড়েছে। সাথে সাথে বেড়েছে ভোগ ও আয় বৈষম্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। সরকারি হিসেব যদি সঠিক হয় তাহলে মাথাপিছু আয়ের এই হিসেবের মানে দাঁড়ায় সম্পদ ও অর্থ অল্প কিছু মানুষের হাতে জমা হয়েছে। করোনাকালে দেশে সহ¯্রাধিক নতুন কোটি পতির সংখ্যা বেড়েছে সাথে সাথে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে লক্ষ-কোটি মানুষ। এ ধরণের বৈষম্যপূর্ণ অবস্থা সমাজে বিশৃংখলা, অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতার জন্ম দেয়। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বন্টনের নায্যতা’ নিশ্চিত করবে বলে অঙ্গীকার করেছিলো। তারা রাষ্ট্রটিকে কল্যানমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরের কথাও বলছে। গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও জনগণের ন্যুনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ ছাড়া তা কি আদৌ সম্ভব? সরকারের মনে রাখা প্রয়োজন সরকার কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। সরকারি সংস্থা বা কল-কারখানায় দুর্নীতি হচ্ছে কি না, কারখানা আধুনিকায়ন হচ্ছে কি না এবং তা যুগের চাহিদা মেটাতে পারছে কি না সেদিকে দৃষ্টি দেয়াই সরকারের কর্তব্য। সরকারি কারখানা বা সংস্থার লাভ-লোকসানের সাথে সাধারণ জনগণের জীবন-জীবিকা নির্ভর করতে পারে না। সরকার জনচাহিদাকে সবসময় অগ্রাধিকার দেবে প্রয়োজনে ভর্তুকি দেবে, প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিল করবে। এটাই গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক সরকারের নীতি কৌশল হওয়া উচিত। অর্থনীতির সূত্র যা ই হোক না কেন এ দেশে একবার দাম বাড়লে তা কমার দৃষ্টান্ত খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার বাজার ব্যবস্থা তদারকির সক্ষমতাও সরকারের নেই। ফলে নির্ধারিত মূল্য ও বাস্তবের মধ্যে অনেক তফাৎ দেখতে পাওয়া যায়। সরকার এমন সময় তেলের দাম বাড়াল যখন শীতকালীন সবজি চাষ ও বোরো মৌসুম। সেচের জন্য কৃষকের ভরষা করতে হয় ডিজেলের উপর। সেচের ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে একথা সকলেরই জানা। তাতে করে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাক বা না পাক জনগণকে ঠিকই বেশি দামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হবে। মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন কোন ইস্যুর নিচে চাপা পরতে পারে না। স্বভাবতই জনগণ এখন প্রশ্ন করছে পরিবহন ভাড়া যদি বাস মালিকদের দাবী অনুযায়ী ঠিক করতে হয় তাহলে কৃষকের দাবী অনুযায়ী কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ হয় না কেন? শ্রমিকের মূল্য নির্ধারণের সূচক সরকার কাদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করে? রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। যে কোন সরকারি সিদ্ধান্ত যদি জনগণকে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে ন্যুনতম বেঁচে থাকার অধিকারই না দেয় তবে তা কার বা কাদের স্বার্থে নেয়া হয়? এ অবস্থায় সরকার যদি তেলের দাম না কমাতে চায় তাহলে ভ্যাট-শুল্ক কমাতে পারে। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে টিসিবির সক্ষমতা বাড়াতে পারে । টিসিবিতে নতুন নতুন পণ্য সংযোজন করা যেতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু করা সরকারের জন্য নিশ্চয়ই কোন কঠিন কাজ নয়। কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে, সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখতে মধ্যসত্ত্বভোগী, দালাল ও সিন্ডিকেট রুখে দেয়া অতি জরুরী। এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। সরকার জনদুর্ভোগ কমাতে জনগুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে দৃষ্টি দিতে বাধ্য হবে তখনই যখন জনগণ এ ব্যাপারে সোচ্চার হবে। আর তা না হলে নতুন নতুন ইস্যুর আড়ালে এই ইস্যুটিও যে হারিয়ে যাবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..