বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
“.... বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজার অষ্টমী দিনে গত ১৩ অক্টোবর ২০২১ তারিখে অর্থাৎ ১২ অক্টোবর দিবাগত ভোর রাতে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীর পাড়ে পূজামণ্ডপে দেবীর কোলে কে বা কারা মুসলামানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘কোরআন’ রেখে দেয়। সকালে পুরোহিত ও পূজারী কেউ মন্দিরে পৌঁছার আগেই ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটায়। এবং সারা দেশে ফেসবুক ইউটিউবের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সংহিসতা উস্কে দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ঐদিনই কুমিল্লায় বেশ কয়েকটি মন্দির ও পূজামণ্ডপ ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনার পর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ৪/৫ টি মন্দিরে পূজা বন্ধ করে দেয়া হয়। যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এই ঘটনার জেরে একই দিনে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ৫/৬টি মন্দির ও পূজামণ্ডপ ভাংচুর, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয। এ ঘটনা দ্রুত সিলেট, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রা, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজারসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা ভাংচুর লুটপাট অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে। দশমীর দিনে ১৫ অক্টোবর নোয়াখালী ও চৌমুহনীতে বিসর্জনের পরেও পূজা মণ্ডপে, মন্দিরে ও সনাতন ধর্মালম্বীদের বাড়িঘর দোকানপাট হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটায়, নারীদেরকে নির্যাতন করে। সনাতন ধর্মাবলম্বী অন্তত ৩ জনকে পিটিয়ে হত্যা করে। পূজা শেষেও পরদিন ১৬ অক্টোবর ফেনী, ১৭ অক্টোবর রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। রংপুরের পীরগঞ্জে জেলে পল্লীতে আগুন ধরিয়ে ২৫টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং ৪০/৫০টি বাড়িতে ভাংচুর করে পরিবারগুলোকে সর্বস্বান্ত করে ফেলে। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোট ১৩ তারিখেই গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করে এবং ১৪ অক্টোবর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এবং ১৭ অক্টোবর ২০২১ রবিবার বাম জোটের একটি প্রতিনিধি দল সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ ও চৌমুহনীতে পূজামণ্ডপ, মন্দির, বাড়িঘর সরেজমিন পরির্দশন করে এবং আক্রান্ত ও আহত নিহতদের পরিবারবর্গের সাথে কথা বলেন ও মতবিনিময় করেছেন। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে নানা সময়ে উস্কে দিয়েছে এবং ব্যবহার করেছে। যা আজও অব্যাহত আছে। বাম জোটের প্রতিনিধি দলটি ১৭ তারিখ প্রথমে হাজীগঞ্জে রামকৃষ্ণ আশ্রম পরিদর্শন করে। আশ্রমের পুরোহিত সেবাময়ানন্দ, পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় সাংবাদিক ও জনসাধারণের সাথে কথা বলে জানা যায় কুমিল্লার ঘটনার পর হাজীগঞ্জে রাত ৮.৪০ মিনিটে প্রথমে ৩০/৪০ জনের একটি গ্রুপ তৌহিদী জনতার নামে মিছিল করে আশ্রমে গেটে এসে তাণ্ডব শুরু করে এবং শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা মিছিল করে এবং লোকসংখ্যা বেড়ে ৪০০/৫০০ জন হয়, পরে তা আরও বাড়তে থাকে। এরপর তারা কাঠের গুড়ি দিয়ে আশ্রমের গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে ভাংচুর, লুটপাট শুরু করে। আশ্রমের স্কুলও ভাংচুর করে। রাস্তায় মেয়েদেরকে লাঞ্ছিত করে, অলংকার ছিনিয়ে নেয়। পুরোহিত বলেন, প্রথমে মিছিলকারীরা এসে তাণ্ডব চালালে সাথে সাথে থানায় ফোন করে জানানো হয। কিন্ত ঘটনার দেড়-দুই ঘণ্টা পর ৫/৭ জন পুলিশ এসেই ১০ মিনিট পরে আবার চলে যায়। স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের ইউএনও পরের দিন ফোন করে জিজ্ঞাসা করে তোমাদের ওখানে কিছু হয়েছে কিনা? জেলা প্রশাসনের কর্তা ডিসি, এসপি ঘটনাস্থলে আসে ২ দিন পর ১৫ অক্টোবর। পুরোহিত আরও বলেন, স্থানীয় হামলাকারীরা গেটের বাইরে থেকে এবং দূরের লোকজনকে ভিতরে তা-বের জন্য পাঠায়। তিনি আরও বলেন, আমরা পুলিশকে সিসিটিভি ফুটেজ দিয়েছি। কিন্তু এখনও ফুটেজ দেখে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এতে সনাতন ধর্মালম্বীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এরপর হাজীগঞ্জ বাজারে রাজলক্ষ্মী নারায়ণ জিউআখড়া পরিদর্শন করা হয়। সেখানে পূজামণ্ডপ, প্রতিমা, প্যান্ডেল সবকিছু তছনছ করে সন্ত্রাসীরা ভাংচুর ও লুটপাট করে। ঐ মন্দিরের পূজা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার পালের সাথে কথা বলে জানা যায়- প্রথমে ৩০/৪০ জনের মিছিলটি যখন ৪/৫ বাজার প্রদক্ষিণ করে সে সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী হস্তক্ষেপ করলে হয়তো পরিস্থিতি এতদূর গড়াতো না। কিন্তু পুলিশ যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি করে। গুলিতে ৪ জন হামলাকারী নিহত হয়েছে বলে পুলিশ প্রশাসন স্বীকার করেছে। যা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। হাজীগঞ্জে নবদূর্গা ও দশভূজাসহ আরও ৩/৪টি পূজা মণ্ডপে ভাংচুর ও লুটপাট করে। দশভূজা মন্দির এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক মানিক সাহাকে ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করে। নিহত মানিক সাহার নববিবাহিতা স্ত্রী অন্তঃস্বত্তা বলে জানা যায়। এরপর বাম জোটের প্রতিনিধি দল নোয়াখালী চৌমুহনীতে একে একে রাধামাধব মন্দির, রামঠাকুর আশ্রম, বিজয়া সর্বজনীন পূজা মন্দির, ইসকন মন্দির পরিদর্শন করেন এবং সেখানে ঐ সব মন্দিরের পুরোহিত, সেবায়েত ও স্থানীয় জনসাধারণের সাথে কথা বলে জানতে পারেন দশমীর আগের দিন ১৪ অক্টোবর পুলিশের পক্ষ থেকে পূজারীদের বলা হয় দশমীর দিন ১৫ অক্টোবর বেলা ১১টার মধ্যেই প্রতিমা বিসর্জন দিতে। কিন্তু দেশবাসী জানে সবসময়ই সনাতন ধর্মালম্বীদের দুর্গা পূজার প্রতিমা সন্ধ্যায় বিসর্জন দেয়া হয়। নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতিকর অবস্থায় কারণে প্রশাসনের কথামতো তারা ১১টার মধ্যেই প্রতিমা বিসর্জন দেয়। কিন্তু তারপরেও তাদের উপর হামলা, নির্যাতন, লুটপাট বন্ধ হলো না। দশমীর দিন ১৫ অক্টোবর জুম্মার নামাজের পর নারায়ে তাকবির, কোরানের অবমাননা সইবো না- ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীর ২টার সময় মিছিল সহকারে হল্লা করে একে একে ১৩টি মন্দির পূজা মণ্ডপ হিন্দুদের বাড়িঘর চৌমুহনী বাজারে দোকানপাট ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। বিজয়া সর্বজনীন পূজা মণ্ডপে তত্ত্বাবধায়ক উৎপল সাহা জানান, এটা স্বতঃস্ফূর্ত কোনো হামলা নয়, কারণ হামলাকারীরা গান পাউডার, লোহার পাইপে বারুদ দিয়ে বোমা বানিয়ে তা দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে। ঢাকা থেকে কোনো এক গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন পরিচয়ে এসে ঐ আলামত নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, মন্দির ভাংচুর করেছে, প্রণামীর টাকা পয়সা, স্বর্ণলংকার লুট করেও সন্ত্রাসীরা ক্ষান্ত হয়নি। ওরা আমাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমার স্ত্রী, ৩ কন্যা, নিহত শ্যালকের স¿ীকে দোতলায় উঠিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। দরজা তালা ও বিভিন্ন জিনিস দিয়ে আটকে রাখে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা এখনো ট্রমাটাইজ হয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে তারা কেঁদে ওঠে। ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। এখানেও পুলিশকে খবর দেয়ার দেড়-দুই ঘণ্টা পরে সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার পরে তারা আসে। এখানেও প্রণামীর কয়েক লক্ষ টাকা হামলাকারীরা নিয়ে যায় বলে তিনি জানিয়েছেন। আমাদের প্রতিনিধি দল নিহত যতন সাহার স্ত্রী লাকী রানী সাহা, বোন মুক্তা রানী সাহা ও শিশুপুত্র আদিত্য’র সাথে সাক্ষাত করেছেন। তাদের সান্তনা দেয়ার কোন ভাষা আমাদের ছিল না। যতন সাহার স্ত্রীও বাকরুদ্ধ, কোন কথা বলতে পারছিল না, শুধু কাঁদছিল। এরপর ইসকন মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার পুরো মন্দির এলাকায় লণ্ডভণ্ড দৃশ্য দেখা যায়। সেবায়েত রসপ্রিয় দাস রত্নেশ্বর দেবনাথের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২টা ১৫ মিনিটে ঐ মন্দিরে হামলা করে ১০০০/১৫০০ জনের একটি জঙ্গী মিছিল। এখানে হামলাকারীদের হাতে ২ জন নিহত হয়েছে। পান্থ দাস নামের এক ভক্তকে কুপিয়ে মেরে পাশের পুকুরে পানিতে ফেলে দেয়। পরদিন পুকুর তার লাশ ভেসে উঠলে সেখানে থেকে উদ্ধার করা হয়। আরেকজন নিমাই দাস নামের একজনকে মাথায় ১০/১২টি কোপ দিয়ে তাকে মাটিতে থেতলে দেয়া হয়। যেখানে থেতলে দেয় সেখানে তার চুল ও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ২ দিন পরে গিয়েও আমরা দেখতে পেয়েছি। ইসকনের সেবায়েত বলেছেন পূজার বিভিন্ন ভক্তদের দেয়া প্রণামীর টাকা, স্বর্ণলংকারসহ প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার মালামাল সন্ত্রাসীরা লুট করেছে। বাম জোটের প্রতিনিধি দল সর্বশেষ কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীর পাড়ের পূজা মণ্ডপ ও চকবাজার এলাকায় চাঁদমনি রক্ষা কালী মন্দির পরিদর্শন করে। নানুয়া দিঘীর পাড়ের পূজামণ্ডপটি রাস্তার উপর একটি অস্থায়ী প্যান্ডেলে করা হয়। দীপন সংঘ নামে একটি সামাজিক সংগঠন বহু বছর ধরে এখানে পূজা করে আসছে। এযাবৎ কোন দিন এমন ঘটনা ঘটেনি। সেখানে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়- ১২ অক্টোবর সপ্তমী পূজা শেষ হয় রাত ৩টার দিকে। রাত ৪টার সময় সবাই লাইট বন্ধ করে চলে যায়। সকালে পূজা মণ্ডপে পুরোহিত আসার আগেই লোকজন দেখতে পায় মতলবাজ কে বা কারা পূজামণ্ডপে মূল বেদির বাইরে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হনুমানের কোলে কোরআন শরীফ রেখে দিয়েছে। সাথে সাথে পুলিশকে খবর দেয়া হলেও তৎক্ষণাৎ পুলিশ সেখানে আসেনি। ইতিমধ্যে উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এর ছবি তুলে ফেসবুক ইউটিউবে কোরআন অবমাননার কথা প্রচার করে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিতে থাকে। পরে কোতোয়ালী থানার ওসি এসে আলামত ‘কোরআন’ উদ্ধার করে বগলে নিয়ে ওয়াকিটকিতে কথা বলতে থাকে এবং ঐ ছবি ভিডিও করতে দিয়ে সারা দেশে উন্মাদনা ছড়াতে সাহায্য করে। এরপর ২/৩টার দিকে কয়েক শত মানুষ মিছিল করে ঐ পূজা মণ্ডপে প্রতিমা ভাংচুর করে পুকুরে ফেলে দেয় এবং চাঁদমনি রক্ষা কালী মন্দির, ৪/৫টি পূজা মণ্ডপ ও প্রতিমা ভাংচুর, লুটপাট করে। চাঁদমনি রক্ষা কালী মন্দিরের পুরোহিত অমর চক্রবর্তীর সাথে কথা বলে জানা যায়, হামলাকারীর পর পর ৩ বার আক্রমণ করতে আসে। প্রথম ২ বার তারা গেট ভেঙে ঢুকতে পারেনি, ৩য় বারে গেট ভেঙে মন্দিরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়, ভাংচুর, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে মন্দিরে সবকিছু পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। উল্লেখ্য, এই মন্দিরের সভাপতি একজন জেলা জজ হওয়ার পরও মন্দিরটি রক্ষা পায়নি। এখানেও প্রথম বার হামলার পর পুলিশকে জানালেও যথাসময়ে আসেনি। এ সকল মন্দির, পূজামণ্ডপ, বাড়িঘর, দোকানপাট সরেজমিন পরিদর্শন করে, পুরোহিত, সেবায়েত, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী জনগণ, আক্রান্ত, আহত ব্যক্তিবর্গ, নিহতদের পরিবারের সাথে কথা বলে প্রতিনিধি দলের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, ১৩ তারিখ কুমিল্লায় ঘটনার পূর্বাপর সকল ঘটনা এবং সর্বশেষ রংপুরের ঘটনার মাধ্যমে পরিষ্কার যে, এটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অনুষ্ঠান পালনে নিশ্চয়তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরও যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছে যা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়। ফলে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের দায় সরকারের এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। বাম গণতান্ত্রিক জোট মনে করে সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া এ ধরনের হামলা-ভাংচুর কয়েক দিন ধরে চলতে পারে না। কারণ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। তাদের কাজই হলো যে কোনো সন্ত্রাস, সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের পরিকল্পনার আগাম তথ্য সংগ্রহ করা। সে জন্যই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন ভাতা নির্বাহ করা হয়। কিন্তু পূজাকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা সারা দেশে ঘটলো তার খবর সংগ্রহ করতে কি গোয়েন্দারা ব্যর্থ হয়েছে। সরকার সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটতে দিয়ে ঘটনার পর এখন অসাম্প্রাদায়িক সেজে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে। বর্তমান ভোট ডাকাতির সরকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা ঢাকতে এবং ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই সরকার একদিন সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটতে দিয়ে দেখাতে চায় দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাই তাদের দমনের নামে, ভোটার বিহীন ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে এবং জায়েজ করতে চায়। অন্যদিকে ভারতেও বিজেপি সরকার বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক হামলাকে কাজে লাগিয়ে ঐ দেশে হিন্দুত্ববাদ জাগিয়ে তুলে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায়। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সরকারের পারস্পরিক যোগসাজশ এখানে স্পষ্ট। বাংলাদেশে মুসলিম সাম্প্রাদায়িক গোষ্ঠীর লাভ হয়। এরা পরস্পরের সহযোগি। সরকার সবসময় তার বিভাজন নীতিতে দেশ শাসন করে সনাতন ধর্মালম্বীদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সরকারের চরিত্র হলো ‘সর্প হয়ে দংশন করো ওঝা হয়ে ঝাড়’ এর মতো। গত কয়েক দিনে প্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরব থেকে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব চালাতে দিয়ে এখন সরকারি দল, অঙ্গ সংগঠন ও তাদের পোষ্য সংগঠন এবং ব্যক্তিদের মাঠে নামিয়ে অসম্প্রদায়িক সাজার চেষ্টা করছে। দেখাতে চায় তোমাদের রক্ষাকর্তা আমরা আগামীতে আমাদেরকেই ভোট দিতে হবে নইলে রক্ষা নাই। কিন্তু দেশবাসী জনগণ সরকারের এ চাতুরী ধরে ফেলেছে। এ প্রেক্ষিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই দেশে গত কয়েক দিন ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য সরকারই দায়ী। ফলে এই সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার কোন নৈতিক অধিকার নাই। ১। কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, চৌমুহনী, রামগঞ্জ, রামগতি, চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, কক্সবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, খুলনা, ফেনী, রংপুরসহ সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করে অবিলম্ব গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ২। সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির কমিটিকে ও বাড়িঘর, দোকানপাটের মালিকদের এবং নিহত আহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৩। মন্দির, মণ্ডপে হামলার দায় সরকারের। ব্যর্থতার দায়ে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অপসারণ করতে হবে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলা-উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলা-ব্যর্থতার অপরাধে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ৪। সংবিধানের ৩২ ধারা পুনঃস্থাপন করে ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। ৫। সংবিধান, রাষ্ট্রীয় আইন-বিধিবিধান, পাঠ্যপুস্তক থেকে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য, লেখাসহ সকল উপাদান বাদ দিতে হবে। ৬। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ৭। ধর্মীয় বক্তব্যের নামে সাম্প্রদায়িক উস্কানী দেয়া শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। আমরা দেশের সকল বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি গোষ্ঠীকে উপরোক্ত দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..