বাম বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি ও কৌশল

ডা. মনোজ দাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১. ভূমিকা: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি চায় জনগণের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্র নির্মাণের পূর্বশর্তগুলো পরিপক্ক অবস্থায় পাওয়া যাবে না। এটা পূরণ করতে আমাদের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের বাম বিকল্প অর্থনীতির মধ্যদিয়ে যেতে হবে। প্রথমত কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও গণতন্ত্রীদের একটি মোর্চা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে বাম বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সনাতন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গণ্ডিকে অতিক্রম করার মাধ্যমে বুর্জোয়া বিকাশের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তৃতীয়ত, এই গতিশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত সৃষ্টি করতে হবে। ২. বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গণ্ডিকে অতিক্রম করতে হলে তার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আমাদের বুঝতে হবে: প্রথমত, বর্তমান অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদনির্ভর। বিদেশনির্ভর। এর ফলে বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী পুঁজিপতি শ্রেণির প্রকৃত বিকাশ ঘটেনি। এখানে প্রধান ধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মুৎসদ্দি-পরগাছা-মধ্যসত্ত্বভোগী পুঁজি। দ্বিতীয়ত এখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে অর্থনীতিতে অবাধ লুটপাট, দুর্নীতি এবং বিদেশে সম্পদ পাচারকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনবৈষম্য ও শ্রেণিবৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। চতুর্থত, গ্রামাঞ্চলে উপনিবেশিক-সামন্তবাদী অতীত থেকে চলে আসা উৎপাদন কাঠামোর অবশেষসমূহ টিকে থাকলেও, পুঁজিবাদই গ্রামীণ অর্থনীতির মুখ্য ধারায় পরিণত হয়েছে। গড়ে উঠেছে গ্রামীণ বুর্জোয়া শ্রেণি। পঞ্চমত, ভোগসর্বস্ব পুঁজিবাদের আরোপিত উন্নয়ন ধারা প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। ৩. গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর অনগ্রসরতা, অনুন্নয়ন ও পশ্চাৎপদতা দূর করার লক্ষ্য নিয়ে বাম বিকল্প অর্থনীতির মূল নীতি ও কৌশল ঠিক করতে হবে: গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয় আমাদের আদর্শিক বিষয় থেকে বাস্তবতার জগতে নিয়ে আসবে। তখন ব্যক্তি ইচ্ছানির্ভর কতকগুলি ইউটোপিক নীতিবোধের দ্বারা পরিচালিত হলে চলবে না। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্তর্বস্তুর আলোকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে, বিপ্লবী সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাম বিকল্প অর্থনীতির মূল নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর স্বাধীন ও আত্মনির্ভরতা অর্জন হবে বাম বিকল্প অর্থনীতির মূল নীতি ও লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাম বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি ও কার্যব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কর্তব্যরূপে গণ্য করে অগ্রসর হতে হবে। তৃতীয়ত, বাম বিকল্প অর্থনীতিকে হতে হবে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিকতামুক্ত। চতুর্থত, উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতকে সাহায্য করতে হবে ও রাষ্ট্রের সকল অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বরাদ্দ যুক্তিসংগত পর্যায়ে হ্রাস করতে হবে। পঞ্চমত, শিল্পখাতে একচেটিয়া প্রবণতা প্রতিরোধ ও বৈষম্যহীন প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠত, নিজস্ব জনশক্তি ও মেধাশক্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তার একটি অংশকে আন্তর্জাতিক বাজারে অনুপ্রবেশের প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয় উপার্জন জাতীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করতে হবে। সপ্তমত, প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ধারা চালু করতে হবে। ৪. স্বাধীন ও আত্মনির্ভরতা অর্জন করতে হলে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে: প্রথমত, দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য, নীতিনির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পরিনির্ভরতা দূর করে নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতির আরোপিত তথাকথিত অবাধ মুক্ত বাজার অর্থনীতির পথ পরিত্যাগ করতে হবে। তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমগ্র কালপর্ব জুড়ে থাকবে বহু রূপবিশিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপাদানগুলো এই অর্থব্যবস্থার মধ্যে যুগপৎ অবস্থান করবে। সুদক্ষ রাষ্ট্রীয় খাতকে নিয়ামক রেখে মিশ্র খাত, সমবায়ী খাত ও ব্যক্তিগত খাতের যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি বিকাশের প্রগতিশীল পথ গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে আমলা-মুৎসদ্দি-লুটেরা-পুঁজির যে অশুভ কর্তৃত্ব ও লুটপাটের ব্যবস্থা চলছে তার বিলোপ সাধন করতে হবে। পঞ্চমত, জাতীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে বা উৎপাদন করা সম্ভব, এরূপ পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বিলাস দ্রব্য আমদানি সংকোচন করতে হবে। পুঁজিবাদের ভোগবাদী প্রবণতা রোধ ও মিতব্যয়িতার ধারায় আন্দোলন প্রসারিত করতে হবে। ৫. স্বাধীন ও আত্মনির্ভরতা অর্জন করতে হলে রাষ্ট্রীয় খাত নিয়ে বিশেষ ভাবনার দরকার হবে: আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় খাতকে সুদক্ষ ও বিস্তৃত করে প্রধান খাতে পরিণত করতে হবে। এই পর্বে কয়েক ধরনের মালিকানা থাকলেও রাষ্ট্রীয় খাত প্রধান ভূমিকা পালন করায় অর্থনৈতিক অন্যান্য খাতকে রাষ্ট্রের স্বার্থে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্রীয় খাতে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রথমত, রাষ্ট্রীয় খাতে অর্থনীতির পরিকল্পিত সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। রাষ্ট্রীয় খাতে অর্থনীতির পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার সাথে স্থানীয় সংস্থাগুলোর ব্যাপক উদ্যোগ ও স্বাধীনতাকে এবং মেহনতি জনগণের সৃজনশীল উদ্যোগের সমন্বয় সাধন করতে হবে। এই খাতে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পুনর্গঠিত করতে হবে এবং দক্ষ দেশপ্রেমিক ব্যবস্থাপক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। মাথাভারী প্রশাসনের সংকোচন করতে হবে। বাম বিকল্প অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কাম্য সংস্করণ বিচারের সবচেয়ে সাধারণ মাপকাঠি হতে হবে: যথাসম্ভব কম সামাজিক শ্রম ও বৈষয়িক সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধির উচ্চহার, যে বৃদ্ধি হারে উপযুক্ত মাত্রায় জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখা যায়, বৈষম্য দূর করা যায় এবং উন্নতমানের জিনিসপত্র উৎপাদন সুনিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় খাতের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপযোগী বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে এবং পারফরমেন্স কন্টাক্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। কাজ করার বৈষয়িক ও নৈতিক উদ্দীপনার সমন্বয় সাধন করতে হবে আমাদের। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় খাতের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তার আধুনিকায়ন করতে হবে। শ্রমিক-কর্মচারীদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারখানায় বাড়তি শ্রমিকদের নিয়ে নতুন কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ৬. বাম বিকল্প অর্থনীতির নীতি ও তার কৌশল তৈরি করার সময় বিদেশি সাহায্য ও বিনিয়োগ পাওয়া, না পাওয়া এবং ব্যবহার নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে: গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর তার প্রকৃত অন্তর্বস্তুর আলোকে পরিকল্পিতভাবে ধীর-স্থিরভাবে অগ্রসর হওয়া গেলে বিদেশি সাহায্য পাওয়ার বিরাট সম্ভাবনা থাকবে। জাতীয় স্বার্থে নিজস্ব চাহিদা ও প্রয়োজনের স্বার্থে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিদেশি সাহায্য পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করতে হবে। উন্নত প্রযুক্তিসহ শিল্পের ক্ষেত্রে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। ৭. বাম বিকল্প অর্থনীতি ও কৌশল প্রনয়নের সময় শিল্পায়নের লক্ষ্যের পাশাপাশি গ্রাম ও গরিব অভিমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারা গ্রহণ করতে হবে: গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের আমূল বিপ্লবী পুনর্গঠন ‘কলমের এক খোঁচায় হয়ে যাবে না।’ গ্রামের আমূল বিপ্লবী পুনর্গঠন প্রধানত কৃষির সাথে যুক্ত। কিন্তু কৃষি এক জটিল বিষয়। এজন্য নির্দিষ্ট কোনো পথে নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে কৃষি প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গেলে এর সাথে যুক্ত নানা দিক নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। প্রথমত মনে রাখতে হবে, ‘পুঁজিবাদ ও পণ্য অর্থনীতির অধীনে ক্ষুদ্রাকার চাষ-আবাদ মানবজাতিকে গণ-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারে না।’ এজন্য গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর বাম বিকল্প অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রাম জীবনের আমূল বিপ্লবী পুনর্গঠন, খোদ কৃষকের হাতে জমি ও স্বেচ্ছামূলক সমবায় এই নীতির ভিত্তিতে অগ্রসর হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজার ব্যবস্থার কারসাজিতে গ্রাম থেকে ঢালাওভাবে উদ্বৃত্ত উঠিয়ে আনা যাবে না। উদ্বৃত্তের বড় অংশ কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে হবে। খোদ কৃষকের জন্য লাভজনক পণ্যমূল্যের নিশ্চয়তা, ক্ষেতমজুরদের কাজ, গ্রামীণ শিল্প ও কুটির শিল্প এবং বহুমুখী সার্ভিসের প্রসার ঘটিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যক্রম অগ্রসর করতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষকদের ওপর বলপ্রয়োগ করা যাবে না। শিক্ষা, দৃষ্টান্ত ও কৃষকদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হবে। এই পর্বে কৃষিতে বিক্ষিপ্ত ছোট আকারের উৎপাদনকে সমবায় ও বৃহদাকার উৎপাদনের ধারায় স্থানান্তরিত করার জন্য এক সৃষ্টিশীল উপায় আবিষ্কার করার দরকার হবে। কৃষক পরিবারগুলোর সমবায়ের মধ্যে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত যোগদান গ্রামাঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সংগঠিত উৎপাদন সমবায়গুলোর জন্ম দেবে। এই সমবায় যখন বৃহৎ সমাজকে আলিঙ্গন করবে, রাষ্ট্রীয় খাত প্রধান ভূমিকা পালন করবে, তখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কমিউনিস্ট-বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির মোর্চা সমবায়কে সমাজতন্ত্রের অভিমুখে পরিচালনা সম্ভব হবে। এই কর্তব্য সম্পাদন করতে অধিকতর সময় প্রয়োজন হবে, দরকার হবে বাস্তব পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের এবং প্রায়োগিক বিপ্লবী সৃষ্টিশীলতার। ৮. গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর বাম বিকল্প অর্থনীতির বিকাশের বস্তুগত নিয়মাবলী সম্পর্কে একটা নিখুঁত উপলব্ধি অর্জন করতে হবে: গতিশীল ও পর্যায়ক্রমে সনাতন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গণ্ডিকে অতিক্রম করতে হলে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের বিকল্প অর্থনীতিক বিষয়গত নিয়মগুলো জানা ও তার অর্থবহ প্রয়োগের ওপর সাফল্য নির্ভর করবে। প্রথমত, উৎপাদিকা শক্তির সাথে উৎপাদন সম্পর্কের সামঞ্জস্য সাধনের নিয়মের প্রয়োগ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি পর্যায়ের কর্তব্য হবে উৎপাদন সম্পর্কের সেইসব সুনির্দিষ্ট রূপ সৃষ্টি করা যেগুলো উৎপাদিকা শক্তিসমূহের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ এবং যেগুলো তাদের অব্যাহত অগ্রগতিকে সহায়তা দান করে। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির পরিকল্পিত বিকাশের নিয়ম এবং বাজারের সাথে তার সমন্বয় সাধন করতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের পদ্ধতি হিসেবে বাজার থাকবে। কিন্তু সনাতনী পুঁজিবাদে বাজারব্যবস্থা আর সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে (বাম বিকল্প অথনীতিতে) বাজারের উপস্থিতি সম্পূর্ণ এক হবে না। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে সমাজ ও অর্থনীতির মৌলিক ও বড় বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাজারের ভূমিকা নিয়ামক হবে না। রাষ্ট্রের ভূমিকাই হবে নিয়ামক। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মৌলিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে- যথার্থ প্রক্রিয়া ও উপযোগী কাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও চেক-আপের মাধ্যমে, পরিকল্পনাকে বাজারের ভূমিকার সাথে পরিপূরক রূপে অগ্রসর করার প্রয়োজন হবে। বাম বিকল্প অর্থনীতির পরিকল্পিত-সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ যথানুপাতিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য মূল্য-সূত্রের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি ও তার সাথে জনগণের স্বার্থের সমন্বয় সাধনের নিয়ম মেনে চলতে হবে। কৌশলগত অগ্রগতি ঘটাতে হবে। শ্রমিকদের কাজের শৃঙ্খলা উন্নত করতে হবে। দক্ষতা এবং উন্নততর শ্রম সংগঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধির সাথে জনগণের স্বার্থের সমন্বয় সাধন করতে হবে। ৯. উপসংহার: বাম বিকল্প অর্থনীতির নীতি ও কৌশল পরিবর্তনযোগ্য, বিষয়গত ও বিষয়ীগত বাস্তবতার আলোকে ক্রমেই সেগুলি সুনির্দিষ্ট রূপ ধারণ করবে। বাস্তবায়নের পথ দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতিতে অসংখ্য পরিমাণগত পরিবর্তনের সঞ্চয়ন ঘটিয়ে আমাদের আংশিক গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে অনেকগুলো আংশিক গুণগত পরিবর্তনের দ্বারা গুণের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ পরিবর্তনের শর্ত তৈরি করতে হবে আমাদের। কোনো তাত্ত্বিক গোড়ামী বা সংস্কারবাদিতায় আবদ্ধ থাকলে চলবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা আমরা গ্রহণ করবো। কিন্তু কোনো কিছুর হুবহু অনুকরণ করবো না। ইতিবাচক দিকগুলোকে ধারণ করবো। দরকার হবে বিপ্লবী দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী শক্তির।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..