তালেবানি কট্টর মৌলবাদী মধ্যযুগীয় বর্বর শাসন

আফগান নারীদের কঠিন সময়

মমতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

পার্বত্য ভূমির দেশ আফগানিস্তান, মুসলিম অধ্যুষিত, জাতিতে পাঠান–নিকট অতীতে ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে রাজতন্ত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধারার শাসন ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে পরিচালিত হয়েছে দেশটিতে। এমন কি ১৯৭৮ সালে কমিউনিস্ট পিডিপিএ আফগানিস্তানে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। এই সময় নারীশিক্ষার প্রসার, সহশিক্ষা, কলকারখানা, আধুনিক কৃষি ও পশুপালন ব্যবস্থাসহ সোভিয়েত সাহায্যে দেশটির আধুনিকায়ন ঘটে। নারী স্বাধীনতার আবহ তৈরি হয়। বাহিরের জগৎকে নারীরা চিনতে শুরু করে। এই সময় অবকাঠামোগত অনেক উন্নতি সাধিত হয়। নানা ঘটনাপ্রবাহ ও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মার্কিন ষড়যন্ত্রের ‘মুজাহিদ’ বাহিনী গঠন করে বাম সরকারের পতন ঘটানো হয়। ‘মুজাহিদ’ বাহিনীর আরেক সংস্করণই হলো এখন কার তালেবান। দীর্ঘ দুই দশক আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্য তাদের সমর্থিত সরকারের দ্বারা শাসনব্যবস্থা পরিচালিনা শেষে ঐ দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসঘাতকতা করে গত বৎসর তালেবানের সাথে চুক্তি করায় আফগানিস্তানে দ্বিতীয় দফায় তালেবানি শাসন ফিরে আসে। ফলে ঐ দেশের নারীদের জীবনে এক দুর্বিষহ অবস্থা নেমে এসেছে। আফগানিস্তানকে ‘ইসলামী আমিরাত’ ঘোষণা করেছে তালেবান শাসক গোষ্ঠী। নারীর স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ পিত্রিত এক পুরুষতন্ত্র এবং ধর্মীয় মৌলবাদ এর শাসন নারীর মানবাধিকার এর অন্তরায়। এই তিন ব্যবস্থায়ই নারীকে শোষণ, দাসত্বের শাসন এবং পশ্চাৎপদ মধ্যযুগীয় কুসংকারাচ্ছন্ন জীবনে আলোর পৃথিবী থেকে অন্ধকার জগতের বন্দিত্বে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। ১৫ আগস্ট থেকে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে নারীর জীবনে প্রচলিত দুই ধরনের লড়াইয়ের সাথে যোগ হয়েছে তালেবানি মৌলবাদী কট্টরপন্থি বর্বর মধ্যযুগীয় শাসন ও নির্যাতনের এক চরম দুরাবস্থা। কেননা মৌলবাদ নারীর অস্তিত্বকেই স্বীকার করে না। প্রথম দফায় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবাদন শাসনমলে নানাবিধ বিধি নিষেধের বেড়াজালে নারীদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে যায়। ঐ সময় নারীর অভিজ্ঞতা বদ্ধ জ্ঞান হলো ঐ দেশের নারীরা নারী স্বাধীনতা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দেয় তালেবানি শাসন, এমন কি খেলাখুলা পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয় মেয়েদের জীবনে। বাইরে যাওয়াও প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়। সব নারীদের পর্দাবৃত হয়ে পুরুষসঙ্গী সাথে নিয়ে বাইরে যেতে হতো, নারীদের নারীর একা বেড়োনোর কোন ক্ষমতাই ছিল না। বর্তমানে লন্ডনে থাকা ৩২ বৎসর বয়স্ক ‘ফিরা’ নামের এক নারী বর্ণনায় প্রথম তালেবান শাসনের কষ্টের কথা উঠে এসেছে এভাবে ‘ফিরার বাবাকে তালেবান ধরে নিয়ে যায়। তাদের পাঁচ ভাই বোনের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। মা তাদের বাবাকে খুঁজতে গেলে তাকেও মারধোর করে তালেবানরা নির্যাতন চালায়। তারা সমস্যার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে তালেবান শাসনের অবসানে আবার তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসে বলে বর্ণনা দেন ‘ফিরা’। এখনকার তালেবান শাসনে আবার তার পরিবার নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছেন ফিরা, এবং আফগান নারীদের ধারণা প্রথম বার তালেবান শাসনে একশত বছর পিছিয়ে গিয়েছে আফগানিস্তান। ২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর নারীদের জীবনে আবারো বদর আসে। শুরু হয় নতুন পথ চলা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু হয় নারীর, কর্মক্ষেত্রে বাড়ে নারীর পদাচারণা। সঙ্গীত-চিত্রাঙ্কন ও খেলাধুলা সাফল্যের ছাপ রাখতে শুরু করেন নারীরা। এমন কি গণমাধ্যমের নারীর উপস্থিতি বাড়ে। ইউনেস্কোর তথা অনুসারে গত বছর আফগানিস্তানে শিক্ষার হার ছিল ৪৩। ২০১৭ সালে থেকে পরের দুই বছরের আরো বেড়েছে ৮ ভাগ। আফগান নারীদের সাফল্য ও সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘বেহেস্তা আরঘান্দ’ সংবাদ উপস্থাপক। তালেবানের ক্ষমতা দখলের কয়েক সপ্তাহ আগে আফগানিস্তানের বার্তা সংস্থা টোলের হয়ে তালেবানের এক নেতার সাক্ষাৎকার নিয়ে ছিলেন তিনি। বেশ কিছু কড়া কথার মাধ্যমে নারী অধিকার নিয়ে তিনি বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছিলেন এক তালেবান নেতার কাছে। তবে তালেবান ক্ষমতা দখলের পরে দেশ ছাড়তে হয় বেহেস্তাকে। তালেবান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা দখলের পর সাংবাদিকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। তাই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। তালেবান দেশটির অর্থনীতি, কূটনীতি, শাসন পদ্ধতি পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দেয় আফগান নারীদের নিয়ে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থা নারীদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আর সে সব উদ্বেগ যে অমুলক নয়, তার প্রমাণ ও মিলতে শুরু করেছে। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের তালেবানের অন্তবর্তী সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছেন আফগান নারীরা পুনরায়। তালেবানের নূতন সরকারের মন্ত্রিসভায় কোনো নারীসদস্য রাখা হয়নি। এমনকি নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভবনে নারীকর্মীদের ঢুকতে দিচ্ছে না তালেবান। এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আফগান নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পড়ার কথা কথা জানিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এর সাথে পোষাকে শিক্ষাব্যবস্থা রূপরেখার ব্যাপারে অনেক শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। পুরুষের সাথে ক্লাস করা নিষিদ্ধ এবং নারীদের হিযাব পড়া বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালগুলোতে নারী শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এই বিষয়টিতে অনিশ্চয়তার কারণে নারীদের উচ্চ শিক্ষা নেয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে দাড়িয়েছে। হয়ত সম্ভবই হবেই না নারীর উচ্চ শিক্ষা নেয়া। এসব ঘোষণা তালেবান সরকারকে বর্হিজগতের কাছে যাতে প্রশ্ন বিদ্ধ না হতে হয় তারি কুটনৈতিক চাল মাত্র। বর্তমান সরকারের খেলাধুলা ও শারিরীক শিক্ষা বিষয়ক দপ্তরের মহাপরিচালক জানান দেশটিতে চারশত ধরনের খেলাধুলার অনুমোদন দেয়া হবে। তবে এত রকমারি খেলায় নারীদের অংশ গ্রহণের কোন ঘোষণা নেই। এক্ষেত্রেও নারীরা বাদ পড়ার সম্ভবনাই বেশী। ইতোমধ্যেই আফগান নারী ফুটবলাদের আশি জনের বেশি সদস্য পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন। ইতোপূর্বে কাবুল বিমান বন্দরে কাজ করতেন আশি জনের বেশি নারী। তবে তালেবানের আমলে কাজে ফিরেছেন মাত্র বার জন। জাতিসংঙ্গের একজন আফগান কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে নারীদের বাইরে বের হতে বাঁধা দিচ্ছে তালেবান। এমনকি নারীদের চাকুির ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। শুধু খেলোয়ার নয় আফগানিস্তান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন নারী অধিকার কর্মী, রাজনীতিক, গবেষক ও সাংবাদিকরাও। ইতোমধ্যে ভারতের নারী সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের আয়োজিত অনলাইন আলোচনার এমনই কয়েকজন আফগান নারী জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। আগের বারের তালেবান শাসনের আফগানিস্তান একশত বছর পিছিয়েছে। তবে এবার চুপচাপ বসে নেই নারীরা। রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে অন্তভুক্তির দাবিতে কয়েক দিন আগে আফগানিস্তানেরা তালেবান সরকারে নারী সদস্যের অন্তর্ভুক্তির দাবি করেন। তারা বলেছেন তালেবান সরকারে নারীর ভূমিকা পরিস্কার না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তালেবানের রক্তচক্ষু মোকাবেলা করেই বিভিন্ন দাবিতে নারীদের বিক্ষোভ হচ্ছে। চলছে অনলাইন জগতেও প্রতিবাদ। এসব বিক্ষোভ নারীদের ওপর তালেবানদের সহিংস আচরণ ও মারধরের অভিযোগ করেছেন নারী সাংবাদিকরা শিক্ষার্থীদের জন্য তালেবান নির্ধারিত পোষক জাতিয় প্রতিবাদ জানিয়েছেন আফগান নারীরা। প্রতিবাদ জানাতে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ডোন্ট টাস মাই ক্লথস’ ও আফগান কালচার নামে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেছেন। এ হ্যাসট্যাগের সংগে আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোষাকের ছবি জুড়ে দিয়ে তা শেয়ার করেছেন। অধিকার আদায়ে আফগান নারীদের লড়াই চলছেই, এ পথে বারবার হোঁচট খাচ্ছেন তাঁরা। এক পা এগোলেও পেছাতে হয় দশ পা। আফগান নারী এ লড়াইয়ে মৌলবাদের বিরুদ্ধে কতখানি টিকে থাকতে পারবেন সে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তবুও বলতে হয় আফগানি নারীরা লড়াইয়ের ভূমিতে সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে যে সাহস এবং চেষ্টা নিয়েছেন তাকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা। বিশে^র সব দেশের নারী জাতির তাদের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া এ মুহূর্তে জরুরি কর্তব্য। এ দায়িত্বটি মাথায় রেখে, আফগানিস্তানের নারী সমাজের ওপর ধর্মীয় জঙ্গিবাদী শরিয়া আইনের তালেবান গত ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সিপিবি নারী সেল প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশে সংহতি জানিয়েছেন, সেই সাথে মৌলবাদী তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দানে যেন বাংলাদেশ সরকার বিরত থাকেন এ যৌক্তিক দাবিও রেখেছেন। জয় হোক মৌলবাদের বিরুদ্ধে তুখোর সংগ্রামী আফগান অর্ধ নারী জনগোষ্ঠীর। লেখক : সদস্য, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..