সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

শাহীন রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আমরা আজ অত্যন্ত ব্যথিত, ক্ষুদ্ধ ও উদ্বিগ্ন। কেননা আবারও বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে সাম্প্রদায়িক সন্ত্র¿াস। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ ১২টি জেলার ২২টি জায়গায় হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আমাদের রংপুরের পীরগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের উলিপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। এসব হামলায় তাদের মন্দির, প্রতিমা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট করে পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। দৈহিক নির্যাতন থেকেও তারা রেহাই পায়নি। পত্রিকার তথ্য মতে সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৫ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। দেশের নানা স্থান থেকে সাম্প্রদায়িক হামলার আরো খবর আসছে। গুজবও ছড়িয়ে পড়ছে। সন্ত্রাসের ভয়ে ভীত এখন দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ-জন। অথচ বাংলাদেশ এমন ছিল না। হাজার বছর ধরে নানা ধর্ম ও মত-পথের মানুষ পাশাপাশি মিলেমিশে বসবাস করেছে। একে অপরের ধর্ম-কর্ম-উৎসবে পাশে থেকেছে। পরস্পরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সুখ-দুঃখ-আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। যদিও ইতিহাসে দেখা যায় যে, রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেণিহীন স্বার্থে বারবার রাজনীতির মধ্যে ধর্মকে টেনে এনেছে। ধর্মের নাম ভাঙিয়ে জনগণকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। তবে ভরসা হল-এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক নয়। তারা অন্যের ধর্ম-কর্মকে সম্মান করে। তাই এদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। বরং সবসময় একটি চিহ্নিত গোষ্ঠি সাম্প্রদায়িক গুজব ছড়িয়ে উস্কানি দিয়ে সহিংসতা চালায়। এবারেও সেটাই ঘটেছে। অবশ্য অপকৌশলটি একই ধরনের। প্রথমে ইসলাম ধর্ম, পবিত্র কোরআন শরিফ কিংবা মহানবীর অবমাননার মিথ্যা বানোয়াট গুজব ছড়ানো। ভিন্ন ধর্মের কাউকে এজন্য দায়ী করে তাকে ফাসানো। তারপর সেই এলাকায় সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব চালানো। যদিও পরে প্রমাণিত হয় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি আদৌ এই অপকর্মটি করেনি। আসলে তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে কিংবা তার নামে ভূয়া আইডি খুলে অন্যরা এই ঘৃণিত কাজটি করেছে। আর কেউ যদি এক্ষেত্রে অপরাধী হয়, তার জন্য আইন রয়েছে। একজনের অপরাধের দায়ে সকলে কেন সহিংসতার শিকার হবে? ব্যক্তির দোষ কি সম্প্রদায়ের উপর চাপানো যায়? অতীতে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার ঘটনা স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির সামাজিক মাধ্যমের দ্বারা মুহূর্তেই সারাদেশে ও গোটা বিশ্বে অপপ্রচার চালিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করা সম্ভব। যে কেউ যখন তখন এভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারে। এবারেও সেটাই ঘটেছে। আর নানা সমস্যা ও দুর্দশায় দিশেহারা অসহায় ক্ষুদ্ধ জনগণ এক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয়। কারণ ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সক্ষমতা তাদের থাকে না। আসলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মূল হোতা একটি চিহ্নিত অপশক্তি। এরা হল মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি জামাত–শিবির–রাজাকার। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে তারা এতদিন ছিল কোণঠাসা। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতার স্বার্থে রাজনীতি ধর্মের ব্যবহার বড় বড় দলগুলির দ্বারা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তারা এভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়-মদদ পেয়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এদের লক্ষ্য দেশ ও জনগণের অগ্রগতিকে ঠেকানো। দেশকে তালেবানী আফগানিস্তান বানানো। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলির ধ্বংস সাধন। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল এই সন্ত্রাসীদের দমন করে জনগণকে রক্ষা করা। বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের জান-মাল সুরক্ষা সহ সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান। এর জন্য নানা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী ও তাদের অনেক বিভাগ রয়েছে। অথচ দুঃখজনক হল তা সত্ত্বেও কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঠোকানো যায়নি। তাই রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে এসব হামলার সঙ্গে সরকারি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনগণ। স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা ছিল নীরব দর্শক। আসলে সারা বিশ্বে, জনগণের অসহায়, দুর্বল, ক্ষমতাহীন অংশ সবসময় নানাভাবে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বহন করে। তথাকথিত ‘সংখ্যালঘু’ রূপে এদের চিহ্নিত করা হয়। তারা এদেশে হিন্দু বা আদিবাসী, ভারতে মুসলিম কিংবা দলিত, অন্যত্র কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্য কেউ। এদেশে শাসক শ্রেণির একদলের কাছে তারা ভোট ব্যাংক। আর অন্যদল প্রতিহিংসামূলক সন্ত্রাস চালিয়ে তাদের দেশ ছাড়া করে। তাই আমরা দেখি এই দেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত ছিল একসময় ৩০ শতাংশের উপরে। এখন তা ৭/৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তাই রাষ্ট্র, সরকার, সরকারি দল– কে দেশ ও জনগণকে রক্ষা করবে! আসলে জনগনের শেষ ভরসা জনগণ। জনগণের নিরাপত্তাহীন অংশকে রক্ষার দায়-দায়িত্ব সমাজ ও সমাজের জনগণকেই নিতে হবে। কারণ, ইতিহাস বলে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ গণপ্রতিরোধই পারে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করতে। তারাই ফিরিয়ে আনতে পারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ। তাই আসুন, আমরা সকলে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। সকলে আওয়াজ তুলি– সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ফিরিয়ে আনো, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ কনো, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে লালন-পালন চলবে না, গ্রামে-গঞ্জে-পাড়া-মহল্লায় সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..