অণু তৈরির কৌশল আবিষ্কারে রসায়নে নোবেল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : ‘অ্যাসাইমেট্রিক অর্গানোক্যাটালাইসিস’ নামে অণু তৈরির নতুন এক কৌশল আবিষ্কার করে রসায়নে নোবেল জিতে নিয়েছেন জার্মানির বেঞ্জামিন লিস্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড ডব্লিউ সি ম্যাকমিলান। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে বাংলাদেশ সময় ৬ অক্টোবর দুপুরে এক অনুষ্ঠানে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের মহাসচিব গোরান হ্যানসন তাদের নাম ঘোষণা করেন। তারা দুজন পৃথকভাবে কাজ করেছেন আণবিক গঠন নিয়ে। নতুন ওষুধের উপকরণ, সৌরকোষ থেকে ব্যাটারি স্টোরেজের মতো বিভিন্ন বিষয়ে সেই আণবিক গঠনের প্রভাব কী, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন। রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষে জানানো হয়, অণু গঠনের জন্য একটি দুর্দান্ত ‘হাতিয়ার’ তৈরি করেছেন জার্মানির ম্যাক্স-প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের লিস্ট এবং আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাকমিলান। তাদের আবিষ্কার করা অ্যাসাইমেট্রিক অর্গানোক্যাটালাইসিস যৌগ অণু তৈরিতে অভিনব একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে নতুন ওষুধের উপকরণ থেকে শুরু করে আলোক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরকারী সোলার সেলের যৌগ সবই তৈরি করা যায়। তাদের আবিষ্কার করা ‘প্রভাবক’ পরিবেশবান্ধব এবং কম খরচে উৎপাদন করা যায়। গোটা বিশ্বের জিডিপি-এর ৩৫ শতাংশই নির্ভর করে রাসায়নিক অনুঘটন প্রক্রিয়ার উপর। যেহেতু তাদের উপরেই নির্ভরশীল ওষুধ-সহ যাবতীয় শিল্পপণ্যের উৎপাদন। এই দু’জনের দেখানো পথই নতুন শতাব্দীতে পা পড়ার পর থেকে অত্যন্ত কার্যকরী নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কারের দরজাটা হাট করে খুলে দিয়েছে। লিস্ট ও ম্যাকমিলান দু’জনেই এমন পথ খুঁজেছিলেন যাতে নির্ঝঞ্ঝাটে, যেমনটি চাইছেন ঠিক সেভাবেই দুইটি জৈব অণুর মধ্যে জোড়া বাঁধিয়ে কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিজেদের ইচ্ছেমতো গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। যাতে চাইলে সেই বিক্রিয়ার গতি বাড়ানো বা কমানোও যাবে। মানবশরীরে এই কাজটা প্রকৃতি করে চলে অনায়াসে, অনবরত। মানবশরীরকে বলে দিতে বা শেখাতে-পড়াতে হয় না, জীবন-রথের চাকাকে তরতরিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে কখন কোন প্রোটিন বা উৎসেচক প্রয়োজন হবে। ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে ঠিক সেভাবে ঘটতে দেয় না বাতাসের আর্দ্রতা (জলের উপস্থিতি) আর অক্সিজেনই। অথচ, প্রকৃতি গোড়া থেকেই এই সব লক্ষ লক্ষ ‘হাতিয়ার’ তৈরি করে রেখেছে মানবশরীরে। যাদের কাজকর্মের গতি বাতাসের আর্দ্রতা আর অক্সিজেন কমাতে-বাড়াতে পারে না। এরা অনায়াসেই নিজের নিজের খেয়ালে কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি কখনও বাড়িয়ে কখনও বা গতি কমিয়ে আমাদের জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। এদের বলা হয় অনুঘটক (‘ক্যাটালিস্ট’)। আর তাদের সেই কাজকর্মের প্রক্রিয়াটার নাম অনুঘটন প্রক্রিয়া (‘ক্যাটালিলিস’)। শুধুই শরীরে নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও এমন নানা ধরনের অনুঘটকের প্রয়োজন হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়ানো আর কমানোর নিরিখে যথাক্রমে দু’ধরনের অনুঘটক হয়। ধনাত্মক অনুঘটক (‘পজিটিভ ক্যাটালিস্ট’) আর ঋণাত্মক অনুঘটক (‘নেগেটিভ ক্যাটালিস্ট’)। লিস্ট ও ম্যাকমিলান- দু’জনেই অনুঘটক আর অনুঘটন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কয়েক শতাব্দীর প্রচলিত ধারণায় সজোরে ধাক্কা মেরেছিলেন। ২০০০ সালে আলাদা আলাদা ভাবে করা দু’টি গবেষণায় নতুন শ্রেণির এক অনুঘটকেরই খোঁজ দিয়েছিলেন লিস্ট ও ম্যাকমিলান। যা আমাদের পরিচিত ধাতব অনুঘটক নয় পুরোদস্তুর। আবার মানবশরীরের লক্ষ লক্ষ উৎসেচকের মতো অনুঘটকও নয়। এই নতুন শ্রেণির অনুঘটকের নামটা প্রথম দিয়েছিলেন অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকমিলান। ‘অরগ্যানোক্যাটালিস্ট্স’। প্রক্রিয়াটার নাম- ‘অরগ্যানোক্যাটালিসিস’। এই নতুন শ্রেণির অনুঘটকরা আদতে জৈব অণু। চার হাতের (‘ভ্যালেন্সি’) কার্বন পরমাণুর জৈব যৌগ। যার শৃঙ্খলগুলি খুব দীর্ঘ। তাদের কোনও হাতে ধরা থাকতে পারে অক্সিজেন পরমাণু, কোনও হাতে হাইড্রোজেন বা কোনও হাতে নাইট্রোজেন পরমাণু। এই সব পরমাণুই যেহেতু খুব সহজলভ্য তাই নতুন নতুন ওষুধ তৈরির জন্য রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো এগিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধা হয় না ওষুধ সংস্থাগুলির। আবার ধাতব অনুঘটক ব্যবহারের বিস্তর হ্যাপাও সামলাতে হয় না তাদের। যেহেতু ধাতু বাতাসের আর্দ্রতা আর অক্সিজেন পেলেই অনাকাক্সিক্ষত বস্তুতে পরিণত হতে পারে। তা ছাড়াও বেশির ভাগ ধাতব অনুঘটকই তৈরি হয় ভারী ধাতু দিয়ে। যা পরিবেশের পক্ষে বিপজ্জনক। এই নতুন জৈব অনুঘটক বানাতে প্রকৃতির নিয়মকেই অনুসরণ করেছিলেন লিস্ট ও ম্যাকমিলান। অনেক জৈব অণুই আমাদের দু’টি হাতের মতো একে অন্যের প্রতিবিম্ব (‘মিরর ইমেজ’)। কিন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ধাপে ধাপে যখন এই সব প্রতিবিম্বের মতো জৈব অণুগুলি তৈরি হয় তখন তাদের মধ্যে কেউ যেমন উপকারী হয় অন্যটি তেমনই হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক, অপকারী। কিন্তু ধাতব অনুঘটকগুলি জৈব অণুদের প্রতিবিম্বগুলিকে চিনতে পারে না আলাদা ভাবে। দু’টি প্রতিবিম্বকেই সামনের দিকে এগিয়ে দেয় রাসায়নিক বিক্রিয়ার পরের ধাপে। ফলে, পরের ধাপে গিয়ে ওষুধ প্রস্তুতকারকরা জৈব অণুর অপকারী প্রতিবিম্বটিকেও পায়। তা বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া যেমন জটিল, তেমনই তা সম্পূর্ণ নির্ভুলও নয়। তাই তা খুব কার্যকরী ওষুধ তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটা কিন্তু মানবশরীরে হয় না। প্রকৃতিই হতে দেয় না। লিস্ট ও ম্যাকমিলামের উদ্ভাবিত অরগ্যানোক্যাটালিসিস পদ্ধতিতে জৈব অণুর দু’টি প্রতিবিম্বের মধ্যে শত্রু আর মিত্রকে চিনে ফেলা সম্ভব হয় অনেক আগেভাগেই। মানবশরীর যে ভাবে করে ঠিক সেই ভাবেই। প্রকৃতির কাছ থেকে পাঠ নিয়ে ওষুধ তৈরির এমন নতুন উপায় দেখানোর জন্যই এবারের রসায়নে নোবেল মিলল দু’জনের।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..