আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণ খুঁজে পদার্থে নোবেল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : ২০২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যুকুরো মানাবে ও জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর মেটিরিওলজির অধ্যাপক ক্লাউস হেসেলমান এবং ইতালির বিজ্ঞানী জর্জিও পারিসি। পৃথিবীর জলবায়ু পরিস্থিতির ফিজিক্যাল বা ভৌত মডেল তৈরি, পরিবর্তনশীলতা পরিমাপ এবং নির্ভরযোগ্যভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতার বিষয়টি অনুমানের জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন স্যুকুরো মানাবে এবং ক্লাউস হাসেলমান। তাঁরা দুজনে এ বছরের নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেক পেয়েছেন। পারমাণবিক ও গ্রহীয় পরিসরে ভৌত ব্যবস্থা বা ফিজিক্যাল সিস্টেমের বিশৃঙ্খলা ও ফ্লাকচুয়েশন পরস্পরের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের বাকি অর্ধেক পেয়েছেন ইটালির রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জিও পারিসি। অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, যাবতীয় খামখেয়ালিপনা আর এলোমেলো আচরণের মধ্যে নিয়ম খুঁজে বার করা আর অনেক আগেভাগে তার প্রায় নিখুঁত পূর্বাভাসের পথ দেখানোর জন্য পদার্থবিজ্ঞানে তিন দেশের তিন জনকে দেওয়া হল নোবেল পুরস্কার। এই তিন পুরস্কারজয়ীর নাম ৫ অক্টোবর, ঘোষণা করেছে নোবেল কমিটি। ‘দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’-এর তরফে জানানো হয়েছে, এক কোটি ক্রোনার (সুইডিশ মুদপ্রা) মূল্যের নোবেল পুরস্কারের অর্ধেক ভাগাভাগি করে নিয়েছেন স্যুকোরো মানাবে ও ক্লস হাসেলম্যান। বাকি অর্ধেক পেয়েছেন জিওর্জিও পারিসি। আমাদের সামনে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, যাবতীয় খামখেয়ালিপনা আর এলোমেলো আচরণের সেরা দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আবহাওয়া। এখন জলবায়ুও। পৃথিবীর মতোই যাবতীয় জটিল ব্যবস্থার অন্তরে অন্দরে রয়েছে এই সব অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, খামখেয়ালিপনা আর এলোমেলো আচরণ। তাদের মধ্যে নিয়ম খুঁজে বার করে অনেক আগেভাগে তাদের বুঝে ফেলার পথ প্রথম দেখিয়েছিলেন মানাবে, হাসেলম্যান এবং প্যারিসি। এঁদের মধ্যে মানাবে ও হাসেলম্যান এও দেখিয়েছিলেন, কী ভাবে মানুষ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রকৃতি, পরিবেশের খামখেয়ালিপনা আর এলোমেলো আচরণকে। যার জন্য শীতকালেও জবজবে ঘামে ভিজতে হচ্ছে আমাদের। নিম্নচাপের দৌরাত্ম্য, ঘূর্ণিঝড়, টাইফুন-টর্নেডোর তাণ্ডব বাড়ছে সমুদ্রোপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে। অধ্যাপক মানাবের গবেষণাটি ছিল গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে। হাসেলম্যান তাঁর গবেষণাটি করেছিলেন সাতের দশকে। আর পারিসির গবেষণাটি ছিল আটের দশকের। নোবেল কমিটির তরফে বলা হয়েছে, ‘তিন জনের গবেষণাই বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা।’ তা সে প্রকৃতি, পরিবেশই হোক বা যে কোনও ধরনের জটিল ব্যবস্থা (‘কমপ্লেক্স সিস্টেম্স’), সকলেরই অন্দরে রয়েছে এলোমেলো হয়ে পড়ার প্রবণতা। চূড়ান্ত খামখেয়ালিপনাই যেন তাদের নিয়ম। তাই আগেভাগে বলা খুব কঠিন হয়ে পড়ে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট শহরে ঠিক কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার পর প্রচণ্ড ঝড়ের পূর্বাভাসে গ-গোল হয়ে যায়। বদলে যায় ঝড়ের গতিবেগ, গতিপথ। আবহাওয়ার খামখেয়ালে। আমরা অতশত না বুঝে দোষ দিই আবহাওয়া দফতরকে। প্রকৃতির এমনই খামখেয়াল যে, প্রাথমিক অবস্থার সামান্য রদবদলই পূর্বাভাসকে আমূল বদলে দেয়। তার ফলে ‘তুমুল বৃষ্টি হবে’-র পূর্বাভাস বদলিয়ে যায় ঝকঝকে রোদে। ছয়ের দশকে মানাবের দেওয়া গাণিতিক মডেলই প্রথম দেখিয়েছিল বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কী ভাবে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ে। দেখিয়েছিল, কেন ভূপৃষ্ঠ যতটা তেতে ওঠে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তর ততটা তেতে ওঠে না কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়লে। তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন, তার উপর আছড়ে পড়া সৌর বিকিরণের কতটা অংশ প্রতিফলিত হয় পৃথিবীর দৌলতে। ফিরে যায় মহাকাশে। দেখিয়েছিলেন, এক ঘণ্টায় পৃথিবীর এক বর্গ মিটার এলাকার উপর যদি ৩৪২ ওয়াটের ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিকিরণ আছড়ে পড়ে তা হলে তার মধ্যে প্রতি বর্গ মিটার এলাকায় ভূপৃষ্ঠ শুষে নেয় ২৩৫ ওয়াটের সৌর বিকিরণ। আর বাকি মাত্র ১০৭ ওয়াটের বিকিরণ মহাকাশে ফেরত পাঠায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। ফলে, ভূপৃষ্ঠ যতটা তাতে, ততটা গরম হয় না বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরগুলি। মানাবেই প্রথম দেখিয়েছিলেন, এই তারতম্যের সঙ্গে যথেষ্টই সম্পর্ক আছে বায়ুমণ্ডলের পরিচলনের। তাঁর এই মডেলই এখন জলবায়ুর পূর্বাভাসের মডেলগুলির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এও দেখিয়েছিলেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে সভ্যতার ভূমিকা কতটা। তাঁর কাজের ১০ বছর পরের গবেষণায় আবহাওয়া আর জলবায়ুর মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন হাসেলম্যান। আবহাওয়া প্রচণ্ড খামখেয়ালি হলেও কেন জলবায়ুর মন আগেভাগে পড়ে ফেলা যায়, তারও কারণ জানিয়েছিলেন হাসেলম্যান তাঁর গাণিতিক মডেলে। আবহাওয়া ও জলবায়ু বদলাতে মানুষের ভূমিকা কতটা, সেটাও দেখিয়েছিলেন তিনি। আর পারিসির কৃতিত্ব, তিনি যে কোনও জটিল ব্যবস্থার মধ্যেই এই সব অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, যাবতীয় খামখেয়ালিপনা আর এলোমেলো আচরণের মধ্যে শৃঙ্খলা খুঁজে বার করে তাদের মতিগতি আগেভাগে বুঝে ফেলার পথ দেখিয়েছিলেন তাঁর গাণিতিক মডেলে। যা পরে গণিতশাস্ত্র, জীববিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহৃত মেশিন লার্নিং পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে, আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..