বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি কোন পথে?

এম এম আকাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের সংস্কার ছাড়া যেটুকু প্রবৃদ্ধি এদেশে হচ্ছে তাকে কখনোই দক্ষ, বৈষম্যহীন ও টেকসই বলা যাবে না। বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্বে ধীরলয়ে (৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০০০ সালের পর। তা বাড়তে বাড়তে প্রথমে ৫, পরে ৬ এবং অবশেষে ৭ শতাংশে উপনীত হয়েছে। সামাজিক নির্ণায়কের ক্ষেত্রে যেমন- নারীর অগ্রগতি, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এই ধরনের মানব উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, রেমিট্যান্স ও পোশাকশিল্পে লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত এবং তা নিয়ে শাসক শ্রেণি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অনেক প্রচারও করে থাকেন। এসব কেউ স্বীকার করে নিলেও বলতেই হবে যে, এখানে দুটো স্থায়ী ঘাটতি থাকছে। ১) এই পুঁজিবাদী বা বাজার নির্ভর উন্নয়নের ফল সব মানুষ সুষমভাবে পাচ্ছে না। ২) ধনী-গরিবের আয়-সম্পদ-শিক্ষা-চিকিৎসা বৈষম্য দৃষ্টিকটুভাবে বাড়ছে। তা ছাড়া দারিদ্র্যের আপেক্ষিক হার হ্রাস পেলেও মোট দরিদ্র লোকের সংখ্যা এখনো প্রায় ৩-৪ কোটির সমান। এই সংখ্যা বিশ্বের অনেক ছোট দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, ৫০ বছর ধরে সব সরকারের আমলেই দেখছি ধনী ও গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য সাধারণভাবে বেড়েছে এবং বাজারের ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। রাষ্ট্র তাদেরই সেবা করছে। তাই ভবিষ্যতে সুশাসন ও মালিকানার গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা টেকসই নাও হতে পারে। বর্তমান উন্নয়ন ধারায় গরিবের একদম কিছু হচ্ছে না- তা আমি বলছি না। গরিবও এগোচ্ছে, ধনীও এগোচ্ছে। কিন্তু ধনী এগোচ্ছে খরগোশের গতিতে আর গরিব এগোচ্ছে শামুকের গতিতে। বাংলাদেশে অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (১৭.৪%)। গড় আয়ও অনেক বেড়েছে! যদি বলি আমার অর্ধেক শরীর ফ্রিজে, অর্ধেক শরীর চুল্লির মধ্যে আছে- আর সব মিলিয়ে আমি গড়ে নাতিশীতোষ্ণ আছি। ব্যাপারটা অনেকটাই সে রকম। সেজন্য মানুষ এসব উন্নতির পরও সমতা ও সুশাসনের অভাবে অসন্তুষ্ট। মানুষ বাস্তবে দেখছে যে, সে পরিশ্রম অনুযায়ী ফল পাচ্ছে না। কিন্তু আরেকজন পরিশ্রমের তুলনায় অনেক বেশি পাচ্ছে। আসলে সামান্য হলেও কিছু প্রবৃদ্ধি অনেকেরই হচ্ছে। তবে নিচের দিকে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তুলনামূলক অনেক কম মাত্রায়। ওপরের দিকে বেশি মাত্রায় হচ্ছে। তার ফলে আয় বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে। সব জায়গাতেই বৈষম্য লক্ষ্যণীয়। আমরা যে গড় আয়ু বৃদ্ধির কথা বলছি সেখানেও গরিবের গড় আয়ু অতটা বাড়েনি। শিক্ষার হারের কথা যদি বলি, গরিবের ঘরে শিক্ষার মান যতটা বেড়েছে, ধনী ও মধ্যবিত্তের ঘরে তা বেড়েছে অনেক বেশি। আগে অনেকেই প্রাইমারি স্কুলে পড়তে পারত না। এখন পারছে। কিন্তু গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মান আর শহরের প্রাইমারি স্কুলের মানে অনেক তফাত। শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মান আর বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলের মানেও অনেক বৈষম্য। স্বাস্থ্য খাতেও বৈষম্য আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যটা হয়তো পরিমাণগতভাবে দেখা যাবে না। কিন্তু গুণগতভাবে দেখতে পাব। যেমন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হয়তো অনেকেই বলবেন, কমিউনিটি ক্লিনিক অনেক হয়েছে। সবাই স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। কিন্তু অল্পসংখ্যক ধনী স্কয়ার হাসপাতাল বা সিঙ্গাপুরে গিয়ে যে মানের সেবা পাচ্ছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বারান্দায় যে রোগীটি আছে সে তো তা পাচ্ছে না। তার মানে প্রতিটি স্তরে আমরা একটা বৈষম্য সৃষ্টি করে ফেলেছি। সমাজটা আর ঐক্যবদ্ধ থাকছে না। সমাজে শ্রেণি হিংসা শুধু নয় একই শ্রেণির মধ্যে ঈর্ষার প্রতিযোগিতা চলছে। তাই এটাকে উন্নয়ন বলা যাবে গড়ে অথবা ধনী সংখ্যালঘুর দৃষ্টিতে। কিন্তু বণ্টনের দিক থেকে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দিক থেকে এটাকে উন্নয়ন বলা যাবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বর্তমানে তার শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আর শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি খাতে পুঁজি বিনিয়োগ ও শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াতে হবে। আর নতুন প্রযুক্তি আনতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। এভাবে চললে ১০ বছর পরের বাংলাদেশ আরেকটু উন্নত হবে। হয়তো মধ্যম আয়ের কাছাকাছি চলে যাবে। এবং গণতন্ত্রের ইস্যুটা মানুষের কাছে উত্তরোত্তর আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন যখন অগ্রসর হয়ে যায় তখন রাজনৈতিক উন্নয়নটা বেশিদিন পিছিয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু এই ১০ বছরে যদি রাজনৈতিক কোনো বড় অস্থিতিশীলতা হয়, গণতন্ত্রের সঙ্গে কর্তৃত্বপরায়ণতার দ্বন্দ্বটা যদি সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান না হয় এবং উল্টো নৈরাজ্য ও বিস্ফোরণ ঘটে তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ যদি পিসফুল রিফরমেশন না হয়, যদি সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া না হয় অর্থাৎ সেলফ রিভিশন ও রিমিশন না হয় তা হলে বাংলাদেশ হয়তো মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হবে। অধিকসংখ্যক মানুষ যদি দেখে তারা যে রকম কাজ বা কষ্ট করছে কিন্তু সে রকম কিছু পাচ্ছে না, আর অল্পসংখ্যক মানুষ যদি দেখে কোনো কাজ ছাড়াই অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে, যেমন চাইলেই ব্যাংক থেকে টাকা পাচ্ছে, তা আবার দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশেও পাঠিয়ে দিতে পারছে। কর ফাঁকি দিতে পারছে, ঋণ শোধ না করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। সেই সমাজটা তো বিস্ফোরণ ছাড়া মসৃনভাবে চলার কথা নয়। বিদ্যমান রাজনীতি ও ক্রমসংকোচনশীল গণতন্ত্র অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র থাকলে অধিকাংশ মানুষ ভোট দিয়ে এমন সরকার আনত, যে সরকার লুটেরা পুঁজিবাদের প্রশ্রয় না দিয়ে জনগণের সেবাকে অধিকতর গুরুত্ব দিত। কিন্তু আমাদের দেশে যে ভোটের গণতন্ত্র ১৯৯০ সালের পরে জন্ম নিয়েছে, তার অনেক নেতিবাচক দিক রয়েছে। এর আগে ১৯৭১-৭৫ কালপর্বেও ন্যূনতম উদারনৈতিক এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল। ১৯৭৫ সালে তাকে ‘শোষিতের গণতন্ত্রে’ পরিণত করার উদ্যোগ নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে নিহত হন। আবার ১৯৭৫-৯০ কালপর্বে ছিল লেবাসি গণতন্ত্র। ৯০ এরপর কিছুদিন চালু ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র। আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দাবি করেন বর্তমানে চালু হয়েছে অনুদার বা কর্তৃত্বমূলক (Illiberal and Authoritarian) গণতন্ত্র। সব মিলিয়ে আমাদের নিছক ভোটের গণতন্ত্র ফলপ্রসু বা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এধরনের সংকুচিত ও ‘মানি’, ‘মাসল’ ও ‘ম্যানিপুলেশন’ নির্ভর ভোটের গণতন্ত্র এমনকি প্রচলিত অপেক্ষাকৃত উন্নত বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মানও অর্জনে সক্ষম নয়। কোন কোন উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বিদ্যমান এধরনের আরো সীমিত ভোটের গণতন্ত্রকে Illiberal Democracy or Authoritarian Rule বলে। অর্থাৎ এমন তথাকথিত বুর্জোয়া ‘গণতন্ত্র’ আছে যাকে ‘অনুদার গণতন্ত্র’ বা ‘কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন’ বলা হয়। এখানে যে কর্তা গণতন্ত্রের চর্চা করছেন বা যে দল গণতন্ত্রের চর্চা করছেন, সেই দল বা তিনি নিজে তার দলের ভেতর থেকেই কর্তৃত্বপরায়ণ একজন কর্তা হিসেবে নানা কারণে উঠে আসেন। তার ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের অধীনে অনেকেই আছেন। বাংলাদেশে সম্প্রতি এধরনের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হয়ে গেছে এই কারণে যে, এখানে প্রধান বিরোধী দল বা সরকারি দল উভয়ই এ দেশে কর্তৃত্বপরায়ণ দুটি দল। উভয়েই দেশে অনুদার গণতন্ত্র চালাতে ইচ্ছুক। তাই মানুষের কাছে ‘চয়েস’ হচ্ছে এই কর্তৃত্ব বা ওই কর্তৃত্ব। তাই এখানে অনুদার গণতন্ত্র স্থায়ী হয়ে গেছে। একজনের কর্তৃত্বপরায়ণ রাজত্ব যদি মানুষ অস্বীকার করে তবে আরেকজনের কর্তৃত্বপরায়ণ রাজত্ব আসে। কে এমপি পদে মনোনীত হবে, কাকে উচ্চ পদ দেওয়া হবে সব নির্ধারিত হচ্ছে অগণতান্ত্রিকভাবে, কখনো কখনো টাকা-পয়সা, স্বজনপ্রীতি ও সচরাচর শীর্ষ কর্তৃত্ব দ্বারা। তবে এই দুই দলে কর্তৃত্বে যে দুজন আছেন তাদের মধ্যে কে বেশি উদার এসব বিচার করে কখনো কখনো মানুষ একটি দলে আসে, আবার অসহ্য হয়ে গেলে আরেকটি দলে যায়। এভাবেই এতদিন চলে আসছে। ফলে ১৯৯০ সালের পর থেকে কর্তৃত্বপরায়ণ অনুদার গণতন্ত্র থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ কখনোই রক্ষা পায়নি। তবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির কৃতিত্ব হচ্ছে যে ইতোমধ্যে তারা তাদের ক্ষমতা যথেষ্ট সংহত করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন এবং বিরোধী দলের তথাকথিত কর্তৃত্বের দুই আইকন মাতা-পুত্রের ভাবমূর্তিও ধ্বংস করে দিয়েছেন। এর ফলে দ্রুত নতুন ইতিবাচক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব না হলে বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদের প্রবণতা আরো শক্তিশালী হবে। সম্প্রতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ল্যাটিন আমেরিকার ‘Banana Republic’ জাতীয় প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। কর্তৃত্বমূলক গণতন্ত্রের ট্র্যাজেডির মধ্যে থেকেই সম্প্রতি অবাধ বাজার অর্থনীতির হাত ধরে বাংলাদেশের যতটা উন্নতি হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন কিন্তু সম্ভব ছিল। এমনকি এ অবস্থায় বৈষম্যহীন উন্নয়নও সম্ভব হতে পারে যদি কঠোর রাষ্ট্রের (Hard State) কর্তৃত্ব কিছুটা আলোকিত উদ্দেশ্য অভিমুখী হয়। আমাদের সামনে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের উদাহরণ আছে। এক দলীয় রাজনৈতিক কঠোর কর্তৃত্ব যদি তথাকথিত মুক্তবাজার নীতির পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রিয় পুঁজিবাদ’ বা তথাকথিত ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তনে আগ্রহী হয়, যদি অন্ধ দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কিছুটা বিকেন্দ্রীভূত বা বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক পথে খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে অংশগ্রহণমূলক প্রবৃদ্ধির মধ্যে নিয়ে আসতে ইচ্ছুক হয় এবং সর্বোচ্চ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকটি নিজে যদি অসৎ ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়, তা হলে তা যে আপেক্ষিক ভাবে কিছুটা জনপ্রিয় ও ফলপ্রসু হয়ে উঠতে পারে তা এসব দেশের ব্যতিক্রমী উদাহরণ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। শাসক দলের কেউ যুক্তি তর্কের সময় এসব উদাহরণ উল্লেখ করেন। তারা ভুলে যান যে– হায় সেই রামও নেই (বঙ্গবন্ধু), সেই অযোধ্যাও নেই (মুক্তি যুদ্ধোত্তর সদ্য উদ্দীপ্ত বাংলাদেশ!)। চীনের শি-পিং বা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান বা মালয়েশিয়ার মাহাথিরের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তটি অনেকে এক্ষেত্রে দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে যে কর্তৃত্বপরায়ণ গণতন্ত্রের ধারা বিরাজমান তা সুশাসন ও সমতাকে একেবারে বাদ দিয়ে নিছক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কিছু পরিমাণে চরম দারিদ্র্য কমানোর দ্বারা ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন, সেটা মুশকিল। সেটা হয়তো মন্দের ভাল হিসাবে কিছুদিন পারবেন যদি দেখাতে পারেন যে, নিজস্ব কর্তৃত্বের চেয়ে অপর বিকল্পটি আরো মন্দ। কিন্তু সেটাও বড়জোড় কিছুদিনের জন্য টিকবে, দীর্ঘ দিন নয়। উন্নত অ্যান্টিবডির সন্ধানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মনস্তত্ত্বে ভোট ও গণতন্ত্র প্রীতির মাত্রা বিভিন্ন হতে পারে। শাসক কর্তৃক ম্যানেজেবল জনসংখ্যাও একেক দেশে একেকরকম হতে পারে। তাই ভিন্ন আন্তর্জাতিক পটভূমিতে চীনে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় যা সম্ভব বর্তমানে বাংলাদেশে তা সম্ভব নাও হতে পারে। মার্কোসের ফিলিপাইন সেরকম একটি ব্যর্থতার উদাহরণ। এরপরেও কেউ কেউ একসময় উত্তর কোরিয়া ও ক্যাম্বোডিয়ার একনায়কসুলভ শাসন ব্যবস্থাকেও আদর্শ হিসাবে অভিহিত করতেন। আমাদের দেশে অতীতে জেনারেল এরশাদের আমলটিও সেরকম একটি উদাহরণ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল, যদিও এখন তা অনেকে ভুলে গেছেন। তখন ড. জাফরউল্লাহ্ও সহযোগিতায আমাদের জাতীয় ঔষধ নীতি, গ্রামীণ ব্যাংক স্টাইল উন্নতি ও রাস্তাঘাটেরও প্রচুর উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু তারপরও স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতায় টিঁকতে পারেন নি। তবে এরকম ব্যবস্থা শুধু ভোট বা নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা খুবই দুরূহ। কিন্তু এরপরেও আমরা জানি যে বিদ্যমান সিস্টেমটি আভ্যন্তরীণ নানা দ্বন্দে দীর্ণ। রয়েছে ক্ষমতাসীন লুটেরাদের নিজস্ব ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব। রয়েছে সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। রয়েছে বুর্জোয়াদের বিভিন্ন অংশের দ্বন্দ্ব যদিও আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এখন এটা অনেকখানি স্তিমিত। সমগ্র সামাজিক পরিমণ্ডল জুড়ে এছাড়াও রয়েছে পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার সঙ্গে আধুনিক ধ্যানধারণার দ্বন্দ্ব। রয়েছে জনগণের সঙ্গে মাঠে ময়দানে তৃণমূলে দুর্নীতিবাজ গণশত্রুদের দ্বন্দ্ব। রয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তির দড়ি টানাটানির দ্বন্দ্ব। রয়েছে মৌলবাদী জঙ্গি শক্তি, লুটেরা বুর্জোয়া শক্তি, লিবারেল বুর্জোয়া শক্তি, বাম-প্রগতিশীল শক্তি, ধর্মীয় নানাধরনের সুবিধাবাদী সামাজিক শক্তি, এবং নানা পেটি বুর্জোয়া সুবিধাবাদী শক্তির প্রতিনিয়ত ক্ষমতাকে ঘিরে নিরন্তর এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা। এই দ্বন্দ্বগুলি সব যদি কখনো একটি বিন্দুতে আকস্মিকভাবে ঘনীভূত হয় তাহলে সেই দুর্বল গ্রন্থিতে তখন সৃষ্টি হতে পারে চরম পরিবর্তনের কোনো সুযোগ। তীব্র কোনো অর্থনৈতিক শক থেকেও এরকম ঘনীভূত সংকটের উদ্ভব হতে পারে। কিন্তু সেরকম সুযোগও কুশলী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে জনগণের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। আবার হিসাবের ভুল হলে ‘এডভেনচারে’ পা হড়কে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্পের অপমৃত্যুও হতে পারে বা সে অন্য কোনো শক্তির দ্বারা ব্যবহৃতও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বাম প্রগতিশীলদের বা জনগণের ঘাড়ে পা রেখে উপরে উঠে আসতে পারে শাসক শ্রেণির ভেতর থেকেই কোনো লৌহমানবের স্ট্র্রং স্টেট, কোনো ধর্মীয় ছদ্মবেশী একনায়ক বা নতুন কোনো সদ্য গঠিত গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক বুর্জোয়া দলের প্রতিনিধি। এদের ফলাফলে তারতম্য থাকলেও আখেরে এর কোনটির ফলাফলই জনগণের জন্য মৌলিকভাবে শুভ হবে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..