ডেঙ্গু : সাবধানতা ও করণীয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা স্বাস্থ্য ডেস্ক : বিশ্ব যখন করোনা মহামারিতে আতঙ্কিত, তখন আমাদের দেশে করোনার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ডেঙ্গির প্রকোপ। দেশে কোভিড রোগীর সংখ্যা কমলেও হাসপাতালগুলো এখন ডেঙ্গু রোগীতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গু শনাক্ত হলেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। অথচ অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা বাসাতেই সম্ভব। তবে নিচের যেকোন একটি বিপদ চিহ্ন থাকলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। বিপদ চিহ্নগুলি হলো- ১. প্রচণ্ড পেট ব্যথা ও অত্যাধিক পানি পিপাসা থাকলে। ২. ঘন ঘন বমি বা বমি বন্ধ না হলে। ৩. রক্তবমি বা কালো পায়খানা হলে। ৪. দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত হলে। ৫. ৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রস্রাব না হলে। ৬. প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হলে। ৭. ডায়রিয়া হলে এবং অত্যধিক শারীরিক দূর্বলতা অনুভব করলে। ৮. গর্ভবতী মা, নবজাতক শিশু, বয়স্ক রোগী, ডায়বেটিস ও কিডনি রোগ থাকলে। ৯. শরীর অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা হয়ে গেলে। এছাড়া আপনার চিকিৎসক যদি আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে বলে সেক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হবেন। যদি উপরের কোন বিপদ চিহ্ন না থাকে এবং রোগী মুখে পর্যাপ্ত তরল খাবার খেতে পারে সেক্ষেত্রে রোগীকে বাসায় রেখে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। বাসায় রেখে চিকিৎসাকালে রোগী পূর্ণ বিশ্রামে থাকবে। তাকে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার যেমন, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, ভাতের মাড়, স্যুপ খেতে দিতে হবে। রোগীকে প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ দেয়া যাবে না। রোগীর জ্বর কমাতে কুসুম গরম পানি দিয়ে সারা শরীর মুছে দিতে হবে। ডেঙ্গু ও করোনার একটি কমন উপসর্গ হলো জ্বর। সেক্ষেত্রে ডেঙ্গু নাকি করোনা সেটি প্রথমেই আইডেন্টিফাই করা কঠিন। তাই ডেঙ্গু রোগ বা করোনা উভয় ক্ষেত্রেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেন দ্রুত বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি আলোকপাত করতে হবে- ১. সাধারণত জ্বর হলে প্রতি কেজি ওজনের সঙ্গে দৈনিক টোটাল চাহিদার আলোকে সাত কিলো ক্যালোরি এক্সট্রাভাবে যোগ করতে হয়। তাই ডেঙ্গু হোক বা করোনা; জ্বর থাকলে ক্যালরি চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। সেক্ষেত্রে রোগী সুস্থ অবস্থায় যতটুকু খাবার গ্রহণ করতেন প্রতিবার একটু করে তার খাবারের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। খাবারগুলো একবারে না খেয়ে বারে বারে খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে খাবারের পর মিষ্টি আইটেম, ডেজার্ট বা দুধের তৈরি খাবার অল্প পরিমাণে খেতে হবে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে তা বিবেচনা করে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। ২. যদি প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যায় সেক্ষেত্রে কিছু পুষ্টি উপাদান রোগীর খাদ্য তালিকায় যোগ করতে হবে যেমন- ফোলেট সমৃদ্ধ খাবার, ভিটামিন কে, ডি, বি১২। এছাড়া আয়রন সমৃদ্ধ খাবার এবং তা শোষণের জন্য ভিটামিন সি যুক্ত করে খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। ভিটামিন-সি যেভাবে প্লাটিলেট কাউন্ট বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে সেভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে। ৩. খাদ্য তালিকায় রাখা যেতে পারে ক্লিয়ার সুপ, ফলের রস, ডাবের পানিসহ বিভিন্ন তরল খাবার। এতে ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স থাকবে। এছাড়া হজমে অসুবিধা না থাকলে, মুখে রুচি কমে গেলে প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার, দুই থেকে তিনটি খেজুর ইত্যাদি। সেরে ওঠার পর করণীয় যে কোনো রোগ থেকে সেরে ওঠার পর স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসতে কিছুটা সময় লাগে। এ সময়টায় সাবধানের সঙ্গে নিয়ম মেনে চলা উচিত। ডেঙ্গুকে ঝড় ও সাইক্লোনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ঝড় ও সাইক্লোন হলে যেমন বাড়িঘর দলিত-মথিত হয়ে যায়, ডেঙ্গু হলে শরীর ও মনে ঠিক ওই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঝড় ও সাইক্লোন শেষ হওয়ার পর যেমন করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু করতে কিছু সময় লাগে, তদ্রুপ ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পরও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু করতে খানিকটা সময় নেওয়া উচিত। ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর রোগী দুর্বল থাকে, অবসাদগ্রস্ত থাকে, মাথা হালকা থাকে, চলাফেরার সময় কিছু ভারসাম্যহীনতা থাকে, গভীর ও নিবিড়ভাবে কাজে মনোনিবেশ করা যায় না। যারা প্রফেশনাল কাজে ব্যস্ত থাকেন, তারাও জ্বর সেরে ওঠার পর গভীরভাবে কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না। ব্রেনের অ্যানালাইটিক্যাল ক্ষমতা হ্রাস পায়, তাই এ সময়ে ওই ধরনের কাজে হাত দেওয়া ঠিক নয়। বরং ওই ধরনের কাজ করতে গেলে পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে না। এক ধরনের অবসাদ ও হতাশা সৃষ্টি হবে। সপ্তাহ দু-তিনেক পর রোগীর শারীরিক ও মানসিক কাজ করার ক্ষমতা আগের মতোই ফিরে আসবে। তাই ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর শিথিলতার সঙ্গে দু-তিন সপ্তাহ কাটাতে হবে। করণীয়: যারা শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করেন, তারাও দ্রুত ওই ধরনের কাজে যাবেন না। সপ্তাহ দুয়েক শিথিলতার সঙ্গে সময় কাটান, তারপর আস্তে আস্তে নিজ কাজে হাত দেন। এ সময় পর্যায়ক্রমে চলাফেরা শুরু করুন। প্রথমে বাড়িতে চলাফেরা করুন, তারপর বাড়ির আঙিনায় যান, এর পর উপাসনালয়, বাজার, অফিস-আদালতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। অফিস-আদালতে হালকা রুটিন ওয়ার্ক করুন। এভাবে সপ্তাহ দু-তিনেক কাটান। তারপর যার যে কাজ সে কাজ শুরু করুন। স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া শুরু করুন। ডেঙ্গুর সময় রোগীরা সাধারণত তরল, নরম এবং সহজপাচ্য খাবারের ওপর নির্ভরশীল থাকে। জ্বরের সময় যে খাবারগুলো খেতে বারণ করা হয়েছে, সেগুলোকে এখনো না বলুন। আর যেগুলো খেতে বলা হয়েছে, সেগুলোকে এখনো হ্যাঁ বলুন। তরল, নরম ও সহজপাচ্য খাবার থেকে আস্তে আস্তে উঠে আসুন। তরল খাবার আগের মতো বেশি না খেয়ে কিছুটা কমিয়ে ফেলুন। ফলমূল যেভাবে বেশি করে খেয়েছেন, সেভাবে না খেয়ে স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ যেভাবে খায়, সেভাবে খেতে থাকুন। নরম খাবার, যেমন জাউভাত না খেয়ে এখন ভাত খান। তবে এ পর্যায়ে গুরুপাক খাবার, যেমন-রোস্ট, বিরিয়ানি ইত্যাদি না খেয়ে লঘুপাক বা কম মসলা দিয়ে সহজে হজম হয় এমন খাবার খান। এ সময় ভারী ব্যায়াম করা উচিত নয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আগে যদি জিমে যাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর কিছুদিন জিম থেকে দূরে থাকুন। প্রয়োজন হলে এক বা দুই মাস অপেক্ষা করুন। নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস থাকলেও এ সময় ব্যায়াম করবেন না। কারও আগে থেকেই রাত জাগার অভ্যাস থাকলে ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর এ অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পারতপক্ষে রাত ১০টার পর আর জেগে থাকবেন না। রাতের বেলায় ক্ষতিপূরণকারী কিছু হরমোন শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। দিনের বেলায় জেগে থাকার ফলে যে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়, রাতে ঘুমানোর ফলে ওই বিষাক্ত পদার্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ পরিপূর্ণ নিবিড় ঘুমের মাধ্যমে ব্রেন সতেজ হয়, মন সতেজ হয়, শরীরও সতেজ হয় এবং ক্লান্তি দূর হয়। দিনের বেলায়ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। অন্য সময় দিনের বেলায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিলেও ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর দিনে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাস করুন। দুপুরে খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক ঘুমানোর চেষ্টা করুন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..