আসছে ভয়ঙ্কর সৌরঝড় শীতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক ঃ ভয়ঙ্কর সৌরঝড় (‘সোলার স্টর্ম’) আসছে। যার ফলে ভেঙে পড়তে পারে গোটা বিশ্বের যাবতীয় ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা। আর তা বেশ কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসও স্থায়ী হতে পারে। অপরদিকে উষ্ণায়নের দৌলতে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এ বার শীত ও শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা এবং তার স্থায়িত্বও অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। আমেরিকার আরভিনে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়। গবেষণাপত্রটি পিয়ার রিভিউ পর্যায় পেরিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশের অপেক্ষায়। সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি। এই ধরনের সৌরঝড়কে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয়, ‘করোনাল মাস ইজেকশান (সিএমই)’। যা গোটা সৌরমণ্ডলের পক্ষেই হয়ে ওঠে অত্যন্ত বিপজ্জনক। গবেষকরা জানিয়েছেন, এবার যে সৌরঝড় আসছে তেমন ভয়ঙ্কর সৌরঝড়ের ঝাপটা আধুনিক পৃথিবীকে এর আগে সইতে হয়েছিল ১৮৫৯ আর ১৯২১ সালে। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, ১০০ বছর পর ফের ভয়ঙ্কর সৌরঝড়ের মুখোমুখি হতে চলেছে পৃথিবী। ১৯২১ সালে ভয়ঙ্কর সৌরঝড় আছড়ে পড়ায় পৃথিবীর যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তা অভূতপূর্ব। বিজ্ঞানের পরিভাষায় তার নাম ‘ক্যারিংটন এফেক্ট’। সেই সৌরঝড়ের ঝাপটায় পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বিশাল চৌম্বক ক্ষেত্রে বড় বড় ফাটল ধরেছিল। আর তার ফাঁক গলে ঢুকেছিল অত্যন্ত বিষাক্ত সৌরকণা আর মহাজাগতিক রশ্মি। টেলিগ্রাফের তার সশব্দে ফেটে গিয়ে দাউদাউ করে জ্বলেছিল দীর্ঘ সময় ধরে। যে মেরুজ্যোতি (‘অরোরা’) শুধু পৃথিবীর দুই মেরুতেই দেখা যায় সাধারণত, সৌরঝড়ের প্রবল ঝাপটায় সে বার তা বিষুবরেখার নীচে থাকা কলাম্বিয়াতেও দেখা গিয়েছিল। খুব উজ্জ্বল ভাবে। গবেষকরা লিখেছেন, ‘এমন ভয়ঙ্কর সৌরঝড় বা সিএমই-র পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রতি দশকে থাকে ১.৬ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ। এ বার তেমনই একটি সিএমই-র ঝাপটা সইতে হতে পারে পৃথিবীকে। যার সম্ভাবনা খুব বেশি।’ ১৮৫৯ এবং ১৯২১ সালের মতো তীব্রতায় অতটা না হলেও ১৯৮৯ সালের মার্চে যে সিএমই ধেয়ে এসেছিল পৃথিবীর দিকে তার ঝাপ্টায় কানাডার গোটা কুইবেক প্রদেশে টানা ন’ঘণ্টা ‘ব্ল্যাক আউট’ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর চারপাশে থাকা শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রই সৌরঝড়-সহ সূর্য থেকে ছুটে আসা নানা ধরনের হানাদারের হাত থেকে আমাদের বাঁচায়। দুই মেরুতে চৌম্বকক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী থাকে বলে সৌরকণারা ধেয়ে এলে তাদের বেশির ভাগকেই ফিরিয়ে দেয় দুই মেরুর চৌম্বকক্ষেত্র। সেই সংঘর্ষেই মেরুজ্যোতির জন্ম হয়। পৃথিবীসহ সৌরজগতের সব গ্রহের দিকেই ধেয়ে যায় এই সৌরঝড়। যে গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র প্রায় নেই বা খুব পাতলা, নেই বায়ুমণ্ডলও- সেই গ্রহকে এই ঝাপ্টা বেশি সহ্য করতে হয়। তাই কোনোকালে মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হলেও সেখানে তা টিকে থাকতে পারেনি। তার চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রায় নেই বলে। বায়ুমণ্ডলও খুব পাতলা বলে। মূল গবেষক, আরভিনের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঙ্গীতা আবদু জ্যোতি বলেছেন, ‘যেটা সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় তা হল, আমরা অতিমারির জন্য যেমন আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না এক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটার আশঙ্কা। কারণ, সূর্যের বায়ুমণ্ডলে (করোনা) কখন ভয়ঙ্কর সৌরঝড় উঠবে তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় এখনও। তবে এটুকু বলা যায়, সেই ভয়ঙ্কর সৌরঝড়ের পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে অন্তত ১৩ ঘণ্টা সময় লাগবে।’ গবেষণাপত্রটিতে বলা হয়েছে, আধুনিক ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থার উপর এ বারের সিএমই-র আঘাত কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে কোনও তথ্যাদি বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। কারণ, এর আগে যখন (১৯২১) এমন ভয়ঙ্কর সিএমই পৃথিবীর উপর এসে আছড়ে পড়েছিল তখন পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি। গবেষকদের আশঙ্কা, এবার যে ভয়ঙ্কর সিএমই আসছে পৃথিবীর দিকে তার ঝাপ্টায় সমুদ্রের নীচ দিয়ে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে যাওয়া ইন্টারনেটের যাবতীয় কেবলই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বার্তার গতি বাড়াতে এই ইন্টারনেট কবেলগুলিতে ৩০ থেকে ৯০ মাইল অন্তর বসানো থাকে ‘রিপিটার’। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র স্বাভাবিক না থাকলে যেগুলি বিগড়ে যায়। একটি রিপিটার ক্ষতিগ্রস্ত হলেই ভেঙে পড়ে সেই লাইনের যাবতীয় যোগাযোগব্যবস্থা। দেশের মধ্যে ইন্টারনেট যোগাযোগের কেবলগুলির মতো সমুদ্রের নীচে থাকা এই কেবলগুলি ফাইবার দিয়ে বানানো হয় না। তাই সেগুলির নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। এদিকে অপর এক গবেষণায় এবার শীতে ভয়ঙ্কর শৈত্যপ্রবাহ, তুষারপাত, তুষারঝড় হতে পারে বলে অশনিসঙ্কেত দেখা গেছে। এই অশনিসঙ্কেতের কথা জানিয়েছে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স। এবার শীত পড়তে পারে জাঁকিয়ে। অনেকটাই বাড়তে পারে শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা। তা আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে চলতে পারে। হতে পারে ঘনঘনও। বাড়বে তুষারপাত, তুষারঝড়ও। মাত্রায়, ঘটনার সংখ্যায়। বাংলাদেশসহ গােটা উত্তর গোলার্ধে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি জানিয়েছে, উষ্ণায়নের জন্য যেমন ভয়ঙ্কর তাপপ্রবাহের মাত্রা ও ঘটনার সংখ্যা এবং ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে, তেমনই চরম শীত, শৈত্যপ্রবাহ, অতি তুষারপাতের ঘটনা এ বছর অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে এশিয়া, কানাডা ও উত্তর আমেরিকায়। কেন এ বার শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা ও ঘটনার সংখ্যা উত্তর গোলার্ধে অনেকটা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, গবেষণাপত্রে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, এর মূল কারণ উত্তর মেরুর জলবায়ুর অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তন। সেই সঙ্গে উত্তর মেরুর উপর বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতির খুব দ্রুত পরিবর্তন। উত্তর মেরুর বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে (‘স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার’) অল্প জায়গার মধ্যে এমন এক ধরনের বায়ু চলাচল করে, যা ঘোরে লাট্টুর মতো বনবন করে। আবহবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘আর্কটিক স্ট্র্যাটোস্ফেরিক পোলার ভর্টেক্স’। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই পোলার ভর্টেক্সটির এলাকা খুব দ্রুত প্রসারিত হয়েছে, হয়ে চলেছে। উষ্ণায়নের দৌলতে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই এটা হয়েেছ। এর ফলেই উত্তর আমেরিকা ও কানাডা তো বটেই, গোটা এশিয়াতেও এ বছরের শীতকালে শীতলতা ও শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা ও তার স্থায়িত্বও অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। বাড়তে পারে তুষারপাত, তুষারঝড়ও। মাত্রায়, ঘটনার সংখ্যায়। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও শৈত্যপ্রবাহের ঘটনা কী ভাবে বাড়তে পারে উষ্ণায়নের জন্য? বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য অন্যতম গবেষক ম্যাসাচুসেট্স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-এর অধ্যাপক জুডা কোহেন একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। কিছুটা উষ্ণ এলাকা বলে যার পরিচিতি আমেরিকায়, সেই টেক্সাসে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভয়াবহ তুষারঝড়ের ঘটনা ঘটেছিল। তা অনেক দিন স্থায়ীও হয়েছিল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..