হে যুবক, আপনার ভবিতব্য আপনাকে ডাক দিচ্ছে

হাবীব ইমন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এক. দেশে করোনা মহামারির সময় চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন- এই পাঁচ ধরনের অপরাধ বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া ২০২০ সালের সারা দেশের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ চিত্র সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় খুন ও মাদকের ঘটনাও কম নয়। দেশে আজ ফ্রি স্টাইল চলবার নীতি অনুসরণ হচ্ছে। ফলে ‘আইনবিহীন আইন’ এবং ‘পরিকল্পনাবিহীন অর্থনীতি’ চালু আছে। জাতির কর্ণধারেরা বিভিন্ন মাধ্যমে এটা প্রচার করছে, ‘আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছি, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে’। —এইসব উক্তি দলকানাদের কাছ থেকে বাহবা মিলছে, দেশের মানুষের কাছে অর্থবহ না হলেও বিবেকবান মানুষের কাছে উদ্বেগের। উন্নয়নের জোয়ারটা এমনই, চোরেরা ডাকাত হলো, ডাকাতেরা লুটেরা হলো, ওদের গ্রেড বদলালো। আর আদার বেপারিরা জেনারেল মার্চেন্টে পরিণত হলো। সামাজিক সুনীতি ভেঙে অবক্ষয়ের মহাসড়কে আমরা হাঁটছি। গ্যাসের মূল্য, বিদ্যুতের মূল্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে হিমশিম খাচ্ছে এদেশের ৯৯ ভাগ মানুষ। এই চিত্রটি আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরা কোন অচলায়তন সমাজ এবং রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে আছি। এটাই সমাজ ও রাষ্ট্রের সেই চিত্র, যেখানে সুস্থির চিন্তা এবং বোধের কোনো জায়গা নেই। স্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিকহারে হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু বেশ লম্বা হচ্ছে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল। যতোটুকু গণতান্ত্রিক চর্চার জনবলয় গড়ে উঠেছিল, ডিজিটাল ৫৭ ও ৩২ ধারা দিয়ে সেগুলোও ভেঙে ফেলা হচ্ছে। দুই. ক্রমশ এখন আমরা আত্মসুখসর্বস্ব হয়ে উঠেছি। আমরা আমাদের বিবেককে নিকোটিনের কালো ধোঁয়ায় বিষাক্ত করে তুলেছি। এ যেন নিরাময় অযোগ্য-অসুখের প্রকোপ। তাই তো কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম আমাদেরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না। আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে সীসার ধোঁয়া। আমাদের সামনে এতো এতো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, আমাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আওয়াজটা খুব ছোট হয়ে আসছে। খুব ক্ষীণ। এগুলো কোনোটাই কাক্সিক্ষত নয়। কিছুই এখন আর আমাদের এসবে যায়-আসে না। আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে নানানমাত্রিক ঝঞ্জাটমুক্ত বিলাসী আলাপনে কিংবা জীবন-যাপনে। বাসে কিংবা চায়ের কাপে ঠিকই আমরা ঝড় তুলছি। কিন্তু ওখান পর্যন্তই। সাথে ভয় আর ভীতির আর্তনাদও এতোটা, আমরা ওই সংস্কৃতির ভেতরে আটকা পড়ছি। মিটিং-মিছিলে যাওয়াটা কিংবা আওয়াজ তুলে প্রতিবাদ জানানোটা এখন ‘ঝামেলা’ মনে হয়। এটাই হয়তো পুঁজিবাদে এখনকার বাস্তবতা। এ বাস্তবতার ভেতরে আমরা সবাই পড়ে গেছি। এটা একটা চক্রব্যুহ। ক্ষমতার চক্রব্যুহ। ত্রিমাত্রিক শক্তিতে এটা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। তারই ফল সর্বোভূক বিভিন্ন প্রবণতা। এখান থেকে বের হতে সময় লাগবে। তবে হতাশা বা নৈরাশ্যের কিছু নয়। আমি আশাবাদী আছি, থাকতে চাই। আসুন, আমরা সবাই মিলে সবকিছুর উর্ধ্বে রেখে ভালো কিছু করার চেষ্টা করি। যা কিছু মঙ্গল, তার সঙ্গে লড়াই করি। সংগ্রাম করি। কোনো লড়াই বা সংগ্রামের ফলাফল বৃথা যায় না। এটাও ঠিক, রাজনীতি চর্চা না থাকলে ক্ষমতাচর্চা কখনো কখনো ব্যক্তিকে অ্যাবসর্ব করে ফেলে। ব্যক্তির তার নিজের ভেতরে ‘কল্পরাজ্য’ তৈরি করে। তিন. অর্থব্যবস্থার গতি স্তব্ধ হলে মানুষ কাজ খোয়াবে, বাজার ব্যবস্থায় তা অনেকটা স্বতঃসিদ্ধ। আমাদের দেশে সেই ঘটনাই ঘটেছে। সমাজের নি¤œবিত্ত, মধ্যবিত্ত হিসেবে যারা নিজেদের দাবি করেন, তাদের অনেকেই আয়ের পথ হারিয়েছেন। কাজ হারিয়েছেন। দীর্ঘকাল যাপন করতে হবে দুঃসহ জীবন। এসবতো বাস্তবতা। পুঁজিবাজার অর্থনীতির অতিমারির বাস্তবতা। যতো কঠিনই হোক তা মোকাবেলা করতে হবে। আগেই কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাসের শ্লথগতি, আমদানি-রপ্তানি হ্রাস ও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতির চিহ্ন ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মী কাজ হারিয়েছেন। অনেকে নতুন করে হয়েছেন কর্মহীন। অনেকে কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ অবস্থায় বেকারের তালিকা আরও দীর্ঘ হবে। কর্মহীন নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। কাজে ফিরতে না পারা এসব মানুষ আরো দারিদ্র্যতার শিকার হচ্ছেন। বেঁচে থাকার তাগিদে ঋণগ্রস্ত হচ্ছে অনেকে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অর্থনীতিতে এক ধরনের দুষ্টচক্র সৃষ্টি হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রায় সব চাকরির পরীক্ষাই আটকে গেছে। সরকারি চাকরির ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫১টি পদ শূন্য আছে বলে ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বরে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন। অনেকেই আছেন, যাদের চাকরিতে প্রবেশের বয়স আর বেশিদিন নেই। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ থাকলে সমাজে যে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম। প্রথম আলো একটি তারুণ্য জরিপে জীবনের লক্ষ্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তাদের বেশি উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণরাই এসব নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকেন। এই উদ্বেগের পেছনে কারণ হচ্ছে, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা। একটি কথা স্পষ্টভাবে বুঝে নেয়া জরুরি। যতোগুলো বিপন্নতার সম্মুখীন, তার কার্যত সবগুলোর মূলে রয়েছে একটিই কারণ—নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের কী কর্তব্য, সে বিষয়ে দেশের সরকার গা-ছাড়া। তারা ছোটো লাভ-ক্ষতির অংকের বাহিরে দেখতে অক্ষম। কিন্তু, তারাই যখন ক্ষমতায়, তখন তাদের কর্তব্যগুলোর কথা স্মরণ না করালেও নয়। এই মুহূর্তে কর্তব্য মানুষের বোঝা লাঘব করা। যারা কাজ খোয়াচ্ছেন, এই মুহূর্তে তাদের জন্য বেকার ভাতার ব্যবস্থা করবার কথা ভাবা যেতে পারে। করোনায় বিদ্যমান শ্রমবাজারের সংকট নিয়ে একটি কর্মসংস্থান কমিশন গঠন করা যেতে পারে। ওই কমিশন বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঢেলে সাজানো এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা। চার. বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরুনো আমাদের পথচলা। আমাদের পথচলা কোথাও মসৃণ না। নানা সংকট, নানা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে আমরা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি। একজন ব্যক্তি সৃষ্টির অন্তর্লোকে প্রথমত নিজেকে সংগঠিত করে। এই গঠন সমাজের অপরাপর ভাব-বস্তুর ভেতর দিয়ে নিজেকে সংগঠিত করা। দ্বিতীয়ত কাজ হলো, সংগঠনের ভিত দিয়ে চেতনাগত জায়গায় সমাজ-মানুষ-প্রকৃতিকে সম্পৃক্ত করা। মনে রাখা দরকার, প্রকৃতি নিজেই সংগঠন। এ মনোবল, এ শক্তি ও সাহস নিয়ে আমরা পারবো। তরুণরা পারে, যুবকরা পারে—বহুবার এটা প্রমাণিত, স্বীকৃত। আমাদের বোধশক্তি একটি চেতনাগত সংগঠনের ভেতর প্রবেশ করে। কেননা ভাষা-চিন্তা-দর্শন-শ্রেণিগত রুচি মিলেই একটি চেতনাগত সংগঠন সৃষ্টি করে। চেতনা কোন স্থির ধারণা নয়, চলমান। সৃষ্টির ভেতর দিয়ে চলমান চেতনাগত জায়গায় মানুষ স্বপ্ন-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। এবং ঘটায়। যুবকরা এই ক্ষেত্রে সমাজের অন্তর্গত আর উপরি-কাঠামোর কাজ করে। মানুষকে জাগায়, জাগাতে অনুপ্রাণিত করে। স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথ দেখায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন সৃষ্টিযজ্ঞে যুব সংগঠনের ভূমিকা কি? এখন আপনি-আমি কতটা প্রস্তুত সেটাই প্রশ্ন। যারা মনে করি একটা পরিবর্তন চাই, ব্যবস্থা বদলাতে চাই, এ রাষ্ট্রের গুণগত মান চাই, সাম্যের সমাজ চাই, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা সেই চেষ্টাটা করি সর্বাত্মক। নিশ্চয় সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে এদেশের যুবকরা বুকে তাজা রক্ত ঢেলে যখন একটা লাল-সবুজ মানচিত্র বানিয়ে ফেললো, তখন আমরাও পারবো। আমাদের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও ইতিহাস। সে ইতিহাস সংগ্রামের, এবং রক্তক্ষয়ী। আমাদের দেশ ও জাতির উত্থান-পতন ও উত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইতিহাসের দিকে আরেকটু চোখ ফেরালে দেখা যাবে, গত শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে স্বাধীনতাকামী মানুষের জাগরণ আর ফ্যাসিবাদী শাসন কাঠামোর বিপরীতে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্থান। অনস্বীকার্য আজ, মুক্তিকামী মানুষের জাগরণের পেছনে চেতনাগত সংগঠনের কাজটি সুচারু করেছিলো বিভিন্নশ্রেণি-পেশার যুবকরাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানবিকতার স্লোগান আর উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পেছনে স্বাধীনতাকামী মানুষের চেতনাগত পাটাতন নির্মাণেও যুবকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। পাঁচ. কোনো সংগঠনই আদর্শ বিচ্যুত কিংবা ‘ম্যানিপুলেট পলিটিক্যাল’ হয়ে টিকে থাকতে পারেনি। অনেক দৃষ্টান্ত আছে। সেদিকে যাবো না। তবে আদর্শচ্যুতিতে সবচে’ বড় বিভেদ ঘটে নেতৃত্বের চেতনাগত জায়গায়। যার ফলে লক্ষ্য আর আদর্শ ওখানে স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু নানা বৈচিত্র্যের সামগ্রিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের চিন্তার সম্মিলিত রূপ আদর্শকে আরো বেশি সংগঠিত করতে পারে। একটি উদাহরণ দিলে সেটা স্পষ্ট হবে, একক ফুলের বাগান থেকে কোন বাগানে যদি নানান জাতের বৈচিত্র্য ফুলের সমাহার ঘটে, সেটা নানাভাবে সৌন্দর্যকে ঋদ্ধ করে। কারণ বাগানকে আদর্শ হিসেবে নিলে, নানা ফুলের ভেতর আমরা সৌন্দর্য চেতনার সম্মিলন হিসেবে দেখতে পাবো। চেতনার এই সম্মিলন সমাজ বদলের প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। এই সম্মিলন অতীতে করেছে—বর্তমানে করেছে, ভবিষ্যতেও করবে নিশ্চয়। যুববসমাজ শুনলে অনেকে উচ্ছন্নে যাওয়া অপসংস্কৃতিমনস্ক একদল ছেলেমেয়ের কথা বলবে। যুবকদের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও অনেকের কাছে এমনটাই। কিন্তু প্রকৃত চিত্র কি সত্যিই তাই? তা হলে কি আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ উন্নতির ইঁদুর দৌড়ে লড়াই করতে পারতো? লড়াকু এই মানসিকতা, এই সাহস কি সকলের থাকে? সেই বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য্য, নতুন চিন্তাধারার রসদ কিন্তু থাকে প্রকৃত অর্থে যুবকদের কাছেই। কাজেই যুবসমাজের ভাবমূর্তি সাময়িকভাবে বিকৃত হলেও তা আসলে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে সৃষ্ট এক ধারণামাত্র। সমাজের ভাবমূর্তি তৈয়ারে যুবকদের অবদান সর্বাধিক। ছয়. ‘আমরা মনে করিতে পারি যে, তরুণদের রচিত যে-কোনো প্রতিষ্ঠান—যেমন সেবাসমিতি, যুবক সমিতি বা তরুণসংঘ আখ্যা পাইবার যোগ্য, কিন্তু এ ধারণা ভ্রান্ত। যে প্রতিষ্ঠান বা আন্দোলনের মূলে স্বাধীন চিন্তা ও নূতন প্রেরণা নাই সে প্রতিষ্ঠান বা আন্দোলন তরুণের আন্দোলন বলিয়া অভিহিত হইতে পারে না। তরুণ প্রাণের লক্ষণ কি?—লক্ষণ এই যে, সে বর্তমানকে বা বাস্তবকে অখণ্ড সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে পারে না, সে বন্ধনের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিতে চায় এবং সে আনিতে চায় ধ্বংসের মহাশ্মশানের বুকে সৃষ্টির অবিরাম তা-ব নৃত্য। ধ্বংস ও সৃষ্টির লীলার মধ্যে যে আত্মহারা হইতে পারে একমাত্র সেই ব্যক্তিই তরুণ। তারুণ্য যার আছে সে ধ্বংস ও সংগ্রামের ছায়া দর্শনে ভীত হয় না অথবা নব-সৃষ্টিরূপ কার্যে অপারগ হয় না।’ : সুভাষচন্দ্র বসু, তরুণ প্রাণের লক্ষণ। যে যুবশক্তি আত্মবিস্মৃত ছিলো, কলুর বলদের মতো কষাঘাত খেয়ে এ শক্তি নিস্প্রভ থাকলে চলবে না। যুবসমাজের সেই শক্তি, সেই দৃঢ়তা আছে যাতে তারা মতামত গঠন করতে পারে। উচ্চকণ্ঠে দাবি জানাতে পারে। যুক্তির দ্বারা মত প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাদের দ্বারা বহু অসাধ্য সাধনই সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের কাজ কী? যুবকদের দায় কী? যুবকদের জন্য কী আমরা কোনো স্বপ্ন তৈয়ার করতে পারছি? আরো অনেক প্রশ্ন আছে, সেসব প্রশ নৈব্যত্তিক হলেও গুরুত্ব অনেক। সত্যি কথা বলতে কী, প্রথাগত বা গৎবাধা কিছু ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত চলছি। যারা অসংগঠিত ও ছন্নছাড়া যুবক রয়েছে, তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারলে নিশ্চয়ই তাদের পথ পরিবর্তন হবে। যে রাষ্ট্রে বা সমাজে নেতৃত্বের অযোগ্যতার জন্য সমাজ ও জাতির দুর্গতি সংঘটিত হয়েছে, সেখানে যুব সমাজ বিদ্রোহী হয়েছে, এটা ইতিহাসের কথা। সাত. যুবকদের কাজ মানুষের সঙ্গে থাকা। মানুষের অধিকার, মুক্তির আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্নের ভেতর থাকা, নিজের অধিকার সুনিশ্চিত করা। পুঁজিবাদের চেহারা আজ যেমন-তেমনই হোক, তেমনি ভোরের লাল টুকটুকে সূর্যে প্রভা জ্বলে উঠছে ভবিষ্যতের আকাশে। জাস্ট বিবেকের আস্তিনটা খুলে ফেলুন। যুবকদের আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। কেউ কেউ বলেন যুব-আন্দোলন রাষ্ট্রনীতির আন্দোলন নয়, এটা একধরনের ভ্রান্ত কথা, রাজনীতি-বর্জন করা এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়। এই আন্দোলনে রাষ্ট্রনীতির স্থান আছে, যেমন জাতীয় আন্দোলনেরও রাষ্ট্রনীতির স্থান আছে। বিপ্লবী চে-কে শুধু টিশার্টে প্রদর্শনী আইকন নয়, বাস্তব জীবনে প্রকৃত আইডল হিসেবে এগিয়ে চলি। অন্তত ইন্দ্রিয় শক্তি বা বোধ এতটুকু স্বাক্ষ্য দেয়, আমরা চেতনায় সংগঠিত। আদর্শের দৃঢ়তায় অটল। সংগঠিত জায়গাটা আরো সুসংবদ্ধ করতে হবে। আদৌ সংগঠিত কিনা, সেই প্রশ্ন হয়তো বিজ্ঞজনেরা করতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি, ভূঁইফোঁড় এবং ক্ষণস্থায়ী কাজে মনোযোগ না দিয়ে, যতোটুকু শক্তি ও সামর্থ্য রয়েছে, সেখান থেকেকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে মৌলিক-প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদীকার্যকর আন্দোলনের পথে অগ্রসর হতে হবে। আমাদের লড়াইটা তীব্র। সংগ্রামটা জোরালো। সেজন্য আমাদের অনুশীলন, বিজ্ঞান চর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পাঠ ও প্রয়োগের সর্বোচ্চ উপাদান সৃষ্টি করতে হবে। পথের সঙ্গীকে যেমন চিনে নিতে হয়, তেমনি মত ও পথে স্বাতন্ত্র্যবোধে ঐক্য থাকতে হয়। অধ্যাপক আহমদ শরীফের ভাষ্যে, এদেশটাকে যদি একটা যাত্রীবোঝাই হাল-পালহীন নৌকোর সঙ্গে তুলনা করা যায়, তা হলে এ বিপন্ন জীবন ও দেশ রক্ষার জন্য আজকে কে ধরবে হাল, কে উড়াবে পাল, কে টানবে দাঁড়, কে বাঁচাবে তরী?’ সুপরিকল্পিত মাকর্সীয় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার আদর্শ-উদ্দেশ্যে সেক্যুলার যুবকদের তৈরি করে দেশের মানুষের মনে উন্নততর ভবিষ্যত সম্পর্কে আশা ও আশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত বিজয় ঠেকায় কে? চান বা না চান- আপনার ভবিতব্য আপনাকে ডাক দিয়েছে। লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..