কমিউনিস্ট পার্টির নারী সেল ও প্রাসঙ্গিকতা

মৃণাল চৌধুরী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রামের কমিউনিস্ট পার্টি কার্যালয়ে নারীমুক্তি আন্দোলন ও নারী সেল সম্পর্কে কথা হচ্ছিল। কেউ কেউ কমিউনিস্ট পার্টির নারী সেল সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। প্রশ্নগুলি হলো- (১) নারী গণসংগঠন যেহেতু আছে সেখানে আলাদাভাবে নারী সেলের প্রয়োজনীয়তা কী? (২) নারী শাখা থাকলেই তো যথেষ্ট- নারী সেলের প্রয়োজনীয়তা কেন? (৩) শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা নারী-পুরুষ সহশিক্ষার পক্ষে, সেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে আলাদা নারী সেল কেন? (৪) নারী দিবস কেন? তাহলে তো পুরুষ দিবস বা মানুষ দিবসও পালন করা উচিৎ। নারী সেল ও নারী শাখার পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে একজন তো বিজ্ঞতার সাথে বললেন- “নারী শাখা করবে উৎপাদন আরী নারী সেল করবে প্রদর্শন”। (৫) নারী সেলের সাফল্য কী? পার্টি দলিল, পার্টির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এতো অনীহা, এতো বিভ্রান্তি বা এতো প্রশ্ন যদি কমরেডদের মধ্যে থাকে, তাহলে তো পার্টির কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হবার নয়। পার্টি সিদ্ধান্ত পার্টির যে কোনো স্তরের সদস্যদের জানার যেমন অধিকার থাকে, তেমনই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পার্টির সকল স্তরের নেতা ও সদস্যদের দায়িত্ব রয়েছে। সিদ্ধান্তের তাৎপর্য, বাস্তবতা ও লক্ষ্য সম্পর্কে সকল স্তরের সদস্যদের জানানোর যেমন তাগিত থাকতে হয়, তেমনই পার্টির সিদ্ধান্ত প্রত্যেক সদস্যের নিজ উদ্যোগেও জেনে নেয়া উচিত। নয়তো: সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ তো থাকেই না বরং ক্ষেত্র বিশেষে বিরোধিতাই বাড়ে। নারী দিবসের মূল স্লোগান হলো “নারী মুক্তি”। পুঁজিবাদী সমাজে পুরুষ শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের লড়াই হলো পুঁজিবাদী শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। নারীর সংগ্রাম পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তো বটেই, অধিকন্তু তার সংগ্রাম পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেও। এন.জি.ও’রা নারী দিবসের মূল স্লোগান নারীমুক্তির স্লোগানকে ছিনতাই করে নারী দিবসকে উৎসবে দিবসে পরিণত করেছে। তারা নারীমুক্তির লড়াইকে আড়াল করতে চায়। শুধু নারী দিবসের স্লোগান নয়, ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে রক্তেরাঙ্গা মহান মে দিবসের শ্রম দাসত্ব থেকে মুক্তির স্লোগানও। শোষক-শাসক সমর্থিত শ্রমিক ও এন.জি.ও কর্মীরা মে দিবসের রক্ত রঞ্জিত লাল পতাকা হাতে নিয়ে শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে স্লোগান না দিয়ে স্লোগান দিচ্ছে- “মে দিবসের মর্মবাণী- মালিক শ্রমিক ঐক্য জানি”। শোষক বুর্জোয়া সরকারের মন্ত্রী ও দলীয় নেতারা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কথা বলে না- বরং উৎপাদন বাড়ানোর হিতোপদেশ প্রদান করে। এখন ছিনতাইয়ের যুগ। ইতোমধ্যে ছিনতাই হয়ে গেছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি। অথচ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী লুটেরা পুঁজির সেবাদাসেরা দাবি করে- তারাই মুক্তিযুদ্ধের চ্যাম্পিয়ন। আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে-আমরা যেন নারী দিবস, মে দিবসকে বার্থডে’তে পরিণত না করি। কমিউনিস্ট পার্টির নারী সংগঠন থাকতে নারী সেল কেন? কমিউনিস্টরা মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ তথা সমাজ বিপ্লব করার জন্যই গণসংগঠন করে। গণসংগঠন হলো পার্টির সাথে পার্টি বহির্ভূত গণমানুষের সংযোগ সেতু। বুর্জোয়া গণসংগঠন ও কমিউনিস্ট গণসংগঠন এক নয়। পার্টি সংগঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও গণসংগঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্যও অভিন্ন। নারী চায় নারীমুক্তি। প্রত্যেক গণসংগঠন আশু দাবি নিয়ে লড়াই করে সাথে সাথে ভবিষ্যতে মুক্তির লড়াইয়ের জন্য জনগণকে সংগঠিত ও সচেতন করে। গণসংগঠনগুলির মুক্তির স্লোগানের কোনটি সমাজ বিপ্লব সম্পন্ন করা ছাড়া সম্ভব নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিকে নারীমুক্তি বলা যাবে না। পাখি সোনার খাঁচায় থাকলেও বন্দি, বাঁশের খাঁচায় থাকলেও বন্দি। কমিউনিস্টরা গণসংগঠনে কাজ করে মুক্ত মনের বাহক হিসাবে লড়াই করতে শেখায়। “এ লড়াই পুঁজিবাদী শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তো বটেই, এছাড়া এ লড়াইয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাদী সমাজের একজন মানুষকে মুক্ত মনের মুক্ত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলে। কমিউনিস্টদের শ্রমে ঘামে গড়ে উঠা গণসংগঠনগুলি সম্পর্কে পার্টিকে সময়ে সময়ে মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিগত একাদশ কংগ্রেসে নারী গণসংগঠন সম্পর্কে পার্টির মূল্যায়ন হলো- “নারী গণসংগঠন দেশের সর্ববৃহৎ নারী সংগঠন”। দুঃখের বিষয় নারী আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী লড়াকু এই সংগঠনটি এখন এন.জি.ও’র প্রকল্পভিত্তিক কাজ করছে। নির্যাতিত নারীদের আইনগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সংগঠনটি দিন দিন নারী মুক্তির লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। সংগঠনটিতে অর্থ বরাদ্ধের কারণে জেলাগুলি কেন্দ্রনির্ভর হয়ে পড়েছে। কাজকর্ম মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কতিপয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপের কারনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। কংগ্রেসের পরে পার্টি উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, সংগঠনটিতে কমিউনিস্ট বিরোধিতা বেড়েছে। কেন্দ্রের গোপন নির্দেশনাও তাই। পার্টির নারী শাখা এবং নারী সেল দুটি ভিন্ন সাংগঠনিক বিধিবিধান। শাখা পার্টির গঠনতন্ত্রের বিষয় আর নারীসেল হলো কেন্দ্রীয় কমিটির কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের একটি। পার্টির শাখা হলো পার্টির বুনিয়াদী প্রাথমিক সংস্থা। কল-কারখানা, প্রতিষ্ঠান, বাগান, খামার, গ্রাম এলাকা, অঞ্চল, মহল্লার পার্টি সদস্য ও প্রার্থী সদস্যদের সমন্বয়ে পার্টি শাখা গঠিত হয়। শাখা সদস্যদের সুনির্দিষ্ট জায়গায় সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়। যদি কোনো জেলায় তিন জন বা কয়েকজন মাত্র পার্টি সদস্য থাকে তাহলে তাদের নিয়ে পার্টির একটি শাখা করা যায়। তাকে জেলা কমিটি বলা চলে না। জেলা কমিটি গঠন করতে হলে কয়েকটি শাখা থাকতে হবে। শাখার শেকড় গভীর থেকে গভীরে যায়। জেলা শাখার সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে উপজেলা-থানা, এলাকা, গ্রাম, মহল্লা, কারখানা এমনকি পাড়া বা কারখানার সেকশন ভিত্তিতেও শাখা গঠন করা যায়। যে জেলায় অনেক নারী সদস্য বিভিন্ন উপজেলা বা অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে তাদেরকে নিজ নিজ এলাকাতেই সংগঠিত হতে হবে। কোন এলাকায় তিন জন বা ততোধিক নারী সদস্য থাকলে সেখানে প্রয়োজন মনে করলে নারী শাখা গঠন করা যায়। কিন্তু অনেক সদস্য থেকে কয়েকজনকে বাছাই করে শাখা গঠন করার সুযোগ গঠনতান্ত্রিকভাবে নেই। তাই অনেক জন থেকে কয়েকজনকে বাছাই করে নারী সেল গঠন করার সিদ্ধান্ত পার্টি গঠন করেছে। নারী সেল কেন? কমিউনিস্ট পার্টির তিনটি সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। (১) কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমজীবী মানুষের বিপ্লবী রাজনৈতিক দল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পার্টিতে শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম। (২) বিপ্লবী কর্মকাণ্ড অগ্রসর করতে হলে যে যুব শক্তির প্রয়োজন তাও পার্টিতে কমে গেছে। (৩) সমাজের অর্ধেক অংশ নারী। মানব ইতিহাসে যে দিন থেকে শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থা শুরু হয় সেদিন থেকে নারী শোষণ শুরু হয় এবং নারী হয় গৃহবন্দি। সমাজের অর্ধেক নারী শক্তিকে বাদ দিয়ে সমাজ বিপ্লব সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তি বৃদ্ধি করাই পার্টির লক্ষ্য। দুর্বলতা কাটানোর জন্য পার্টিতে কেন্দ্রীয় কমিটি নারী সেল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে নারী সমাজের মধ্যে পার্টির কাজ বিপুলভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি সাহসের সাথে দায়িত্বে ও নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। শুধু কেন্দ্র নয়, এ কাজটি জেলা উপজেলা এমনকি শাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নারী গণসংগঠনের সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা, লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে বিচ্যুতি, কমিউনিস্ট বিরোধিতা ইত্যাদি বিষয়ে পূর্বেই বলা হয়েছে। তাই নারী সমাজের মধ্যে বিভিন্নভাবে কাজ করার জন্য গণসংগঠনের বাইরে গঠন করা হয়েছে নারী সেল। বুর্জোয়া ধারার নারী আন্দোলন নয়। পার্টির লক্ষ্য নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে নারীমুক্তি তথা মানব মুক্তির লক্ষ্যে নারীদের সংগঠিত করার কাজটিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা। আমাদের নারী সদস্যদের মধ্যে শ্রমিক, কৃষাণী, ছাত্রী, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী এমনকি গৃহিণীও রয়েছে। তাদের এবং বিভিন্ন গণসংগঠনে তৎপর নারী কর্মীদের নারীমুক্তি আন্দোলনের সাথে যুক্ত করাই নারী সেলের কাজ। নারীসেল গঠন করা হয়েছে প্রায় ১০/১১ বৎসর হয়ে গেল। কিন্তু কাক্সিক্ষত অগ্রগতি কেন হচ্ছে না? এ প্রশ্ন অত্যন্ত যৌক্তিক ও জরুরি। এ দুর্বলতা কেবল নারী সেলের নয়। এ দুর্বলতা সমগ্র পার্টির। পার্টির রাজনৈতিক প্রত্যাশার সাথে সাংগঠনিক শক্তির রয়েছে বিশাল গ্যাপ। সাংগঠনিক শক্তি কাগজে কলমে যা আছে ততটুকু সক্রিয় নয়। পার্টির সাংগঠনিক সক্রিয়তা যতটুকু তার সাথে ফারাক রয়েছে কমিউনিস্ট গুণাবলি ও নৈতিকতার। কমিউনিস্ট পার্টি গাছ বড়-ফল কম। সে আলোচনা অনেক দীর্ঘ। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কালো ছায়া আমাদের পার্টিতেও নেই বলা যাবে না। এটাও নারী সেলের অগ্রগতির জন্য বাধা। সমাজের অর্ধেক নারীকে নারীমুক্তি আন্দোলনে টেনে আনা বা পার্টিমুখী করার যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়েও নেই। ভাবতে অবাক লাগে বারবার কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও এমন অনেক জেলা রয়েছে যে তাদের একজনও নারী সদস্য নেই। নারী সেল গঠন পর্যায়ের শুরুতে তার প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ করে পার্টি সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছিলেন- ‘যে সমস্ত জেলায় নারী সদস্য নেই সে সমস্ত জেলায় পুরুষ সদস্যদের দায়িত্ব দিয়ে নারী সেল গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে’। মূল কথা হলো আমাদের শ্রমে, ঘামে ও ত্যাগে যে পার্টিটি আমরা গড়ে তুলেছি সে পার্টির নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা এই মুহূর্তে আমাদের নেই। সেটা অর্জন করাটাই এই মুহূর্তে আমাদের জরুরি কর্তব্য। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..