মহান শিক্ষা দিবস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৭ সেপ্টেম্বর সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের মহান শিক্ষা দিবস। শিক্ষার অধিকার আদায়ে রক্তে আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ইতিহাসের এক দিন। ১৯৬২ সালের এ দিনে পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ নাম না-জানা অনেকেই। তাদের স্মরণে প্রতিবছর এ দিনকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের মাত্র দুই মাস পর ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এসএম শরীফের নেতৃত্বে শরীফ কমিশন নামে খ্যাত এই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের প্রতিবেদন পেশ করেন। এতে শিক্ষা বিষয়ে যেসব প্রস্তাবনা ছিল তা প্রকারান্তরে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে গিয়েছিল। প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- সস্তায় শিক্ষা করা যায় বলে যে ভুল ধারণা রয়েছে তা ত্যাগ করতে হবে। এতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ছাত্র বেতন বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত শরীফ কমিশনের ওই প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, প্রশাসন, অর্থবরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। আইয়ুব সরকার এই রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ এবং তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সৃষ্টি হয় একের পর এক ইতিহাস। প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে প্রণীত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের শুরু থেকেই ছাত্রদের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ছাত্র সংগঠনগুলো এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নামে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ডাকে দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ ও বাবুল। ২৪ সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানের ছাত্রসমাবেশ থেকে শিক্ষানীতি বাতিল, হত্যার বিচারসহ ছাত্রসমাজের উত্থাপিত দাবি মানার জন্য চরমপত্র ঘোষণা করা হয়। ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন স্থগিত করে। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ৬৬’র ছয় দফা,’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান,’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেদিন ছাত্রসমাজই পালন করেছিল নতুন ইতিহাস নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা, যার ধারাবাহিকতা আজ অবধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে একটি শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, যাতে শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য শিক্ষা রিপোর্টের মতোই ছাত্রসমাজ তথা জনগণের আকাক্সক্ষার কোনোই প্রতিফলন ঘটেনি তাতে। যেকোনো নীতি প্রণয়নে ও তা বাস্তবায়নে প্রতিফলন থাকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তথা সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের। সব সরকারই মুক্তবাজার অর্থনীতির দর্শনকে ধারণ করে ধনিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি প্রণয়ন করে, যার মধ্যে শিক্ষানীতি অন্যতম। সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদ গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, সার্বজনীন একই ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিটি সরকারের আমলেই তা হয়েছে উপেক্ষিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গীকার ছিল গণমুখী, সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন।’৭৫ পরবর্তী প্রতিটি সরকার ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পালন করে গেছে অগ্রণী ভূমিকা। স্বাধীনতার ৪৬ বছর এবং ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের ৫৮ বছর পরও এদেশের ছাত্রসমাজকে শিক্ষার অধিকার আদায়ে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে যেমন ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন,’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, যার অনিবার্য পরিণতিরূপে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, তেমনিভাবে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রসমাজ সর্বগ্রাসী শিক্ষা সঙ্কট উত্তরণে রচনা করবে ছাত্র গণআন্দোলন, যা বেগবান করবে সমাজ বিপ্লবের লড়াইকে। এই হোক মহান শিক্ষা দিবসের অঙ্গীকার।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..