করোনাকালে নারী দিবস

শান্তা মারিয়া

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হলো- “করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব”। সমতার বিশ্ব গড়ার লড়াইতে নারীর অবস্থান কী? শুধু কি নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন বিশ্বই একান্ত কাম্য? তা নয়। বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য বিশ্ব হোক বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও নির্যাতনমুক্ত। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। মানবমুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে সবসময়েই জড়িয়ে আছে নারী। ইতিহাসই তার প্রমাণ। এবার নারী দিবসের ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরাই প্রথম ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে, কারখানার অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে ও মজুরি বৈষম্যের প্রতিবাদে আন্দোলন করেন। সেসময় থেকেই মানবমুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় নারীমুক্তির আন্দোলন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারীসংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেতা ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেন হেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারীপ্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারীদিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। ১৯১১ সাল থেকেই দিবসটি পালন শুরু হয়। কমিউনিস্ট কর্মীরা বিশেষভাবে দিনটি পালন করতে থাকেন। ১৯১৪ সাল থেকে কয়েকটি দেশে এই দিবস পালন শুরু হয়। বাংলাদেশেও সত্তরের দশক থেকে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় এবং জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আহ্বান জানায়। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘে গৃহীত হয় নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের সনদ সিডও। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ ও নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দিবসটি পালিত হয়। এখানে আমি চীন দেশে নারী দিবসের কথা একটু বলতে চাই। চীনের মহান নেতা চেয়ারম্যান মাও সেতুং বলেছিলেন, চীনের অর্ধেক আকাশ ধরে রেখেছে নারী। এ কথার তাৎপর্য হলো ১৯৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর চীনে নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা হয়। ১৯৬০ থেকে ৭০-এর দশকে চীনের নারীর কর্মসংস্থানের হার বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। চীনের জিডিপিতে ৪১ শতাংশর বেশি অবদান নারীর যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শাংহাই বা বেইজিংয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশ কর্মী হলেন নারী। শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর পরিমাণ বেশি। চীনের কর্মজীবী নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ অনেক সুবিধা ভোগ করেন। কর্মক্ষেত্রে রয়েছে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের ব্যবস্থা। চীনদেশে নারী দিবস ৮ মার্চে পালিত হয় সাড়ম্বরে। এদিন সরকারি ছুটির দিন। এদিন চীনের নারীদের কাছে রীতিমতো উৎসবের। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা এদিন নারীদের বিশেষ উপহার দেন, বেড়াতে নিয়ে যান, বাইরে খাবার ও বিশেষভাবে দিনটি উদযাপনের আয়োজন করেন। অধিকার ও নিরাপত্তার কথা যদি ওঠে তাহলে বলতেই হবে চীনে প্রতিটি দিনই নারী দিবস। কারণ চীনে সরকারি নীতি ও সংবিধানে নারী-পুরুষের কোনো বৈষম্য নেই। শুধু তাই নয়, নারীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও চীনের আইন খুবই কঠোর। এখন আসি করোনাকালে বাংলাদেশে নারীর অবস্থা নিয়ে। নিউ নরমাল জীবনে নারীর জীবনসংগ্রাম অনেক কঠিন হয়েছে। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অনেকের ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বিপরীত চিত্রও কিছু কিছু রয়েছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে ফেসবুক পেজে অনেকে ব্যবসা করেছেন। ক্ষুদ্র পুঁজির অনেক নারী অনলাইনে পোশাক, গয়না, প্রসাধনী বিক্রি করে কিছুটা লাভের মুখ দেখেছেন। এবারের নারী দিবসের যে প্রতিপাদ্য সেই অনুসারে নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন সমতার বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য করণীয় কী সেদিকে একটু তাকাই। এ বছরের প্রতিপাদ্যে যে বিষয়টি আছে সেটি হলো নারীদের জন্য সমতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। নারীকে বিভিন্ন পেশায় শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই হবে না। সেইসঙ্গে নীতি নির্ধারণী পর্যায় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতেও পৌঁছাতে হবে। এজন্য চাই নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশে রয়েছে নারী উন্নয়ন নীতি। তবে নারী উন্নয়ন নীতি কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না বরং নীতিসমূহের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব নারীর ক্ষমতায়ন। এ বছর নারী দিবসে সকলের প্রত্যাশা হলো নারীরা আরও বেশি করে যেন নেতৃত্বে আসেন। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অধিকসংখ্যক উপস্থিতি খুব বেশি প্রয়োজন। এমনিতে বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। কিন্তু যদি গৃহস্থালি কাজের হিসাব ধরা যায় তাহলে ৪৮ শতাংশ অবদান নারীর। বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ নারী পুরোপুরি গৃহস্থালিতে শ্রম দেন। বাকিরা ঘরে বাইরে উভয় ক্ষেত্রে শ্রম দিচ্ছেন। নারীর মজুরিপ্রাপ্ত শ্রমের সঙ্গে যদি মজুরির বাইরের গৃহস্থালি শ্রম যোগ করা যায় তাহলে দেখা যাবে নারীর অবদান বরং পুরুষের চেয়ে বেশি। বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণা বলছে, অর্থনীতিতে নারীর কর্মসংস্থানের হারের অগ্রগতির ফলে নারী-পুরুষ সমতায় বাংলাদেশ আরো এগিয়েছে। সংস্থাটির প্রকাশিত ‘ভয়েস টু চয়েস বাংলাদেশ জার্নি ইন ওমেনস্ ইকনমিক এমপাওয়ারমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়। তবে স্বাধীনভাবে কর্মসংস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে দেশের নারীরা। নারীর সমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি করে তার অংশগ্রহণ। কিন্তু সেখানে রয়েছে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন। কর্মক্ষেত্র বা তার বাইরে নারীরা কতোটা নিরাপদ? কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। করোনা মহামারির সময়ে নারীর জীবনে আরেকটি সংকট দেখা গিয়েছিল। সেটি হলো পারিবারিক নির্যাতন। করোনার সময় অনেক পুরুষ ও নারী কাজ হারিয়েছেন। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পারিবারিক দ্বন্দ্বও অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে। যার কারণে পারিবারিক নির্যাতনের পরিমাণও বেড়েছে। পরিবারের শিশু ও পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে থাকায় গৃহস্থালি কাজের চাপও নারীর ওপর বেশি মাত্রায় পড়েছে। অনেক পরিবারে এমনও দেখা গেছে যে, স্বামী স্ত্রী দুজনেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবু অসুস্থ শরীরে নারীকেই সেবা দিতে হয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি। ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নারী। বামপন্থিদের নেতৃত্বে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনও হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশে। তবু কমেনি ধর্ষণের সংখ্যা। রাষ্ট্রীয় ও সমাজব্যবস্থা যতদিন মানবিক না হবে, যতদিন বৈষম্য বিলোপ না করবে, যতদিন সাম্যবাদী সমাজ না গঠিত হবে, ততোদিন নারী-পুরুষ কারো নিরাপত্তাই পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। কারণ একমাত্র শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজই পারে সকল মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে। নারী দিবসের লড়াইটা তাই শুধু নারীর নয়, শোষণহীন সমাজকামী পুরুষেরও।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..