শাল্লা এবং বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর রাজনৈতিক ছক

জামসেদ আনোয়ার তপন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

১৭ মার্চ দিনটি উদযাপিত হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে। বেশ কিছু দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এসেছেন জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপনের আমন্ত্রণে। জমকালো অনুষ্ঠানের সেই দিনটি এদেশেরই একটি গ্রামের মানুষের জন্য কী ভয়ানক বিভীষিকা রূপে আবির্ভূত হয়েছিল তা মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী অবগত হয়েছেন। হাজারো দুর্টনার খবরের মধ্যে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের সেই খবরটি আবার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই জাতীয় গণমাধ্যমের নজর থেকে হারিয়ে গেছে। হয়তো এত এত খবরের মধ্যে শাল্লার ঘটনার বিশেষত্ব আর নেই। কিন্তু ৭/৮ মাসের শিশুপুত্র সৌম্যকে কোলে নিয়ে সম্পূর্ণ বিনাদোষে কারারুদ্ধ নোয়াগাঁওয়ের প্রতিবাদী যুবক ঝুমন দাসের স্ত্রী সুইটি রানী দাসের মর্মান্তিক আহাজারি এবং দু’চোখের কোল বেয়ে নেমে পড়া অশ্রুজল যে আমরা যারা দেখেছি এবং ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধও হয়ে পড়েছি, সেই আমরাই কী করে ভুলি? আঘাতে ভেঙে যাওয়া মেয়েটির একটি হাত কাপড় দিয়ে বাঁধা। অন্য হাতে শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে এমন অসহায়ের মত আমাদের কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিল তার স্বামীকে ফিরিয়ে আনার যেন এ যাত্রায় তার স্বামীকে ফিরে পেলে পৃথিবীর কাছে তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। সে বলছিল- “একাত্তর সালে আমার জন্ম হয়নি, ময়-মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি পাকিস্তানী হানদারদের অত্যাচারের বিবরণ। তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল সেদিনের সেই হামলা ও অত্যাচারের মাত্রা। আমাকে যেভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। আমরা নিরাপত্তা চাই, ভিক্ষা চাই না, ক্ষতিপূরণ চাই”। ঠিক এভাবেই বলছিল আরো কয়েকজন আক্রান্ত নারী। হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে ১৭ মার্চ সকালে শাল্লা উপজেলার কাশিপুর, দিরাই উপজেলার নাসনি, সন্তোষপুর ও চণ্ডীপুর গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ লাটিসোঁটা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের পাশের ধারাইন নদীর তীরে গিয়ে অবস্থান নেয়। পরে সেখান থেকে শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। ১৯ মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে উদীচীর প্রতিবাদী সমাবেশের দিন শাহবাগের সমাবেশ শেষে পরিকল্পনা করছিলাম আক্রান্ত গ্রামে যাওয়ার। ২২ মার্চ রাতেই রওনা দিলাম সুনামগঞ্জের শাল্লার উদ্দেশ্যে। উদীচী, চারণ, প্রগতি লেখক সংঘসহ প্রগতিশীল কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি দলও একই দিন গিয়েছেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে। পরদিন দিরাই থেকে শাল্লার নোয়াগাঁও যেতে যেতে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে কতটা পথ পাড়ি দিয়ে কত সময় নিয়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে সেই গ্রামটিতে হামলে পড়েছিল। ছোট একটি নদীও পার হতে হয়েছে সেই হানাদার দুর্বত্তদের। অথচ তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে থানা পুলিশ যথাসময়ে জানতে পারলোনা! এগিয়ে এলোনা জনপ্রতিনিধি, সরকারীদলের নেতারা। গোটা একটি গ্রামে কয়েকঘণ্টা ধরে এই হামলা ও লুটপাট চালিয়ে সাম্প্রদায়িক দানবরা নিরাপদে বুক উঁচিয়ে চলে গেল । দিরাই থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যখন গ্রামটিতে পৌঁছাই কয়েকশত অপেক্ষমান নারী-পুরুষের মাঝ থেকে হঠাৎ বিক্ষুব্ধ স্লোগান দিয়ে স্থানীয় শাল্লা শাখার উদীচীকর্মীরা আমাদের বরণ করে নিল। তাদের চোখেমুখে ক্ষোভের আগুন। কিন্তু গ্রামবাসীদের হতবিহ্বল চেহারা দেখে সহজেই বুঝা যাচ্ছিল তাদের মর্মবেদনা। এর আগে বহুবার বিভিন্ন এলাকায় এরকম সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা ঘটলেও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের কোনও উদাহরণ নেই। বাংলাদেশে কয়েক বছরের প্রবণতা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কথিত ধর্মীয় অবমাননার পোস্টকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এর পেছনে ছিল তাদের সম্পত্তি দখল বা অন্য কোনো ষড়যন্ত্র। শাল্লার ঘটনার পেছনেও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার ছিল। হেফাজতে ইসলামের নেতারা উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ধর্মান্ধ মানুষকে সংগঠিত করা হয়েছে। স্থানীয় যুবলীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহীদুল ইসলাম স্বাধীন ছিল ঘটনার মাস্টারমাইন্ড। জলমহালের কর্তৃত্ব ও সেচের পানি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুরো একটি গ্রামের মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। সুদীর্ঘকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য স্থান দিরাই -শাল্লায় সাম্প্রদায়িক বর্বরতার সূচনা করা হল। একজন গ্রামবাসী আমাদের জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন- “হিন্দুর ঘরে জন্ম নেয়াই কি আমাদের অপরাধ?” পাশে তাঁর স্ত্রী হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। আমাদের মধ্য থেকে একজন প্রশ্ন করেছিল পুলিশে খবর দেয়া হয়েছিল কিনা। জবাবে তিনি বলছিলেন- ‘পুলিশের কাছেইতো আমরা আমাদের গ্রামের ছেলে ঝুমনকে সোপর্দ করেছিলাম। আমরা তাদের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। হামলা যে হতে পারে এমন আভাস আগের দিনই পাওয়া গেছিলো। কিন্তু পুলিশ আসেনি। প্রতিরোধ করারও কোন উপায় ছিল না। ওরা ছিল সশস্ত্র এবং সংখ্যায় অনেক বেশি।’ হেফাজতে ইসলামের যে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিরাইয়ে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করেছিল স্থানীয় যুবলীগ। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা সমাবেশ সফল করার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করেছিল বলে গণমাধ্যমে সচিত্র খবর বেরিয়েছে। অথচ এই হেফাজত ইসলামের নেতা মামুনুল হক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তার ঘোষণায় অনুপ্রাণিত হয়ে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর হয়েছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির একটি হল ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান শর্ত হলো, রাষ্ট্রনীতি এবং রাষ্ট্রাচারে কোনো ধর্মকে না রাখা। ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখা এবং এই ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্ম পালনে সব ধর্মের অনুসারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়েছে: ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য- (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার ওপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে। শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে বা দেশের অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হামলা ও লুটপাটের ঘটনার মধ্য দিয়ে উপরোক্ত সকল উপধারার লঙ্ঘন ঘটে চলেছে বাংলাদেশে। এর দায় প্রধানত সরকারকেই নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কোন ব্যবস্থাই নেননি যাতে সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ করা যায়। ঘটনার পর সরকারি দল ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের লোকজন আক্রান্ত পরিবারগুলোকে দু’চার বা পাঁচ-দশ হাজার টাকা ও টিন দিয়েছেন ত্রাণ হিসেবে। সরকারি দলের নেতারা সেখানে সমাবেশ করে বক্তব্য দিয়েছেন, সরকারের উন্নয়ন তৎপরতা বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র হিসেবেই বর্ণনা করেছেন এই ঘটনাকে। অথচ একটিবারের জন্য হেফাজতের নামটিও উচ্চারণ করেননি। মামুনুল হকসহ কিছু মওলানা সারা দেশে মুক্তচিন্তার মানুষ, নারী ও অন্যধর্মের নামে যেভাবে বিষোদ্গার করেন তার ফল হিসেবেই সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের তাণ্ডব ও মারমুখি আচরণ। বস্তুত হেফাজত যত ভয়ংকর ও মারমুখি হবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা আরো সংহত ও মজবুত হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিশ্ববরেণ্য সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, গ্রন্থাগার, উপাসনা মন্দির যত পুড়বে এদেশের সেক্যুলার সিভিল সোসাইটি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ততোধিক ভয় পাইয়ে দেয়া যাবে। আওয়ামী রেজিম দীর্ঘস্থায়ী বা চিরস্থায়ী করা যে কতটা দরকারি তা কষ্ট করে জনগণকে আর বোঝাতে হবে না। রাজনৈতিক এই ছক বাংলাদেশের সমাজকে সাম্প্রদায়িকতার চাদরে মুড়িয়ে দেয়ার পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছে। এদেশের সেক্যুলার সিভিল সোসাইটি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যতদিন এই রাজনৈতিক ছক সম্পর্কে উদাসীন থাকবেন এবং এই ক্ষমতাকাঠামো থেকে পরিপূর্ণভাবে মোহমুক্তি না ঘটাবেন ততদিন আরো অনেক নোয়াগাঁও অনেক ব্রাহ্মণবাড়িয়া আবিষ্কৃত হতে থাকবে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, উদীচী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..