আমাদের সন্তানেরাও জিতবে

মমতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আইনের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য আইন– এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইন-কানুন প্রণীত হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশের আইন-কানুন এখনো ব্রিটিশের ভারত শাসন আইন ও পাকিস্তানি স্বৈরাচারি আইনের ভিত্তিতেই চলছে। আইন ব্যবস্থায় রয়ে গেছে অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি, ফাঁক-ফোকর। এই সাথে কিছুদিনপূর্বে পাস হয়েছে কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইন প্রণয়নের সময় দেশের সাংবাদিক, লেখক, রাজনৈতিক মহল মানুষের মুক্তচিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা হবে বলে সমালোচনা ও বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। শাসকদের ইচ্ছাতেই এই গণবিরোধী আইন পাস হয়েছে। এই কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বলি হলেন লেখক এবং একজন উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ। এ আইনে করা এক মামলায় করোনাকালে গত বছর ৬ মে লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে গ্রেফতার করে র্যাব। একই মামলায় ‘রাষ্ট্র চিন্তা’ নামে একটি সংগঠনের সংগঠক দিদারুল ভূইয়া এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নানকে গ্রেফতার করে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে মুশতাক ও কিশোরকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়নি, কয়েকবার জামিনের আবেদন করা সত্ত্বেও। এই কালো আইনে কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কারাভ্যন্তরে মৃত্যুবরণ করেন বলে জেল সুপার সংবাদ মাধ্যমকে জানান। মৃত্যুর সুস্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি। তিনি শুধু লেখকই ছিলেন না তিনি প্রথম বাংলাদেশে কুমির চাষ করে রপ্তানি করেছিলেন। এবং তিনি ছিলেন বিদেশে পড়াশুনা করা একজন প্রগতিমনা মানুষ। কারাগারে এই লেখকের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই এই মৃত্যু রাষ্ট্রীয় হত্যা বলে রাষ্ট্রকে দায়ী করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে সারাদিন প্রগতিশীল ছাত্রজোটের উদ্যোগে বিভিন্ন বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। সন্ধ্যায় ছাত্র জোটের মশাল মিছিলে এক ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে আহত করে পুলিশ। যারা চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে। এছাড়াও পুলিশ আটক করে নজির আমিন চৌধুরী জয়, তামজীদ হায়দার চঞ্চল, জয়তী চক্রবর্তী, নাজিফা জান্নাত, তানজিম রাফি ও আকিদ আহমেদসহ সাত জন শিক্ষার্থীকে। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে এবং কালো ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের বাতিল চাওয়ার প্রতিবাদে ছাত্রদের সুশৃঙ্খল মশাল মিছিলে পুলিশের এই ন্যাক্কারজনক হামলা ও আটক করার ঘটনা দেশবাসীর ক্ষোভ ও বিস্ময়ের মাত্রা আরো এক ধাপ বাড়িয়ে দিল। কয়েক মাস পূর্বে ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ব্যানারে ছাত্রছাত্রীদের ঢাকা-নোয়াখালী লংমার্চ বহরেও পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনী কয়েক দফা হামলা করা হয়েছিল। গাড়ি ভাঙচুরসহ অনেক ছাত্রছাত্রীকে আহত করে লংমার্চ পুরো সফল করতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের হাতে জিম্মি হয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা ন্যায় ছাত্র আন্দোলনের অধিকার বঞ্চিত। এ কোন পুলিশি রাষ্ট্রের বাসিন্দা হলাম আমরা! এদেশ আন্দোলন সংগ্রামের দেশ। পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত এদেশের ছাত্ররা আন্দোলন করেছে ভাষা-গণতন্ত্র-স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসনের জন্য পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ হয়েছে এবং দু’লক্ষ মাবোন ইজ্জত দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছে। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজই রুখে দাঁড়িয়েছে। রচিত হয়েছে সংগ্রামের এক একটি গৌরবময় ঐতিহাসিক অধ্যায়। অথচ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমার ৭টি ছেলে মেয়েকে কারারুদ্ধ হতে হলো। আহত হতে হলো অনেককে। আমরা ওদের পিতা-মাতারা শুধু হা-হুতাশ বাদ দিয়ে চোখের জল না ঝরিয়ে নিজেরা সাহসী হয়ে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জাগানো আমাদের এখনকার দাঁয়িত্ব। কেননা আমরা বাবা-মায়েরা প্রত্যেকেই একটি আদর্শ ও ন্যায় নীতি নিয়ে জীবনের পথে চলে আমাদের সন্তানদের ভাল কিছু করতে শিখিয়েছি। শিখিয়েছি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। আমরাও আমাদের তারুণ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি। এখন ওদের তারুণ্যের মধ্যেই আমরা আমাদের শক্তির শিক্ষার প্রতিফলন খুঁজে নেব। এবং সন্তানদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও প্রেরণা যোগাব। কেননা ওরাই আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। ওদের হাতেই আমাদের দেশের-দশের ভালো করার সংগ্রামী ঝান্ডাটি তুলে দিতে হবে। প্রতিটি অন্যায়ে প্রতিবাদী হতে উৎসাহ দিতে হবে। ভালো মানুষ হতে শেখাতে হবে। দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে হবে। তাহলেই আমরা সার্থক হব। ওরাও হবে আলোকিত মানুষ। আমাদের দেশটা এখন দুর্বৃত্ত-লুটেরাদের দখলে। ওরা মুষ্টিমেয়। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান, দেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ ও অন্যান্যদের ব্যবহার করছে ওরা। যার ফলে পুলিশ এখন বেপরোয়া। তারা যা খুশি তাই করছে। ন্যায্য আন্দোলন সংগ্রামে মেয়েদের সমানে পিটাচ্ছে, চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে নারী পুলিশ থাকতেও তাদের আনা হচ্ছে না আন্দোলনকারী ছাত্রীদের জন্য। এখানেও পুরুষ পুলিশ ছাত্রীদের অপমান করছে। অথচ পাকিস্তান আমলেও ছাত্রছাত্রীদের পুলিশ কিছুটা সম্মান দেখাত। আর এখন ‘দেশের রাজা পুলিশ’ দিয়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করছে শাসকগোষ্ঠী। যাতে কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদে সাহসী না হয়। এর বিপরীতে আমাদের সন্তানদের রুখে দাঁড়াতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে। দেশবাসীকেও ওদের আন্দোলনের সাথে থাকার উদাত্ত আহ্বান রাখছি। কারণ দেশ সবার। আমাদের সন্তানদের উপর এই পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদ করতে হবে সমস্ত দেশবাসীকেই। তাহলেই দেশ বাঁচবে। সমস্ত অন্যায় দূর হবে। আমাদের কারাবন্দি সংগ্রামী সন্তানেরাও জিতবে। একদিন ওরা জয় করবেই। আসুন আমরাও ওদের জয়ের জন্য লড়াইয়ের পথের সাথী হই। ওদের নিয়ে আমরা গর্বিত। লেখক : ছাত্রনেতা জয়তী চক্রবর্তীর মা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..