ভাষা নিয়ে রাজনীতি

মনির তালুকদার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
“ভাষা নিয়ে রাজনীতি” কথাটা শুনলে আমাদের আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। কারণ, এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান অর্জনের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্ববঙ্গীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং অদূরদর্শিতা অবাঙালি নেতৃত্বের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। পাকিস্তান যেদিন স্বাধীন হলো, সদ্য গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথ নেয়া জিন্নাহ সাহেব পাকিস্তানের প্রথম মন্ত্রিপরিষদে তাবেদার চরিত্রের দুজন পূর্ববঙ্গজাত ব্যক্তিকে ঠাঁই দিলেন। তাদের একজন আবার পূর্ববঙ্গকে নিজের মনে করতে পারেনি। তাই মন্ত্রী অবস্থায় তিনি খুব গোপনে দেশত্যাগ করে ভারতকে আপন ভূমি হিসেবে বরণ করে নিলেন। অপরজন আবার বাংলা ভাষার প্রশ্নে অবাঙালিদের উৎসাহকেও ম্লান করে দিলেন, তিনি বললেন, ‘আরবি হরফে বাংলা লিখতে হবে’। বাঙালি মন্ত্রীর ওই উৎসাহ আমাদের অবাক করারই কথা। তবে করেনি, কারণ সেসময় বাঙালি মুসলমান চর্চায় মুসলমান হলেও চর্চায় অবশ্য বাঙালি ছিলেন সামান্যই। পাকিস্তানের চার শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা উর্দু, যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হলো, পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করবেন–সেটা প্রত্যাশিতভাবেই ঘটেছিল। তবে পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ঊর্দু প্রত্যাখ্যান করবে এটা ছিল আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভাষা পাঞ্জাবি, দ্বিতীয় স্থানে সিন্ধি এবং তৃতীয় স্থানে ছিল বালুচ। ১৯৪৭ পরবর্তী সিন্ধু প্রদেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী আইউব পুরো উর্দুভাষা এবং ক্রমাগত উর্দুভাষী অভিবাসী অনুপ্রবেশের প্রতিবাদ করেন। এতে করে জিন্নাহর বখশিশ পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীত্ব হারালেন। জিন্নাহ রাগান্বিত হয়ে আইউবের বিরুদ্ধে অদক্ষতা ও অসততার অভিযোগ আনেন। এরপর জিন্নাহর প্রয়াণের পরপরই জনপ্রিয়তার কারণে তিনি অনায়াসে আবার ক্ষমতাসীন হন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের আগেই অবাঙালি আগা খান ঢাকা ও চট্টগ্রাম সফর করে লিখেছিলেন, “আমি একজন মানুষকেও উর্দুতে কথা বলতে শুনিনি। সেক্ষেত্রে উর্দু কেন এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা বা দাপ্তরিক ভাষা হবে?” অদূরদর্শী পাকিস্তান সরকার আত্মগরিমায় বাঙালিদের ওপর উর্দু চাপিয়ে দিয়েছিল। আর ওই উর্দু চাপিয়ে দেবার পরিণতিই ছিল ভাষা আন্দোলন, আর ভাষা আন্দোলন থেকে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন। ভাষা নিয়ে রাজনীতি জাতি এবং রাষ্ট্রকে যে বিভক্ত করতে পারে উর্দু নিয়ে রাজনীতি এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে ভাষা নিয়ে রাজনীতি অনেক সময় জাতিকে একতাবদ্ধও করতে পারে, তার বড় উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমরা যদি প্রশ্ন করি, যুক্তরাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা কি? আজ এই প্রশ্নের একক এবং অবিভাজ্য জবাব হবে–ইংলিশ। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীর দেশ। ১৭৭৬ সালে দেশটি যখন স্বাধীন হয়, দেশটির একটি অভিজাত শ্রেণি ছিল অভিবাসী জার্মান। তাদের দাবি ছিল, এ দেশের একটি দাপ্তরিক ভাষা হবে জার্মান। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর প্রথম স্পিকার ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত ফ্রেডেরিক অগাস্টাস কনরাড মুলেনবার্গ। তার জন্ম পেনসিলভেনিয়াতে হলেও তার বাবার জন্ম জার্মানিতে। ফ্রেডেরিক মুলেনবার্গ নিজেও জার্মান বিশ্ববিদ্যারণে পড়াশোনা করেছেন। জার্মান আবহের মধ্যে বেড়ে উঠলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য ইংরেজিকেই উপযুক্ত মনে করেছিলেন। জার্মান লবি তাদের ভাষাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা ঘোষণার বিল প্রস্তুত করেছিল। তবে জার্মান বংশজাত দূরদর্শী স্পিকার নিজেই বাধা হয়ে দাঁড়ালেন, তিনি কোনোভাবেই প্রভাবান্বিত না হয়ে বিনা দ্বিধায় বিলটি উত্থাপিত হতে দিলেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সকল ফেডারেল আইন জার্মান ভাষায় প্রকাশ করার একটি প্রস্তাব উঠল ১৭৯৫ সালে। তবে এক ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। অঙ্গরাজ্যে দাপ্তরিক ভাষা একাধিক হতে পারে, কিন্তু ফেডারেল ভাষা একটাই–ইংরেজি। ১৭৫৩ সালে জার্মান অভিবাসীদের ভাষাশিক্ষা প্রবণতায় ক্রুদ্ধ হয়ে বেঞ্জমিন ফ্রাংলিন বললেন, জার্মান অভিবাসীরা অবিবেচক, তারা ইংরেজি শিখছে না, বা লিখছে না। আর জার্মানদের মধ্যে একেবারে যারা হীনবুদ্ধিসম্পন্ন কেবল তারাই অনন্যোপায় হয়ে নিজের দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আসছে। থিউডোর রুজভেল্ট আমেরিকার জন্য কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষার কথা বলেন, আমাদের একটি পতাকা এবং একটি ভাষা। ইংরেজি এখন বিশ্বভাষা, বিশ্বায়নের ভাষা, প্রযুক্তির ভাষা। কোনো সন্দেহ নেই যে, একটা সময় এসে ইংরেজি ভাষা আমেরিকায় জিঘাংসা তৈরি না করে বরঞ্চ জাতীয় সংহতিকে জোরদার করেছিল। আবার অতি উৎসাহী ইংরেজি প্রেমিকদের “ইংলিশ অনলি মুভমেন্ট” জাতীয় সংহতিতে আঘাতও করেছিল। ভাষার স্বাভাবিক গতিময়তা রুদ্ধ করতে কিংবা কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার ফল কখনো ইতিবাচক হয়নি। তবে ইংরেজি ভাষা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংহতি সৃষ্টি করলেও এ ভাষার পক্ষে কি বৈশ্বিক সংহতি সৃষ্টি করা সম্ভব? “মাইক্রোসফট এনকাটা ওয়ার্ল্ড ডিকশনারি” প্রকাশের সময় উদ্বোধনী ভাষণে দাম্ভিক কণ্ঠে বিল গেটস বলেছিলেন, “এক বিশ্ব এক অভিধান।” ওই বক্তব্যে ভাষাবিজ্ঞানী রিচার্ড মরিসনকে হতভম্ব এবং আতঙ্কিত করেছিল। মরিসন নিজের দায়বদ্ধতা থেকে অনেকটা বিব্রত হয়ে বলেছেন, “এটাও সত্য- বিল গেটস যে “এক বিশ্ব এক অভিধান” এর কথা বলেছেন তা মাত্র কয়েক প্রজন্ম দূরে। তবে আমরা আশা করব মানুষ এক সর্বাত্মক অতলান্ত মহাসাগরে হয়তো পড়বে না।” ভাষা রাজনীতির আসল কথা হলো একই দেশে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের ওপর ভাষাভিত্তিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে এর অনেক কারণ আছে– (১) কোনো ভাষাকে কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া বা না দেয়া এই স্বীকৃতির অনেক মূল্য আছে– যেমন, সকল সরকারি কাগজপত্র, ফর্ম দলিল-দস্তাবেজ, আদালত, সংসদীয় কার্যক্রম সবই স্বীকৃত ভাষায় গুরুত্ব ও ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। তবে অস্বীকৃতি ভাষার সামাজিক আর্থিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস করে। যেসব রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা একাধিক, সেখানে কোনো একটি ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা ঘোষণা করার মানে সেই ভাষায় কথা বলা মানুষকে অন্যদের চেয়ে বেশি সুযোগ প্রদান করা। অন্য ভাষার মানুষের ওপর বেশি সুযোগ প্রদান করা, অন্য ভাষার মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করাতে রাষ্ট্রীয় সমর্থন জোগানো– তার মানে সমাজে অনিবার্য সংঘাত ডেকে আনা। একাধিক ভাষা যখন আবার রাষ্ট্রের সরকারি ভাষা, তখন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী যাদের ভাষা এই স্বীকৃতি পায় না, তারা তাদের ভাষা হেয়কৃত হয়েছে বলে মনে করে এবং তখন ওইসব জনগোষ্ঠী অনন্যোপায় হয়ে আন্দোলনের বাঁকা পথ ধরতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন সময় রাজনীতিবিদদের হাতে সংখ্যালঘুর ভাষা কেবল উপেক্ষিত হয়নি, সে ভাষা ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধও হয়েছে। রাজনীতিবিদদের গতানুগতিক বক্তব্য জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় সংহতি বৃদ্ধির জন্যই নাকি এটা তারা করে থাকেন। অন্যদিকে আবার ক্ষমতাসীন সংখ্যালঘু নেতার হাতে তার ভাষার বিকাশ ও প্রচারও ঘটেছে। জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠায় কখনো একটি ভাষার উপভাষাকে রাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বেলারুশিয়াতে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীদল ভাষায় ভিন্ন বানানপদ্ধতি ব্যবহার করে যাবে এটিও ভাষা রাজনীতি। ঐতিহ্যবাহী চীনা হরফ জটিল, সেক্ষেত্রে সরল হরফের দাবি রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়েছে। অস্ট্রেলীয় নাগরিকত্ব লাভের জন্য ইংরেজি ভাষা জানা বাধ্যতামূলক–এটাও ভাষা নিয়ে রাজনীতি। ১৭৮টি দেশে কমপক্ষে একটি দাপ্তরিক ভাষা রয়েছে। ১০১টি দেশে দাপ্তরিক ভাষা একাধিক। ৬৭টি দেশে ইংরেজি দাপ্তরিক ভাষা, যার অধিকাংশ দেশের নাগরিকদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়। বহুল স্বীকৃত ৪টি দাপ্তরিক ভাষার মধ্যে ইংরেজি ছাড়াও রয়েছে ফ্রেঞ্চ, আরবি ও স্পেনিশ। তবে দাপ্তরিক ভাষার ধারাণাটি রাজনৈতিক এবং আড়াই হাজার বছরের পুরনো খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে সম্রাট দানিউস যখন মেসোপটেমিয়াকে পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন, রাজকীয় আরামায়িক বা দাপ্তরিক আরামায়িক নাম দিয়ে আরামায়িক ভাষার একটি সংস্করণকে যোগাযোগের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন একটি ফরমানের মাধ্যমে–এটিও ভাষা রাজনীতি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দাপ্তরিক ভাষা বলিভিয়ায় ৩৭টি, দ্বিতীয় স্থানে ২৩টি ভাষা নিয়ে ভারতের অবস্থান। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বাংলাকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়েছে, তবে ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি জারিকৃত একটি নির্বাহী আদেশ উল্লেখ করা সমীচীন। “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই দেশের প্রতি তার ভালোবাসা আছে একথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন এটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উশৃঙ্খলতা চলতে দেয়া যেতে পারে না। এই আদেশ জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আধা সরকারি অফিসে কেবলমাত্র বাংলার মাধ্যমে নথিপত্র ও চিঠিপত্র লেখা হবে। এ বিষয়ে কোনো অন্যথা হলে উক্ত বিধি লঙ্ঘনকারীকে আইনানুগ শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিভিন্ন অফিস আদালতের কর্তাব্যক্তিরা সতর্কতার সঙ্গে এ আদেশ কার্যকরী করবেন এবং আদেশ লঙ্ঘনকারীকে শাস্তির বিধান ব্যবস্থা করবেন।” লেখক: কলামিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..