ভাষা আন্দোলন ও তাজউদ্দীনের ডায়েরি

মার্জিয়া লিপি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে প্রোথিত ছিল একাত্তরের স্বাধীনতার বীজ। ১৯৫২ সালের আন্দোলন শুধুমাত্র রাষ্ট্রভাষার জন্য আন্দোলন ছিল না। এ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তায় জন্ম নিয়েছিল একুশের চেতনা। এই চেতনার ভিত্তি ছিল আমাদের জাতীয় জীবনে আত্মত্যাগের বীজমন্ত্র। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পরে। একুশের চেতনার জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। তৎকালীন পাকিস্তানে শতকরা ৫৬ জনের মুখের ভাষা বাংলা হলেও শতকরা ৭ জনের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ভাষা আন্দোলনের প্রথমযুগ ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের সূচনা হয়। এ গণআন্দোলনের মাধ্যমে তদানিন্তন পাকিস্তান অধিরাজ্যের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও, বস্তুত এর বীজ রোপিত হয়েছিল বহু আগে। অন্যদিকে, এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল এ পরাধীন ভূখণ্ডের স্বাধীনতা। ১৫ মার্চ, ১৯৪৮। সেদিন ঢাকার আকাশ ছিল কালো মেঘে ঢাকা। ভোর থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। ওই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্ররা সংগ্রাম পরিষদ আহুত ধর্মঘটে পিকেটিং শুরু করে। ভাষার দাবিতে সারাদেশ জুড়ে আন্দোলনে পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড় নির্যাতন চলছিল। পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়ার দাবিতে শুরু হয় ধর্মঘট। ছাত্র-জনতার পিকেটিং ধীরে উত্তাল হয়ে উঠছিল, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। কিন্তু সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। সেদিন মোহাম্মদ তোয়াহা ও তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্রদের সংগঠিত করেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ (২৩ জুলাই ১৯২৫-৩ নভেম্বর ১৯৭৫) বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা। স্বাধীন ও দেশপ্রেমী চিন্তা ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার ক্ষেত্রে আপসহীন ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন পরাধীন পূর্ব পাকিস্তানকে মুক্ত করার ইতিহাসের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অন্যতম এক নায়ক। যাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস পরিপূর্ণ নয়। তাজউদ্দীন আহমদ এদেশের শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামই নয়, ভাষা অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ছাত্রজীবন থেকেই তাজউদ্দীন আহমদ প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে থাকা অবস্থায় এল.এল.বি. ডিগ্রির জন্য পরীক্ষা দেন এবং পাস করেন। চল্লিশের দশকে নিযার্তন, বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ ও বঙ্গীয় প্রাদেশিকে মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্য। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে মুসলিম লীগ সরকারের গণবিরোধী নীতির প্রতিবাদে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৪৮ ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ উভয় কমিটির সদস্য ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ (এপ্রিল ১৯৫১)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫১-৫৩-তে উক্ত সংগঠনের কার্যকরী সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৯-এ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৫৩-তে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে কারাবরণ করেন। বদরুদ্দীন উমর বিস্তৃত পরিসরে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, ১৯৪৮ থেকে সূচিত আন্দোলন এবং ’৫২-এর অগ্নিঝরা কয়েকটি দিন এবং তারপরে দেশের নানা প্রান্তে নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে সংগ্রামের পথে এসেছে, সে কথা তথ্য-প্রমাণসহ লিখেছেন। পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলনের ওপর তিনি অনেক পরিশ্রম এবং আন্তরিকতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণার ফলশ্রুতিতে প্রকাশিত হয়েছে ‘পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’র দুটি খণ্ড এবং পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘কতিপয় দলিল’-এরও দুটি খণ্ড। বদরুদ্দীন উমরের এই কাজ ১৯৪৭ পরবর্তীকালের পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের পরিচয়ের জন্য আমাদের অনন্য জীবন্ত গ্রন্থ। তিনি আমাদের এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক এবং সচেতন গবেষণা ব্যক্তিত্ব। সাধারণ সম্মান ও পুরস্কারের ঊর্ধ্বে। আর জাতির এই কৃতজ্ঞতার চাইতে বড় সম্মানেরও আর কিছু থাকতে পারে না। বদরুদ্দীন উমরই তাঁর এই গবেষণা-পর্যায়ে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির সাক্ষাৎ লাভ করেন: তাজউদ্দীন আহমদের নিজের কাছ থেকেই, ১৯৭৪ সালে। ‘কতিপয় দলিলের’ প্রথম খণ্ডের একাংশে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির মূল হস্তাক্ষরে ’৪৭ সাল থেকে ’৫২ সাল পর্যন্ত ডায়েরির একটি মূল্যবান অংশ মুদ্রিত হয়েছে। তাঁর উদ্যোগে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তাজউদ্দীন আহমদের নিজের হস্তাক্ষরের এই ডায়েরি এক নতুন তাজউদ্দীনের পরিচয় ঘটিয়ে দেয়। বদরুদ্দীন উমর বামপন্থি ধারার প্রগতিশীল রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও ইতিহাসের স্বার্থে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন। তাঁর বইয়ে ভাষা আন্দোলনে তৎকালীন যুবলীগ নেতা অলি আহাদ ও তাজউদ্দীন আহমদের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের অল্প কয়েক বৎসর পর থেকেই রাজনীতিতে তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা শুরু হলেও তাঁর বর্তমান রাজনীতি চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও ঘৃণার্হ।’ বদরুদ্দীন উমর বইটির অনেকখানি তথ্যের জন্য অনেকখানি নির্ভর করেছেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সরকারের কাণ্ডারি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির ওপর। ভাষা আন্দোলনের কোনো একক রাজনৈতিক নেতা ও নায়ক ছিল না। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রাম ছিল এদেশের সকল শ্রেণির পেশাজীবী ও জনযোদ্ধাদের। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত। অধিবেশনের শুরুতে আলোচনার সূত্রপাত করে পূর্ব বাংলার কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন: “Mr. President, Sir, I move: That in sub-rule (1) of rule 29, after the word `English' in line 2, the words `or Bengalee' be inserted.” আলোচনা বা বিতর্কের একটা পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই পরিষদ-নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাবটিকে নির্দোষ ভেবেছিলেন, কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী প্রস্তাবের পর তিনি এর মধ্যে এমন কিছু ষড়যন্ত্রের আভাস পেলেন, যা পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করবে, পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাঙালি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১-র মধ্যে ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠে বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায়ের দাবি। আন্দোলন আর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাঙালি। ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ও সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার আন্দোলন দমন করার জন্য ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে জনসমাগম, জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভাঙলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও অনেকে। মনীষী, দার্শনিক ও জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের দিনলিপিতেও তাজউদ্দীন আহমদের ভাষা আন্দোলনের সম্পৃক্ততার কথা এসেছে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতায়। তিনি লিখেছেন, ‘‘একটি ব্যক্তিগত বোধের কথা বলে একথা শেষ করি: আমি জানতাম না তাজউদ্দীন প্রতিদিন শুতে যাওয়ার আগে সে রাত দুটাই হোক কিংবা তিনটা, তাঁর দিনের ডায়েরি লিখে তবে ঘুমোতে যেতেন: যদি জানতাম এবং আজ নয় যদি সেই ৪৮ সালেই আমি তাজউদ্দীনের ৩০-০১-৪৮ তারিখের ডায়েরিটি পাঠ করার সুযোগ পেতাম তাহলে সচেতনভাবে না হলেও আমি অচেতনভাবেও উপলব্ধি করতে পারতাম যে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তারিখে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের বদ্ধ খাঁচায় বন্দি অবস্থায় তাজউদ্দীন নিহত হবেন। সেদিন থেকেই অনিবার্যভাবে তাজউদ্দীন ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন–যেমন অনিবার্যভাবে শেখ মুজিব অগ্রসর হয়েছিলেন ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দান থেকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক সেই মুহূর্তটির দিকে। আধুনিক ইতিহাসের প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের নায়কেরা: অর্ডিংসান থেকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হয়ে সালভাদার আলেন্দে, শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আর ইন্দিরা গান্ধীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে, সংগ্রামরত জীবনের সৈনিক হয়ে মৃত্যুর হাতে নিহত হতে। তাজউদ্দীন আহমদ আমার নিকট পূর্বেও অপরিচিত ছিলেন না। তিনি আ-কৈশোর এক সচেতন রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক ছিলেন। আমি ছিলাম চলমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক: আনন্দ-দেশ-সংঘাতময় জীবনে উদ্বেলিত এক অবাক মনের তরুণ: সেই ১৯৪২ সন থেকে। চল্লিশের দশকের প্রায় গোড়া থেকে। আমার স্কুলজীবন ঢাকায় কাটেনি। কলেজে অধ্যয়ন থেকে আমার ঢাকা-জীবন। তাজউদ্দীন আহমদের জীবন-বৃত্তান্ত থেকে দেখেছি তাজউদ্দীন জন্মেছেন ১৯২৫ সালে, ঢাকা জেলারই কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে। আমার নিজের জন্মও ১৯২৫ সালে। বরিশাল জেলার একটি গ্রামে। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৪৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং ১৯৬৫-তে জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ‘ল’ পাস করে এই বিবরণী থেকে আমি জানতে পারিনে ১৯৪৬ সালে অনার্স পাস করলে, ১৯৪৭ সালেই তাঁর যেখানে এম.এ. পাস করার কথা–সেখানে এম.এ.-র কোনো উল্লেখ নাই কেন? তবু একথা ঠিক, তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমি পরস্পরের অপরিচিত ছিলাম না। ১৯৪৬ সালে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এম.এ. পাস করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়কে স্মরণ করতে পারছিনে। তবু ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে ছাত্ররা যে সাধারণ ধর্মঘট ডেকেছিল সে সাধারণ ধর্মঘটের পিকেটিং-এ তাজউদ্দীন আহমদের হাত ধরে আমিও দাঁড়িয়েছিলাম রমনা পোস্ট অফিসের সামনে। টেলিফোন ভবনের একটা অংশ হিসেবে রমনা পোস্ট অফিসের সেই ভবনের অস্তিত্ব এখনও আছে। তার পরিপার্শ্বের বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে। তবু এই ভবনটির সামনে দিয়ে যাতায়াতের সময়ে ১৯৪৮ সনের ১১ মার্চের সেই সাধারণ ধর্মঘট এবং তাতে পিকেটিং-এর দায়িত্ব পালনে তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা; এই সুহৃদ ও সহযাত্রীদের কথা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। কিন্তু আমি সেদিন জানতাম না যে, তরুণ রাজনৈতিক কর্মী তাজউদ্দীন আহমদ রমনা পোস্ট অফিসের সামনের রাস্তায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে পিকেটিং করছেন, তিনি স্বভাবগতভাবে ইংরেজিতে ডায়েরি লিখে রাখেন এবং কেবল ১১.৩.৪৮ তারিখ দিয়ে ঐ রাতেই ধর্মঘটের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে যে ডায়েরি লিখেছেন তা-ই নয়; তার প্রস্তুতিপর্বে ২-৩-৪৮ তারিখের ডায়েরিতে ইংরেজিতে তিনি লিখেছেন: “সকাল ৬টায় উঠলাম। পাঠ্য পড়া: না। কিছু পড়াশোনা হয়নি। সকাল ৮.৩০: রাস্তায় বেরুলাম। নয়া সড়ক হোটেল থেকে জহর আলী গাড়িওয়ালাকে সঙ্গে নিলাম এবং ৯টায় ডাক্তার করিমের ওখানে গেলাম। ডাক্তার করিম তাকে ডাক্তার ওদুদের কাছে নিয়ে গেলেন–১১টায়। তাকে ভর্তি করালেন এবং বেরিয়ে এলেন। হাসপাতালে জনাব ইদ্রিস আলী দেওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। ব্যাংকে এসে ৭০ টাকার একটি চেক ভাঙালাম সোয়া বারটায়। মেসে ফিরলাম সাড়ে বারটায়। খাওয়া খেলাম দেড়টায়। নৈমুদ্দীন সাহেব এলেন বিকেল দুটায়। তার অনুরোধে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি ইশতেহারের খসড়া তৈরি করলাম। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় সভায় যোগ দিলাম–জনাব কামরুদ্দীন সভাপতিত্ব করলেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন: জনাব শামসুল হক, শামসুদ্দীন, সরদার এফ. করিম, তোয়াহা, অলি আহাদ, আজিজ আহমদ, নৈমুদ্দীন, অধ্যাপক কাশেম, মিস লিলি খান, আনোয়ারা খাতুন, টি.আলী, এ.টি.এম. হক, আলী আহমদ, মহিউদ্দীন, ওয়াদুদ, শওকত, আউয়াল, মাহবুব, নুরুল আলম, শহীদুল্লাহ, অজিত বাবু, এ. ওয়াহেদ চৌধুরী। এছাড়া আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। রাত দশটায় ফিরলাম। বিছানায় গেলাম সাড়ে দশটায়। আবহাওয়া: স্বাভাবিক।” “একটি হলে অনুষ্ঠিত ৪৮-এর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে সর্বদলীয় সভার ওপর একটি যুবকের রোজনামচা। সংবাদপত্রে প্রেরিত রিপোর্টারের রিপোর্ট নয়। যুবক নিজে এ সভায় সভাপতিত্ব করেননি। নিজে বক্তৃতা করেছেন বলেও উল্লেখ নেই। অথচ যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে একটি বড় সংখ্যকের নাম এ রোজনামচাকে ইতিহাসের এক অমূল্য দলিলে পরিণত করেছে। এই সভার এমন চিন্তারত বিবরণ সেদিনের কোন সংবাদপত্রেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভাষা আন্দোলনের কমিটি কিংবা অপর সংগঠক কারোর কাছেই রক্ষিত নাই এমন বিবরণ। উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গের অনেকেই আজ গত। যারা জীবিত তারাও এই রোজনামচার মধ্যে নিজেদের নামের উল্লেখ দেখে কেবল শিহরিত হবেন না, নিজের অতীত অস্তিত্বকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতে পারার পূর্বে উজ্জীবিত বোধ করবেন। আবার এও সত্য যে এই ব্যক্তিবর্গের প্রাসঙ্গিক পরিচয় এবং তখনকার পূর্ববঙ্গের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উন্মেষকালের আলোচনা বাদে আজকের পাঠকের কাছে এ রোজনামচা কয়েকটি অপরিচিত নামের তালিকা বই আর কিছু বলেই অনুভূত হতে পারবে না।” তাজউদ্দীন আহমদ অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। আওয়ামী লীগকে বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক-প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন উজ্জীবনে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি জাতীয়করণ করেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় (সহযোদ্ধা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ) নিহত হন। কারাগারের প্রচলিত নিয়ম অগ্রাহ্য করে প্রবেশকারী সশস্ত্রবাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন–৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ। লেখক: গবেষক ও পরিবেশবিদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..