একুশের চেতনা ও বাংলাদেশের কৃষক

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশের মানুষ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক ছিলো। কিন্তু ১৯৪৮ সালেই তাদের শুনতে হলো, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। রুখে দাঁড়ালো মানুষ। তাদের ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের রক্ত ঢেলে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলো পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে, আজ যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। চিরকালের জন্য ফেব্রুয়ারি চিহ্নিত হয়ে রইলো বাঙালির অধিকার আদায়ের মাস হিসেবে। উন্মেষ হলো জাতীয় চেতনার, আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, বাঙালির হাজার বছরের গতিশীল সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতি। জেগে ওঠলো বিজ্ঞানভিত্তিক মুক্ত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা। অন্তরে বাসা বাঁধলো মুক্তির লক্ষ্যে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। এই নতুন দর্শন, উপলব্ধি, অতীব গুরুত্ব বহন করে। আমরা হাতেকলমে শিখলাম, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়তে হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তারপর এই ধারায় বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেলাম লাল-সবুজের নতুন পতাকা। সব মিলিয়ে বলা যায়, লড়াই চালিয়ে সকল বাধা পেরিয়ে মুক্তির মানসে সামনের দিকে এগোনোই মহান একুশের চেতনা। এই দর্শনের আলোকে দেখতে হবে বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষিকে। কৃষক তারাই যারা মাটি কর্ষণ করে উৎপাদন কার্যটি সম্পন্ন করেন। জমি ও কৃষক এক অবিচ্ছিন্ন বিষয়। সেদিক বিবেচনায় ‘কৃষক’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই এ সমাজের বিভাজন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যেমন, বড় কৃষক, মাঝারি কৃষক, ছোট ও প্রান্তিক কৃষক ও ভূমিহীন কৃষক। এসব বিভাজন ঠিক হয়েছে জমির মালিকানার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক ২০১১ সালের কৃষিশুমারি মোতাবেক যাদের দখলে ৭.৪ একর বা এর উপর জমি আছে তারা বড় কৃষক। এর নিচের জমি অর্থাৎ ২০-২২ বিঘা জমির (১ বিঘা= .৩৩ শতাংশ ) মালিক মাঝারি কৃষক। আর যারা ২.৪ একর জমির মালিক তারা ছোট কৃষক। এছাড়া ভূমিহীন কৃষক হচ্ছে যাদের চাষের জমি নেই বা শুধু ভিটেটা আছে। তারা পরের জমিতে কৃষিকাজ করে। দেশে মোট কৃষকের ১.৭ শতাংশ হচ্ছে বড় কৃষক, যাদের দখলে আছে ফসলি জমির ৬৩.৩৭ শতাংশ। মাঝারি কৃষক হচ্ছে ১০.৩৮ শতাংশ। তার মানে দাঁড়ালো, বড় আর মাঝারি কৃষক ১২.০৮ শতাংশের দখলে আছে কৃষি জমির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ সিংহভাগ। আজকের দিনে ধান, সব্জি, মাছ, তামাক, ভুট্টা, ফুল, ফল, তৈলবীজ, কুমির, সাপ, ব্যাঙ এসব চাষসহ পশু-পাখি পালনকারীরা সবাই চাষি। তবে কৃষকদের মধ্যে বড় অংশ হচ্ছে ধানচাষি, কারণ মোট ফসলি জমির ৭৪.৮৫ শতাংশে ধানচাষ হয় (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রণীত পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০১৭)। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। সেদিক থেকে ধানচাষিরাই হচ্ছেন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে প্রধান সৈনিক। তাদের অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অথচ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ধরে তারা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বড় কৃষক ও মাঝারি কৃষক ইতোমধ্যে ধান বিক্রির পর উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে ধানচাষ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন, এমন কি তাদের সন্তানরাও আর ধানচাষে থাকছেন না। এভাবে জমির সিংহভাগের মালিকরা কৃষি উৎপাদন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়ায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার বিরূপ প্রভাব অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় পড়তে বাধ্য, কারণ জিডিপির ১৪.১০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)। আমরা জানি, লোকশান ক্ষয় প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করতে সরকারকে একটি কৃষিনীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা আজো হয়নি। গ্রামে ভূমি ব্যবহার-নীতি আবশ্যক। থাকতে হবে সার, বীজ, কীটনাশকসহ সুলভে সেচের জন্য ডিজেল, বিদ্যুৎ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুব্যবস্থা। সহজ কৃষিঋণ ও ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এক্ষেত্রে সরকারের নজর নেই, যা আছে তা লোক দেখানো। এরপর আমরা যদি ছোট কৃষক ও ভূমিহীন কৃষক প্রসঙ্গে আসি দেখতে পাবো এরাই হচ্ছেন বর্তমান সময়ে প্রকৃত মেহনতি কৃষক। তাদের সমস্যার অন্ত নেই। প্রধান সমস্যা হচ্ছে, তাদেরকে পরের জমি ব্যবহার করে কৃষিকাজ করতে হয়, সে নানা পদ্ধতিতে। যেমন টংক, রংজমা, লিজ, বর্গা ইত্যাদি পদ্ধতি। কখনো এক ফসলের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ জমির মালিককে দিয়ে চাষ করা হয় এবং ফসল উঠলে সে চুক্তির অবসান ঘটে, তারপর নতুন চুক্তিতে আসতে হয়। এখানে কাজ করে দারুণ অনিশ্চয়তা, যা ?নিবিড় উৎপাদন বৃদ্ধির অন্তরায়। এ বিষয়টি প্রাচীন, সামন্তযুগীয়। বর্গা প্রথাও সামন্তযুগের অবশেষ, আধুনিকতার বিপরীতে। এখানেও ভূমি ব্যবহারের নিশ্চয়তা পায় না কৃষক। উৎপাদন বৃদ্ধিতে জমির উর্বরতা বাড়ানো একটি শর্ত হলেও কৃষক তা করতে আগ্রহী হয় না এই অনিশ্চয়তার জন্য। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। ভূমিহীন কৃষকরা বাংলাদেশে কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়। ফলে তারা সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত যা উৎপাদন ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এই মেহনতি কৃষকরা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে পারে না অর্থের অভাবে। তাদেরকে চড়া সুদের এনজিও বা মহাজনী ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর প্রান্তিক কৃষক যদি কৃষিঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হয়ে যায়। এসব বিষয় কৃষকের জীবন ও কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করে, যা মোটেও কাম্য নয়। ফলে সব মিলিয়ে ত্বরান্বিত হয় নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া এবং গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয় ছোট ও ভূমিহীন কৃষকরা। এ প্রক্রিয়া আমাদের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিকে বাড়াচ্ছে, কৃষির ক্রমবিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। সব মিলিয়ে বলা যায় আমাদের কৃষক ও কৃষি মোটেও ভালো নেই। কৃষক বীজের জন্য বহুজাতিক কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছে। গ্রামীণসমাজ ও অর্থনীতিতে ক্ষমতাসীন ও তাদের অনুসারী টাউটদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হচ্ছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষি উপকরণ সহজে কৃষকের নিকট পৌঁছানোর সুব্যবস্থার অভাবে কৃষক ও কৃষি উৎপাদন আজ হুমকির মুখে পতিত। সেজন্য সরকার অনুসৃত লুটেরা অর্থনীতির প্রণেতা বাজার অর্থনীতি একমাত্র দায়ী। এজন্যই আজ কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা লুটার অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই নীতির কারণেই কৃষক আজ ধানচাষে অনাগ্রহী হয়ে অন্যরকম চাষ যেমন মাছচাষ, সব্জিচাষ, ফলচাষ ও পশুপাখি পালনের দিকে এবং নানা কাজ যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসা, রিকশা-ভ্যান-অটোরিকশা চালানো বা শ্রম বাজারে নাম লেখাচ্ছে। কিন্তু সরকার অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতির কারণে কোথায়ও তারা ভালো অবস্থানে নেই, কেবলই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। আমরা আমাদের আলোচনা একুশের চেতনা দিয়ে শুরু করেছিলাম। কৃষক ও কৃষির সংকট থেকে উত্তরণের মানসে আমাদেরকে সেখানেই ফিরে যেতে হবে। আমরা জানি সাম্রাজ্যবাদ আমাদের ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো। সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার সরকারের নিকট আন্দোলনের আপডেট পাঠিয়ে একে নস্যাৎ করতে চেয়েছিলো। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল আমেরিকার সপ্তম নৌবহর এসেছিলো বঙ্গোপসাগরে। আর পঞ্চাশ বছর ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারগুলোর ওপর চড়াও হয়ে সাম্রাজ্যবাদই জনগণের মুক্তির পথে মূল বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশের মেহনতি কৃষক সমাজকে এ বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। কৃষকদেরকে শ্রমিকসহ অন্যান্য মেহনতি মানুষের সাথে জোট বেঁধে অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে হবে। আর লড়াইয়ের জন্য চাই অস্ত্র। এই অস্ত্র হচ্ছে নিজস্ব স্বাধীন কৃষক-গণসংগঠন, যা গড়ে তুলতে হবে আন্দোলনের মাঠে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে চিহ্নিত করতে হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুকে। মনে রাখতে হবে মুক্তির জন্য সংগঠিত হওয়ার বিকল্প নেই, লড়াইয়ের বিকল্প নেই। কায়েমি স্বার্থবাদীরা কৃষকদের কোনো ছাড় দেবে না, ভারতের বর্তমান কৃষক-আন্দোলন এর উদাহরণ। হতাশার কিছু নেই, বাংলাদেশের কৃষকের বুকে জ্বলছে একুশের বিপ্লবী চেতনা। আমাদের জয় সুনিশ্চিত, ইতিহাস সে কথাই বলে। লেখক: কলামিস্ট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..