১৯৭০’র অসাধারণ একুশের সংকলন ‘বিদ্রোহী বর্ণমালা’

এ এন রাশেদা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

হিসেবের নিরিখে একান্ন বছর। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের বছর। পাকিস্তানের নির্বাচনের বছর। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনকালে জানতে ইচ্ছে করছে- সেসময়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের কথা যারা ভাবতেন, তাদের ভাবনার জগৎ কেমন ছিল? দীর্ঘদিন ধরে সংকলনটি সযত্নে রাখলেও দু-একটি কবিতা ছাড়া মনোযোগ দিয়ে তেমনভাবে অনেক কিছুই পড়া হয়নি। শুধু প্রচ্ছদ দেখে গর্ববোধ করেছি। মাত্র দিন কয়েক আগে হঠাৎ হাতে আসা সংকলনটি সত্যিকার অর্থে পড়তে গিয়ে মনে হলো- সে সময়ে অর্থাৎ ঊনসত্তরে এদেশের কবি-সাহিত্যিকরা অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ধারায় ঋদ্ধ ছিলেন, তাতো চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশক ধরে গড়ে ওঠারই ফল। তাই ছিন্নভিন্ন, অধিকারহারা মানুষের কথাই ফুটে উঠেছে তাদের কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে। মানুষকে সংগঠিত করতে রাজনৈতিক কর্মীরা জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন। জেলের মধ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় মৃত্যুবরণও করেছেন। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করে স্বাধীনতাও এনেছেন। বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই কোনো একক দলের নয়– সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের যুদ্ধে আমরা আছি, এতদিন ধরে আমরা যা চেয়েছি। যদিও ’৭৫ পরবর্তীতে সরকারসমূহ যোজন যোজন দূরে সরে এসেছে। কোন কবি এবং সাহিত্যিকদের লেখায় পূর্ণ ছিল ওই সংকলনটি? কবি শামসুর রহমান, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, সরদার ফজলুল করিম, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, কবি সিকান্দার আবু জাফর, সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত, কবি মাহমুদ আল জামান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, জাহাঙ্গীর মহিউদ্দিন খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খান মোহাম্মদ ফারাবী, আব্দুল কাইয়ুম, কবি আক্তার হুসেন, আজমিরী ওয়ারেস, কাজি হাসান হাবিব, আল মাহমুদ, নাসিমুন আরা মিনু, মাসুদ আহমেদ মাসুদ, কাজী মমতা হেনা, নুরুল ইসলাম, আসেম আনসারী প্রমুখ। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ নিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার ১/৪ ডিমাই সাইজের চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের সাদা কাগজে ছাপা, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদে এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূরের সম্পাদনায় এক টাকা মূল্যমানের ‘বিদ্রোহী বর্ণমালা’– অসাধারণ উজ্জ্বল লাল, নীল, হলুদ ও সাদা রঙে ফুটে উঠেছিল সত্যিকার অর্থেই বর্ণমালার বিদ্রোহ। একি শুধুই বর্ণমালার বিদ্রোহ- শিল্পীর চোখে দেখা দিয়েছিল, না কি গণমানুষের বিদ্রোহের কথাও শিল্পীর মনে ধরা দিয়েছিল? ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তো সে কথাই বলেছিল। সে কথা স্মরণ করে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’। ‘এখানে এসেছি কেন? এখানে কি কাজ আমাদের? এখানে তো বোনাস ভাউচারের খেলা নেই কিংবা নেই মায়া কোনো গোল টেবিলের, শাসনতন্ত্রের ভেল্্কি বাজি সিনেমার রঙিন টিকেট নেই, নেই সার্কাসের নিরীহ অসুস্থ বাঘ, কসরৎ দেখানো তরুণীর শরীরের ঝলকানি নেই কিংবা ফানুস ওড়ানো তা-ও নেই, তবু কেন এখানে জমাই ভিড় আমরা সবাই? আমি দূর পলাশতলীর হাড্ডিসার ক্লান্ত এক ফতুর কৃষক, মধ্যযুগী বিবর্ণ পটের মতো ধু-ধু, আমি মেঘনার মাঝি, ঝড় বাদলের নিত্য সহচর, আমি চটকলের শ্রমিক, আমি মৃত রমাকান্ত কামারের নয়ন পুত্তলি, আমি মাটিলেপা উঠোনের উদাস কুমোর, প্রায় ক্ষ্যাপা, গ্রাম উজাড়ের সাক্ষী, আমি তাঁতী সঙ্গীহীন, কখনো পড়িনি ফার্সি, বুনেছি কাপড় মোটা-মিহি মিশিয়ে মৈত্রীর ধ্যান তাঁতে আমি রাজস্ব দপ্তরের করুণ কেরানি, মাছি-মারা তাড়া খাওয়া, আমি ছাত্র, উজ্জল তরুণ, আমি নব্য কালের লেখক, —————————— আমরা সবাই এখানে এসেছি কেন? এখানে কি কাজ আমাদের? কোন সে জোয়ার করেছে নিক্ষেপ আমাদের এখন এখানে এই ফালগুনের রোদে?’ শামসুর রাহমান ১৯৬৯-এ তাঁতী, কুমোর, চটকলের শ্রমিক, ঝড়-বাদলের মাঝির অবস্থা এবং হাড্ডিসার চাষীর বর্ণনা দিয়েছেন। জীবনের ডাকে তারা সবাই বাইরে এসেছেন- অর্থাৎ ১৯৬৯-এ। তিনি আগামীতে গণজোয়ার অনুমান করেছেন হয়তো। কারণ তারপর তিনি জীবনের মানের কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে বলেছেন, “জীবন মানেই/ তালে তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে চলা, নিশান ওড়ানো,/ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শূন্যে মুঠি তোলা,/....” আর রাজপথে কবি দেখলেন- “ দেখলাম আমরা সবাই জনসাধারণ....” ‘বিদ্রোহী বর্ণমালা’র সব কবির কবিতার অংশবিশেষ তুলে ধরা সম্ভব না হলেও দু-একজনের শিরোনামটি বলা যেতে পারে। কবি আল মাহমুদ লিখেছেন– ‘আমিও রাস্তায়’, কাইয়ুম চৌধুরী লিখেছেন- ‘সেই দিন’, আখতার হুসেন লিখেছেন- আই. বির ‘ডায়েরি থেকে’ ইত্যাদি। অর্থাৎ ১৯৭০ এ সবাই দেখছেন সামনের বিক্ষুব্ধ দিনগুলি। ‘ধন্য একুশে ফেব্রুয়ারি’ শিরোনামে সত্যেন সেন যা লিখেছেন তার মর্মকথা হলো– পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৯ সালেই শতাধিক রাজবন্দীকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ভর্তি হতে দেখেছেন তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে। তারা লীগ শাহীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য জনতাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। জনতা সেদিন এই আহ্বানের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। তাই তারা এই ডাকে সাড়া দেয়নি। জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আহ্বানকারীরাই জেলখানায় বন্দী হয়ে গেলেন। কিন্তু তাদের মনোবল ভাঙেনি। জেলের ভেতরের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ৫৮ দিন অনশন করেছেন। শিবেন রায়সহ বহু বন্দী মৃত্যুবরণ করেছেন। যশোর জেলা কৃষক নেতা বৈরাগী এবং ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলে গুলি চালানোর ফলে সাতটি মহামূল্যবান প্রাণ-প্রদীপ নিভে গেছে। অনেকে জখম হয়ে অকর্মণ্য হয়ে গেছেন। অনেক ঘা খাবার পর জেলখানার ভেতরে এবং বাইরে কর্মীরা বুঝতে পেরেছেন– কোথায় তাদের ভুল। সেদিন জনতার মনের ভাবটা তারা নিজেদের কল্পনার দৃষ্টি দিয়েই দেখেছিলেন।’’ এর ফলে জেলখানার বন্দীদের মধ্যে অবসাদের ভার দেখাও স্বাভাবিক না বলে সত্যেন সেন জানিয়েছেন। ১৯৫২ সালে কুমিল্লা জেলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেখেছেন- আশে পাশের বাড়ির ছাদের ছেলের দল ভিড় করে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছে আর চিৎকার করে আশ্বাসবাণী শোনাচ্ছে– ‘কিছু ভাববেন না আর ক’টা দিন অপেক্ষা করুন, আমরা বার করে নিয়ে আসবো’। সত্যেন সেন লিখেছেন, ‘ওদের কথা শুনে আমার দু’চোখ জলে ভরে উঠে। যে দিকে কান পাতি সেদিকেই জনতার জয়ধ্বনি। জনতা জেগেছে। আমরা বলেছিলাম, জনতা বহু পিছনে পড়ে আছে, নিকট ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলন সম্ভব হবে না। আবারও আমাদের অংক ভুল বলে প্রতিপন্ন হয়ে গেল। আমাদের সমস্ত হিসাবকে নস্যাৎ করে দিয়েছে জনতা, একুশে ফেব্রুয়ারির বাণী বহন করে বীর পদভারে এগিয়ে চলেছে। ধন্য একুশে ফেব্রুয়ারি।’ চমৎকার বিশ্লেষণ সত্যেন সেনের ১৯৫২ পর্যন্ত। বায়ান্নর সতের বছর পর ১৯৬৯- এসে মুজাহিদুল ইসলাম ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ৬ দফার সঙ্গে ছাত্রদের পাঁচ দফা যুক্ত করে ১১-দফার আন্দোলনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে জাতিগত সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে ১৯৭০ এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি লিখেছেন- ‘জাতিসমস্যা সমাধানে প্রগতিশীলদের কর্তব্য।’ আমি শেষ দিক থেকে দুটি প্যারা উদ্ধৃত করছি– “পূর্ববাংলার প্রগতিশীলদের একই দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া অগ্রসর হইতে হইবে। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামকে সত্যিকার অর্থে মেহনতি জনগণের নিকট অর্থবহ করার জন্য সামন্তবাদের শোষণ হইতে কৃষককে মুক্ত করার দাবি, একচেটিয়া পুঁজির শোষণকে খতম করিয়া, শিল্প বাণিজ্যের অবাধ ও বিকাশের সুযোগ করিয়া দেওয়ার দাবি এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণের হাত হইতে দেশকে পরিপূর্ণভাবে মুক্ত করার দাবিও উত্থাপন করিতে হইবে। ইহা ছাড়া সিন্ধি, বেলুচ, পাঠান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে সমর্থন করিতে হইবে। এই আন্তর্জাতিক চেতনা বাঙালি দেশপ্রেমকে আরও অগ্রসর করিবে এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্যাতিত মানুষের সংগ্রাম জোরদার হইবে। সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীরা, যেখানে ‘অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম’ ইত্যাদি ধ্বনি তুলিতেছে, সেইস্থানে প্রগতিশীলদের ‘বাঙালি ও অন্যান্য জাতির প্রত্যেকের আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য’ ক্ষমতাসীন শোষক শ্রেণীসমূহের বিরুদ্ধে সকল নিপীড়িত জাতির শোষিত জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিতে হইবে। পাকিস্তানের জাতি সমস্যা সমাধানের জন্য বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার কায়েম করার জন্য সঠিক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পথে অগ্রসর হইতে হইবে। সেই গণআন্দোলনের শক্তি শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে পরিচালিত করিতে হইবে। এবং সকল নির্যাতিত জাতিসমূহের জনসাধারণকে সেই আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করিতে হইবে। সকল নিপীড়িত শ্রেণির মানুষের ঐক্যবদ্ধ দুর্বার সংগ্রাম দ্বারা একচেটিয়া পুঁজি সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে খতম করিয়া শ্রমিক- কৃষক-মধ্যবিত্ত ও কল্যাণকামী জাতীয় বুর্জোয়াদের সমবায়ে গঠিত জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়াই বাঙালি ও অন্যান্য জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কায়েম হইবে। এই সংগ্রামে সকল নির্যাতিত জাতিকে সমস্বার্থবোধ হইতে ঐক্যবদ্ধ করিতে হইবে। এই পথেই পাকিস্তানের জাতি সমস্যার সমাধান হইবে।” উদ্ধৃতিটুকু দীর্ঘ হলেও প্রণিধানযোগ্য। এটিই ছিল প্রগতিশীলদের চিন্তা। শুধু বাঙালির কথা ভাবার জন্যই বঙ্গবন্ধু জাতীয় সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র লারমাকে বলেছিলেন– “তোরা সব বাঙালি হয়ে যা”। তা যে কত পশ্চাৎপদ চিন্তা তা ভাবাই যায় না। আজও পার্বত্য এলাকার জনগোষ্ঠী তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। শুধু বাঙালি হলে যে হয় না মানুষ হতে হয়- বাংলাদেশের মানুষ তা দেখছে, কিন্তু হৃদয়াঙ্গম কি করতে পারছে? না পারছে না। সেজন্য যে দীক্ষা দরকার তা বঙ্গবন্ধুর দলে যেমন অনুপস্থিত তেমনি সমগ্র দেশে। সবাইতো বাঙালি, তাহলে এত রক্তপাত কেন? স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনকালে দেশ এত অশান্ত কেন? আজ বাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালি কেন? ‘জাগো জাগো-বাঙালি জাগো’ আওয়ামী লীগ আজ কাকে জাগতে বলবে? বাঙালি জেগেছে, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে কিন্তু সৎ দেশপ্রেমিক মানুষ হয়েছে কি? আর সে কারণেই তো হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। বিদেশের মাটিতে বেগমপাড়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বয়ং দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। দেশজুড়ে অন্যায়-অনাচার হয়– তা শুধুই বাঙালি হওয়ার জন্যই তো? প্রগতিশীলদের দায়িত্ব আজ অবলীলাক্রমেই পড়েছে– বাঙালিকে মানুষ করার বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ধারাকে বেগবান করার। এর বিকল্প যে কিছু নেই। লেখক: সম্পাদক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..