হারিয়ে যাচ্ছে কি ‘বাতাসে একুশের গন্ধ’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

‘একুশ’ এবার তার ৭০ বছরে পদার্পণ করলো। আমি আমার সেই কিশোর বয়স থেকেই ‘একুশের’ সঞ্জিবনী মন্ত্রের পরশে বছর-বছর প্রত্যয় দীপ্ত হয়ে চলেছি। এর মাঝেই একথা ভেবে মনে জাগছে বেদনা, জাগছে শঙ্কা যে- হারিয়ে যাচ্ছে কি ‘বাতাসে একুশের গন্ধ’। আজকাল কি আগের মতো ‘বাতাসে একুশের সেই গন্ধ’ পাওয়া যায়? একথা ঠিক যে, সময়ের প্রবাহে সবকিছুই নতুন রূপ ও উপাদানে সঞ্জীবিত হয়। গন্ধেও আসে নতুন সুবাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই নতুন যদি এমন হয় যার ফলে ‘একুশের’ অনুভব ও বোধ হারিয়ে যেতে থাকে– তাহলে? ‘বাতাসে একুশের গন্ধ’ যদি ফিকে হতে থাকে– তবে? এসব ভাবনার কারণেই মনে আজ আমার গভীর বেদনা ও শঙ্কা! বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে। রফিক, শফিক, সালাম, জাব্বার, বরকতদের বুকের রক্তে রচিত হয়েছিল ১৯৪৮ থেকে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের নতুন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। বায়ান্নর আগে ও পরে মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য, জনগণের রুটি-রুজির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য আরও অনেক গণসংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে। আরও রক্ত ঝরেছে। শহীদ হয়েছে আরো অনেকে। কিন্তু বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিই আজও থেকে গেছে বাঙালির ‘শহীদ দিবস’ হয়ে। দেশের জন্য আত্মদানের মহিমা, পুলিশের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া বুক, উড়ে যাওয়া মাথার খুলি, দুঃখিনী মায়ের কোল খালি করে চিরবিদায়ের বিরহ যন্ত্রণা– এগুলোই সেই ‘অমর একুশের’ প্রতিচ্ছবি। গ্রীক ট্র্যাজেডির মতো বেদনা ও বীরত্বের অমর গাঁথা। শহীদ দিবস পালনের নানা অনুষ্ঠানমালায় তাই শুরু থেকেই যুক্ত থেকেছে হৃদয় নিংড়ানো বেদনা, বুক-ফাটা-কান্না, সুকরুণ ‘প্যাথোজ’। সেই শোক ও বেদনার অনুভূতিকে রূপ দিয়েছে একুশের ‘প্রভাতফেরি’। পুরুষদের পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি বা প্যান্ট-সার্ট। মেয়েদের কালো পাড়ের সাদা শাড়ি। বুকে কালো ব্যাজ। নগ্নপদে দু’লাইনে সুশৃঙ্খলভাবে রাজপথ ধরে পদযাত্রা। কারো হাতে ব্যানার অথবা ফেস্টুন। অধিকাংশের হাতে ফুল। একেক দলের সামনে বা মাঝে গলায় হারমোনিয়াম ঝোলানো। সমবেত কণ্ঠে গান। প্রধানত, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো... আমি কি ভুলিতে পারি।’ মাঝে মধ্যে স্লোগান ‘শহীদ স্মৃতি, অমর হোক’, ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা, চালু কর’। আর সমসাময়িক রাজনৈতিক স্লোগানের নিনাদ। পাড়া-মহল্লা থেকে প্রভাতফেরিগুলোর শুরু। রাত ভোর হওয়ার আগেই গান গেয়ে যাত্রা শুরু। রওনা হওয়ার সময়টা এমনভাবে সাজানো যেন আজিমপুর গোরস্থানে শহীদদের কবরগুলোতে ফুল দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যখন মিছিল পৌঁছাবে তখন পূব-আকাশ মাত্র আলোকিত হতে শুরু করেছে। কিম্বা আরো কিছুটা বিলম্বে। সর্বত্র ভাব-গম্ভীর বিনম্র পরিবেশ। সবকিছু নিবেদিত শহীদদের স্মৃতিতে, তাঁদেরকেই সবচেয়ে ওপরে স্থান দিয়ে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এই আবেগঘন বেদনার পরিমণ্ডল বিনষ্ট করার সাহস নেই কারোই। কোথায় আজ সেই ‘প্রভাতফেরির’ আবেগঘন পরিবেশের আবেশ, হারিয়ে গেছে সেই আবেশ। ‘একুশে’ যেমন বেদনা-শোকের প্রতিচ্ছবি, তেমনি তা হল সাহস ও বীরত্বের, সংগ্রামের ও প্রতিবাদের প্রতীকী উপলক্ষ। তাই মৌন সম্ভ্রমে শান্ত-স্থির পায়ে শহীদ মিনার অতিক্রম করার সময় বিনম্র হাতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে শহীদ মিনার চত্বর ত্যাগ। প্রভাতফেরির সমাপ্তি। শহীদ মিনার চত্বর ছেড়ে যাওয়ার পরেই কেবল নগ্ন পায়ে স্যান্ডেল চড়ানো। তার পরেই কেবল লাইন ভেঙে জঙ্গি মিছিল। সেই মিছিলে সমসাময়িক নানা ইস্যুতে স্লোগান। অনেকেরই গন্তব্য বাংলা একাডেমি। কারো কারো আবার প্রভাতফেরির মতোই গান গাইতে গাইতে দু’সারিতে মিছিল করে নিজ নিজ পাড়ায় ফেরা। ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’, ‘অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা চাই’, ‘আইয়ুব শাহী খতম কর’, ‘সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’, ‘পূর্ব বাংলাকে শোষণ করা চলবে না’, –কত রকম সব সরব স্লোগান। বেলা ১০টা-১১টার মধ্যে প্রভাতফেরির পালা শেষ। সেসব আজ নেই। তাই মনে ভাবনা জাগছে– ‘আগের মতো সেই একুশ কই’? ভোর থেকেই একুশের সংকলন বিক্রির ধুম। প্রভাতফেরির পথে পথে, আর সবচেয়ে বেশি বাংলা একাডেমি চত্বরে। অগণিত সব সংগঠন-সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত এসব সংকলন। ব্যক্তিগত প্রকাশনা আর লিটল ম্যাগাজিনও অনেক। মুখে মুখে আলোচনা– কাদের একুশে-সংকলন এবার সবচেয়ে ভালো হল। কোন সংকলনের বিক্রি সবচেয়ে বেশি হল। এসব শেষ হতে দুপুর পার। বিকেলে পল্টন ময়দানে জনসভা। কারো হয়তো সেদিনই, কারো বা পরের দিন। সন্ধ্যায় শহীদ মিনারকে মঞ্চ করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, আব্দুল লতিফ, জাহেদুর রহিম, অজিত রায়– সেরা সব গণসঙ্গীত শিল্পীদের প্রাণ উজাড় করা গান। কোথায় আজ সেরূপ শিল্পিত অনুষ্ঠান মালা? শহীদ মিনার সাজানোসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের হাতে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ট কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সহযোগিতায় আগের দিন রাত থেকেই শুরু সে কাজ। কয়েকটি দল গেছে ফুল সংগ্রহ করে আনতে। বাগান খালি করে বিছানার চাদর দিয়ে বড় ঝোলা বানিয়ে তাতে ফুলের ডালি বয়ে এনে তারা তা জমা করেছে শহীদ মিনারের পাদদেশে। সন্ধ্যার পরেই চারুকলার শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞ শিল্পীর নির্দেশনায় রাস্তায় আলপনা আঁকা শুরু হয়েছে। একদল কর্মী প্রেসের কাজ শেষ করতে গলদঘর্ম। ভোর হওয়ার আগেই একুশের সংকলনের ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হবে। শেষ মুহূর্তে পাওয়া প্রবন্ধ-কবিতা ছাপা মেশিনে উঠিয়ে দেয়া, অন্য যে প্রেসে প্রচ্ছদ ছাপা হচ্ছে তা নিয়ে এসে বাঁধাইখানায় জমা করা, প্রেস ও বাঁধাই কর্মীদের কাছে কাকুতি-মিনতি করে তাদেরকে সারা রাত জেগে হলেও বইয়ের ডেলিভারি নিশ্চিত করতে অনুরোধ করা। এসব নিয়ে টেনশন ও ব্যস্ততার শেষ নেই। মন প্রাণ উজাড় করা সর্বব্যাপি স্বতঃস্ফূর্ত সচল সেরূপ চঞ্চলতা আজ কোথায়? সবকিছুকেই তো আজ নামিয়ে আনা হয়েছে ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের’ বাণিজ্যিক পর্যায়ে! প্রভাতফেরিতে যাওয়ার পথে পাশ দিয়ে হেঁটে চলা পথযাত্রীকে শহীদদের সম্মানে অন্তত আজকের একটি দিন স্যান্ডেল-পাদুকা খুলে পথ চলার জন্য অনুরোধ। ফেরার পথে ডানে-বায়ে তীক্ষè নজর, দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখার জন্য আগেই অনুরোধ করে যে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, তা কেউ অমান্য করেছে কি না। উর্দু লেখাগুলো আলকাতরা দিয়ে মুছে দেয়া হয়েছে আর ইংরেজি লেখাগুলো কাগজ দিয়ে সাময়িকভাবে ঢেকে দেয়া হয়েছে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন নিয়ে সকলের মধ্যে আবেগময় আলোচনা। সচরাচর প্যান্ট-শার্ট পড়া মানুষরাও এ দিনে পড়েছেন পাজামা-পাঞ্জাবি। ঘরে-ঘরে সেরূপ স্বদেশপ্রেমের প্রকাশ কি আজ দৃশ্যমান হয়? আজও একুশে ফেব্রুয়ারি-তে আমরা শহীদ দিবস পালন করি ঠিকই। কিন্তু দুঃসহ যন্ত্রণায় মনে ডুকরে আর্তনাদ করে ওঠে একটি প্রশ্ন, ‘সেই আগের মতো একুশ কই?’ ‘বাতাসে একুশের গন্ধ’ কই? একুশের অনেক কিছুই যদিও আগের মতো আছে, কিন্তু বেশিরভাগটা বদলে গেছে। প্রভাতফেরি আছে, কিন্তু সবাই প্রভাতফেরিতে থাকেন না। প্রধান আকর্ষণ মধ্যরাতে টিভি ক্যামেরার সামনে শহীদ বেদিতে মাল্যদানে। নিরাপত্তা আর প্রটোকলের নিñিদ্র ঘেরাটোপে ‘একুশের গন্ধের’ অমৃতসুধা এখন নিঃশেষ প্রায়। মধ্যরাতে হুড়াহুড়ি, কে কার আগে চত্বরে উঠে মালা দেবে। টিভি-র লাইভ কাভারেজ চালু থাকতে থাকতে চেহারা দেখাতে না পারলে চলবে কেন? দলের নেতা-নেত্রীদের ছবিটা, দলের নামে ব্যানারটা সবচেয়ে উঁচু জায়গায় প্রদর্শন করতে না পারলে দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে পারলাম কই? প্রতিপক্ষকে ‘ডাউন’ না করতে পারলে ভাষার প্রতি মর্যাদা প্রকাশ হল কই? লাইন ভেঙে বিশেষ ‘স্ট্যাটাসের’ মানুষ রূপে নিজেকে জাহির করার বীরত্ব না দেখাতে পারলে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে পারলাম কই? শুধু মধ্যরাতেই নয়, এমন অবস্থা থাকে প্রভাতকালেও। টিভি ক্যামেরা যেন হয়ে ওঠে শহীদ মিনারের চেয়েও ‘পবিত্র আকর্ষণ’। শহীদরা উপলক্ষ মাত্র, ‘শহীদ দিবস’ নিছক একটা অনুষ্ঠান সর্বস্ব ব্যাপার। আসল কথা হল নেতা-নেত্রী, দল ও নিজেকে প্রদর্শন করা। সবকিছু দেখে মনে আজ ক্রোধান্বিত প্রশ্ন, কুৎসিত ‘প্রদর্শনবাদের’ হাতে কি ‘শহীদ দিবস’ আজ আবার নতুন করে শহীদ হলো? প্রভাতফেরি আজও আছে। কিন্তু নগ্নপদে পায়ে হাঁটা আর নেই। বলা হয়– স্যুট-বুট পরে ফুল দিলেও নাকি অনুভূতি প্রকাশের কোনো কমতি ঘটে না। প্রভাতফেরিতে আগের মত গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে গান নেই। যুক্তি দেয়া হয়– না থাকলেই কি, হৈ-হট্টগোল আর গাল-গপ্পোর মাঝেই কি শ্রদ্ধা জানানো যায় না? আজিমপুর গোরস্থানে শহীদের কবরে মালা দিতে অল্প লোকই যায়। এত পথ হাঁটা কেন? সেখানে তো টিভি ক্যামেরা নেই। সকলের মাঝে একটিই ভাব– তাড়াতাড়ি চলো, তাড়াতাড়ি চল, রুট ভেঙে লাইন ভেঙে সেখানে, যেখানে টিভি ক্যামেরা-ক্রু আছে। এভাবেই শহীদ দিবস আজ বহুলাংশেই হয়ে উঠেছে কুৎসিত প্রদর্শনবাদ আর মধ্যরাতে চর দখলের কায়দায় কোন দল তার নেতা-নেত্রীর নামে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে জিগির করতে পারবে তার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। লাঠিয়ালদের এই দখলের খেলায় জনতা আজ প্রায় বিতাড়িত। বিতাড়িত শহীদদের মর্যাদাও। শহীদ মিনার চত্বরকে প্রসারিত ও উঁচু করা হয়েছে। সুন্দর করা হয়েছে তার অঙ্গসজ্জা। ফ্লাড লাইটের তীব্র আলোয় সমুজ্জ্বল করা হয়েছে গোটা এলাকা। দৃশ্যমান করা হয়েছে পুলিশ-র্যা বের উপস্থিতি। কিন্তু শহীদ দিবস যেন হয়ে উঠেছে প্রাণহীন। শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, বীরের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি, ভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা আর আদর্শের জন্য সংগ্রামের দৃঢ়পণ শপথ– এসবের খুব কমই এখন খুঁজে পাওয়া যায় একুশে উদ্যাপনের জাঁকজমক অনুষ্ঠানমালায়। তাই দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে আক্ষেপ, ‘বাতাসে একুশের গন্ধ কই’? একুশে উদ্যাপনের রূপটা বদলাতে শুরু হয় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর। আরো সঠিকভাবে বললে ১৯৭০ সাল থেকে। ‘একুশের প্রথম প্রহর’-এর বুদ্ধিটা কার মাথা থেকে এসেছিল জানি না, কিন্তু সেই আওয়াজটা ধরেই একুশের অনুষ্ঠানমালার একটা মহেন্দ্রক্ষণ সৃষ্টি হয়ে গেছে। এবং সেটি হলো মধ্যরাতে বারোটার ঘণ্টা বাজার মুহূর্তটি। ‘প্রভাতফেরীর’ অনুভূতি ও আবেগ সৃষ্টি হওয়া কি কোনোভাবে মধ্যরাতে সম্ভব হতে পারে? বাহাত্তরের পর শুরু হয়ে যায় আগেভাগে আর সবচেয়ে উঁচুতে নেতার ছবি বা দলের ব্যানার টাঙানোর সংঘাতময় প্রতিযোগিতা। মধ্যরাতের মারামারি আর হাঙ্গামা। তবে তা মধ্যরাতেই শেষ হয়ে যেত। পঁচাত্তর পর্যন্ত সকালের প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারের প্রভাতকালীন প্রশান্ত পরিবেশ আগের মতোই ভাবগম্ভীর থাকত। পঁচাত্তরের ‘একুশের’ অনুষ্ঠানমালা ছিল সবচেয়ে সুন্দর করে সাজানো। বর্তমানে প্রচলিত থাকা অলঙ্করণ, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা প্রভাতফেরির রুট ইত্যাদি ব্যবস্থাগুলো সে বছরই প্রবর্তন করা হয়েছিল। তখন থেকে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়েছিল। সেবার ছাত্র-ছাত্রীরাই গলায় লাল স্কার্ফ লাগিয়ে সাদা পোশাক পরে শহীদ মিনার চত্বরে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করেছিল। আমি তখনো ডাকসুর ভিপি। কিন্তু পঁচাত্তরের পর সেই শৃঙ্খলা ও প্রশান্ত ভাব-গম্ভীর পরিবেশ আর রক্ষা করা যায়নি। পুলিশ ও সরকারি বাহিনী দিয়ে সে কাজ করার চেষ্টা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু ডাণ্ডার ভয় দেখিয়ে কি ‘বাতাসে একুশের গন্ধে’ পরিবেশ ভরিয়ে তোলা যায়? অনেকে ভাবতে পারেন যে, এসব কথা হল সেলিমদের মতো প্রবীণদের অতীতমুখীন রক্ষণশীলতার দীর্ঘশ্বাস। পুরানো ‘আচার’-কে আঁকড়ে ধরে থাকার নিস্ফল প্রয়াস। নতুনকে দেখে বৃদ্ধদের আতঙ্কিত আর্তনাদ। কিন্তু আমি বলব, এসব কথা হয়তোবা কিছুটা সঠিক হলেও হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সব ‘আচার’-ই ‘অনাচার’ নয়। রূপ বদলাবে। সে বদল মেনে নিতে হবে। কিন্তু একুশের মর্মবাণীর, তার বোধ ও অনুভবের শুকিয়ে যাওয়াটা মেনে নেয়া যায় না। সেটা তো ‘একুশের’ই মরণ। কিন্তু একুশের মৃত্যু নেই। তার মৃত্যু ঘটতে দেয়া যেতে পারে না। তাই তার অমূল্য স্নিগ্ধতা, শুদ্ধতা, বোধ ও অনুভবের ঐতিহ্যকে অবলম্বন করেই রচনা করতে হবে ‘একুশে’ পালনের নব নব রূপ ও উপাদান। সে দিকে মনযোগী না হলে ‘বাতাসে একুশের গন্ধে’র কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। ‘একুশে’কে কোথাও আর খ্ুঁজে পাওয়া যাবে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..