একুশ মানে মাথা নত না করা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বায়ান্নর একুশ বাঙালির নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে জেগে উঠার প্রথম বিদ্রোহ, যেখানে জাতি একটি চেতনাগত দিক-নির্দেশনা পেয়েছিলো। সেই চেতনা নিয়েই বাঙালি জাতি প্রথম মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে জেগে উঠার স্বপ্ন এই অমর একুশে। একুশের চেতনার মধ্য দিয়েই বাঙালি পেয়েছিলো মুক্তি সংগ্রামের দিশা। বায়ান্নর ফাল্গুনে রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে। রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতদের বুকের রক্তে রচিত হয়েছিল আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। ১৯৫২-র একুশের শহীদেরা হয়ে উঠেছেন বিশ্বের প্রতিটি বর্ণমালার পাহারাদার। বায়ান্নর আগে ও পরে এরকম আরও গণসংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে। আরও রক্ত ঝরেছে। কিন্তু তারপরও বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিই আজও থেকে গেছে বাঙালির ‘শহীদ দিবস’ হয়ে। দেশের জন্য আত্মদানের মহিমা, পুলিশের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া বুক, উড়ে যাওয়া মাথার খুলি, দুঃখিনী মায়ের কোল খালি করে চিরবিদায়ের বিরহ যন্ত্রণা-এগুলোই একুশের প্রতিচ্ছবি। সেই শোক ও বেদনার অনুভূতিকে রূপ দেয় একুশের ‘প্রভাতফেরি’। বায়ান্নর ভাষার লড়াইটা হয়েছিল ঢাকাতে কিন্তু সেই লড়াইয়ের বিস্তৃতি আজ গোটা বিশ্বে। একুশের রক্তসিঁড়ি পাড়ি দিয়ে এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি হলো মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। ‘১৯৫২’ সনের রাজপথ রাঙানো মহান একুশের উদ্দীপনায় ‘৫৪’তে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ‘৫৮’তে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ‘৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬’র ৬ দফা, ‘৬৯’ এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০’ এর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন এবং ‘৭১’ এর বীর বাঙালির অস্ত্রধারণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জন। কিন্তু ব্যর্থতাও আছে। আমরা কি পেরেছি প্রতিটি বাঙালি সন্তানকে তার নিজের মাতৃভাষাকে চেনাতে, জানাতে, পাঠে সক্ষম করতে? আমরা কি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে বর্তমান প্রজন্মের মননে-ধ্যানে-অনুশীলনে বাংলা ভাষাকে বিশেষ স্থান করে দিতে পেরেছি? পেরেছি কি বাংলাদেশের ভাষাভাষি মানুষকে তার মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার দিতে? একজন বাঙালির সন্তানেরা যদি জন্মের পর তার নিজের ভাষায় কথা বলার, সেই ভাষাতেই লেখাপড়া করার অধিকার থাকে তাহলে একজন আদিবাসী সন্তান কেন তার মাতৃভাষায় শিক্ষিত হতে পারবে না? আমরা আসলে লড়ছি উত্তর-দক্ষিণের বৈষম্যহীন সাম্যবাদী একক পৃথিবীর জন্য, যেখানে সারা পৃথিবীর মানুষ হবে পরস্পর প্রতিবেশী। পৃথিবীর সকল জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান করবে, এক ভাষা অন্য ভাষাকে দমনের বদলে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে, এক ভাষার সমৃদ্ধি আরেক ভাষাকে ঋদ্ধ করে তুলবে, ক্ষুদ্রজনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকেও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিশ্বের সকল মানুষ সক্রিয় প্রয়াসে নিয়োজিত হবে-এ সবই তো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্মবাণী। সেই মর্মবাণীকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করার ও তাকে কর্মে রূপায়িত করে তোলার সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব তো ‘একুশে’র দেশের মানুষ হিসেবে আমাদেরই। বিশ্বায়নের ছুঁতোয় কোনো পরভাষাই যাতে আমার মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশকে ব্যাহত করতে না পারে সে ব্যাপারে সকলের সর্তক থাকতে হবে। দেশের সকল নাগরিকের জন্য অভিন্ন শিক্ষাপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সেইসঙ্গে দেশের সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার উন্নয়ন ও বিকাশে সক্রিয় সহযোগিতা দানের দায়িত্ব বহন করতে হবে আমাদেরই। একুশ যেমন বেদনা-শোকের প্রতিচ্ছবি, তেমনই তা হল সাহস ও বীরত্বের, সংগ্রাম ও প্রতিবাদের প্রতীক। একুশ বাঙালিকে শিখিয়েছে যে কোনও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। আমরা যখনই অন্ধকার শক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছি, একুশে হয়ে উঠেছে তখন প্রতিরোধের সাহস। একুশের চেতনায় বাঙালি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। লড়াই করেছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, জাতিসত্তা রক্ষা ও শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজের জন্য। শতকরা ৯০ জন কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষ জীবন বাজি রেখে অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল তাদের পক্ষে আনার জন্যই কমিউনিস্টদের লড়াই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..