কমছে পরিযায়ী পাখি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রকৃতি ডেস্ক : পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রজাতির পাখি শীতপ্রধান দেশ থেকে খাবার ও উষ্ণতার জন্য হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এদেশে চলে আসে। বালিহাঁস, সারস পাখি, ডুবুরি পাখিসহ নানা পরিযায়ী পাখির সঙ্গে দেশীয় পাখির কলকাকলিতে প্রতি বছরের এসময় মুখরিত হয়ে ওঠে দেশের হাওড়-বাওড়, বিলসহ বিভিন্ন জলাশয়। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ফুটতেই ওড়াউড়ি, ছোটোছুটি আর সাঁতার খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে পাখিরা। তাদের কিচির মিচির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে জলাশয়ের চারপাশ। তবে পাখিশিকারিদের তা-ব, জলাশয় কমে যাওয়া, কীটনাশকের অতি ব্যবহার ইত্যাদি নানা কারণে গত কয়েক বছর ধরে পাখির আগমন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তা ছাড়া ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দেও পাখিগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। এবছর দেরিতে হলেও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের হাকালুকি হাওরে অতিথি পাখির কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে। তবে গত কয়েক বছরে তুলনায় এ হাওরে অতিথি পাখির আগমন অনেক কমে গেছে। অতিথি পাখিগুলো মূলত হাকালুকি হাওরের চাকিয়া, কাংলি, গোবরকুড়ি, গৌড়কুড়ি, পিংলা, কালাপানি, ফুটবিল, কৈয়াকোনা বিলে আশ্রয় নেয়। তাই বিলপাড়ের গ্রামগুলোর মানুষের এখন ঘুম ভাঙে অতিথি পাখির কিচিরমিচির শব্দে। অতিথি পাখিরা কখনও জলকেলি, কখনও খাদ্যের সন্ধানে এক বিল থেকে অন্য বিলে ওড়াওড়ি করছে। আর চেঁচামেচিতে মুখর করে তুলেছে হাকালুকিকে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা যায়, এ বছর জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত পাখিশুমারিতে হাকালুকি হাওরের ৪০টি বিলে পাখির সংখ্যা আরও কমে গেছে। এ সময় হাওরে মোট ১৮ হাজার ৬৬০টি পাখি পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে পাখির সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৯৩১টি। ২০১৮ সালের শুমারিতে ৪৫ প্রজাতির ৪৪ হাজার ১০০ পাখি পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে শুমারিতে ৫০ প্রজাতির ৫৮ হাজার ২৮১টি পাখি পাওয়া যায়। অরক্ষিত হাওরে বিষটোপ আর ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করায় দিন দিন অতিথি পাখির সমাগম কমছে। মৎস্য অভয়াশ্রম থাকলেও সেই অভয়াশ্রমগুলোতেও শিকারিরা হানা দেয়। এবার হাকালুকি হাওরে আসা পাখির মধ্যে রয়েছে বালি হাঁস, চিতি হাঁস, সরালি, চখাচকি, টিকি হাঁস, বেগুনি কালেম, পাতিসরালি, রাজসরালিসহ নানা প্রজাতির পাখি। অজানা বিচিত্র বর্ণের নানা প্রজাতির এসব পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়েছে হাকালুকি হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। হাকালুকি হাওর রক্ষণাবেক্ষণে উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএসের আশিঘর গ্রাম সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, শীতের শুরু থেকেইে নানা প্রজাতির অতিথি পাখি হাকালুকি হাওরে আসছে। তবে আগে ৫০-৬০ প্রজাতির পাখি এলেও কয়েক বছর ধরে ৩০-৪০ প্রজাতির পাখি আসছে। পাখিবিশেষজ্ঞ ড. ইনাম আল হক বলেন, কয়েক বছর ধরে পাখির আগমন কমে গেছে। গত বছর পাখিশুমারিতে বিলুপ্ত প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়নি। ফেঞ্চুগঞ্জের ইউএনও রাখী আহমেদ বলেন, পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন শিকারিকে গ্রেপ্তার করে সাজা দেওয়া হয়েছে। অতিথি পাখি সংরক্ষণে হাওর এলাকার জনসাধারণকে আরও সচেতন হতে হবে। এছাড়া হাকালুকি হাওরে চলছে অতিথি পাখি শিকারিদের পাখি শিকারের মহোৎসব। শৌখিন ও পেশাদার শিকারিরা বন্দুক, বিষটোপ, জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি শিকার করছেন। শিকারিরা ৪টি পরিযায়ী পাখি বিক্রি করছেন ২০০০-২৫০০ টাকায়। পাখি শিকার বন্ধ করতে সংশ্লিষ্টদের কোনো উদ্যোগ নেই। এদিকে পাখি নিধনের কারণে ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫টি উপজেলাজুড়ে হাকালুকি হাওরের অবস্থান। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর। ৪৮ হাজার হেক্টরজুড়ে এই হাওরে চোট বড় ২৩৮টি বিল ও ১০টি নদী রয়েছে। এখানে প্রতি বছর শীতের শুরুতে সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাকালুকি হাওরে ছুটে আসে। আর এসব অতিথি পাখি শিকারের জন্য নানা ফাঁদ পেতে থাকেন শিকারিরা। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নের হাওরপারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীত এলে হাওরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাওরের পাঁচবিলা, চৌকিয়া, হাওরখাল, ফুটি, তুরল বিলসহ কয়েকটি এলাকায় সন্ধ্যার পর শিকারিরা জাল পেতে থাকেন। রাতের বেলা পাখিরা খাবারের সন্ধানে দলবেঁধে এক বিল থেকে আরেক বিলে উড়তে যাওয়ার সময় পাতানো জালে ১০ থেকে ১৫টি পাখি আটকা পড়ে। এছাড়াও বিলের পানিতে কারেন্ট জাল পেতেও পাখি শিকার করা হয়। পাখিরা বিলে নেমে সাঁতার কাটার সময় শিকারিরা তাড়া করেন। তাড়া খেয়ে পাখিরা জালে আটকা পড়ে। তাছাড়া পুঁটি মাছ ও দানাদার শস্যে বিষ মিশিয়ে পাখি শিকার করা হচ্ছে। পাখিদের মধ্যে সরালি, সাদা বক ও কিছু অচেনা পাখি রয়েছে। হাওর তীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজার ও গ্রামে বিক্রি করা হয় পরিযায়ী পাখি। সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্চ স্টাডির (সিএনআরএস) মাঠ ব্যবস্থাপক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, পাখি শিকারের সঙ্গে হাওরপারের মৎস্যজীবীরাও জড়িত। পাখি শিকারিরা রাতে বিভিন্ন ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করছেন। পদ্মায় অর্ধেকে নেমেছে পাখির সংখ্যা : রাজশাহীর পদ্মায় আবারও শুরু হয়েছে জলচর পাখিশুমারি। পদ্মা নদী সংলগ্ন এলাকায় গত ৫ জানুয়ারি প্রথম দিন পদ্মার ৩৯ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে পরিচালিত শুমারিতে ৪১ প্রজাতির মোট ২ হাজার ৭০৯টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে। পদ্মা নদীর চর খানপুর থেকে শুরু করে মাঝারদিয়াড় চর পর্যন্ত শুমারির কাজ চালানো হয়। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন), বাংলাদেশ বন বিভাগ, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও রাজশাহী বার্ড ক্লাবের সদস্যরা এই পাখিশুমারিতে অংশ নেন। শুমারিতে অংশ নেওয়া পাখি বিশেষজ্ঞরা জানান, শুমারিতে ৪১ প্রজাতির মোট ২ হাজার ৭০৯টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে ৫৭৭টি প্রিয়ং হাঁস। বিরল প্রজাতির পাখির মধ্যে আছে কালো মানিকজোড় ও একটি ফুলুরি হাঁস। বছর শেষে ওয়েটল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংস্থা থেকে পাখিশুমারির ফল প্রকাশ করা হবে। আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্য মতে, গত বছর পদ্মার চরে প্রথমবারের মতো জলচর পাখিশুমারি করেন একদল গবেষক। শুমারিতে রাজশাহীর পদ্মার পাড়জুড়ে ৩৭ প্রজাতির মোট ৪ হাজার ২৫টি পাখি গণনা করা হয়। এর মধ্যে ২৭ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১০০টি পাওয়া গেছে প্রিয়ং হাঁস। সৈকত পাখির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে টেমিং এর চা পাখি। পদ্মার চরে অনেক দুর্লভ প্রজাতির পাখি পাওয়া গেছে। গত বছরই পদ্মাচরে প্রথম দেখা গেছে ‘কমন মার্গেঞ্জার’। সবচেয়ে বিরল পাখির মধ্যে দেখা গেছে একটি বৈকাল তিলিহাঁস। এছাড়া দেশি মেটে হাঁস, লালমাথা ভূতিহাঁস, ইউরেশিয় সিথিহাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস, কালা মানিকজোড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে চালানো এ পাখিশুমারি ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আইইউসিএন’র সিনিয়র প্রোগ্রাম কর্মকর্তা সরোয়ার আলম দিপু। তিনি জানান, আগামী ৭ দিন ধরে এ পাখিশুমারি চলবে। আমরা সাধারণত হাওর অঞ্চলের পাখির শুমারি করে থাকি। তবে এবারের এই শীত মৌসুমে উত্তরের শহর রাজশাহীতে দ্বিতীয় শুমারি করা হয়েছে। গত বছরের শুমারিতে পদ্মা নদীর ওই এলাকায় ৩৭ প্রজাতির মোট ৪ হাজার ২৫টি পাখি গণনা করা হয়েছিল। এবারের শুমারিতে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে পরিযায়ী পাখির প্রজাতি বেড়েছে। তবে আগে তুলনায় পাখির সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে, যা ভাবনার বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এদিকে শীতের শুরুতে নওগাঁর সীমান্তঘেঁষা সাপাহার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জবই বিলে পরিযায়ী পাখিদের আগমন ও বিচরণ শুরু হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিলে মৎস্য শিকারীদের অবাধ বিচরণ ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে মৎস্য আহরণের ফলে পাখিগুলো আবারও হারিয়ে যেতে বসেছে। জবই বিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি সোহানুর রহমান সবুজ বলেন, প্রতিবছর এ বিলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক পর্যটক আসেন। শীতে বিলের জীববৈচিত্র্যের প্রতি খেয়াল না করে তারা ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে সারা বিল ঘুরে বেড়ায়। এতে বিলে অবস্থানরত পাখির স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হয়। তাছাড়া বিলে এখনও পাখি শিকারীদেরও অপচেষ্টা রয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..