একেবারে মূলে না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝা যাবে না

নেলসন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বর্তমান করোনাকালীন বাস্তবতায় দেশে দেশে খাদ্য সহায়তার লাইনে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সমীকরণ এবং এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারের নেওয়া নানা কার্যক্রমের ভিন্নতার ওপর নির্ভর করছে এই লাইনের দৈর্ঘ্য। বাংলাদেশে করোনার প্রথম ধাক্কার সময় যখন হঠাৎ করেই লকডাউন ঘোষণা করা হলো, তখন বিশেষত শহরাঞ্চলের মানুষেরা এমন লাইনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল খাদ্য সহায়তার লাইনের দিকে তাকালেও পরিস্থিতি কিছুটা অনুমান করা যাবে। কথা হলো এই খাদ্য সংকট কি করোনার সঙ্গে সঙ্গে আছড়ে পড়ল পৃথিবীর বুকে? উত্তর হচ্ছে-না। এই খাদ্য সংকট আগে থেকেই ছিল। কিন্তু তথাকথিত উন্নয়ন সংগীতের জোর গলা একে বরাবরই একটু আড়ালে রাখে। ফলে বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে এই সংকটের কথা পেটভরা মানুষদের মনেই থাকে না। যখন ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি ভাইরাল হয়, যখন কোনো জেয়াফতের খাওয়া পেতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে কেউ মারা যায়, তখন নিরাপদ বেষ্টনীতে থাকা সংবেদনশীল মানুষেরা একটু নড়েচড়ে বসে। এর আগ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো হেলদোল থাকে না। এমনকি এখন যখন গার্মেন্টস শ্রমিক বা পাটকল ও চিনিকল শ্রমিকদের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে এর দমনও বাস্তব, তখনও এই সংকটটির কথা মাথায় আসছে না। হ্যাঁ, শেষোক্ত বিষয়টি একেবারে কৃত্রিম, যার নির্মাণে রাষ্ট্রের ভূমিকা মুখ্যের কাতারেই পড়ে। এই সংকট শ্রমিক অধিকার সংশ্লিষ্ট সংকট হওয়ায় এর সঙ্গে একেবারে মৌলিক চাহিদাটির সম্পর্কের বিষয়টিকে সাধারণত শনাক্ত করা হয় না। অথচ এটিই সরাসরি সম্পর্কিত। কীভাবে? শ্রমিকের মজুরির প্রসঙ্গটি আদতে কীভাবে আসে? এই মজুরির ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো, দৈনিক একজন লোকের প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ক্যালোরি। এই হিসাবের সঙ্গে পরে যুক্ত হয় আধুনিক কাঠামোয় একটি অণু পরিবারের সদস্য সংখ্যা (মা-বাবা ও দুই সন্তান; মোটাদাগে চারজন)। পুঁজিপতিদের কাছ থেকে এর চেয়ে বড় কোনো কিছু আদায় সম্ভব নয় বলেই এই ন্যূনতম বিষয়টিই সামনে থাকে। সঙ্গে যুক্ত থাকে বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়গুলো। বিনোদন এখানে সংযোগের দাবি রাখলেও তা আলোচনায় একেবারে উহ্য থাকে। কারণ বাকিগুলোই ঠিকঠাক আদায় হয় না। আর শ্রমিকেরা তখনই আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন, যখন এই ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণেও পুঁজিপতিরা অনীহ থাকেন। অর্থাৎ, মূল আলোচনাটি ঘুরপাক খাচ্ছে খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদাকে ঘিরেই, যেখানে বছর বছর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। কথা হলো বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে অর্থনীতির মূলনীতিকে বিবেচনায় নিলে উৎপাদন ও জোগানকে বিবেচনায় নিতেই হয়। আর সে হিসাবে অবশ্যই উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো একটি ঘটনা ঘটছে, যা নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো বিকল্প হাতে রাখে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নীতি কাজ করে-এমন দাবি না করেই অনুসিদ্ধান্তটি টানা হলো। এবার দেখা যাক, উৎপাদনে এই অবনমনের মৌল কারণটি কোথায়, যখন নানা প্রযুক্তি সহায়তা দিন দিন বাড়ছে। এখানেই আসছে প্রাকৃতিক পরিবেশে হওয়া পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি। আরও স্পষ্টভাবে বললে- জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন মানুষকে এক ভয়াবহ দৌড়ে নামিয়ে দিয়েছে। মানুষ মুনাফার পেছনে ছুটতে গিয়ে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলোকে নির্মাণ করেছে, তেমনি এই জলবায়ু পরিবর্তনও মানুষকে এক দ্রুতগতির ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়েছে। তার এখন শ্যাম রাখি, না কুল রাখি দশা। একটু খোলাসা করা যাক। এই এখন না হয় দৃষ্টিগ্রাহ্য খাদ্য সংকটের পেছনে করোনাকে দায়ী করা যাচ্ছে। কিন্তু তার আগে যে ধারাবাহিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে বিশ্বের এক বড় জনগোষ্ঠী যাচ্ছিল, তার কারণ কী? সোজা উত্তর, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন। এ দুই কারণে সৃষ্ট নানা সংকটের কারণে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ব্যহত যেমন হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে বৈষম্য। এই দুই মিলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেমন বাড়ছে, তেমনি অন্যদিকে কমছে মিঠাপানির উৎস। বলা হচ্ছে, ২০৫০ সালে তেলের মতোই দামি বস্তু হয়ে উঠতে পারে পানি। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন হয়তো সত্যই বলেছিলেন যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি হয়, তবে তা হবে সুপেয় পানির হিস্যা নিয়ে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ১১০ কোটি মানুষ সুপেয় পানির সমস্যায় ভুগছে। ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক নামে একটি সংস্থার মতে, ইতিমধ্যেই পানি সংকট ঘিরে রেখেছে প্রায় ২৭০ কোটি মানুষকে। এই সংখ্যাটি পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা প্রতি বছর অন্তত এক মাস পরিষ্কার সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিংবা সুপেয় পানির খরচ বহন করতে তারা অক্ষম। ২০৫০ সালে নিশ্চিতভাবে পানি সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার প্রায় ২০০ কোটি মানুষ তীব্র পানি সংকটে ভুগবে। এই সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশের অবনমন ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ নদী বিলীন হওয়া ছাড়াও প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ প্রায় শেষ হয়ে যাবে বলে এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড প্রিজারভেশন ফাউন্ডেশন। বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উষ্ণায়নের জন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছরে ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়া দাবানলের সংখ্যাই এই প্রবণতার সাক্ষ্য দেয়। ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়বে। এমন নয় যে, এখন থেকে সচেতন হয়ে এর সবকিছু থামিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কমিয়ে আনা সম্ভব। কথা হলো পানির উৎসগুলো বিলীন হলে, জলজ উৎস তেকে সংগৃহীত খাদ্যের পরিমাণ নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক হ্রাস পাবে। এমনকি খাদ্য উপযোগী মাছ বিলীনও হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারি। বিজ্ঞানীরা বহু আগে থেকেই বলে আসছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে প্রতি দশ বছরে ২ শতাংশ হারে খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে আগামী দুই দশকের মধ্যেই বিশ্বের নানা প্রান্তে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে এমন অস্থিরতা দেখাও যাচ্ছে। কিন্তু এসব অস্থিরতার প্রবণতাকে আমলে নিয়ে একে যতটা রাজনৈতিক কারণের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, ততটা এর মৌল কারণটি খুঁজে দেখা হচ্ছে না। একটু যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকানো যাক। গত চার বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্প জমানায় দেশটিতে অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে এককভাবে সব দায় ট্রাম্পের ঘাড়ে চাপালে সংকটটির একটি সহজ সমাধান হয়, কিন্তু তা সংকটটি বাড়িয়ে তোলা ছাড়া আর কিছু করে না। কারণ, ট্রাম্প এই পুরো সংকটের নির্মাতা নন। বরং সংকটের একটি পর্যায়ে এসে তাকে একেবারে খোলতাই করে দেখানোর নায়ক বা খলনায়ক তিনি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি জানিয়েছেন, শুধু বন্যার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে সাড়ে সাত হাজার কোটি ডলারের খাদ্য নষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রসেডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণাপত্রে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে হওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে মাত্র একটির কারণে হওয়া ক্ষতির কথা শুধু উল্লেখ করা হয়েছে। তাও শুধু খাদ্যের ওপর এর প্রভাবটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তারপর তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনা করেছে। পুরো অর্থনীতিকে বিবেচনায় আনা হয়নি। বলা হয়েছে, ঠিক কী পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা নিরূপণ ভীসণ সময়সাপেক্ষ এবং এর যথাযথ নির্ধারণ প্রায় অনিশ্চিত। এই গবেষণার সত্যতা পাওয়া যাবে, মার্কিন খাদ্য সহায়তা প্রকল্প (ফুড স্টাম্প) থেকে সাহায্য নেওয়া লোকের সংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির দিকে তাকালে। মানুষ যত বেশি এই খাদ্য সহায়তার লাইনে দাঁড়িয়েছে, তত বেশি তার ভেতরে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দেশটির অন্যতম বড় ও ব্যয়বহুল শহর নিউইয়র্কের পথেঘাটে তো বটেই গণপরিবহনে পর্যন্ত গৃহহীনদের নিরুপায় জীবন দেখা যায়। এই গৃহহীনদের আবার নিম্নমধ্য ও মধ্যবিত্ত লোকেরা পর্যন্ত উৎপাত বলে ঠাওরাচ্ছে। ফলে একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি জন্ম নিচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতিই দিন দিন বড় হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতা হওয়ার বাস্তবতাটি তৈরি করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রক্ষমতায় নেক প্রতিশ্রুতি নিয়ে এলেন জো বাইডেন। এসেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি পুনর্বহালসহ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বেশ সোচ্চার কথা বলছেন তিনি। শুধু এই সময়েই নয়, আগে থেকেই তিনি এ নিয়ে কথা বলছেন। এখন দেখার অপেক্ষা তিনি শেষ পর্যন্ত এই সংকট মোকাবিলায় এর প্রভাবে সৃষ্ট উপরিতলের সমস্যাগুলো নিয়েই কাজ করেন, নাকি আরও গভীরে গিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রসর হন। সমন্বিত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাঁকে অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনের কারণকে যেমন মোকাবিলা করতে হবে, তেমনি এর ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ভবিষ্যৎ সংকট সৃষ্টির প্রবণতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে খাদ্য সংকটের কথাটিই আবার বলা যাক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, বাড়ানো হচ্ছে সংকর বীজ, এমনকি জিএম শস্যের ব্যবহার। এমনকি কৃত্রিম খাবার নিয়েও হচ্ছে জোর গবেষণা, যার কিছু কিছু এরই মধ্যে বাজারে এসেছে এবং এক শ্রেণির মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। দেখতে হবে, এই অপ্রাকৃতিক উপায়গুলোই আবার নতুন সংকটের জন্ম দেয় কিনা। যেমন, বিভিন্ন সংকর বীজ, কীটনাশক, ও সারের ব্যবহারের মাধ্যমে উচ্চফলন পাওয়া গেলেও মাটির উর্বরা শক্তি যে কমে, তা তো এক ধরনের প্রমাণিত সত্য। এসব ফসল উৎপাদনে পানির ব্যবহারও বেশি করতে হয়। আবার ফসল উৎপাদনে বিষের ব্যবহার, শুধু কীটপতঙ্গকেই মারে না, পশু-পাখিসহ উপকারী অণুজীবদের জন্যও এটি ভয়াবহ ক্ষতিকর। ফলে শুধু এই উচ্চ ফলনশীল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির হাত ধরেই একেকটি এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন। তাই এই সবকিছুকেই বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে। এই মৌল বিষয়গুলোকে এড়িয়ে আর যা-ই হোক জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়কে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..