ইতিহাসের পাতা থেকে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
[১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির সংখ্যায় প্রকাশিত] ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী ষ তদন্ত-৭ বেক্সিমকো গ্রুপ: অল্প সময়ে ব্যবসা-শিল্প-ব্যাংক প্রসার একতার বিশেষ রিপোর্টার : স্বাধীনতার আগে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন তাঁরা, তবে মূলত স্বাধীনতা-উত্তরকালেই আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা করে, বিভিন্ন সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে প্রচুর ঋণসুবিধা নিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপ দেশের অন্যতম প্রধান ধনীতে পরিণত হয়েছে। বিএনপি সরকারের আমলেই এই গ্রুপের ধনবৃদ্ধি ঘটেছে সবচেয়ে বেশ। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী জামালউদ্দিনের সঙ্গে এই গ্রুপের মালিকদের বিশেষ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল এবং এখনও তা আছে। এই গ্রুপের কাছে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রচুর পাওনা অনাদায়ী থাকার পরও এই গ্রুপের মালিক ভ্রাতৃদ্বয় দু-দুটো প্রাইভেট ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক হয়েছে। গ্রুপের চেয়ারম্যান সোহেল রহমান আইএফআইসি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান এবং গ্রুপের অন্যতম পরিচালক সালমান এফ রহমান আরব-বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা-পরিচালক। শেষোক্ত ব্যাংকের অন্যতম বিদেশি উদ্যোক্তা গালাদারী ভ্রাতৃদ্বয়ের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চোরাকারবারির সঙ্গে যুক্ত থাকার ইতিহাস একাধিকবার একতা’র পাতায় ছাপা হয়েছে। সোহেল রহমান আইএফআইসি ছাড়াও আইসিবিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক। গ্রুপের অন্যান্য পরিচালকের মধ্যে অন্যতম শামসুল হক, ইকবাল আহমেদ ও আনসার রহমান। আনসার রহমান বিদেশে থাকেন। অর্থের প্রাথমিক উৎস স্বাধীনতার পরে এই গ্রুপের মালিকরা তাঁদের তখনকার একমাত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান স্পিনিং কারখানা নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ রাষ্ট্রায়ত্ত হওয়ার মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সরিয়ে ফেলেন বলে জানা যায়। এছাড়া স্বাধীনতার পর পরই ড্যানিস ইউনিকর্ন কোম্পানির সহায়তায় সরকারকে ৪টি ফকার বিমান সরবরাহ করেও এই গ্রুপ প্রচুর অর্থ লাভ করে। ফকার বিমান সরবরাহ থেকে প্রচুর অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে দারুণ কেলেঙ্কারি হয়। ১৯৭২ সালে দৈনিক পূর্বদেশ এ ‘আকাশচুরি’ শিরোনামে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। বিমান সরবরাহের কাজ পাওয়ার ব্যাপারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি রুহুল কুদ্দুসের সহায়তা ছিল বলে জানা যায়। ইউনিকর্ন কোম্পানির সঙ্গে এই গ্রুপের সম্পর্ক স্বাধীনতার আগে থেকেই। ইউনিকর্ন এদের কাছ থেকে ১৯৬৮ সালের দিকে পাট কিনতো। ইউনিকর্নের প্রধান ব্যক্তি ভিক্টো ওয়েইনবার্গ একজন ওলন্দাজ ইহুদি। কাঁচামাল সরিয়ে ফেলা ও ফকার বিমান সরবরাহের মাধ্যমে অর্জিত টাকাই ছিল স্বাধীনতা-উত্তরকালে তাদের ব্যবসার প্রাথমিক প্রধান মূলধন। কাঁচামাল সরানোর জন্য মামলা হয়। সোহেল রহমানদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ওয়ারেন্ট জারি হয়। এসময় সোহেল রহমান ও আনসার রহমান কিছুদিনের জন্য লন্ডনে পালিয়েছিলেন এবং গ্রুপের অন্যতম পরিচালক শামসুল হক দেশেই লুকিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আওয়ামী লীগ ও সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে যোগাযোগ করার মধ্য দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করা হয়। আওয়ামী লীগ শাসনামলে তারা বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা শুরু করে। একটি প্রধান সুইস কোম্পানি অন্ডো এন্ড সীর সহায়তায় এবং টিসিবির সঙ্গে স্পেশাল ট্রেড অ্যারেজমেন্টের অধীনে তারা প্রচুর অর্থ লাভ করে। উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ কাঁচামাল সরানো ও ফকার বিমান সরবরাহের টাকা দিয়ে এই গ্রুপ প্রথমে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো ফুডস লিঃ-এই দুটো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। বিএনপি সরকারের সঙ্গে প্রথমদিকে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালে এই গ্রুপের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের অর্থসচিব এম. সাইদুজ্জামানের সম্পর্ক হয়। এই সম্পর্ক এখনও আছে। এম. সাইদুজ্জামান বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টা। তাঁকে এই গ্রুপের কর্তাব্যক্তিরা একবার লন্ডনে কিছুদিন থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে জানা যায়। সাইদুজ্জামানের আশীর্বাদে সোহেল রহমান রূপালী ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি পরিচালক ছিলেন। জনতা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোলায়মান চৌধুরীর সঙ্গেও এই গ্রুপের বিশেষ সম্পর্ক হয়। সোলায়মান চৌধুরী জনতা ব্যাংক থেকে এই গ্রুপকে বিপুল পরিমাণ ঋণ পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেন। এই গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৭ কোটি টাকা। চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর সোলায়মান চৌধুরী এখন এই গ্রুপের অর্থ প্রশাসন বিষয়ক পরিচালক নিযুক্ত হয়েছে। বাখরাবাদের লাভ-অলাভ সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে এই গ্রুপ ১৯৮০ সালে বাখরাবাদ গ্যাস প্রকল্পের কাজ পায়। কাজ পাওয়ার ব্যাপারে দুর্নীতি হয়। বর্তমান সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দুর্নীতি তদন্ত হয় বলে জানা গেছে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের ৪ কোটি টাকার কাজে গ্রুপের কোনো লাভ হয়নি বলে তারা দাবি করলেও এই কাজে তারা প্রচুর লাভ করেছেন বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত। এ ব্যাপারে একটি উদাহরণ উল্লেখযোগ্য- সম্প্রতি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ তারা পাননি, যারা পেয়েছেন তারা টেন্ডারে কাজের জন্য ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখ করেছেন ১ কোটি ২০ লক্ষ ডলার, অন্যদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের দাবি ছিল ২ কোটি ২০ লক্ষ ডলারের। টেন্ডারে উল্লিখিত অর্থের ব্যবধান থেকেই অনুমান করা যেতে পারে তারা প্রথম পর্যায়ের কাজে কী বিপুল অঙ্কের টাকা লাভ করেছিলেন। বর্তমান সামরিক সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তির সঙ্গেও এই গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর একবার গ্রুপের প্রধান কর্তাব্যক্তি সোহেল রহমানের পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। লাভ হলেও ব্যাংক ঋণ অনাদায়ী এই গ্রুপের লাভজনক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, বেক্সিমকো ফুডস লি. ও নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লি.। প্রতিষ্ঠান ৩টির নামে একাধিক ব্যাংকের পাওনা রয়েছে এবং লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও পাওনা শোধ করা হচ্ছে না ও পাওনার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে শিল্পঋণ সংস্থা, সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের, বেক্সিমকো ফুডস-এর নামে শিল্প ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পাওনা রয়েছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে শিল্পঋণ সংস্থা ও জনতা ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ যথাক্রমে সোয়া ২ কোটির টাকা ও প্রায় ২ কোটি টাকা এবং বেক্সিমকো ফুডস-এর নামে একমাত্র সোনালী ব্যাংকের পাওনার পরিমাণই ৪ কোটি টাকারও বেশি। নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের মতো একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও স্বাধীনতা-উত্তরকালে এই গ্রুপের প্রকৃতিগত পরিবর্তন ঘটে। শিল্পের পরিবর্তে এদের অর্থ উপার্জনের মূল উৎস হয়ে দাঁড়ায় আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা। নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে চলে যায়। এরা তারপর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানি ও সোনালী আঁশ লি. এর মতো দুটো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানিটি এখন গ্রুপের হৃদযন্ত্রের কাজ করছে বলা যায়। এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে যেসব দ্রব্য আমদানি-রপ্তানি হয়, ব্যবসার সুবিধার্থে সেসব দ্রব্য সংগ্রহ, উৎপাদন কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণকে কেন্দ্র করেই গত এক দশকে গড়ে উঠেছে আমদানি-রপ্তানি-নির্ভর এদের জন্য ডজনখানেক শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এই গ্রুপ বেশ কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া সত্ত্বেও এখনও এদের অর্থের মূল উৎস ব্যবসা এবং চরিত্রও তাই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..