মাওলানা হসরত মোহানি

অর্নিবান অনিক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের চর্চার এক কোণে পড়ে থাকেন তিনি। মাওলানা হসরত মোহানি। উর্দু কবি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সাহসী ব্রিটিশবিরোধী মুক্তিযোদ্ধা, সর্বোপরি কমিউনিস্ট। আন্দোলনের কারণে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক যাকে বহুবছর জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। বছর শেষের দিনটি ছিল তাঁর জন্মদিন। আলিগড় কলেজে তখন সৈয়দ আহেমদ খান এবং থিওডর মরিসনের রাজত্ব। ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতিকে কুনজরে দেখা হতো। অন্যদিকে মোহানি ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের মানুষ। সবার অলক্ষ্যে বাল গঙ্গাধর তিলকের রাজনৈতিক সাহিত্যে ডুবে থাকতেন। কিন্তু কলেজ ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত একটি সভায় তাঁর রাজনৈতিক ভাবধারা প্রকাশ পেয়ে যায়। রাজদ্রোহের অভিযোগে মরিসনের নেতৃত্বে কলেজের ট্রাস্টি বোর্ড তাকে বহিষ্কার করে। শিক্ষান্তে বেছে নিলেন নিজের প্রিয় সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার লাইন। স্বাধীনতার লড়াইয়ের আগুনে ঝাঁপ দেয়ার লক্ষ্যে ব্রতী হয়ে নিলেন কংগ্রেসের সদস্যপদ। তখন কংগ্রেসে গোখলের নরমপন্থি এবং তিলকের চরমপন্থিদের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন। ১৯০৭ সালে তিলকের চরমপন্থিদের সাথে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন। উর্দু-ই-মুয়াল্লা - এই পত্রিকাটির সম্পাদক তখন মোহানি। পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় মোহানির কলম তখন ঝরাতো ব্রিটিশ-বিরোধী আগুন। দেশভক্তির পুরস্কার জুটতে বেশিদিন লাগেনি। নিউজপেপারস এক্টের আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হয় মামলা। শাস্তি - দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড। এই শেষ নয়। ভবিষ্যতে আরও পাঁচবার দেশসেবার পুরস্কার হিসেবে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কিন্তু যে স্বাধীনতা আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিক-প্রান্তিক মানুষের চাহিদা অনুক্ত থেকে যায় সে যে বড় অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা। তাই ১৯২৫ সালে কানপুরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় তিনি নিলেন অন্যতম প্রধান ভূমিকা। যে স্বরাজে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি যুক্ত না হয় সে যে বড় অসম্পূর্ণ স্বরাজ। তাই ১৯২১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে প্রথম বার পেশ করলেন পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব। সঙ্গ দিলেন আরেক কমিউনিস্ট। স্বামী কুমারানন্দ তথা বাঙালি বিপ্লবী দ্বিজেন্দ্র কুমার নাগ - একাধারে গৈরিক বস্ত্র পরিহিত সন্ন্যাসী ও কমিউনিস্ট। সে বছর গান্ধীজীর তীব্র আপত্তিতে বাতিল হয়ে যায় এই প্রস্তাব। ১৯২৮ সালে ২৮ অগাস্ট লখনও তে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলন সম্পর্কে সুভাষ চন্দ্র বসুর লিখিত অভিমত দেখে নেয়া যাক — “২৮ অগাস্ট মঙ্গলবার, খুবই হৃদ্য পরিবেশে সর্বদল সম্মেলনের কাজ শুরু হয়! জনসমাগম যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল, প্রকৃতপক্ষে এই উপলক্ষে সব প্রধান নেতাই উপস্থিত ছিলেন! বিশাল হলঘরে সদিচ্ছার আবহাওয়া বজায় ছিল! সর্বদল সম্মেলনের রিপোর্ট রচয়িতাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করাই ছিল সেইদিনের কর্মসূচি ! বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা একের পর এক উঠে দাঁড়িয়ে স্ব স্ব অভিনন্দন জ্ঞাপন করলেন! কেবলমাত্র মৌলানা হসরত মোহানির ভিন্ন সুর শোনা গেলো, তিনি রিপোর্টের নিন্দা করলেন, তার কারণ ছিল রিপোর্টে পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলাই হয়নি!” লাহোরে মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রস্তাবের বিরোধিতাকারী মোহানী স্বভাবতই স্বাধীনতার পর ভারতের মাটিকেই স্বদেশ হিসেবে বরণ করে নেন। “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” কথাটির অর্থ হল ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। স্লোগানটি প্রথম দেন মৌলানা হসরত মোহানি। বাকিটা, ওই যা বলা হয়, ইতিহাস। কমরেড ভগৎ সিং ফাঁসি কাঠে চড়ার আগে যে স্লোগান বার বার দিয়েছিলেন, সেই স্লোগানের জন্মদাতা কমরেড মৌলানা হসরত মোহানি। গত ৭০ বছর যাবৎ ইতিহাসের পাতার এককোণায় এনাদের ঠাঁই দিয়ে আসার অবিমৃশ্যকারিতার বিষে জর্জরিত ভারত। আজ বিজেপি/আরএসএস’এর প্ররোচনায় যখন দিকে দিকে রব উঠেছে - “মুসলমানরা স্বাধীনতার জন্য কী করেছে? কমিউনিস্টরা স্বাধীনতার জন্য কী করেছে”- তখন মোহানিদের স্মরণ করা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। লাল সালাম কমরেড মোহানি।”

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..