ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
[কোভিড-১৯ প্রতিরোধে অবিলম্বে সকল নাগরিককে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেয়ার দাবিতে গত ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ- এর সংবাদ সম্মেলনের পঠিত বক্তব্য] “আপনারা জানেন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগী বাংলাদেশে শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হবার পর জানুয়ারি ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বব্যাপী ‘গ্লোবাল হেলথ ইমরাজেন্সি’ ঘোষণা দেয় এবং পরবর্তীতে মার্চ ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী অতিমারী (Pandemic) ঘোষণা করে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চীন, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি নিজ নিজ দেশের জনগণকে সম্পৃক্ত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করায় যেমন সাফল্য অর্জন করে অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোভিড-১৯ প্রতিরোধে কার্যকর বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারায় এবং এদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সংগঠিত না থাকায় এরা বিপুল প্রাণহানির সম্মুখীন হয়ে চলেছে। বাংলাদেশে সরকার কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রথম থেকেই জনগণকে সম্পৃক্ত না করার ফলে এবং সম্পূর্ণ আমলা-প্রশাসন-আমলা-ব্যবসায়ী নির্ভর নীতি গ্রহণ করবার ফলে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের বিমানবন্দর, স্থলবন্দরে স্ক্রিনিং করা, কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক না করে দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে দ্রুত বিস্তার ঘটে। শতাধিক চিকিৎসকের মৃত্যু ও ব্যাপক সংখ্যক ডাক্তারদের সংক্রমিত হওয়া, মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) প্রভৃতি নিয়ে দুর্নীতি, কোভিড-১৯ প্রতিরোধে হাসপাতালগুলোতে ট্রায়াল পদ্ধতি চালু না করার ফলে চিকিৎসা নিয়ে জনগণের ভয়ানক দুর্ভোগ, হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের স্বল্পতা, আইসিইউ’র স্বল্পতা, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, কর্পোরেট ও প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা প্রভৃতি ঘটনা সারাদেশে জনগণের জীবনে এক মহাবিপর্যয় নেমে আসে। কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের জন্য যে হারে টেস্ট করা প্রয়োজন বাংলাদেশে সরকারি মহল থেকে প্রথম থেকেই টেস্ট করাকে অবহেলা করে আসা হয়েছে। কমিউনিটি লেভেলে করোনা সংক্রমণ বিস্তার রোধে সরকার কঠোর ‘লকডাউন’ না দিয়ে ‘গণছুটি’ ঘোষণা করায় তেমন সুফল পাওয়া যায়নি। লকডাউনে গার্মেন্ট শ্রমিকদের কাজে যোগদানের ঘোষণাটি ছিল সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনা, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু সংখ্যা, করোনা উপসর্গ জনিত মৃত্যুসংখ্যা, প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় তথ্য প্রথম থেকেই সরকারি মহল থেকে গোপন রাখা হয়েছে। কোভিড-১৯ শনাক্তের জন্য টেস্ট সংখ্যা হ্রাস করা এবং কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সরকারের সাফল্য দাবি করা জনমনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়েছে। বাস্তবে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস নির্মূল না হয়ে কমিউনিটি লেবেলে দীর্ঘকাল অবস্থান গ্রহণ করার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে অব্যাহত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ করার সরকারি প্রচেষ্টা না থাকায় এবং সরকারি মহলের সফলতার দাবি জনগণের ভেতর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে শৈথিল্য এনেছে। দেশে দেশে অতিমারি কোভিড-১৯ চিকিৎসার দায়িত্ব সেসব দেশের রাষ্ট্র সরকার গ্রহণ করলেও বাংলাদেশে সরকার যে দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ টেস্টে সরকারিভাবে ফি ধার্য করা হয়েছে। আশার কথা কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সারাবিশে^র বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত চেষ্টায় কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে। বায়োনটেক-ফাইজার ভ্যাকসিন, মডার্নার টিকা, অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রেজেনিকার ভ্যাকসিন, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন, চীনের সিনোভ্যাক ভ্যাকসিন বিশে^র বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের দেশের জনগণের জীবন সুরক্ষায় সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশে সরকার কোভিড-১৯ মোকাবিলায় যেমন আমলা-ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে এসেছে তেমনি ভ্যাকসিন সংগ্রহেও সরকার একই নীতি অবলম্বন করে চলেছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে এবং জীবনরক্ষায় বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহকে সরকার অগ্রাধিকার ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিয়ে একে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি অ্যাস্ট্রোজেনিকার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে আমদানির জন্য সরকার ভারত সরকারের সাথে ‘জি টু জি’ চুক্তি না করে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাকে সাথে নিয়ে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে ত্রি-পক্ষীয় চুক্তি করেছে। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রেজেনেকার ২ ডলার মূল্যে ভ্যাকসিন বাংলাদেশ সরকার বেক্সিমকোর মারফত পাচ্ছে ৫ ডলারে। সম্প্রতি সংবাদপত্র ও মিডিয়ায় এই ভ্যাকসিন রপ্তানিতে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সংবাদ প্রকাশ পেলে সারাদেশে জনমনে বিক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পূর্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন ২০২১ সালে জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে দেশে ভ্যাকসিন দেয়ার কাজ শুরু হবে। এখন ভারত সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার সংবাদ এবং এই নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতা ইত্যাদি ঘটনায় এটা পরিষ্কার সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত ভ্যাকসিন বাংলাদেশের পেতে আরও সময় লাগবে। বাংলাদেশের জনমনে আজ তাই প্রশ্ন উঠেছে জনগণ কবে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন পাবে? ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা তাই জরুরি হয়ে পড়েছে। কেবলমাত্র ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের ওপর কেন নির্ভর করা হলো সে প্রশ্নও আজ উঠেছে। গত বছর বাংলাদেশে চীনের প্রতিনিধি দল যখন তৃতীয় পর্যায়ের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল তখন কাদের স্বার্থরক্ষায় তা নাকচ করা হয়েছিল? চীনের সিনোভ্যাক ভ্যাকসিন, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন বহুদেশ আমদানি করছে অথচ বাংলাদেশ সরকার সেক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ না করবার কারণ কী? কদিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিবিসি’র কাছে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারা ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলেছেন, চীনা কোম্পানির কাগজপত্র জমা দিতে বলেছেন। বাংলাদেশে ৪৩’র দুর্ভিক্ষের সময়ও একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মুনাফা লোভের কারণে ব্যাপক মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল, কোভিড-১৯ অতিমারিকেও বাংলাদেশে ব্যবসা হিসেবে নেয়া হয়েছে। সরকার-সংসদে ব্যবসায়ী ও আমলাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ফলে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা-জীবন রক্ষা নয়, মুনাফা লোটাই এখন বড় বিষয় হয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনেকা ভ্যাকসিন ক্রয়ে বাংলাদেশ সরকারকে যুক্ত করে বেক্সিমকো ফার্মা ২ ডলারের ভ্যাকসিনের মূল্য ৫ ডলার করেছে। অন্যদিকে শেয়ার মার্কেটে বেক্সিমকো ফার্মার ৬০ টাকার শেয়ার ২০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। ভ্যাকসিন নিয়ে সরকারের রাখঢাক জনগণ পছন্দ করে না। কিভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জনগণ করোনা ভ্যাকসিন পেতে পারে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনগণ জানে না সরকার কিসের ভিত্তিতে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির অগ্রাধিকার নীতি তৈরি করেছে? কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সম্মুখসারির যোদ্ধা ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী-পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সর্বাগ্রে দিতে হবে। দিতে হবে সমাজকর্মী, জরুরি ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মীদের। বিনামূল্যে সরকারিভাবে এই ভ্যাকসিন দিতে হবে, ভ্যাকসিন নিয়ে কোনও ব্যবসা চলবে না, এটা নিশ্চিত করবার দায়িত্ব সরকারের। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেককে সরকার গত ৫ জানুয়ারি ২০২১ প্রয়োজনীয় টিকা উৎপাদন করার অনুমতি দিয়েছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনেকা কোভ্যাক্সের আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছিল। শর্ত ছিল অতিমারি চলাকালে অলাভজনক ভিত্তিতে টিকা বিক্রি করতে হবে। সেক্ষেত্রে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকোর বাণিজ্যিক চুক্তি শর্ত ভঙ্গের এক দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ আমলা-ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় টিকা পাওয়ার ন্যায্য অধিকার থেকে বাংলাদেশের জনগণকে বঞ্চিত করার বিরুদ্ধে তাই সকলকে সোচ্চার হওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..