ভ্যাকসিন যুদ্ধ ও গরিবের পরিণতি

তাহসীন মল্লিক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর থেকে চলছে তুমুল ব্যবসায়ীক প্রতিযোগীতা। দিন দিন যা পাশবিক রূপ ধারণ করছে। ফিকশন চলচ্চিত্রে মহামারীতে গোটা বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কল্পনা যত বড়, মানুষের পাষবিকতার বাস্তবতা ঠিক যেন ততোটাই বড়। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার এবং চীনের সিনোভ্যাকের কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন করোনাভ্যাক কেন্দ্র করেই এই যুদ্ধের শুরু। যদিও ভ্যাকসিনের যুদ্ধ এখনও পর্যন্ত তথ্য সংঘাতেই সীমাবদ্ধ। আর হাতেগোনা কয়েকটি দেশে চলছে রাশিয়ান স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন। সবার আগে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া দেশটি বেলারুশ, আর্জেন্টিনা সহ কয়েকটি দেশে টিকা সরবরাহ করে ভ্যাকসিন যুদ্ধের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মার্কিন-জার্মান ভ্যাকসিন ফাইজার-বায়োনটেকের ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছে। আর কিছু রাষ্ট্রে চলছে চীনের করোনাভ্যাক অথবা সিনোফার্মা কোম্পানীর ইইওইচ-পড়ৎা। সংবাদ মাধ্যমগুলো এই দুই দেশের ভ্যাকসিন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং প্রকাশের মাধ্যেম আন্তর্জাতিক বাজারে চলছে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগীতা। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলো স্বভাবতই ফাইজার-বায়োনটেকের পক্ষেই রয়েছে। সংবাদ মাধ্যমগুলো দাবি করছে ফাইজারের টিকা অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর। এদিকে তুরষ্কের প্রয়োগকৃত সিনোভ্যাকের চাইনিজ টিকার কার্যকারিতা দাবি করা হয়েছে ৯১ শতাংশ। ইউরোপে সর্বপ্রথম চীনের ভ্যাকসিন গ্রহণকারী সার্বিয়াতে ইইওইচ-পড়ৎা এর কার্যকারীতা দাবি করা হয়েছে ৭৯.৩৪ শতাংশ। ভ্যাকসিনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে খবরের কাগজে অগ্রাধিকার পাচ্ছে ভ্যাকসিন গ্রহণ পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর। ফাইজারের ভ্যাকসিন গ্রহণে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এমনকি একাধিক মৃত্যুর খবর চাউর হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য, নরওয়েতে করোনা টিকা নেওয়ার পর মৃত্যু হয় ২৩ জনের। মৃতরা অধিকাংশই বয়স্ক। দিন কয়েক আগে ফাইজার বায়োএনটেক টিকা দেওয়া হয়েছিল বেশ কয়েকজনকে। মৃতের পাশাপাশি বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা যাচ্ছে। ২৩ জনের মধ্যে ১৩ জনেরই মৃত্যু হয়েছে একই উপসর্গ নিয়ে। কিন্তু আগাম চাহিদার শীর্ষেই আছে ফাইজার। শুধু বিশ্বেই নয় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক করোনা ভ্যাকসিনের বিপনন নিয়ে চলছে যুদ্ধ। মর্ডানা এবং ফাইজারের মধ্যে চলছে নীরব রেষারেষি। ইউরোপে বাজার দখলের পথে ফাইজারের সাথে বাণিজ্যিক প্রতিযোগীতায় লিপ্ত আছে অক্সফোর্ড-এস্ট্রোজেনকা। অক্সফোর্ড-এস্ট্রোজেনকা ভারতের ভ্যাকসিনের বাজার ধরতে পারলেও স্থানীয় ইন্ডিয়া বায়োটেকের রোষানলে পড়েছে। ইন্ডিয়া বায়োটেকের প্রধান নির্বাহী স্বয়ং বাক্যবানে ভ্যাকসিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। ভ্যাকসিন নিয়ে এই তথ্য যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ভ্যাকসিনের আগাম চাহিদা নিজেদের দিকে টেনে নেয়া। সদ্য বাজারে প্রবেশ করা এই সকল ভ্যাকসিনই যে আগাম অর্ডার পেয়েছে তা প্রাথমিক পর্যায়েই আছে। ভ্যাকসিনের তথ্য সংঘাত ধীরে ধীরে যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভ্যাকসিনের এই যুদ্ধ পাশবিক রূপ নেয় যখন দরিদ্র দেশ গুলোর ভ্যাকসিন প্রাপ্তি অনিশ্চয়তায় পর্যবসিত হয়। ১৭২টি দেশ ‘কোভ্যাক্স’ পদ্ধতির আওতায় ভ্যাকসিন প্রস্তুতের আয়োজন করে সকল দেশকেই ভ্যাকসিনের আওতায় আনার চেস্টা করেছে। কোভ্যাক্স-এ ১৭২ টি দেশ মাত্র ৫ বিলিয়নের একটি তহবিল গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। যা মাত্র ২ বিলিয়ন ভ্যাকসিন প্রস্তুতে সক্ষম। কোভ্যাক্স এর আওতায় কোন দেশ তার জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দরিদ্র দেশগুলোতে সেক্ষেত্রে এই ২০ শতাংশ ভ্যাকসিন গ্রাহী হবেন ওই দেশের ধনীক শ্রেণিই। স্পস্টত বিশ্বের দারিদ্র্য পীড়িত মানুষই থেকে যাচ্ছেন ভ্যাকসিনেশনের আওতার বাইরে। এদিকে ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও কোন বাধা ধরা নিয়ম মানা হচ্ছে না। এমনকি চাহিদা বৃদ্ধি পেলে ভ্যাকসিনের দাম কি হারে বৃদ্ধি পাবে এমন কোন নির্দেশনাও নেই। ফলে চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে ভ্যাকসিনের দাম হাতের নাগালেই থাকবে না বলে শঙ্কা রয়েছে। আবার ৭৩ টি গরীব দেশ যাদের জিডিপি ২% এর ও নিচে তাদের ক্রয়ের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এই দেশ সমূহকে ডেবিট সার্ভিস সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভের এর আওতায় ভ্যাকসিন ক্রয়ের শর্তে ১ জুলাই ২০২১ পর্যন্ত সকল ঋণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী কোম্পানী সমূহের লাগামা টানার কোন ব্যাবস্থা রাখা হয়নি। আবার একসঙ্গে এত টিকা উৎপাদনেও সময় লাগবে অনেক। ফলে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, ধনী দেশগুলোই আগে নিজেদের জনগণের জন্য টিকা নিশ্চিত করবে। তারপর হয়তো ধীরে ধীরে দরিদ্র দেশগুলোর দিকে নজর দেয়া হবে। অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধনী দেশগুলো উৎপাদন হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ৬১ শতাংশ ভ্যাকসিন কিনে রেখেছে। অথচ এই ধনী দেশগুলোতে বাস করেন বিশ্বের কেবল ১৩ শতাংশ মানুষ। এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একাধিক ভ্যাকসিনও যদি বাজারে আসে, তাহলেও এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ফলে ভ্যাকসিন বাণিজ্যের পাশবিকতার শিকার হবে পুরো বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..