ফিরে দেখা ২০ জানুয়ারি ২০০১

[লেখাগুলি ২০০১ সালের ২৯ জানুয়ারি ও ৫ ফেব্রুয়ারির সংখ্যায় প্রকাশিত]

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

জীবন দিয়ে লাল ঝাণ্ডা তুলে ধরলেন কমরেড আবুল হাশেম মোর্শেদ আলী ১৯৬৯ সালে আমি যখন ডেমরা শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দিই শহীদ আবুল হাসেম তখন লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের একজন শ্রমিক। তাঁত চালাতেন তিনি এবং ওই সময় থেকেই শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অল্পদিনের মধ্যে পার্টির গ্রুপে সংগঠিত হন। থাকতেন ডেমরা বাজারে পরিবারসহ। পরে কিছুদিন সারুলিয়অ এলাকাতেও ছিলেন। ১৯৮১ সালে জিয়া সরকার আমাদের সিবিএ ইউনিয়নকে জোর করে উৎখাত করে। সে সময় এর বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন হয়। কমরেড হাসেমকে বিরোধী পক্ষ নির্মমভাবে মারধর করে। তিনি আহত হয়ে কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকেন। পরে তাঁকে’সহ প্রায় পাঁচশ জন শ্রমিককে সরকারি নির্দেশে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর জীবন রক্ষার জন্য তিনি আদমজী জুট মিলে বদলি শ্রমিকের কাজ নেন। কমরেড তাজুল তখন আদমজীর নেতা। কমরেড তাজুলের বাসায় তিনি থাকতেন। সেখানে শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন, সংগঠন দাঁড় করানোর জন্য অন্যান্য পার্টি কমরেডদের নিয়ে আবুল হাসেম কাজ চালাতেন। কমরেড তাজুল যখন শহীদ হন তখন তাঁর সঙ্গে কমরেড হাসেম ছিলেন। ঢাকায় খবর নিয়ে আসেন কমরেড তাজুল আর নেই। ’৯০-র পরে অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের সিবিএ নির্বাচনে আমরা জয়লাভ করি। তখন কমডে হাসেম আবার বাওয়ানী জুট মিলে চাকরি ফিরে পান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পার্টি ও শ্রমিক আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে ছিলেন। নেতা হওয়ার জন্য পেটি বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে কাজ করতো না। কিভাবে, কি হলে আন্দোলন-সংগঠন এগিয়ে যাবে সেটাই ছিল তাঁর মূল চিন্তা। কমরেড হাসেম জীবন দিয়ে পার্টির ঝাণ্ডাকে ঊর্ধ্বে তুলে রেখে গেলেন। কমরেড হাসেম লাল সালাম। তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার দায়িত্ব নতুন প্রজন্ম হাতে নেবে। তুমি অমর। ৩ ফেব্রুয়ারি ১১ দলের বিক্ষোভ মিছিল মিছিলে আর আসা হলো না বিপ্রদাশের কাপালিমেট, মোংলা, বাগেরহাটের ছেলে বিপ্রদাশ ২০ জানুয়ারি

সিপিবি’র লাখো মানুষের মহাসমাবেশে এসেছিলেন পল্টন ময়দানে। নিরোদ বিহারী রায় ও সবিতা রায়ের সন্তান বিপ্রদাশ ছিলেন খুলনা বি.এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অর্থনীতি (সম্মান), প্রথম বর্ষের ছাত্র। ২০ বছরের টগবগে তরুণ বি.এল কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন, থাকতেন মিছিল সমাবেশের পুরোভাগে। আর তাই ২০ তারিখের মহাসমাবেশে এসেছিলেন খুলনা জেলা সিপিবি’র সাথে। রাতজাগা ভ্রমণ ক্লান্তি ভুলে গিয়ে রাজধানী শহরে মিছিল করেছেন প্রচণ্ড রোদ্দুর উপেক্ষা করে সমাবেশে বক্তৃতা শুনেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যখন লাখো মানুষের মিছিলের কয়েক মহূর্তের অপেক্ষা অন্যান্যের মতো তাকেও উদ্বেলিত করেছিল– সেই সময় বিস্ফোরিত হয় ঘাতকের নির্মম বোমা। বোমার স্প্রিন্টার আঘাত হানে তার বাম ফুসফুসের ওপরের অংশে। বিপ্রদাশকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও পরে ২০ জানুয়ারি রাতেই মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা দ্রুত তার ফুসফুসে অস্ত্রপচার করেন। এরপর বিপ্রদাশ ৩/৪ নং ওয়ার্ডের ৫নং বেডে ডাক্তার ও নার্সদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন গত ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। বিপ্রদাশের পাশে সার্বক্ষণিকভাবে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়নের কর্মীরা ছিলেন সেই আহত হওয়ার পর মুহূত থেকে। পালাক্রমে রাত জেগে বসে থেকেছেন বিপ্রদাশের সেবায়-স্বজনের মত। বিপ্রদাশও সুস্থ হতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ২৯ জানুয়ারি সকাল ১১টায় হঠাৎ করেই তার কর্ডিয়াক এ্যারেস্টসহ দেহ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তাকে তৎক্ষণাৎ পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে নিয়ে ২ ব্যাগ রক্ত, অক্সিজেনসহ অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর বিপ্রদাশকে চিকিৎসকরা আবার বেডে নিয়ে আসেন। এসময় তার অবস্থা দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। চিকিৎসকরা তাকে স্বাভাবিক খাবার খেতে দেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে বিপ্রদাশের মাকেও মোংলা থেকে নিয়ে আসা হয়। আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন ডাক্তাররা। কিন্তু গত ২ ফেব্রুয়ারি

দুপুরের খাবার খাওয়ার প্রায় আধ ঘণ্টা পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসকরা ছুটে আসেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বিপ্রদাশ মৃত্যুবরণ করেন। বিপ্রদাশের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই কমিউনিস্ট পার্টি সভাপতি কমরেড মনজুরুল আহসান খান, সিপিবি’র কেন্দ্রীয় সদস্য ও একতার নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রহমান, ক্ষেতমজুর নেতা অ্যাড. সোহেল আহমেদ ও অ্যাড. আনোয়ার হোসেন রেজা, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি ছাত্রনেতা সোহেলসহ আরো অনেকে সেখানে ছুটে যান। মৃত্যুর সময় বিপ্রদাশের মা, কাতাতো ভাই অমেন্দ্র নাথ রায় ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ক্ষেতমজুর নেতা রমেন্দ্র বর্মন। চলে গেলেন বিপ্রদাশ। কিন্তু মৃত্যুর আগে একতার পক্ষ থেকে আমরা গিয়েছিলাম আহত বিপ্রদাশের সঙ্গে কথা বলতে। বোমা হামলার পর কিছু ভাবছেন, পার্টি, সংগঠন ইত্যাদি সম্পর্কে তার কাছে জানতে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহত বিপ্রদাশ বলেছিলেন, পল্টনের এই দুঃখজনক ঘটনায় কোনো আফসোস নেই– এটা একটা দুর্ঘটনা। কিন্তু এর জন্য নিজেকে গুটিয়ে নেবো কেন? আমি আবারো রাজপথে আসবো। আমি মিছিলে আসব। পার্টিকে এগিয়ে নিতে হবে, লাল ঝাণ্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। আমি মিছিলে আসব, বারবার আসব। লেখাপড়া শেষ করে মানুষ হয়ে দিনমজুর দুঃখিনী মা ও ছোট বোনের কষ্ট দূর করারও কথা ছিল বিপ্রদাশের। বিপ্রদাশের কথাগুলো এখনো কানে বাজছে, মিছিলে আসব, আমি বারবার মিছিলে আসব। লাল সালাম কমরেড! কমরেড বিপ্রদাশ, আমরা তোমার লাল ঝাণ্ডা তুলে ধরতে এখনো বেঁচে আছি। তোমার হত্যার প্রতিশোধ নিতে এখনো এ দেশের লক্ষ-কোটি জনগণ অপেক্ষমান–লাল সালাম কমরেড! কমরেড হিমাংশুর পুত্র জামা চায় না, চায় একটি লাল টুপি অ্যাড. ফিরোজ আহমেদ ‘কাকু-আমি কোনো জামা কাপড় চাই না, আমাকে তুমি একটি লাল টুপি দিও’-পল্টনে সিপিবি’র মহাসমাবেশের শহীদ হিমাংশু মণ্ডলের কিশোরপুত্র কল্লোলের কান্নার আর্তি প্রতি মুহূর্তে আমার কানে বাজছে। ৯ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার দুপুর বেলা। বটিয়াঘাটা

থানা কমিটির সভ্য, প্রাথী সভ্যদের সাধারণ সভা ছিল স্থানীয় কলেজ প্রাঙ্গণে। সভার কারণে গিয়েছিলাম বটিয়াঘাটায়। সভার পূর্বে মটর সাইকেলযোগে হিমাংশু মণ্ডলের বাড়িতে যাই। ইট বিছানো রাস্তা আর এবড়ো-থেবড়ো মাটির গ্রাম্যপথ পেরিয়ে শহীদ হিমাংশু মণ্ডলের বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, দুপুর পেরিয়ে গেছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের উপার্জনক্ষম হিমাংশুর মৃত্যুর পর পরিবারটি দিশেহারা। পার্টির আর্থিক অনুদান শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করতে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। জমিতে কিছু আলু ছিল। আলু জমিতে বড় হওয়ার আগে তুলে এনে উঠোনে বিক্রির চেষ্টা চলছে। দাড়িপাল্লায় মাপামাপি হচ্ছিল তখন। আমি হিমাংশুর বাড়িতে পৌঁছানো মাত্র ছুটে এলো পরিবারের সদস্যরা। বৌদি, তিন মেয়ে, পরে পুত্র কল্লোল। বড় মেয়ে অভাবের কারণে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। মেজোটি বিবাহিতা এবং অন্তঃসত্ত্বা ছোটটি দশম শ্রেণির ছাত্রী। পুত্র কল্লোল সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। এক বোতল হরলিক্স নিয়ে গিয়েছিলাম অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটির জন্য। কল্লোল হিমাংশুর ছবি সম্বলিত পার্টির পোস্টারটি ভীষণ আগ্রহে দেখালো আমাকে। অবুঝ কিশোর জানে না এ পোস্টার দেশের সর্বত্র এখন দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। কান্না এবং গর্বে কল্লোলের মুখ তখন দীপ্ত। ফিরে আসার আগ মুহূর্তে কল্লোলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি আমার কার্ড কল্লোলকে দিয়ে বললাম, আমার ঠিকানা রাখ। কাপড়, জামাসহ প্রয়োজনীয় জিনিস লাগলে আমাকে চিঠি লিখ। পাঠিয়ে দেবো। এক মিনিট নিশ্চুপ, নীরব থাকার পর কল্লোল বললো ‘কাকু আমি কোনো জামা কাপড় চাই না। আমাকে তুমি একটা লাল টুপি দিও’। কমরেড হিমাংশু মৃত্যুর পরও লাল পতাকা ত্যাগ করেননি। আর তার পুত্র কল্লোল একটি লাল টুপি পেতে চায়। কমরেড হিমাংশুর সোনার ছেলে কল্লোল। পার্টিরও সোনার ছেলে। কল্লোলরাই তো পার্টির ভবিষ্যৎ, যারা আমাদের লাল পতাকা আগামী দিনে বয়ে বেড়াবে। সে লাল পতাকা তো বিপ্লবের পতাকা। কল্লোলের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..