তিন আইন স্থগিত, দিল্লি ছাড়েনি কৃষক

নিমাই গাঙ্গুলী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

দিল্লির কনকনে ঠান্ডা। যার সঙ্গে কোনভাবেই আমাদের দেশের ঠান্ডার তুলনা হয় না। আর এই হাড় কাঁপানো শীতেই রাত কাটাচ্ছে লক্ষ লক্ষ কৃষক। দিল্লি শহর জুড়ে হাজার হাজার ট্রাক্টর। তার উপরে অথবা খোলা মাঠে তাবু টানিয়ে রাত্রিযাপন। ইতোমধ্যে এভাবে ৫০ রাত পার হয়েছে। হরিয়ানা-পাঞ্জাবের কৃষকরাই মূলত চাল, ডাল, আটা অথবা প্রস্তুতকৃত খাবারের যোগানদাতা। কখনও কখনও নিজেদের রান্না নিজেরাই করেন। কৃষিপ্রধান এই নিকটবর্তী রাজ্য দুটির অংশগ্রহণও বেশি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাই প্রথম দিকেই এই আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করেছে। এই দুই রাজ্যের কৃষকদের একটা বড় অংশই শিখ সম্প্রদায়ের পাঞ্জাবী। আর তাই এই আন্দোলনকে শিখ সম্প্রদায়ের আন্দোলন বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে সাম্প্রদায়িক মোদী সরকার। কিন্তু কৃষকরা এসব অপপ্রচারে একেবারেই বিভ্রান্ত হয়নি। বরং তাদের আন্দোলন আরো জোরদার হয়েছে। পাঁয়তারা চলছিলো এপ্রিল থেকেই। সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যসভায় কৃষি সংস্কারবিষয়ক তিনটি বিল উপস্থাপিত হয়। সংসদে বিরোধীদের প্রতিবাদ ও ভাঙচুরের কারণে ৮ সাংসদের সদস্যপদ স্থগিত হয়। কৃষক সভার নেতৃবৃন্দ প্রথম থেকেই এই বিলের বিরোধিতা করে আসছিলেন। সবার বিরোধিতার মুখে এই বিল পাস হয়ে যায়। কৃষকবিরোধী তিন বিল, তিন আইনে পরিণত হয়। কৃষকদের সুশৃঙ্খল জমায়েত হতবাক করেছে সারা বিশ্বকে। কোনো বাড়াবাড়ি নেই, ভাঙচুর নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ দিল্লি শহরে অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যাকে বলেছেন “টুকরে টুকরে গ্যাং” অথবা “বিছিন্নতাবাদী খালিস্থানি আন্দোলন”। এতো উস্কানি সত্ত্বেও আন্দোলন চলেছে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই। প্রতিদিন আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন গান আর স্লোগান। এ যেন এক কাব্যিক মহাসমাবেশ। একে একে এই আন্দোলনে সামিল হয়েছে ৫শ’র বেশি কৃষক, ক্ষেতমজুর, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। কৃষক নেতৃবৃন্দ দফায় দফায় মিটিং করছে সরকাররের মন্ত্রীদের সাথে। কিন্তু মোদী সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল। আইন বাতিল হবে না। আর কৃষিবিরোধী আইনগুলোর বাতিল চায় কৃষক। জীবন পণ লড়াই তাদের। ইতোমধ্যে দিল্লি শহরে আন্দোলনরত ৭০ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তবুও কৃষক রাজপথ ছাড়েনি। তিন আইনের বাতিল ছাড়া ঘরে ফিরবে না কৃষক। কী আছে তিন আইনে? সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্য সভায় কৃষি সংস্কারের উদ্দেশ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি বিল উথাপন করে। এই বিল তিনটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে পাস হয়ে এখন আইনে পরিণত হয়েছে। প্রথম বিল - “ফারমার্স প্রডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স বিল ( প্রমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটিশন)-২০২০”। এই আইনের ফলে সরকার নিয়ন্ত্রিত কৃষিবাজার বা মান্ডিগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে। কৃষিবাজার বা মান্ডিগুলো গড়ে তোলা হয়েছিলো ফরিয়াদের দৌরাত্ম্য কমানোর উদ্দেশ্যে। প্রত্যেকটা রাজ্যে স্থানীয় পর্যায়ে এই কৃষিবাজার বা মান্ডিগুলো গড়ে উঠেছে। এখনও নতুন নতুন মান্ডি গড়ে উঠছে। যেখানে কৃষক সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে। এখানে রাজ্য সরকারের একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে। কিন্তু নতুন আইনে রাজ্য সরকারের কোনো ভূমিকা থাকবে না। কৃষক চাইলে মান্ডির বাইরে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। আর মান্ডির বাইরে যে কেউ এই পণ্য কিনতেও পারবে। এর ফলে কৃষিপণ্য ব্যবসায়ে নতুন নতুন বৃহৎ পুঁজির প্রবেশ ঘটবে। কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে মান্ডির ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে কৃষিকে মুক্তি দিতেই এ আইন। অন্যান্য পণ্যের মতই কৃষিপণ্যের বাজার হবে উন্মুক্ত। কৃষিবাজার থেকে আসা রাজস্ব আগে রাজ্য সরকার পেতো। নতুন আইনে রাজ্য সরকার আর কৃষিবাজারের রাজস্ব পাবে না। তাই প্রথম আইনটির ফলে মান্ডিগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে। রাজ্যগুলো কৃষি বাজারের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। আর কৃষিতে কর্পোরেট পুঁজির প্রবেশ ঘটবে। এই আইনের ফলে বাজারের ওপর কৃষক বা সরকার কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তাই কৃষক এই আইন মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় বিল- “ফারমার্স (এম্পাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরেন্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস বিল-২০২০”। এই আইনে চুক্তিভিত্তিক চাষ বা কন্ট্রাক্ট ফারমিং- এর কথা বলা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কৃষক চাষ শুরু করার আগেই ক্রেতার সাথে দাম নির্ধারণ করবে। আইনে চুক্তির একটা রূপরেখাও দেয়া হয়েছে। কী পণ্য, কীভাবে সরবারহ হবে তা উল্লেখ থাকবে চুক্তিতে। একপক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে অপর পক্ষ আদালতেও যেতে পারবে। কিন্তু পণ্যের দাম কিভাবে নির্ধারিত হবে তা এ আইনে উল্লেখ নাই। আর ক্রেতা যদি চুক্তি ভঙ্গ করে তবে ক্ষুদ্র চাষিদের এমন কোনো সম্পদ বা অর্থ নাই যা দিয়ে তারা মামলার ব্যয় নির্বাহ করবে। জমিদার আমলের অবস্থাতেই যেন আবার ফিরে যাবে কৃষকরা। আর তাই এ বিল প্রত্যাখ্যান করেছে কৃষক। তৃতীয় বিলটি হচ্ছে- “অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটিজ (এমেন্ডমেন্ড) বিল বা অত্যাবশ্যক পণ্য বিল-২০২০”। এই আইনে চাল, ডাল, আলু, তৈলবীজ ও পেঁয়াজের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যকে অত্যাবশ্যক পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এর ফলে এসব শস্যের উৎপাদন, বিক্রি বা গুদামজাতকরণে আগের মতো আর সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ব্যবসায়ী বা মজুদদাররা এখন তাদের ইচ্ছামতো অত্যাবশ্যকীয় এসব খাদ্যদ্রব্য ক্রয়, বিক্রয়, মূল্য নির্ধারণ ও গুদামজাত করতে পারবে। আগে রাজ্য সরকার পণ্যের উৎপাদন এবং চাষিদের দিকে নজর রেখে গুদামজাত করার সিদ্ধান্ত নিতো। এখন বিষয়টা চলে গেল কেন্দ্রের হাতে। আর কেন্দ্র এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে দামের ওপর। কেন্দ্রীয় সরকার শুধু এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে, যদি পচনশীল পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ আর অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আবার রাজ্য ভেদে প্রত্যেক পণ্যের দামের ওঠানামাও হয় একেক রকম। এতে কৃষকের স্বার্থ যেমন ক্ষুণ্ন হবে তেমনই ক্ষুণ্ন হবে রাজ্যগুলোর অধিকার। আর তাই কৃষকদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও মানছেন না এ আইন। ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে বিতর্কিত কৃষি আইনগুলো স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে। এই তিন আইন সংস্কারের উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্ট একটা কমিটিও করে দিয়েছে। এটাকে কৃষকের আপাত বিজয় হিসেবেই দেখছেন আন্দোলনরত নেতৃবৃন্দ। কৃষক কিন্তু আগে থেকেই সংস্কারের সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কৃষক নেতারা বলেছেন, কোর্ট কেন, কৃষকের সমস্যার সমাধান করবে সরকার। তারা চান তিন কৃষি আইনের বাতিল। কৃষকের সাফ কথা- রাজ্যের কৃষি কেন্দ্রের হাত থেকে ফিরিয়ে দিতে হবে রাজ্যের হাতে। চুক্তিভিত্তিক চাষের আইন কৃষক মানবে না। মান্ডিই হবে কৃষকের পণ্য বিক্রির বাজার। কৃষকবিরোধী তিন আইনের বাতিল ছাড়া ঘরে ফিরবে না কৃষক। লেখক : সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..