স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন এবং শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতি

মাহবুব আলম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এই লেখার বিষয়বস্তুটি শুধু স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন নিয়ে নয়। অথবা স্বশাসিত নির্বাচিত সংস্থাগুলির ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা কীভাবে এই সংস্থাগুলির অধিক গণতন্ত্রায়ণ সম্ভব তা নিয়েও নয়। বরং তা একান্তভাবে নির্বাচিত সংস্থাগুলির আওতাধীন এলাকাগুলিতে চলমান আন্দোলন সংগ্রামের সাথে আমাদের পার্টি, শ্রেণি ও গণ-সংগঠনগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে। বিশেষ করে একটি “অগ্রবর্তী প্রভাবক” লেনিনীয় পার্টি এবং সেই পার্টির সদস্য হিসেবে যারা সমাজে, গ্রাম ও শহরে কাজ করছেন তাদের জন্য গভীরভাবে বিবেচনাযোগ্য কিছু প্রস্তাবনার বিষয়ে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পার্টির সর্বস্তরেই প্রচলিত নির্বাচন বিষয়ে কিছু মৌলিক ঐক্যমত্য আছে। নির্বাচন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও ভূমিকা বিষয়ে আমাদের কিছু রক্ষণশীলতা বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থাকলেও, নির্বাচনকে প্রচার ও আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনার লেনিনীয় নীতিতে আমরা সহমত। তবে কোনো একটি বিশেষ নির্বাচনে বা আন্দোলনে অংশ নেয়া না নেয়ার বিষয়টি নির্ভর করে, পার্টি কর্তৃক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ সাপেক্ষে গৃহিত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে। তবে নির্বাচন সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত: জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হিসেবে একটি সাধারণ ধারণা থাকলেও, স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনও এই চিন্তার বাইরে নয়। প্রসঙ্গত, পার্টির একাদশ কংগ্রেসে উত্থাপিত, কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্টের “নির্বাচন ও নির্বাচনী সংস্থার কাজ” বিষয়ে বর্ণিত পর্যালোচনায়, সকল নির্বাচনের অংশগ্রহণের বেশকিছু উৎসাহব্যঞ্জক সংবাদ রয়েছে। এবং সেখানে পার্টির মধ্যে নির্বাচন বিষয়ে অংশগ্রহণে রক্ষণশীলতা, নির্বাচনের প্রস্তুতিহীনতা, স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনাগ্রহ, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না বলে নির্বাচন থেকে বিরত থাকা, নিজস্ব মার্কা ব্যবহারে দ্বিধা, পার্টির পরিচয় আড়াল করার প্রবণতা ইত্যাদি প্রবণতার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “নির্বাচন সম্পর্কিত ঘাটতিগুলো পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে দূর করতে হবে। নির্বাচন-ব্যবস্থা সংস্কার এবং কালো টাকা, পেশিশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, প্রশাসনিক কারসাজিমুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বেগবান করতে হবে। ” একটু গভীরভাবে দেখলে, পার্টির এই পর্যালোচনার ভেতর দিয়ে আমরা দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সন্ধান পাই। প্রথমত: নির্বাচন সংক্রান্ত ঘাটতিসমূহ দূর করার পার্টিগত উদ্যোগের স্বীকৃত প্রয়োজনীয়তা, দ্বিতীয়ত: নির্বাচনকে জনগণের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে মানুষের অংশগ্রহণভিত্তিক আন্দোলনে পরিণত করার দায়। এক্ষেত্রে প্রথমটি হচ্ছে, সংগঠনের সচেতন ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের প্রশ্ন আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সেই সাংগঠনিক কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে সংগঠনের চারপাশে শ্রেণি-গণ মানুষের সমাবেশ নিশ্চিত করা। সাংগঠনিক উদ্যোগ এবং তার মাধ্যমে সংখ্যাধিক্য মানুষের আস্থা অর্জনের এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় যে তুলনামূলকভাবে সচেতন সামাজিক শক্তির জন্ম হয়, সেটাই পার্টির কাক্সিক্ষত দ্বিতীয় শর্তটি পূরণের চাবিকাঠি। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, গত ৫০ বছর ধরে আমাদের গ্রাম-শহরে ঘটে যাওয়া সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণ করা সচেতন সাংগঠনিক কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে বিশ্বাস এবং জাগরণ সৃষ্টি করবে তাই পার্টির বিকল্প সামাজিক ভিত্তির ভ্রুণ হিসেবে কাজ করবে। তবে এই দ্বিতীয় শর্তটির পূরণ, একটি বা গুটি কয়েক কর্মসূচি পালনের বিষয় নয় বরং এ হল বিপ্লবী লক্ষ্যাভিমুখী এক অব্যাহত, সুদূরপ্রসারী রণনৈতিক কার্যক্রমের অংশ। এ পর্যায়ে, শুধুমাত্র জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনকেও একটি আন্দোলনের পন্থা হিসেবে গ্রহণ করতে পার্টির সাংগঠনিক উদ্যোগের, চুম্বক আকারে হলেও একটি সম্প্রসারণযোগ্য রূপরেখা উত্থাপন করা যেতে পারে: (এক) নির্বাচনী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, ট্রেনিং মেটেরিয়াল তৈরি এবং সংগঠনের সাথে আন্দোলনকে গ্রথিত করতে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল টিম গঠন। (দুই) কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল টিমের কর্মকাণ্ডের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রচারের জন্য নির্বাচন, প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচন অথবা বিজয় অর্জনের জন্য নির্বাচনের স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে, প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনের পূর্বে এবং পরে প্রার্থীর কর্মকাণ্ডের সুচিন্তিত এবং বাস্তবসম্মত বিকল্প বিধিমালা প্রণয়ন। (তিন) কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল টিম কর্তৃক প্রণীত “বিকল্প নীতিমালার” ভিত্তিতে জেলা টিম গঠন এবং প্রস্তুতকরণ। যাতে সেই টিম, জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনকে “বিকল্প পন্থায় এবং বিকল্প গড়ার” লক্ষ্যে প্রস্তুত করে তুলতে পারে। উপরোল্লিখিত সাংগঠনিক পরিকল্পনার প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়নের এবং অনুশীলনের দুর্বলতা থাকলে বোধগম্য কারণেই তা চলমান শ্রেণিসংগ্রাম, লোকাল-পার্শিয়াল আন্দোলন, অন্যান্য গণ আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জনকে বিলম্বিত করবে। ক্ষতিগ্রস্ত করবে পার্টির স্বাধীন ভূমিকা, শ্রেণি ও গণ-সংগঠনসমূহের বিকাশ এবং গণভিত্তিক বিপ্লবী পার্টি হিসেবে গড়ে ওঠার মহতী প্রচেষ্টাকে। বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে। যেমন, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত এবং বিজয়ী নেতাকর্মীসহ আমাদের সমর্থিত ব্যক্তিদের কতজন আমাদের সাথে বর্তমানে কাজ করছেন? স্থানীয় সরকারের ভেতর তাদের কাজের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষাসমূহ কি কি? বিগত দিনে স্থানীয় সরকারের কাজে তারা কি কোন গণমুখী বিকল্পনীতি অনুসরণ করেছেন? না কি তারা, প্রচলিত চেয়ারম্যান-মেম্বরদের মত, রাষ্ট্রের সীমিত সেবামূলক তথ্যসমূহ গোপন করে, স্থানীয় সংস্থাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন? বলাই বাহুল্য যে, পার্টি এবং সংগঠনের পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া এইসব প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর পাওয়া এবং সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানো দুষ্কর। এটা লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি-গণ সংগঠন হিসেবে কৃষক সমিতি এবং ক্ষেতমজুর সমিতির ঘোষণা এবং কর্মসূচিতে স্থানীয় সরকারের (ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌরসভা) নির্বাচন সম্পর্কে কোন উল্লেখযোগ্য ঘোষণা বা কর্মসূচি নেই। আমার ধারণা, এটা হল ৬০’এর দশক থেকে চলে আসা ঐতিহ্যগত পন্থায় এসব সংগঠন পরিচালনার অভ্যাস মাত্র। এটি, হয় আন্দোলন-সংগঠন পরিচালনায় নুতন বাস্তবতা এবং প্রয়োজনীয়তা ধরতে না পারার দুর্বলতা, অথবা আন্দোলন-সংগঠনকে “স্বাচ্ছন্দ্যের রাজনীতি” (পড়সভড়ৎঃ ুড়হব ঢ়ড়ষরঃরপং) থেকে বের করে আনতে না পারার ব্যর্থতা। স্বাচ্ছন্দ্যের রাজনীতি হচ্ছে এমন এক পেটি-বুর্জোয়া সুবিধাবাদী প্রবণতা যা পার্টি এবং সংগঠনকে শত্রুর চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহসকে ভোতা করে দেয়। নানা অজুহাতে শত্রুর সাথে সহাবস্থান করে কার্যত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার সুবিধাবাদকে লালন করে। আরো পরিষ্কার করে বললে, এটা হল পার্টির সর্বস্তরে বুর্জোয়া-নির্ভরতা আর সুবিধাবাদী মোহের বিস্তার ঘটিয়ে পার্টির স্বাধীন বিকাশের পথ রুদ্ধ করা। আমাদের ক্ষেতমজুর সংগঠন সারা বছর মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করবে, কৃষক সংগঠন কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্যের জন্য লড়াই করবে অথবা আমাদের নেতাকর্মীরা, আরো বৃহত্তর পরিসরে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে জলাবদ্ধতার নিরসন, নদীভাঙন রোধ অথবা এলাকার যে কোনো উন্নয়নে জানকবুল সংগ্রাম করবে কিন্তু বছর শেষে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারগুলো গঠন করবে এলাকার চিহ্নিত গণবিরোধী শক্তি। আমরা এর বিপরীতে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের অব্যাহত সংগ্রামের ন্যায্য হিস্যা দাবি না করে, নির্বাচনী আন্দোলনে দর্শকের ভূমিকা নেবো- এটা সঠিক নয়। বরং বলা ভুল হবে না যে, এটা হল “রুটি-রুজির জন্য কমুনিস্ট পার্টি আর ক্ষমতার জন্য ধনীদের দল” এই পুরানো প্রচলিত ধারণারই প্রতিরূপ। আমাদের বুঝতে হবে যে, জাতীয় নির্বাচনের মত, স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনেও শ্রেণিসংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের লক্ষণসমূহের অভূতপূর্ব সম্মিলন সুস্পষ্ট। সেকারণেই জাতীয় নির্বাচনের মতো, স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনগুলোতেও সকল পশ্চাদপদ ধারণা এবং অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে গণভিত্তিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের আদর্শিক বিশ্বাস এবং গণমুখী বিকল্পের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অর্থ-বিত্তের নির্বাচনের বিপরীতে গণ-তহবিলের নির্বাচন, তথাকথিত বংশ আভিজাত্যের বিপরীতে ন্যায়নীতি আর অধিকার আদায়ে শ্রেণি শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব, সন্ত্রাস আর পেশিশক্তির নির্বাচনের বিপরীতে সাধ্য অনুযায়ী গণপ্রতিবাদ বা গণপ্রতিরোধের দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মকে ব্যবহারের বিপরীতে সকল ধর্মের ভেতর অন্তর্নিহিত উদারতা ও সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহার, আঞ্চলিকতাসহ অন্যান্য পুরানো ধ্যান-ধারণার বিপরীতে ফাঁকা আবেগী স্লোগান নয়, সৃজনশীল ইস্যুভিত্তিক স্লোগানকে জনপ্রিয় করে গণসমাবেশ ঘটাতে হবে এবং শোষিত মানুষের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আশাবাদ জাগিয়ে তুলতে হবে। একইভাবে, নির্বাচনী আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার কাজে উল্লিখিত বিকল্প পদ্ধতির ধারাবাহিকতায়, নির্বাচনোত্তর কার্যক্রমেরও একটি অসম্পূর্ণ কিন্তু সম্প্রসারণযোগ্য নিম্নোক্ত কিছু কর্মপন্থা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে: (এক) স্থানীয় সংস্থাগুলোর লুক্কায়িত সেবাসমূহের (ঢ়ৎড়লবপঃং) স্থানীয় গণমানুষের কাছে উন্মুক্তকরণ এবং তার সাথে স্থানীয় প্রান্তিক মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারের সমন্বয়সাধন; (দুই) গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের দাবিকে জনগণের দাবিতে রূপান্তরিত করতে লোকাল সাংসদ, স্থানীয় আমলা (টঘঙ), ঘএঙ কর্তৃক গণসেবা ও উন্নয়ন কার্যপরিচালনার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের বিপরীতে স্থানীয় নির্বাচিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠার গণভিত্তিক সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। (তিন) বাস্তব ঘটনাবলির মধ্যদিয়ে স্থানীয় সংস্থাগুলির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মুখোশ উন্মোচন করে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের আকাঙ্ক্ষাকে উচ্চতর আন্দোলনের দিকে শাণিত করতে হবে। কিন্তু এটা বলাটা বোধকরি অতিশয়োক্তি হবে না যে, আমাদের গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শত শত স্থানীয় বিকল্প গণনেতার উপস্থিতি ব্যাতিরেকে, জাতীয় ক্ষেত্রে বিকল্প শক্তির উত্থান অধরা থাকতে বাধ্য। যদিও এই বিষয়গুলি বলার চাইতে, করাটা শতগুণ কঠিন। কিন্তু আজকের সময়ে, এর কোনো শর্টকাট আছে বলে মনে হয় না। ইউরোপ-আমেরিকা, লাতিন-আমেরিকা, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার সমসাময়িক গণ-জাগরণ, গণ-আন্দোলন এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ ও বহুজাতিক কর্পোরেশনের দুনিয়াব্যাপী নিও-লিবারেল পলিসির আগ্রাসন ঠেকাতে, জাতীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় সকল ক্ষেত্রেই, গণজাগরণ এবং গণভিত্তিক প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই এবং এটা সময়ের দাবি। সে কারণে আমরাও কোনভাবে এই বাস্তবতার বাইরে নই। তবে এটা জোরের সাথে বলা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এই ধরনের বিকল্প দৃষ্টান্তের প্রতিষ্ঠা যত কঠিনই হোক না কেন, এইসব দৃষ্টান্তের প্রসার হবে ছোঁয়াচে রোগের মত দ্রুত সংক্রমণশীল এবং বর্ধনযোগ্য। এই ধরনের দৃষ্টান্ত এলাকা থেকে এলাকায় এক অভাবনীয় দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতা তৈরি হয়ে আছে। আজকে হাজার প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মাঠে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের ঝাণ্ডা বহনকারী কমরেডদেরই সর্বস্তরে বিকল্প সৃষ্টির সৃজনশীল দৃষ্টান্তের উপায় সন্ধান করতে হবে। কারণ, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাম পন্থা এবং সমাজতন্ত্রের অনুসারী বুদ্ধিজীবী গবেষকরা, সমাজতন্ত্র পুনর্গঠনের খুঁটিনাটি বিষয়ের গবেষণায় যতটা উৎসাহী, ঠিক ততোটাই, সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের পথ-পদ্ধতির গবেষণায় অনুৎসাহী। কারণটা সহজ, লুটপাটকারী ধনিকদের এই বাংলাদেশে, সমাজতন্ত্রের গবেষণা বিপ্লবী পোশাকে এক শান্তিপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তির উপায় কিন্তু সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে ক্ষমতা দখলের স্বাধীন লড়াই হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ এবং কষ্টসাধ্য। স্বাধীনতার পর, গত ৫০ বছরে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর, মেরুদণ্ডহীন, লুটপাটকারী ধনিকরাই, শুধুমাত্র ক্ষমতা বজায় রাখার হীন স্বার্থে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে অকার্যকর করেছে। বাঙালি ধনিকদের এই কুৎসিত ক্ষমতালিপ্সার সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষার আধুনিক রূপ, বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির মুনাফার জন্য রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নিও-লিবারেল নীতি-কৌশলের বিচরণের অবাধ মুক্তবাজার নীতির আগ্রাসন। একইসাথে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কহীন বিষয়গুলি যেমন ব্যক্তির আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা, বংশ, ধর্ম, অঞ্চল, অর্থ ইত্যাদির আবেগ আর বৈষয়িক অনৈতিক সুবিধাকেই নির্বাচনের মুখ্য বিষয় হিসেবে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এই গণবিরোধী ব্যবস্থাকে হালাল করে তুলছে কর্পোরেট মিডিয়া, মেরুদণ্ডহীন বুদ্ধিজীবীদের স্তুতি সর্বস্বতা এবং শোষিত মানুষের দুর্বল সংগঠন এবং ঐক্যের অভাব। এ রকম পরিস্থিতিতে কমুনিস্ট বিপ্লবীদের দ্বারা বিপ্লবী লক্ষ্যাভিমুখে পরিচালিত প্রয়াসের অংশ হিসেবে নির্বাচনী সংগ্রাম, শ্রেণি-গণসংগ্রামের ধারায় বিকল্প রাজনীতি এবং বিকল্প সামাজিক ভিত্তি গড়ে তোলার দুরূহ কাজটি করতে সৃজনশীল উপায় অনুসন্ধান সবিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ তথা মানবমুক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবহমানকালের লালিত স্বপ্নকে স্বার্থক তুলতে এসব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া জরুরি। লেখক : কানাডা প্রবাসী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..