কেরালায় বামদের বিপুল জয়

রতন খাসনবিশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনে কেরালায় বিপুলভাবে জয়ী হয়েছে বাম জোটের প্রার্থীরা। বুথওয়ারি গণনার হিসেবটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে ১০১টি বিধানসভা কেন্দ্রে পুরভোট এবং পঞ্চায়েত ভোটে বামপন্থিরা নির্বাচিত হয়েছেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে আছে ৩৮টি বিধানসভা কেন্দ্রে। মাত্র ১টি বিধানসভা কেন্দ্র বিজেপির দখলে আছে। বলা প্রয়োজন যে, তিরুবনন্তপুরম লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে নেমম বিধানসভা আসন ২০১৬ সালে যেটিতে বিজেপি জয়লাভ করে, একমাত্র সেই কেন্দ্রটি এবারও আছে বিজেপির দখলে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ১৬টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবার এই সব কেন্দ্রের অধিকাংশই তাদের হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেরালার বাম জোট জয়ী হয়েছিল ৮২টি আসনে। পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোটে ফলাফলে যা ইঙ্গিত আছে তার নিরিখে বলা যায় যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কেরালায় এবার তার চেয়েও বেশি আসনে জয়ী হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বাম জোটের। কেরালায় সচরাচর ৫ বছর অন্তর সরকার বদল হয়। সদ্য সমাপ্ত পুরসভা ও ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে ইঙ্গিত আছে তাতে এটা মনে করার সঙ্গত কারণ আছে যে কেরালায় সরকার বদলের ট্র্যাডিশন এবার সম্ভবত ভাঙতে চলেছে। বিপুল ভোটে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে কেরালার বাম জোট অথবা এলডিএফের। বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কেরালা সরকার কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল প্রধানত দুর্নীতির প্রশ্নে। সদ্য সমাপ্ত পুরসভা ও ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বোঝা গেল, এই অভিযোগ জনমানসে রেখাপাত করতে সমর্থ হয়নি। আরও যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সেটা এই রকম যে, কেরালার কংগ্রেস যত বেশি করে বিজেপির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাম জোটের বিরোধিতায় নামছে, তত বেশি করে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বহু ধর্ম অবলম্বনকারী মালয়ালমভাষী রাজ্য কেরালা। এই রাজ্যটি নানা দিক থেকে বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতির আধার। বিজেপির একমুখী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সেকারণেই কেরালায় স্থান পায় না। কেরালার কংগ্রেস ধর্মীয় বহুত্ববাদী কেরালাবাসীদের রাজনৈতিক আধার হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্ত পূরণ করে। প্রাথমিক শর্ত পূরণে বামপন্থিরাও নিঃসন্দেহে সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে কেরালায়, যে কারণে ১৯৫৭ সালে কেরল রাজ্য গঠনের পর প্রথম যে নির্বাচন হয় সেই নির্বাচন থেকে আজ পর্যন্ত কখনই বামপন্থিরা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি কেরালায়। পিএসপির রাজনীতি চলে যাওয়ার পর থেকে কেরালার রাজনৈতিক ক্ষমতা বাম এবং কংগ্রেসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বিজেপি নয়, মুসলিম লিগও নয়। কেরালার কংগ্রেস গত লোকসভা নির্বাচনেও কেরালার জনমানসে তাদের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষা করতে পেরেছিল সেক্যুলার রাজনীতির জোরে। গত দেড় বছরে দিশাহীন কেরালা কংগ্রেস অন্ধ বাম বিরোধিতার তাগিদে তাদের জোরের জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছে। বামপন্থিদের বিরুদ্ধে তাদের যা আক্রমণ বিজেপির সঙ্গে সারের দিক থেকে তার আর তফাৎ থাকছে না। নীট ফল এটাই দাঁড়াচ্ছে যে কংগ্রেসের চিরাচরিত সমর্থন ভিত্তিটিও দুর্বল হচ্ছে, এই সমর্থনের একটা অংশ চলে যাচ্ছে বাম শিবিরে। স্থানীয় নির্বাচনে বামপন্থিদের বিপুল জয়ের প্রাথমিক কারণ এটাই। আসলে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়াবার জন্য যে মতাদর্শগত জোরের দরকার হয়, কংগ্রেস সেই জোরটি ক্রমাগত হারিয়ে ফেলছে। সারা ভারত জুড়েই কংগ্রেস দিশাহীন, ছন্নছাড়া। ভারতে ফেডারাল চরিত্র রক্ষা করা, বহুজাতিক ভারতকে একটা কেন্দ্রীয় শাসনে বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় নমনীয়তা দেখানো, ভারতরাষ্ট্রের ন্যায্যতা রক্ষার মূল সূত্রটি যে বহুত্ববাদের ভেতরে খুঁজতে হবে– বহু দুর্বলতা সত্ত্বেও এটাই ছিল কংগ্রেসের জাতীয় রাজনীতির জোরের জায়গা। জাতীয় কংগ্রেস এখন সেটাই হারিয়ে ফেলছে। রাজ্যস্তরে কংগ্রেস রাজনীতিতে তার ছাপ পড়ছে। কেরালার মতো বৈচিত্রপূর্ণ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত রাজ্যটিতে জনমানসে কংগ্রেসের এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজ্যের কংগ্রেস দল অন্ধ বামপন্থা বিরোধিতার যত বেশি রসদ খুঁজছে, সে রসদ যোগাড় করার জন্য তাকে তত বেশি আশ্রয় নিতে হচ্ছে বিজেপির মতাদর্শে। কেরালার নির্বাচনে এর দায় কংগ্রেসের ওপর কীভাবে পড়তে পারে পঞ্চায়তে ও পুরসভা নির্বাচনে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কেরালার বাম জোট কংগ্রেসের এই দুর্বলতাটি এই নির্বাচনে খুব সতর্কভাবে কাজে লাগিয়েছে। ইউডিএফ জোট থেকে কেরালা কংগ্রেস মণি অংশটিকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে সিপিএম নেতৃত্বে পরিচালিত এলডিএফ জোট। জোটের শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে তার রাজনৈতিক দিশা অক্ষুণ্ন রেখেই। কংগ্রেস যত বেশি বিজেপির মতো করে বাম বিরোধিতায় নামবে ততই কেরালার কংগ্রেসে ভাঙন আসবে, এলডিএফ আরও শক্তিশালী হবে যার ফলে। কেরালার রাজনীতিতে এই সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কংগ্রেসকে বাম বিরোধিতার পরিসরটি কোথায়, বিজেপি থেকে আলাদা সেটা ঠিক করতে হবে। প্রশ্নটি জটিল, এখনকার কংগ্রেস রাজনীতিবিদদের কাছে এর স্পষ্ট উত্তর নেই। পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে যে এলডিএফ সরকার বর্তমানে কেরালায় ক্ষমতায় আসীন, সেই সরকারটির সরকার হিসাবে কুশলতা প্রশ্নাতীতভাবে ব্যতিক্রমী। এই সরকার কোভিড মোকাবিলায় যে উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, শুধু ভারতের অন্যত্র নয়, সারা বিশ্বেই সেটি উদাহরণ হিসাবে আলোচিত হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় বিজয়ন সরকারের সাফল্য ২০১৮ সালে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারটি কেন্দ্রীয় বিজেপি শাসনের বিরোধিতায় প্রতি পদে তার বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখে গেছে রাজনৈতিক পরিসরে। কেরালার সরকার কেন্দ্রীয় কৃষি আইনের পাল্টা আইন তৈরি করেছে, ফসলের ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্যে কেন্দ্রীয় সরকার যে তঞ্চকতার আশ্রয় নেয় কেরালা সরকার তার স্বরূপ উদঘাটন করেছে ধানের সংগ্রহ মূল্যে রাজ্যের ভর্তুকি বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়ে। জিএসটি নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে কেরালা সরকার। কেজরিওয়াল কিংবা মমতা ব্যানার্জির মতো চটকদারির রাজনীতি বিজয়নের রাজনীতি নয়, ভারতবাসী তার প্রমাণ পাচ্ছে। কেরালার ভোটদাতাররাও এবিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হচ্ছেন। অঙ্গরাজ্যের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে একটি রাজ্য সরকার কী ভূমিকা পালন করতে পারে যার মধ্যে দিয়ে জনচেতনার মান উৎকৃষ্টতর হয়ে উঠতে পারে, কেরালার বাম সরকার তার প্রমাণ রাখছে। এই বামপন্থি রাজনীতি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়লেই বিজেপির একটি পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরি হবে এদেশে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..